বাংলাদেশের শিক্ষা সমসাময়িক ভাবনাঃ একটি জরুরী ভাবনার বই!
ছোটবেলা থেকেই শুনে আসা শিক্ষা নাকি জাতির মেরুদন্ড। তখনো আমি মেরুদন্ড মানে কি জিনিস তা জানতাম না। ভাইয়া প্রথমে চিনিয়ে ছিলো মেরুদন্ড মানে পিঠে যে হাড়ের উপর দিয়ে সোজা রাখে। আমার কাছে তখনও শিক্ষা কেনোইবা এতো গুরুত্বপুর্ন? আর কেনোইবা তা জাতির মেরুদন্ড সেই প্রশ্ন আসে নাই। ভালো ফ্যামিলীতে জন্ম তাই স্কুলে পড়ছি আমার বন্ধু রিপন যার মা বুয়া সে স্কুলে যায় না এইটাই বাস্তবতা মেনে নিয়ে ছোটবেলা থেকে স্কুলে গেছি। সবারই যে স্কুলে যাওয়া আবশ্যক সেই ভাবনা আমার আসে নাই। স্কুল কলেজের অনাকর্ষনীয় পাঠ পদ্ধতি আমাকে পড়াশুনা নিয়ে ভাবতে টানে নাই। খালি চেষ্টা করছি শেষ হয়ে গেলেই বাচি। কিন্তু ভার্সিটিতে ক্লাস করে সেই ভাবনা উড়ে গেলো। ক্লাসরুম কতো দারুন জিনিস হতে পারে তা বুঝে গেলাম। এখন ইএমবিতে পড়ছি কিছু ক্লাস যখন বোরিং যায়, শিক্ষকেরা যখন খুব ভালো মতো বুঝাতে পারে না পড়া তখন মনে হয় এদের পড়াশুনা নিয়ে পড়াশুনাটা করা জরুরী। সেরকম পড়াশুনা বা শিক্ষার একটা সমসাময়িক ভাবনা গুলোর সামগ্রিক চিত্রই তুলে ধরে গৌতম রায় সম্পাদিত এই বইটা। এই বইটা বলা যায় একটা সাইটের পাঠ্যরুপের বই। যেই সাইটটা অসাধারন। বাংলাদেশের শিক্ষা সম্পর্কিত বিষয় নিয়েই যেখানে শুধু বাংলা ইংরেজী নানান আর্টিকেল লেখা হয়, আলোচনা করা হয়।
গৌতম দার এই সাইটটা আমি চিনি অনেক দিন যাবত। কিন্তু কখনো যাওয়া হয় নি। গেলাম কখন? যেদিন তিনি জানালেন যে এই সাইটার হিট একটা ব্লগেরও উপরে। সেই রাতেই সেই সাইটের বাংলা লেখা গুলোর উপর চোখ বুলালাম। কিছুটা একাডেমিক কিন্তু খুব উন্নত ভাবনার একটা ওয়েব সাইট। যদিও বিষয়টা নিয়ে পড়া সহজ না। তাও শিক্ষা নিয়ে এরকম লেখা ভাবনার জায়গায় নিয়ে আমি আগে কখনো পড়ি নাই। সব সময় ভাবতাম এইটা এঞ্জিও আর সরকারী বিষয় আমি কি হনু? কিন্তু সাইটটা পড়েই মনে হলো ভাবার বলার অনেক কিছু আছে শিক্ষা নিয়ে। তখন ভাবলাম সাইটটা নিয়ে কিছু লেখি তা আর হই নি। এই বই নিয়েও আমার লেখার ইচ্ছা পড়ে শেষ করার পর থেকেই। গত সপ্তাহে লিখেই ফেলছিলাম প্রায় কিন্তু কারেন্ট গেলো আর সেইভ করে রাখা গেলো না। সেই লেখাটা ভালোই ছিলো। কিন্তু পড়াতে পারলাম না কাউকে তাই আজ আবার লিখছি। আশা করি এই লেখাটা ভালো হবে না ওতো।
