নিস্ফলা শ্রেষ্ঠ সময় অংশ পাঁচ!
আজ সকালেই মামা চলে গেলো বাড়ীতে। যাবে জামালপুর সকালের ট্রেন অগ্নীবিনাতে। আমারো যাওয়ার কথা ছিলো কিন্তু এই ক্লাস টাস শাহবাগ অবরোধ ফেলে বাড়িতে যেতে ইচ্ছা করলো না। যদিও বাড়িতে যাওয়াটা খুব ইম্পোর্টেন্ট। তবে মামা এতো সাত সকালে গিয়েও পড়ছে ফ্যাসাদে। ট্রেন ছাড়ার কথা নয়টা ২০য়ে। কিন্তু এখনো ট্রেনের কোনো নাম গন্ধ নাই। সেই নভেম্বরে বাড়ি থেকে এসে আর গেলাম না। অথচ উত্তরবংগ, খুলনা এতো দুরে দূরে বাড়ী থেকেও লোকজন প্রতি মাসেই চলে যায় একটু সময় পেলেই। আর আমার বাড়ীতে যাওয়াই হয় না। আসলে বাড়ী আমার খুব যেতে ইচ্ছা করে। কিন্তু কাহিনী হলো বাড়ীতে এতো আদর যত্নের পরেও বারবার যখন মনে হয় আব্বু আম্মু আমার জন্য এতো কষ্ট করলো তাদের জন্য কি দিলাম? আমি কি করলাম জীবনে? ইত্যকার নানান হতাশায় ঢাকায় আসার জন্য মন উসপিস করে তখন। এখন আবার বাড়ীতে নতুন যন্ত্রনা। আমাদের যত প্রভাবশালী রিলেটিভ আছে তাদের মধ্যে কাকে কাকে বলবে আমার চাকরী জন্য তা নিয়ে আমার মতামত জানতে চায়। ব্যাপারটা দারুন ইন্সাল্টিং লাগে আমার কাছে। হয়তো অন্য মানুষদের মতো আমি স্মার্ট না। কিন্তু একটা চাকরী জোগার করা, মাস্টারস শেষে আমার জন্য কোনো ঘটনা না। কিন্তু আমার উদ্যমের অভাব দেখে আমার আম্মু আমার উপরে সেই সামান্য ভরসাও ছেড়ে দিছে। তাই বাড়ীতে গেলেই এখন বিপদ। তাই বাড়িতে গিয়ে এতো স্নেহ মমতার ভেতরেও এই অযথা যন্ত্রনা আমার ভালো লাগে না। তবুও বাড়ীতে হয়তো যাবো সামনের মাসেই। দেখা যাক কী হয়!
কাল ছিলো তিনমিনিট নীরবতার দিন। আমার ঘড়ি বরাবর ফাস্ট। তাই শুয়ে ছিলাম বাসায় তখনি চলে গেলো তিন মিনিট। কী যে মেজাজ খারাপ লাগছে। দুনিয়ার সব মানুষ অফিস আদালত বাদ দিয়ে হাত তুলে নীরব দাঁড়িয়ে ছিলো। আর আমি তখন শুয়ে। যাই হোক কি আর করা। তড়িগড়ি করে রিক্সা নিয়ে গেলাম সায়েন্স ল্যাব মোড় সেখান থেকে হাটা পনেরো মিনিট। শাহবাগে গিয়েই দেখি বাবু ভাই, জ্যোতি আপু,লতা, রোমান হাসান মাহবুব আল্লামা শয়তান সব ব্লগার এক সাথে। স্লোগান স্লোগানে মুখরিত অনেক মানুষ। গোল গোল সার্কেলরা নবাবপুর থেকে হ্যান্ড মাইক কিনে অস্থির অবস্থা। এইসব যখন দেখছি এক লোক সেধে চা খাওয়ালো যারা সিগারেট খায় তাদের তা সাধলো। তার এই আন্তরিকতার আপায়্যন দেখে মুগ্ধ। ব্লগারদের সাথেই গেলাম ছবির হাট। সেখানে রোমান খাওয়া অতি তেলের ভাজাবুজা। হেলাল ভাই দুই তিন রাত জাগা। তিনি আমরে বলে উঠেন শান্তরে একটা কলা আর চা খাওয়াই আমার নাম যদি নেয় পোষ্টে খারাপ কি। কিন্তু হেলাল ভাই জানে না তারে আমার কত পছন্দ। এতো তেল মনে হয় মবিল দিয়ে ভাজছে হালারা। এরপর গেলাম চারুকলা। তার দোতালায় জাহানারা ইমামের বিশাল ছবি। প্রায় আকা শেষ। এই অক্লান্ত পরিশ্রম করছে চারুকলার ছেলেমেয়েরা। আমি তো কিছুই করি না। শাহবাগ আসি ঘুরি ফিরি স্লোগানটাও দেই না। চারুকলার সেই দোতালায় রেলিং নাই। নিচে তাকালেই আমার শুধু লাফ মারতে ইচ্ছা করে। ছাদের পাশে বাসা বলে হয়তো পাচ তলা দেখতে দেখতে গা সয়ে গেছে তো। তাই দোতালা থেকে লাফ মারাটাকে খুব ইজি কাজ ভাবছিলাম। ভাগ্যিস দেই নাই লাফ। বুড়ো বয়সে ঠ্যাং ভেঙ্গে পড়ে থাকার কোনো মানে নাই। নিচে নেমে লতারা গেলো স্লোগান দিতে, শুভ ভাইরা গেলো আরেক দিকে, আর আমি বললাম যাই বই মেলায়। এখানে তো লাখে লাখে মানুষ আছেই।
