ইউজার লগইন

কালো অর্থনীতির তথ্যপুর্ন, রসাত্মক, সহজ পাঠ!

প্রথমেই বলে নেই আমার রিভিউ আমার মতোই সাধারন। একটা বই পড়ে আমার মতো সাধারন মানুষের কি অনুভুতি হলো তাই জানানোই আমার রিভিউয়ের দায়। এর বাইরে আর কিছু নাই। আমি কোনো একাডেমিক রিভিউ লিখতে বসি নাই। তা লেখার মেলা লোক আছে। আর লীনা আপু রিভিউ লেখার পড়ে এ বই নিয়ে আরও নতুন কিছু বলা সম্ভব কিনা তাই নিয়ে দুশ্চিন্তায় ভাবছি।

শিরোনামে আমি বলতেছি কালো অর্থনীতি। কালো শব্দটা আমার ব্যাক্তিগত পছন্দ না কারন চায়ের দোকানে বসতে বসতে আর বাইরে থাকতে থাকতে চেহারার ভেতরে যে শ্যামবর্নের ব্যাপার স্যাপার ছিলো তা তুমুল মাইর খেয়েছে। তাই কালোদের নিয়ে কিছু বললে এখন নিজেরই লাগে। আর পুলক যে ভাবে লোকজনকে নাক সিটকিয়ে বলে ঐ কাইল্লাটা কই গেলো? (আমারে না) তখন নিজের অন্তরাত্মা কেপে উঠে। একদিন হয়তো আমারো শুনতে হবে এমন ডাক। কিন্তু কালো অর্থনীতি বলা দোষের কিছু না। যেমন দোষের না কালোবাজার বা কালো টাকা বলা। বলাই যেতে পারে। আর আনু মুহাম্মদ সাহেবের মতো অজস্র লোকেরাও তাদের বইতে কালো শব্দটাই বারবার ব্যাবহার করেন।

প্রথমেই আসি বইয়ের অসাধারন ভুমিকায়। এই ভুমিকাটা পড়ার পরে যে লোক কোনোদিন অর্থনীতির নাম গন্ধেও থাকে নাই তারও পড়ার আগ্রহে টানবে। আর লেখক এতো প্রানবন্ত ভাষায় ভুমিকাটা লিখছেন অর্থনীতি আর তার নানান ধরনের পুর্বানুমান নিয়ে তা অনন্য। বিভিন্ন বড় মানুষদের ইকোনোমিকস নিয়ে বয়ান ঘটনা ও জোকসের মার প্যাচে মনে করিয়ে দেয় লেখকের আগের বইয়ের নাম ছিলো রঙ্গরসের জীবন যাপন। বইটা পড়ার সময় আমার শুধু বারবার আকবর আলী খানের পরার্থপরতার অর্থনীতির কথা মনে পড়ছিলো। এই পুস্তকটা সেই ধাচেরই অসাধারন বই। মাসুম ভাইয়ের বয়স হলে উনিও নিশ্চই এরকম বিশাল ব্যাক্তিত্বের মানুষ হিসেবে পরিগনিত হবে। বইয়ের প্রথম চেপ্টার লুটপাটের ব্যাংক। শিরোনাম দেখে ধারনা হবে তিনি হয়তো সাম্প্রতিক বিষয় আসয় নিয়ে লিখবেন। কিন্তু এখানে তিনি টেনে এনেছেন বাঙ্গালীর ব্যাংক ব্যবসার ইতিহাস ও লুটপাটের বিভিন্ন ফিরিস্তি। শিব্রামের গল্প দিয়ে শুরু করে পরিচালনা পর্ষদ সিবিএ নেতাদের প্রভাব পুরোটা পড়তে একটুও ক্লান্ত হবেন না। বরং জানার আগ্রহ পেয়ে বসবে। তারপর এরশাদের আমল, বাংলাদেশ ব্যাংকের বিভিন্ন সিদ্ধাতে ক্ষমতাসীনদের নাক গলানো, পরামর্শক নিয়োগ, কমিশন গঠন, ঋন খেলাপীদের বিরুদ্ধে এতো ছাড় তা সব কিছুই দারুন ভাবে লেখা। আর শেষে একটা সেমিনার নিয়েও যে ভাবে আলোচনা হয়েছে তাতে আপনি যতই এসব না বুঝে থাকতে চান বুঝতে আপনাকে পড়তে হবেই লুটপাটের ব্যাংক নিয়ে। এতো ছোট্ট একটা চেপ্টারে আপনি ধারনা পেয়ে যাবেন আসলে ব্যাংকে কি চলে আর কারা কি চালায়!

