ভীড় ঠেলে আয়, সামনে দাঁড়া!
সাভার বিপর্যয়ের পরে কত মানুষ কত ভাবে মাঠে নামলো, কত কাজে কতো ভাবে ঝাপিয়ে আত্মনিয়োগ করলো অথচ আমি কিছুই করতে পারলাম না। একে তো পকেটে টাকা নাই। তারপর আবার যাওয়ার ইচ্ছাও পেলাম না। এতো লাশ এতো মৃত্যু যে দেখতেই ভালো লাগে না। তাও মানুষ যাচ্ছে। দেলোয়ার সাহেবের মতো বাস ড্রাইভাররা বাস চালানো বাদ দিয়ে সারা দিন রাত সাভারে ছিলেন। কী একটা অবস্থা! আমারে বলতেছেন মামা অবস্থা ভয়াবহ। ঐখানের আশে পাশে থাকলেই বা উদ্ধারে সামান্য হাত লাগালেই দেখবেন নিজেকে স্বাভাবিক মানুষ মনে হচ্ছে না। অনিক এনথ্রপোলজির ছাত্র জাহাংগীরনগরের। ও গিয়ে খালি দাড়ায়া ছিলো ডেইলী। আমাকে এসে বললো লাশের গন্ধ এতো খারাপ মনে হয় নিজেও লাশ হয়ে যাই। আমার এক ছোটো ভাই রাজী। যে সাভারের ঘটনার পরের দুই দিন কিছুই খায় নি শত অনুরোধেও। নিজের রুমের রিভলবিং চেয়ারে সারাদিন বসে থাকা এক রাশ মন খারাপ নিয়ে তার। আমার সেরকম কিছুই হয় নি। নিজের তীব্র মন খারাপ নিজের ভেতরেই রেখে আমার দিন যাচ্ছে। আমি কিছুই করতেছিনা, কিছুই করি নাই, খালি বসে বসেই ট্রাজেডীর পরের দিন গুলো পার করলাম। সকালে ঘুম থেকে উঠে হাটতে বের হই। হেটে হেটে ক্লান্ত হয়ে চায়ের দোকানে ফিরি। কানে জমে থাকে বাজাইরা পাব্লিকের আজাইরা সব কথা। কানে যেনো কিছুই শুনতে পারি তাই হেডফোন দিয়ে গান শুনি। কিন্তু গান শুনতেও এখন আর ভালো লাগে না। মাঝে মধ্যেই গান বাজনাকে আমার খুবই অর্থহীন এক জিনিস বলে মনে হয়। হাজারে হাজারে মানুষ মরছে আর রেডিওতে গান বাজছে ও চ্যাংড়া চাবিওয়ালা/ বাড়াইস না আর মনের জ্বালা। কি উদ্ভট এই দেশের বিনোদন জগত। এই বিনোদনের জগতের অন্যতম বড় পুরুস্কার মেরিল প্রথমআলো তারকা পুরুস্কার হয়ে গেলো এই জঘন্য সময়ের ভিতরেই। তার পক্ষে বিপক্ষে লোকজন গত চার পাচ দিন ধরে তুমুল হট্টগোল করলো। তবে আমি দোষ যেমন আলোরও দেখি। তেমন দেখি আগত স্টারদেরও। দেশের এতো খারাপ দিনেও তথাকথিত স্টারদের নুন্যতম কমনসেন্স গড়ে উঠলো না। কোথায় কি করা উচিত? কোথায় যাওয়া উচিত না তার কিছুই তারা বুঝতে চায় না। খালি চিনে ধান্দা। যদি কয়েকজন স্টারও না যেতো তাহলেই তো অনুষ্ঠান পন্ড হয়ে যায়। এই সব লোকরা নাকি স্টার। এদের স্টারডমের খেতায় আগুন। শুধু টেলিভিশন স্টার না, বাংলাদেশে নানা শ্রেনী পেশার তথাকথিত স্টাররা এতো লেইম কিছিমের লোক দেখলেই হতাশা লাগে। অথচ এই দেশের সাধারন মানুষ কত কান্ডজ্ঞান সম্পন্ন ইন্টিলিজেন্ট তার প্রমান তারা বারবার দেয়। ফেসবুকের নানান পেইজে সেচ্ছাসেবকদের ছবি চেহারা দেখছিলাম। কতো সাধারন একেকটা