বইমেলায় গেলে এখন মন খারাপ হয়। মানুষের বড় আকাল। অনেক মানুষই আছে কিন্তু তারা স্রেফ ঘুরতে আসছে। বাংলাদেশের একটা মাত্র মেলা হয় তাও যদি এই দশা হয় তাহলে কি আর করার। তবে বই বিক্রেতারা এখনো হাল ছেড়ে দেয় নাই। তাদের আসা সামনেই অনেক বিক্রি হবে। বইমেলায় অনেক বই দেখি উল্টাই পাল্টাই। কিন্তু কাল আর কিনি নাই কিছুই। উল্টাই পাল্টাই নাম পছন্দ হলেই। জাসাসের শিল্পীরা দেখি লেখক আড্ডায় বসে থাকে। বেচারারা হয়তো শাহবাগ যেতে পারে না। কি দুঃখ তাদের মনে কে জানে! বই মেলায় এখন লেখকদের জন্য খুব ভালো ভীড় কম। তারা আমোদে আড্ডা মারতে পারে। কিন্তু মিলন আংকেলের মন খারাপ। চুপিচুপি বসে থাকে। তার সেই অটোগ্রাফের ব্যাস্ততা আর নাই। রিটন ভাই আর মাজাহার ভাই থাকে বই মেলাতেই বসে। হয়তো বিকেলে চ্যানেল আইয়ের অনুষ্ঠান করে তারা ক্লান্ত। তবে বইমেলায় ছোটোদের বইয়ের নামে যা অখাদ্য বেচা হয় তা দেখে হতাশ হইলাম। ছোটো একি ধরনের বই ৫০-৬০ স্টলে। বাংলাদেশের শিশু সমাজরে মনে হয় এই গাট্টি বস্তা খাওয়ানোর জন্য তারা উঠে পড়ে লাগছে। তার ভেতরে সব চেয়ে বিরক্তি আমার ডোরেমন বইতে। এক ডোরেমন কার্টুন দিনের মধ্যে ৫ বার করে পুর্নপ্রচার। তারও যদি বইয়ের এতো ডিমান্ড থাকে তাহলে তো বিপদ। দেখলাম অভিনেতা চঞ্চল আর কোন নায়িকা আসছে। তাদের ছবি তুলে পাবলিক। মানুষ এখন সব কিছুরই ছবি তুলতে চায়। নজরুল মঞ্চের পাশে পোস দিয়ে বা ভাষা সৈনিকদের মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে ছবি তুলে। কি যে পাইছে মোবাইল ক্যামেরায়। এই সব সার্কাস দেখতে দেখতে বন্ধু নুর ফয়জুর রেজা আসলো। মাওলা ব্রাদাসের পাশে যে মিডিয়া সেন্টার আছে তার পাশেই পেপার বিছিয়ে আড্ডা দিলাম। নুর ফয়জুর রেজা ইয়াং সামু। তার লেখা মনে হয় এবারের অপর বাস্তবে আসবে একটা। গতকাল সে হল থেকে নেমে চা খাচ্ছিলো এমন সময় এক জুনিয়র এসে তারে বললো তার হল জীবনের নানান রকমের কষ্ট। আবদার করলো ওকে যে এই সব নিয়ে একটা পোষ্ট দিয়েন। আমিও তাকে আমার ফেলে আসা সামু জীবনের গল্প বললাম। টিএসসিতে যেয়ে চা খেলাম। নুরের খাদ্য পুস্টির রুমমেট ওকে কি কি বুদ্ধি দেয় তা নিয়ে মশকারী হলো। টিএসসিতেও আন্দোলোন চলছে। স্লোগান শুনতে মজাই পাচ্ছিলাম। সারা দুনিয়ায় এখন আমাদের স্লোগান এগুলাই। বন্ধু জেমস আসলো দারুন আড্ডা। বন্ধু জেমস আবার খুব হুমায়ুন আজাদ ভক্ত। তার গল্প শুনতেও খুব আনন্দ। যদিও আমি ছফাগিরির কারনে হুমায়ুন আজাদ বিদ্বেষী অনেক কথাই জানি। কিন্তু বলি না কারন