ইউজার লগইন

নিস্ফলা শ্রেষ্ঠ সময়!

যাপিত জীবনে কিছু সময় আসে এরকম যখন প্রতিটা মুহুর্তকে দামী মনে হয়। ইচ্ছে করে সবটুকু অনুভব দিয়ে উপভোগ করি কিন্তু উপায় থাকে না। সময় চলে যাবার পরে বুঝা যায় কি চলে গেলো এই এক নিমিষে। আমরা যারা ছয় সাত বছর ধরে ব্লগে ফেসবুকে ডায়লগ বাজী করে বেড়াই, তাদের জন্যে স্বপ্নের মতো কিছু দিন যাচ্ছে। কেউ কোনোদিন ভাবতেই পারে নাই ফেসবুক ব্লগের যুদ্ধাপরাধ বিরোধী সেন্ট্রিমেন্ট এরকম গনরোষে পরিনত হবে। ফেসবুক ব্লগে বিপ্লব হয় তা আরব বসন্ত থেকে জেনেছি। কিন্তু এই শীত পালানো মাঘের দিনগুলোতে এরকম কিছু হুট করেই হবে ভাবি নি। ধারনা ছিলো কাদের মোল্লার ফাসি হবে। সবাই খুব খুশী হবে। ছবির হাটে অনেকে মিস্টি খাবে। কিন্তু হলো যাবজ্জীবন। একজন মানুষ খুনী ধর্ষক কসাইয়ের শাস্তি জেলের আটার রুটি খাওয়া তা আমার চিন্তারও বাইরে। কালকেই এক সামান্য ইভেন্ট থেকে অনেক মানুষ হয়ে জানান দিছে এ রায় মানার কোনো উপায় নাই। আজ তার পুর্নতার দিন। আন্দোলন চলছে। কাল সকালে হরতাল হীন শাহবাগে কিভাবে কি হয় পুলিশ কি আচরন করে? তা দেখার জন্য তর সইছে না।