তারপরের চেপ্টারেই সাম্প্রতিক ইস্যু হলমার্ক নিয়ে। হলমার্কের দুর্নীতি ও জালিয়াত চক্র এতো অর্থ কিভাবে গায়েব করেছে তার অসাধারন বিবরন দেওয়া। কিভাবে পাচ লাখ টাকা আর মেয়ে কে ই৭১ কিনে দেওয়া হলো ঘুষের আদলে তাও পড়ে মজ়া পাইছি। আর বিভিন্ন সময় সোনালী ব্যাংকের নানান কর্তাকে মেনেজ করা আর প্রধানমন্ত্রীর উপদেস্টাকে তার সাথে মিলিয়ে ফেলা সব কিছুই ইন্টারেস্টিং। তবে ভদ্রলোক ভালো। বউয়ের উপরে কোনো দোষ দেয় নাই! এরকম স্বামী পাওয়াও কষ্ট। তবে অডিট টিমের সাহস দেখে মুগ্ধ হইছি।

তারপর আসলো শেয়ার বাজার নিয়ে। এখানে শেয়ার বাজারের প্রচলিত বিভিন্ন কথা খুব চমৎকার ভাবে উপস্থাপন হলো। এবং সরকারী পৃষ্টপোষকতায় আর এসইসি বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যার্থতায় যে কারসাজিটা হলো তা অকল্পনীয়। সরকারী রিপোর্ট, অর্থমন্ত্রীর বেসামাল বক্তব্য, ৯৬য়ের লিগ্যাসি সব মিলিয়ে অল্প কথায় শেয়ার বাজার লুটপাটের পুরো বিবরন পাওয়া যাবে বইতে।

কালো বেড়ালের ভেতর দিয়ে লেখক কালো টাকার প্রভাব ও বিস্তৃতি নিয়েই বলেছেন। দারুন লাগছে নোট বাজেয়াপ্তের কাহিনীটাও। এই কাহিনী আমি আগে জানতাম না। বঙ্গবন্ধু যে কতটা অসাধারন তা এখানে জানা যায়। কিন্তু পরে তার জমানো টাকা নিয়ে যে ধরনের প্রোপাগান্ডা ছড়াইছে মানুষ তাতো সবারই জানা। গত ২৩ বছর ধরে সব সরকারই কালো টাকার সাদা করার বিধানে ছিলো সুবিধাও দেয়া হয়ছে। কিন্তু কালো টাকা কেনো সাদা এতো কম হয় তার উত্তর আমাদের জানা নাই। বিআইডিএসের গবেষনা ও দেশের সামাজিক নানান বিষয়ে এর প্রভাব নিয়ে বর্ননা মুগ্ধ করার মতো। আর কেলেঙ্ককারীর একটা বিষয় বাকী তা হলো পদ্মা সেতু। মন্ত্রী প্রভাব খাটিয়ে দুর্নীতি করতে চাইছে সরকার তা বাধা দেয় নাই বরং বিশ্ব্বব্যাংকের সাথে অযথা দেনদরবার করছে তার বিস্তারিত বর্ননা বই জুড়ে। দুদকের ব্যর্থতাও চোখে আংগুল দিয়ে দেখানো হয়েছে আর বিশ্বব্যাংকের কি মনোভাব ছিলো শুরু থেকেই তাও সুস্পস্ট ভাবে জানা যাবে বই টাতে।