বইটায় মোট ২২ টা প্রবন্ধ সংকলিত হয়েছে। একেকটা একেক বিষয় নিয়ে ভাবনার খোরাক যোগায়। শুরুই হয়েছে জাতীয় শিক্ষানীতির বাস্তবায়ন নিয়ে। কোনো শিক্ষানীতি এইদেশে যখন আলোর মুখ দেখে নি এটা নিয়েও বেশী আশা করা যায় না। তাও লেখক আশা রেখেছেন। কিভাবে বাস্তবায়নের পথে নেয়া যায় বা আদৌ নেয়া সম্ভব কিনা তা নিয়েও আলোকপাত করা হয়েছে। লেখক খুব সাবলীল ভাষায় তার বয়ান উপস্থাপন করেছেন, আমাদেরকে শেখাতে চেষ্টা করেন নি। রাসেল ভাইয়ের একটা লেখা এরপরেই। লেখাটা খুব অসাধারন। শিশুদের জন্য বাংলা বইয়ের যে দারুন সংকট, নাগরিক জীবনের যে পরিস্থিতি তা দারুন ভাবে উঠে এসেছে। আমি আগে জানতাম না যে যুক্তবর্ন একটা সমস্যা হতে পারে শিশুদের বইয়ের ক্ষেত্রে তা জানলাম। বিটিভির পাপেট বাজার জাত করন, সিসিম্পুর নিয়ে কথা, বাজারে চলতি শিশুতোষ বই সব কিছুই নিয়ে উঠিয়ে এনেছেন। একটা লাইন এখানে দুর্দান্ত যে "আমি বাজারে যাই, ২৫ টা মাছ, ২০ টা সবজি, ৩০ পদের যানবাহনের নামের তালিকা আর ছবি সমেত শিক্ষামুলক পুথি কিনতে বাধ্য হই।" সব প্রবন্ধ ধরে ধরে বলা সম্ভব না। তবে যে ২২টা প্রবন্ধ আছে, আপনাকে শিক্ষা নিয়ে চিন্তা করাতে বাধ্য করবে। প্রাথমিক শিক্সা নিয়ে এখানে যেমন আছে, তেমনি ড্রপ আউট কিংবা নামী স্কুলে প্রথম শ্রেনীতি ভর্তি নিয়েও কথা আছে। শিক্ষক প্রশিক্ষণ ও শিক্ষা বাজেট নিয়েও দারুন লেখা আছে। কিভাবে বাগারম্ভর করে শিক্ষা বাজেটের ভেতরে স্বাস্থ, খেলাধুলা, ধর্ম বাজেট ঢুকিয়ে শুভংকরের ফাকি দেয়া হয় সেই বিষয়ে আলোচনা আছে। বাজেট বাস্তবয়নেও কি ধরনের গাফিলতি আছে তাও চিত্রিত। শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ কিভাবে অবহেলার চোখে দেখা হচ্ছে, শিক্ষার প্রতি সরকারী বিনিয়োগ কমিয়ে ফেলা এদিকে নিয়েও যথেষ্ট আলোচনা হয়েছে। প্রান্তিক নারীদের শিক্ষা নিয়ে গৌতম ভাইয়ের লেখাটা খুব কাজের। এবং কিছু কিছু ইনফরমেশন খুব ইন্টারেস্টিং লাগে পড়তে। মাদ্রাসা ও স্কুলে ধর্মশিক্ষা নিয়ে লেখাটাও খুব আগ্রহ সৃষ্টি করে। এরকম লেখা আমি আগে কখনো পড়ি নাই। খুব তথ্যবহুল ও গবেষনা ভিত্তিক। খুব ইন্টারেস্টিং হলো ইংরেজী মাধ্যম নিয়ে আলাদা বোর্ড গঠনের দাবী জানাইছে লেখক মাসুম বিল্লাহ। লেখাটা খুবই প্রাসঙ্গিক ও যুক্তিপুর্ন। কিন্তু এতো ভালো ভালো কথা যদি সরকার বা ইংরেজী স্কুল গুলো শুনতো তাহলে তো ভালোই হতো দেশটার। কিন্তু কে শুনে কার কথা? উচ্চ শিক্ষা নিয়েও ভালো প্রবন্ধ আছে এখানে। পিইচডি না মাস্টারস লেখাটা পড়লেই আপনি বুঝবেন আপনার জন্য কোনটা পারফেক্ট! ভার্সিটি গুলোর এডমিশন টেস্ট কমানো নিয়েও মতামত জানানো আছে। প্রযুক্তি শিক্ষা ও মাঠপর্যায়ে ইংরেজী শিক্ষা কার্যক্রম নিয়ে মোটামুটি আলোকপাত করা আছে। কোচিং সেন্টার ও প্রাইভেট নিয়েও একটা বিকল্প ভাবনার কথা বলা হয়েছে। কৃষিশিক্ষা বনাম প্রযুক্তিশিক্ষা আরটিকেলটাও খুব মজার। লেখক এখানে দুইটা শিক্ষারই কি উদ্দেশে পড়ানো উচিত আর কি পড়ানো উচিত তা নিয়ে খুব সুন্দর ভাবে উপস্থাপনা করেছেন। আর শেষটা হলো দেশে শিক্ষা ও গবেষনা নিয়ে পড়াশুনার কি হাল আরো বাড়ানো যাবে কিনা তা নিয়ে আলোকপাত!