মানুষ কি দারুন ভাবে অসাধারন। এরা কেউই সমাজের সুবিধাভোগী স্টার শ্রেনীর মানুষ না। শুধু একেকটা প্রান বাচানোর আশায় তারা হন্যে হয়ে মরন ঝুকি নিয়ে তুলে আনলো কত প্রান। স্টারদের ভেতরে একমাত্র ইরেশ জাকেরদের গ্রুপটাই অক্লান্ত পরিশ্রম করে গেছে আহত ও উদ্ধার হওয়া শ্রমিকদের সেবায়। একজন আমাকে বললো ইরেশরা এতো কিছু করলো আমরা তো কিছু পারলাম না করতে। আমি বললাম আমার তো বাবা আলী জাকের না। আমার এশিয়াটিক এমসিএলের বড় মালিকানার জবও নাই। সর্বোপরি চিটাগাংয়ের এক সাধারন স্কুল থেকে পাশ করা তাই বুর্জোয়া বন্ধু বান্ধবও নাই। মাসের শেষের দিকে সাভারে যে যাবো সেই গাড়ী ভাড়াটুকুও ছিলো না। ঢেরশ ভাজী কিংবা ছোটো মাছের চচ্চরি খেয়ে দিন কাটে। মনের ভেতরে পাথর চাপা দুঃখ মনেই রাখি। কিছুই করতে পারলাম না এই কষ্ট পীড়া দেয় প্রচন্ড। সামনের মাসে ইচ্ছা আছে টাকা যা পাই হাত খরচ নান্নুরে দোকান বাকি দিয়ে সব তুলে দিবো সাভারের সাহায্যের জন্য। যা আছে কপালে। এমনিতেই টানাটানিতেই থাকি। সেভাবেই যাক। তবে সাহায্যে নামেও পাব্লিকের ভন্ডামী কম না। আমাদের মোহাম্মদপুরে তথাকথিত নওমুসলিমদের এক এঞ্জিও আছে। সেই এনজিও সাভারের টাকা তুলতেছে মসজিদে মসজিদে। আমি সংঘঠনটাকে হারে হারে চিনি। আমি শিউর অর্ধেকেরও বেশী টাকা তারা নিজেরা অফিস টফিস চালাতে যে খরচা তাতে ব্যায় করবে। এরকম ধান্দা বাজদের সংখ্যা কম না। তাই হিসাব কিতাব করে টাকা পয়সা দেয়াটাই বাঞ্চনীয়।
বাংলাদেশ জিতলো। গত টেস্টে হারার পর মনে হচ্ছিলো মনিটর ভাঙ্গী। কারন আমি অনলাইনে খেলা দেখি। সাধের ডাটা গুলারে এতো সহজে খরচা করে। তাও যদি এরকম খেলা খেলে কি আর করা যায়। গত টেস্টে যখন হারলো তখন মন খারাপ থাকলেও খুব হাসি ঠাট্টায় ছিলাম। রাতের বেলা আমার বিসিএস রিটেনে হয়ে যাওয়া উপলক্ষে ভাইয়ার অফিসে খানা। মামা রান্না করছে দারুন খিচুরী বেগুন ভাজি আর গরুর মাংস। খেয়ে টেয়ে অস্থির অবস্থা। অফিসের ভেতরে ভাইয়ার বন্ধু আর ছোট ভাইরা। আসছিলো কিশোর ভাইও। কিশোর ভাই কতো দারুন একজন মানুষ+ কারটুনিস্ট। ভগ্ন স্বাস্থ্য হয়ে আছে এখন তার। কিন্তু সেই তেজী তার্কিকের প্রতিভাটা এখনো ছাড়ে নাই। অনেক দিন পর সবার সাথে খেয়ে খুব শান্তি লাগলো। সবাই আমার বিসিএসের জন্য শুভকামনা আর অভিনন্দন জানালো। খুব আনন্দই পাচ্ছিলাম। কিন্তু কাল সকালেই এক বন্ধু জান্নাতে খিচুরি খাওয়ালো। এতো টেস্ট তাও ভালো লাগছিলো না। বিকেলে জানলাম বাংলাদেশ টেস্ট জিতছে। কিন্তু কিছুতেই আনন্দ নাই। সব যেন বিষাদের দিন যাপন। বাসায় বই পড়তেছি। অব্যাক্ত শেষ করলাম। হলেও হতে পারতো