কালকে থেকেই আমার মেজাজ খারাপ। নতুন করে বলার কিছু নাই। ব্লগেই সব বলে দেই। সকালে ঘুম থেকে উঠেই সেই রেশে বললাম মামা শাহবাগ যাবো দুপুরে খাবো না। পিসিতে বসেই দেখি দশ মিনিটে কারেন্ট নাই। মনে মনে গালিগালাজ করতে করতে চায়ের দোকান আসি। রং চা আর ভালো লাগে না। টাকা নিয়ে পরিচিত রিক্সায় উঠে বলি শাহবাগ। এমন সময় জ্যোতি আপুর এসএমএস শান্ত শাহবাগ যাবা? আমি বললাম যাচ্ছি রিক্সায়। উনিও যেতে চায়। রিক্সা ঘুরলাম। শ্যামলী শিশু মেলার ওদিক গিয়ে ওয়েট করছি। দেখি আপু হন্তদন্ত হয়ে এসে হাজির। রাস্তা ঘাট সব ফাকা। দোকান হোটেল বাজার সব বন্ধ। জামাতের হরতাল এতো কাঠিন্যে পালন হয় তা আমার জানা ছিলো না। শাহবাগ নেমে দেখে খালি মানুষ আর মানুষ। তখন মোটামুটি শুরুর সকাল। হরতালের চোখ রাঙ্গানিকে পাশ কাটিয়ে এতো মানুষ দেখে নিজেই আপ্লুত। এরা কেউ বিরিয়ানীর লোভ বা নগদে ৩০০ টাকা ধান্দা করার জন্য আসে নি। এসেছে নিজের রক্ত পানি করা পয়সা দিয়ে। বসে আছে তপ্ত পিচে প্রচন্ড খটমটে রোদে। আমি কিছু সময় দাঁড়িয়ে ছিলাম তাতেই আমার মাথা ব্যাথা করছিলো। আর তারা স্লোগান, গান, হাততালিতে মুখরিত। তাদের প্রানশক্তি দেখে ইর্ষা হলো। রোদে পেরেশান হয়ে আমি আর জ্যোতি আপু ছবির হাটে গেলাম চা খেতে। ছবির হাটে শুনশান নিরবতা। ইমনের দোকান বন্ধ। এক চাচার দোকানে চা খেতে গেলাম। চাচার দোকানে মন নাই। এমন মনে হচ্ছে যে ঠেকায় পড়ে দোকানদারি করছে। দুধ কম চিনি কম যাই কম দিতে বলি তাই বেশী দেয়। কানেও একটু ঘাটতি। শুভ ভাই আসলো। ক্যামেরা সাথে থাকলে সবার চোখ শুধু ক্যামেরার চোখে পরিনত হয়। এমন সময় ফাকা বেঞ্চের ছবি সাথে ছায়ার খেলা নিয়ে আইফোন বনাম ডিএসএলআর যুদ্ধ হলো। যুদ্ধে জয়ী আইফোন। কারন আইফোনে ছবি তুলেই শেয়ার করা যায়। আমরা শাহবাগ মোড়ের দিকে আবার হাটা দিলাম। দেখি মুক্তিযোদ্ধা সংসদের পতাকাবাহী মিছিল আসছে। অসাধারন একটা সিন। মুক্তিযোদ্ধাদের স্লোগানে পুরা শাহবাগ কাপছে। কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে সাক্ষ্যদান কারী এক প্রবাসী লোক যে সামান্য সময়ে অসাধারন আবেগময় বক্তব্য দিলো তার তুলনা হয় না। আওয়ামীলীগের নেতারাও অনেকে আসলো তারাও খেয়ালখুশী মতো বলে গেলো। আমরা ফুলের দোকানের পাশের ছায়াতে দাঁড়িয়ে ছিলাম। শুভ ভাই ছবি তুলে আগারগাওয়ের দিকে রওনা দিলো। এরফাকেই হেলাল ভাই আর মাসুম ভাইয়ের আগমন। মাসুম ভাইয়ের কাছে সাংবাদিক সুলভ তথ্য জানা। দারুন লাগে উনার তথ্য উপস্থাপনের সিস্টেমটা। হেলাল ভাইয়ের সাথে বিশাল বড় ব্যাগ ক্যামেরা নিয়ে চলছে উনি। গেলাম আবার ছবির হাট। মিনি আডডা হলো। মাসুম ভাইয়ের ছেলের গল্প শুনে ব্যাপক হাসলাম। তারপর আবার শাহবাগ তা হয়ে আজিজে মাসুম ভাই খাওয়ালো। খেয়েদেয়ে রোদে বেরিয়ে পড়লাম। জ্যোতি আপু বাসায় চলে যাবে আর মাসুম ভাই অফিসে। রিক্সা নিয়ে ফেললাম। কিন্তু রিক্সাওয়ালাটা বদ কিসিমের। উনারে যতো বলি রিক্সা আস্তে চালান। কিন্তু ফাকা রাস্তা দেখে তার মন মানে না। আমি নামলাম শ্যামলী। বাসায় যাবো ভুলে চায়ের দোকানের এড্রেস দিলাম। ভাবলাম দুপুরে খাওয়া শেষ বাসায় নাই যাই। বাসায় গেলেই ঘুমাতে ইচ্ছা করবে। চায়ের দোকানে দেখি কেউ নাই। বসে চা খেলাম। ইসমাইল ড্রাইভারের মুখে ভোলার উন্নয়ন অবদানে কে কি করছেন তার ফিরিস্তি শুনলাম। এমন সময় বিষন্ন বাউন্ডুলের এসেমেস বিকেলেই সে যাবে। আমি ভাবলাম আমিও যাই। যেই ভাবা সেই কাজ। পুলককে না নিয়েই রওনা দিলাম। কারন পুলক ফ্যামিলী বয়। ওর মায়ের কখন কি মন হবে তা আনতে পুলককে ফোন দিবে। আর কাজটা না করে দিলে পেরেশানীতে থাকবে পুলক। এসে পড়তে হবে জলদি। এইসব পেরেশানীর কোনো মানে নাই। একা একাই ভালো। রিক্সা নিলাম নিউমার্কেট বরাবর মাত্র ৫০ টাকায়। নিউমার্কেটে না নেমে রিক্সা নিয়ে ছবির হাট আসলাম। বিষন্ন বাউন্ডুলেও হাজির। কয়েকজন ফেসবুকে মেসেজ দিছিলো তাদের খুজলাম পেলাম না। শেষে রাস্তাতে বসেই বিমা ভাই, রাসেল ভাই, আমি, শুভ ভাই, বিষন্ন বাদাম চিবালাম। লোকজন বাড়তেছে। রায়হান ভাই আসলো, টুটুল ভাই-নাজ ভাবী আসলো। গল্প গুজব সাথে স্লোগান মাইকের আওয়াজে মুখরিত পুরা অঞ্চল। এরফাকেই ছাত্র ইউনিয়ন আর ফেডারেশন মশাল মিছিল। মশাল মিছিলের এই সিন সত্যিই অসাধারন। রায়হান ভাই চলে গেলো। হুট করেই উনারে দেখে মনে হলো এই রায়হান ভাই সেই রায়হান ভাই না যারে আমি চিনি। কেমন জানি দুশ্চিন্তা গ্রস্থ লাগতেছে। জেবীন আপু আর জ্যোতি আপু এলমাকে নিয়ে হাজির হলো। ঘুরলাম হেটে হেটে। মোমের আলোয় কেউ দিচ্ছে স্লোগান কেউবা গাইছে গান। অসাধারন পরিবেশ। হাজারে হাজারে মানুষ চারিদিকে। গোটা চারেক স্কুল ফ্রেন্ডের সাথে দেখা হলো নগদে। এতো মানুষ আর বিরক্তিকর মিডিয়া ক্যামেরা দেখতে দেখতেই বেলা শেষ। চারিদিকে শুধু ফেসবুক নিয়া আলাপ। হেলাল ভাই খাওয়ালো ফুচকা। খিদেও ছিলো পেটে দুই প্লেট মেরে দিলাম। ফেরার সময় হয়ে গেলো। রিক্সা নিয়ে আমি আর শুভ ভাই শ্যামলী আসলাম। সেখান থেকে সরাসরি বাসা। কি অসাধারন একটা দিন। এরকম দিন নিয়ে দিনলিপি লেখতে পারাও কপালের লিখন।