আমার জানা আমার কাছেই থাক। বন্ধুদের মধ্যে তা এনে দরকার কি? ইউটিউব নাই তা নিয়ে কিছু সময় হাহাকার করলাম। আমি একটা টিশার্ট পড়ে আসছিলাম। জেমস রাত থাকার জন্য খুব জোর করলো কিন্তু চলে যাবো ঠিক করলাম। জেমস একটা দারুন ছেলে। তার অসুস্থ মায়ের পাশে তার থাকতে হবে তাই তার বাবাকে আজকে বাসায় রেখে সে কথা দিয়ে আসছে আর রাতে থাকবে না, এইটাই শেষ। থাকতে পারলে অবশ্য দারুন হতো। তবে ৯০ টাকা রিক্সা ভাড়া দিয়ে চলেই গেলাম। গায়ে বাতাস লাগছিলো। মাঘের শেষ বাতাস। আর মনে হচ্ছিলো প্রতিদিন এই রিক্সা ভ্রমন বাদ দিতে হবে। বাসে আসবো বাসে যাবো। কত সহস্র ছেলে বাসে আসছে স্লোগান দিচ্ছে তারপর চলে যাচ্ছে। পুলকের বড় বোন তার বন্ধুকে নিয়ে বাসে আসছিলো। এমন সময় এক লোক বললো এই শাহবাগ তো আওয়ামীলীগের খেলা। সঙ্গে সঙ্গে আপু আর তার বন্ধু হুঙ্কার দিয়ে ঊঠলো তুই রাজাকার। পুরা বাস থতোমতো। লোকটা পুরো শকড খায়া গেলো। এই যে আন্দোলোনের স্পিরিট তা শাহবাগ না আসলে পেতাম কোথায়।
ছোটোভাই সাইফ বললো "ভাই আগে দেশ নিয়ে ওতো মাথা ঘামাতাম না। কিন্তু এখন কি হইছে জানেন কোন দেশ নিয়ে গান আসলেই চোখ দিয়ে পানি আসে অটোমেটিক। এই যে স্লোগান দেই প্রতিদিন তোমার আমার ঠিকানা পদ্মা মেঘনা যমুনা তখন মনে হয় এই দেশ ছাড়া আমার আর পরিচয় কি?" এই আন্দোলোনের ফিউচার হয়তো তেমন কিছু নাই কিন্তু দেশপ্রেম রাজনীতির আন্দোলোনের যে পাঠশালা এখানে চলছে এর চেয়ে বড় ফলাফল আর হতে পারে না!





সিম্পলি অসাধারন
ধন্যবাদ ভাইয়া!
বইমেলা জমলো না এখনো। নতুন বইও আসছে অনেক ধীরে।
শাহবাগ- বইমেলা...ফেব্রুয়ারির কেমন কেমন দিনগুলো কেমন কেমন করে চলে যাচ্ছে। তোমার লেখা পড়লে মনে হয়, এই কেমন কেমন সময়গুলো আসলেই কেমন কেমন যেন ! সাবলীল ভাষায়, নিতান্তই সহজ-সরল তুলিতে তুমি যেমন আঁকো কেমন কেমন অনুভূতিগুলো, পড়তে কতইনা ভাল লাগে...।
লেখার গতি থামিয়ে দিও না।
ওরে বাবা, আপনার এই কমেন্টটা যখন প্রথম পড়ি তখন টানা পাচ ছয়বার পড়ছি। আহা কি স্নেহ!
ভালো থাকবেন আপু। সহস্র শুভকামনা!
কাজের কারণে সব সময় যেতে পারি না, গেলেও থাকতে পারি না। শান্তর লেখা পড়ে ঘোলে মেটাই
শান্ত, রাসেল্ভাই, মীর, গৌতম এনাদের লেখা গুলোর জন্যেই দিন শেষে অপেক্ষা করি, এদের লেখা পড়েই সারাদিনের টুকটাক কতো কি জানতে পারি।
শুভ শুরু করেছে এমনি একটা চালু রাখালেই
ওতো ডিটেইলসে আর বলতে পারলাম কই?
বাসে তো আপু পুরা ফাটায়া দিলো। ব্যপক হইছে।
আজ এত্ত মানুষ! তোমাকে মিস করছি। পারভীন আপুও তোমার কথা বলছিলো বারবার।বইমেলায়ও একটা ঢু মারলাম ।
থ্যাঙ্কু আপু। আপনাদের এই ভালোবাসা স্নেহ অমুল্য। পুলকের বোন আইনজ়ীবি তো তাই ফাটায়া দেওয়া উনার কাছে নতুন কিছু না!
বাসের আপু এইটা খুবই ভালো কাজ করসে। মুখের উপর এই গুলাকে এভাবেই বলা উচিত
সবার প্রতিরোধেই তো এই আন্দোলোন!
একদম ঠিক কথা
এই সিরিজটা কোন একসময় বই হয়ে উঠার দাবি জানাবে আপনাতেই।
মন্তব্য করুন