শেষ চেপ্টার হলো তবুও এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ। এইটাই আমাদের স্পিরিট। এতো লুটপাটের পরেও আমরা আগাচ্ছি। রেমিটেন্স বাড়ছে রপ্তানী বাড়ছে। দেশে বিদেশের শ্রমিকদের রক্ত পানি করা পয়সায় বাংলাদেশের অর্থনীতি একটা গতিতে এগুচ্ছে। এই আশাবাদীতাতেই আমাদের থাকতে হবে। এবং অগ্রগতির বাধা আজ হোক কাল হোক দূর করতে হবেই। নয়তো মুখ থুবরেই পড়ে থাকবো।
সব মিলিয়ে বইটা একজন সাধারন পাঠকের চোখে অসাধারন। বইটার কোনো সমালোচনা আমার চোখে পড়ে না। দামটাও খুব বেশী না। আর ভারী ভারী তত্ত্ব দিয়ে বইটাকে একাডেমিক বই বানানো হয় নাই যদিও রেফারেন্স হিসেবেও বইটার জুড়ি নাই। লেখকের কাছে আমার শুধু একটাই অনুরোধ থাকবে সাংবাদিকতার সুত্রে অনেক গোপন খবর বিষয় আসয় আপনাদের জানা। সেগুলোর কিছু স্যাম্পল যদি বইটাতে পেতাম তবে আমরা এইট পাশ পাঠকরা আরো অনেক কিছু জানতাম!

বইয়ের নাম কেলেঙ্কারীর অর্থনীতি। প্রকাশকঃ শুদ্ধস্বর। দাম ২৭০ টাকা।

পোস্টটি ১০ জন ব্লগার পছন্দ করেছেন

জ্যোতি's picture


প্রথমেই আসি বইয়ের অসাধারন ভুমিকায়। এই ভুমিকাটা পড়ার পরে যে লোক কোনোদিন অর্থনীতির নাম গন্ধেও থাকে নাই তারও পড়ার আগ্রহে টানবে। আর লেখক এতো প্রানবন্ত ভাষায় ভুমিকাটা লিখছেন অর্থনীতি আর তার নানান ধরনের পুর্বানুমান নিয়ে তা অনন্য।

একমত ।
রিভিউ সম্পর্কে আমার জ্ঞান নেই। তবু তোমার রিভিউ পড়তে ভালো লাগলো। বই পড়ার প্রতি আগ্রহ জাগবে আর একটা ধারণাও পাওয়া গেলো।
বইয়ের , লেখকের নামটা লিখতা!!
বইয়ের জন্য শুভকামনা।

আরাফাত শান্ত's picture


থ্যাঙ্কস আপু। এতো গেঞ্জামের ভিতরেও লেখাটা পড়ার জন্য!

শওকত মাসুম's picture


দারুণ হইছে শান্ত। অর্থনীতির বাইরের কেউ বইটা কিভাবে দেখছে সেটি বোঝার একটা ইচ্ছা ছিল। এ কারণে গভীর মনোযোগ দিয়ে আলোচনাটা পড়লাম।
প্রথাগত ভূমিকার মধ্যে ইচ্ছা করেই যাইনি। তবে ভূমিকা পড়ে পুরো বই পড়ার আগ্রহের কথা আমাকেও আরও কেউ কেউ জানিয়েছে।
সাংবাদিকতার গোপন খবর লেখার সময় এখনও হয়নি। যেদিন কোনো রাখঢাক ছাড়া বলতে পারবো সেদিন হয়তো লিখবো।

এইট পাশ মানে কি। খালেদা জিয়ার প্রতি ঈঙ্গিত করার জন্য শান্তর ব্যাঞ্চাই

আরাফাত শান্ত's picture


এই কমেন্টটা আমি বারবার পড়ছি। লেখাটা আরেকটু ভালো হয়তো হতো কিন্তু আমার এক ফেন্ড ৩০ মিনিট ধরে দাঁড়ায় রাখছি লেখাটা দ্রুত শেষ করবো বলে। এই তাড়াহুরার জন্য লেখাটা খুব বেশী ভালো হয় নাই। তবুও আপনি প্রশংসা করছেন শেয়ার করছেন তাতে থ্যাঙ্কসের শেষ নাই। শুভকামনা ভাইয়া!

আনোয়ার সাদী's picture


টোবিলে বইটি আছে। আগে পড়ি, পরে বই নিয়ে বলবো। তবে বইটির নাম ও প্রচ্ছদ ভালো হয়েছে।

আরাফাত শান্ত's picture


আপনারও একটা রিভিউ চাই। কিনবো আপনার বইটাও!