কাদের মোল্লার ফাসি চাই। এখন কিভাবে হবে এই ট্রাইবুনাল করবে নাকি কারা করবে তা আমার জানতে ইচ্ছা করে না। সব যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হবে মানুষের খুনের ফাসি হবে এইটাই আমরা চাই। শাহবাগ এখন রাসেল স্কোয়ার, সব লাভ তো নাকি আওয়ামী পেটেই গেলো এই সব নিয়ে ভাবি না। আমার ধারনা এই আন্দোলনের কোনো ফিউচার নাই। তবে ফিউচার হীন এই আন্দোলোনটাই বড় ফিউচার যে আমরা এক হয়ে দাড়াতে পারি। পাচ ছয় হাজার তরুন এক হয়ে বাধার প্রাচীর গড়ে তুলতে পারি। এই শক্তি আর সাহস যদি আমরা রাখতে পারি কারোর বাপের সাধ্য নাই আমাদের রুখার। আমি কালকেও যাবো যতদিন হবে ততদিন যাবো। প্রথম দিন যেতে পারি নি এই ব্যার্থতা আমার মনে তীব্র ভাবে গেথে আছে। হয়তো আমি স্লোগান দেই না মিছিল করি না কিন্তু আমি নীরব দাঁড়িয়ে থেকেই জানান দেই আমার অস্তিত্বের। রাজনীতি কোন পথে, কার কি ফন্দী তলে তলে তা আমাকে ভাবায় না। কে কেনো আসলো? কারা এইটা নিয়ে মাথা খারাপ করছে? কারা অযথাই লোক দেখাইতে আসছে তা নিয়ে আমি বিন্দু মাত্র পেরেশান নাই। আমাকে ভাবায় ৪১ বছরের আগের বিচারের জন্য যদি তরুনরা রাস্তায় নামতে পারে, অজস্র ডিএসএলআর হাতের মানুষেরা শক্তিমান ছবি তুলতে পারে তবে যত মীরজাফরগিরি চলুক জয় আমাদেরই হবে। স্লোগানের ভাষাতেই বলি