মোট কথা হলো বইটা খুব জরুরী একটা বই। কারন এতো বিচিত্র ভাবনা শিক্ষা নিয়ে আপনাকে আর কোনো বই ই পাঠ করে জানতে পারবেন না। সমসাময়িক প্রসংগ গুলোর নির্মোহ বিশ্লেষনই বইটার প্রধান শক্তি। আপনি এর সাথে সব সময় একমত হবেন তাও না। যেমন মাদ্রাসা শিক্ষা নিয়ে বা ধর্ম শিক্ষা নিয়ে লেখকের সাথে আমি একমত না। সে ভিন্ন বিষয়। কিন্তু মতামত গুলো পড়া খুব প্রয়োজনীয় ও ভাবনাটা নিজে করা খুব জরুরী। কারন শিক্ষা নিয়ে ভাববেন মানেই জাতির মেরুদন্ড নিয়ে ভাববেন। সোজা হয়ে দাঁড়ানো বা বসার জন্য মেরুদন্ড যেমন জরুরী তেমন দেশের এডুকেশনের কি হাল চাল অবস্থা তা নিয়ে ভাবা পড়াটাও সবার জন্য জরুরী। কারন আমরা মেরুদন্ড নিয়ে মাথা উচু করে দাড়াবো নাকি অন্ধকারে শুয়েই থাকবো এই চিন্তাটা সবার জন্যই তাৎপর্যপুর্ন!
বইয়ের নামঃবাংলাদেশের শিক্ষা ও সমসাময়িক ভাবনা
ওয়েব সাইটের নাম: http://www.bn.bdeduarticle.com/
সম্পাদনাঃ গৌতম রায়
দামঃ দুইশো চল্লিশ টাকা
প্রকাশক: শুদ্ধস্বর
ঠিকানাঃ শুদ্ধস্বর, বি ৬, কনকর্ড এম্পোরিয়াম শপিং কমপ্লেক্স
২৫৩-২৫৪ কুদরত ই খুদা রোড কাটাবন ঢাকা!





গৌতম রায় শিক্ষা নিয়ে লেখেন। শিক্ষা নিয়ে গবেষণা করেন। ব্লগ-এ শিক্ষা নিয়ে তার লেখালেখি আগে চোখে পেড়েছে। এখানে আলাদা করে বইটি নিয়ে আলোচনার জন্য ধন্যবাদ।
যে সাইটটির কথা বলেছেন সাইটটির ঠিকানা দিয়ে দিলে আগ্রহীদের জন্য সহায়ক হবে। লেখার নিচে বইটি সম্পর্কে যে তথ্য দিয়েছেন তাতে যদি প্রকাশক-পরিবেশক দের নাম বা প্রাপ্তিস্থান থাকে তাতে যারা যারা বইটি সংগ্রহ করতে চায় তাদের কাজে লাগবে।
শুভেচচ্ছা। ভাল থাকবেন।
ধন্যবাদ ভাইয়া। আশা করি এই ব্লগে নিয়মিত আসবেন। আপনার কথাগুলো এডিট করে দিতে চেষ্টা করছি!
ভালো থাকবেন। শুভকামনা!