একজন মায়াবতী's picture


লীনা আপুর রিভিউ পড়লাম, তোমারটাও পড়লাম। বইটাও খুব তাড়াতাড়িই পড়বো।

আরাফাত শান্ত's picture


তুমি যে বিজি সময়ই তো নাই যে পড়বা Sad

লীনা দিলরুবা's picture


তোমার রিভিউ জোস লাগলো। স্টাইলটা দারুণ। আরো রিভিউ চাই।

১০

আরাফাত শান্ত's picture


রিভিউ লিখবো আপু। তবে আপনি যে অনুপ্রেরনা দেন তাতে লেখা আরো ভালো হওয়া উচিত কিন্তু হচ্ছে না Shock

থ্যাঙ্কসের সমুদ্র দিয়ে দিলাম আপনার নামে লিখে Laughing out loud

১১

লীনা দিলরুবা's picture


যত বই তুমি পড়েছ ...। যা জিজ্ঞেস করি তা-ই পড়া ! ওসব থেকে একটু একটু করে লেখো। বা বিষয় ভিত্তিক...। তবে এটা সত্যি শান্ত, বইপড়ার মতো অসাধারণ একটা জগৎ ছিল বলে বেঁচে গেলাম। Smile

১২

আরাফাত শান্ত's picture


আসলে পাব্লিক লাইব্রেরীতে অনেক দিন টানা গেছি তো তাই কিছু কিছু বই পড়া। আপনার মতো পড়তে পারলে আপু কি যে ভালো লাগতো। কিন্তু চায়ের দোকান আর পিসি এমবিএ ক্লাসে সময় থাকে না। তাই খুব চেস্টা করতেছি চায়ের দোকান সময় কমানোর। ওলরেডী সফল। আরেকটু কমালেই অনেক বই পড়া যাবে!

১৩

জেবীন's picture


মাসুম্ভাই'র বইটার আরেকটা সুন্দর রিভিউ পড়লাম Smile
বইটা যদিও এখনো টেবিলেই সাজানো আছে , অটোগ্রাফহীন ভাজঁ না খোলা হালে! Sad

১৪

আরাফাত শান্ত's picture


আপনি তো লেখা ভুইলাই গেছেন। শুক্কুরবারে লেইখেন কিছু একটা!

১৫

তানবীরা's picture


অসাধারণ রিভি্উ হয়েছে Big smile

১৬

আরাফাত শান্ত's picture


ওতো ভালো হয় নাই আপু। আপনাদের প্রশংসায় শুধু শুধু গাছে উঠে লাভ নাই। থ্যাঙ্কস!

১৭

নিভৃত স্বপ্নচারী's picture


রিভিউ ভাল লাগলো!

১৮

আরাফাত শান্ত's picture


থ্যাঙ্কস ভাইয়া!

১৯

বিষণ্ণ বাউন্ডুলে's picture


ক্রিটিক রিভিউ এর চাইতে পাঠক রিভিউ পড়তেই আমার বেশি ভাল্লাগে। Smile

মন্তব্য করুন

(আপনার প্রদান কৃত তথ্য কখনোই প্রকাশ করা হবেনা অথবা অন্য কোন মাধ্যমে শেয়ার করা হবেনা।)
ইমোটিকন
:):D:bigsmile:;):p:O:|:(:~:((8):steve:J):glasses::party::love:
  • Web page addresses and e-mail addresses turn into links automatically.
  • Allowed HTML tags: <a> <em> <strong> <cite> <code> <ul> <ol> <li> <dl> <dt> <dd> <img> <b> <u> <i> <br /> <p> <blockquote>
  • Lines and paragraphs break automatically.
  • Textual smileys will be replaced with graphical ones.

পোস্ট সাজাতে বাড়তি সুবিধাদি - ফর্মেটিং অপশন।

CAPTCHA
This question is for testing whether you are a human visitor and to prevent automated spam submissions.

বন্ধুর কথা

আরাফাত শান্ত's picture

নিজের সম্পর্কে

দুই কলমের বিদ্যা লইয়া শরীরে আমার গরম নাই!