"আমাদের ধমনীতে শহীদের রক্ত"

পোস্টটি ১০ জন ব্লগার পছন্দ করেছেন

একজন মায়াবতী's picture


টিপ সই
প্রত্যেক রাজাকারের বাচ্চার ফাঁসি চাই

আরাফাত শান্ত's picture


এক দফা এক দাবি!

বিষণ্ণ বাউন্ডুলে's picture


ওখনকার একটা মুহূতও মিস করার মত না।

এক্সাম না থাকলে প্রত্যেকদিন দুই বেলাই হয়ত যাওয়া হত। Sad

আরাফাত শান্ত's picture


ধন্যবাদ তুমারে এতো এক্সামের ব্যাস্ততায় দুই দিনে দুইবার আসার জন্যে!

জ্যোতি's picture


অফিসে একটা হাজিরা দিয়ে আসি। দুপুরে তোমরা থাকলে ফোন দিও , দেখা হবে ।

আরাফাত শান্ত's picture


আজ়কেও ছিলাম আপনাকেও থ্যাঙ্কস এতো কষ্ট করে বসের চোখ ফাকি দিয়ে আসার জন্যে!

জ্যোতি's picture


ফেরার পথে ৩ বার রিক্সা বদলাম আজ। একবার কলাবাগান থেকে ২৭ নম্বর পর্যন্ত গেলাম একট স্কুল ভ্যানে।

আরাফাত শান্ত's picture


কষ্ট হইছে? আমার মতো তো হয় নাই যে মনের দুঃখে শাহবাগ থেকে বাসা হেটে আসছি!

জ্যোতি's picture


Sad তোমার মত কষ্ট হয়নি। তবে টনসিল ফুলেছে, গরা ব্যথায় জ্বর Sad
তবুও কাল সন্ধ্যায় যাওয়ার ইচ্ছা আছে।

১০

আরাফাত শান্ত's picture


আমি বিকেলেই যাবো। দুপুরে যেতে ইচ্ছা করতেছে না!

১১

জ্যোতি's picture


গরা = গলা

১২

লীনা দিলরুবা's picture


কি অসাধারণ দিনলিপি ! যুদ্ধকালীন বাংলাদেশে অনেক তরুণ এভাবে দিনলিপি লিখতো।
চলুক...।

১৩

আরাফাত শান্ত's picture


ধন্যবাদ আপু। আপনার এই স্নেহে মুগ্ধ হই বারবার!

১৪

উচ্ছল's picture


"আমাদের ধমনীতে শহীদের রক্ত"

১৫

আরাফাত শান্ত's picture


বৃথা যেতে দেবো না!

১৬

তানবীরা's picture


কি অসাধারণ দিনলিপি

মন্তব্য করুন

(আপনার প্রদান কৃত তথ্য কখনোই প্রকাশ করা হবেনা অথবা অন্য কোন মাধ্যমে শেয়ার করা হবেনা।)
ইমোটিকন
:):D:bigsmile:;):p:O:|:(:~:((8):steve:J):glasses::party::love:
  • Web page addresses and e-mail addresses turn into links automatically.
  • Allowed HTML tags: <a> <em> <strong> <cite> <code> <ul> <ol> <li> <dl> <dt> <dd> <img> <b> <u> <i> <br /> <p> <blockquote>
  • Lines and paragraphs break automatically.
  • Textual smileys will be replaced with graphical ones.

পোস্ট সাজাতে বাড়তি সুবিধাদি - ফর্মেটিং অপশন।

CAPTCHA
This question is for testing whether you are a human visitor and to prevent automated spam submissions.

বন্ধুর কথা

আরাফাত শান্ত's picture

নিজের সম্পর্কে

দুই কলমের বিদ্যা লইয়া শরীরে আমার গরম নাই!