@মুনীর উদ্দিন শামীম, আপনার শিক্ষাবিষয়ক ভাবনাগুলো আমরা বন্ধু ব্লগে কিংবা 'বাংলাদেশের শিক্ষা' ওয়েব সাইটে দেখতে চাই, পড়তে চাই, আলোচনা করতে চাই।
আলোচনা ভাল লাগলো।
একদিন সময় করে সাইটটা ভাল করে ঘুরে দেখার ইচ্ছা থাকলো।
পড়ে নিও
সাইটটা ভালো করে ঘুরে আপনার শিক্ষাভাবনা নিয়ে একটা লেখা দেন।
শিক্ষাবিষয়ক গৌতমদার সাইটটা ঘুরে দেখা হয়নি, অনেক প্রশংসা শূনেছি অনেকের কাছে । গৌতমদা শিক্ষাবিষয়ক অনেক পোষ্ট লিখেছেন যাতে আলোচনাটা, ভাবনাটা সবসময়ই মনে হয়েছে যে এমনই দরকার ।
বাংলাদেশের শিক্ষা ও সমসাময়িক ভাবনা বইটা নিয়ে শান্তর আলোচনা ভালো লাগলো । শান্তর রিভিউ চলুক ।
রিভিউ গুলো ভালো হয় না ওতো। আর দিনলিপি নিয়েই যেভাবে মযে থাকি তাতে রিভিউ লিখতে গেলে মাথা ব্ল্যাঙ্ক হয়ে থাকে কিভাবে লিখবো? থ্যাঙ্কস আপু এই ভাবে অনুপ্রেরনা দেয়ার জন্য!
এবার একটু ঘুরে দেখেন।
কোপাকুপি রিভিউ হইছে। ভাই, রিভিউ কিন্তু আরো চাই।
থ্যাঙ্কস ভাই। আপনার মতো ব্লগার পেয়ে ধন্য হলাম। যে কেউ আরো রিভিউ চায় আমার
রিভিউ ভালো হইছে। বইটা পড়ে দেখতে হবে। শিক্ষাব্যবস্থার কালো দিক কি হতে পারে তাতো ভাই হাড়ে হাড়েই টের পাচ্ছি !!
ঢাকায় আসো হলে গিয়ে দিয়া আসবো নি!
সাইটটা খুব ভালো লাগলো। শান্তর পোস্টের জন্যে জানতে পারলাম।
থ্যাঙ্কস বন্ধু!
ভাল হৈছে রিভিউ। প্রিয়তে রাখলাম, সময় পেলে পড়ব।
দৌড়ের উপর আছি
দোড় ঝাপ করে শরীর ফিট রাখেন!
দৌড় শেষ হলো?
শান্তর এই লেখা পড়ে গৌতম দা যদি না খাওয়ায় তাহলে তারে ধিক্কার
ধিক্কার দেন আর না দেন, রান্না কিন্তু সুস্বাদুই হইসিল।
রিভিউ ভালো হইছে। বইটা পড়ে দেখতে হবে।
আপনার কাছেও তাইলে একটা রিভিউর দাবি থাকলো।
মাঝখানে পুরা একটি দিন নেটে ছিলাম না, তাই এই লেখাটার কথা জানতেও পারি নি। আজকে একজন ফোন দিয়ে বললো লেখাটার কথা। পড়ে পুরা টাশকি খাইসি। শান্ত ভাইয়ের সাথে সেদিনও সিরিয়াস আর অ-সিরিয়াস লেখা নিয়ে কথা হচ্ছিল- তিনি যে অসিরিয়াসভাবে সিরিয়াস সিরিয়াস কথা বলে ফেলেন- এবং আমি যে সেইটায় মুগ্ধ সেটা জানিয়েছিলাম তাঁকে। এরইমধ্যে তিনি যে এরকম একটা সিরিয়াস পোস্ট লিখে ফেলবেন ভাবতেই পারি নি। ...কিন্তু এজন্য তাঁকে আনুষ্ঠানিকভাবে ধন্যবাদ দিচ্ছি না, কারণ ধন্যবাদে সবকিছু প্রকাশ করা যায় না। বই পড়ার পর যাদের কাছ থেকে মতামত, মন্তব্য আশা করি, তিনি তাঁদের একজন।
শান্ত ভাই এবং অন্য যারা বইটি পড়েছেন, কোনো ভুলত্রুটি থাকলে (থাকলে মানে, আছে অবশ্যই, নিজেই অনেক ভুল পেয়েছি- এর বাইরে আরও নিশ্চয়ই আছে) ধরিয়ে দিলে কৃতজ্ঞ থাকবো যাতে তা পরবর্তী সংস্করণে সংশোধন করতে পারি।
ধন্যবাদ ভাইয়া। তাড়াহুরায় অনেক ভুল ছিলো তাও সাদরে গ্রহন করছেন।
মন্তব্য করুন