সেই দুলাভাইয়ের ফাসির মঞ্চে তেরো জন শেষ করলাম। লীনাপুর ভাইয়ের সিলভিয়া প্লাথের অনুবাদও শেষ করলাম। এতো এতো বই পড়ছি কিন্তু কোনো কিছুতেই মন খারাপের রেশ কাটছে না। মন ভালো করাতে ফেসবুক এক্টিভেট করলাম তাও একগেয়ে। সব মাহমুদুর রহমানের দল ফেসবুকে। যারা নিজেদেরকে ভালো ধার্মিক মানুষ প্রমান করতে হাজতে কোরান শরীফ বুকে জড়িয়ে হাটে। আর কেউ অসাম্প্রদায়িকতা প্রগতিশীলতার মুখোশ বুকে জড়িয়ে হাটে। কিন্তু কেউই কোনোটাতেই বিশ্বাস রাখে না। খালি লোক দেখানো প্রমান করা। আমিও লোক দেখানোর কাজ কম করি না। কিন্তু তাই বলে এতো মুখোশ নিয়ে চলার নাম জীবন হতে পারে না। নগরে আবার হেফাজতিরা আসছে। পাচ তারিখেও তারা হয়তো , সফল একটা অবরোধ করবে। ধুমায়িত শিক কাবাবে যেমন পাখা দিয়ে বাতাস করে। সেরকম বাতাস বিএনপি করবে হেফাজতিদের। আর ধর্ম রক্ষার শিক কাবারের ঘ্রান শুনে আমরা ভুলে যাবো সাভারের গলিত লাশ আর কাটা হাত পায়ের কথা। যেভাবে আমরা ভুলেছি নীমতলি, স্প্রেক্টাম, তাজরীন, কতো লঞ্চ ডুবি আরো কতো ট্রাজেডির কথা। রাসেল ভাইরা আজো জেলে। কবে মুক্তি পাবে ঠিক নাই। এই মানুষ গুলার মনোবল সেলফরেস্পক্ট সব গুড়িয়ে দিলো এই সরকার। অবশ্য সরকারের কি দোষ। এই ফখা চখার আমলে বেচে আছি তাই সাত জনমের পুন্যের ফসল।
ব্যাক্তিগত নানান কারনেও মন খারাপ। ফয়সাল ভাইটা মারা গেলো স্ট্রোক করে। যে মানুষটা আমারে দেখলেই বলতো শান্ত সাহেব আপনাকে পাঞ্জাবীতেই ভালো লাগে। তার লাশ আজিমপুরে কবর দিয়ে আসা হলো। এতো হাসি খুশী কতো গল্প জানে সেই মানুষটা আজ তিনি অন্ধকার কবরে। প্যাকেটে প্যাকেট গোল্ডলীফ খেতে খেতে আমাকে বলতো আপনি আর কতো চা খান? এক কালে আপনার তিন গুন চা খাইছি সেই মানুষটার আজ কুলখানীর দাওয়াত। কিচ্ছু ভালো লাগছে না ভাবতে। সোসাইটি ৬য়ে আর এক ভদ্রলোক তার শ্বাশুরীকে খুন করছে। তার তিনদিন আগে বউকে তীব্র আহত করে হাসপাতালে। লোকটা নাকি আওয়ামীলীগের পাতি নেতা। তাই সন্ধ্যা বেলায় দেখলাম পোলাপান রাম দা কিরিচ নিয়ে তার বাসা পাহারা দেয়। পুলিশ প্রথমে ঢুকতে পারে নাই। পরে র্যাব টেব এসে বুঝিয়ে শুনিয়ে উনাকে জেলে নিয়ে গেলো। এই খুনীরা কি ভাবে না যে যত হেডম থাকুক তারাও একদিন মরবে নির্মম ভাবেই? অরুপ রাহীর গান আছে মরার দেশ ভালো লাগে না। আসলেই দেশটা মরার। মানুষ খালি মরছেই আর মরছেই। কোনোথামা থামি নাই। পোস্টটা শেষ করি শিরোনামটা যে আশাবাদ দিয়ে যে ভীড় ঠেলে আয়, সামনে দাঁড়া। কেউ না কেউ দাঁড়াবেই আর সাধারন মানুষ তো দাড়াচ্ছেই। ভোর আসবেই একদিন!





মন খারাপের দিনে এমন লেখা পড়লে মনটা আরও খারাপ হয়ে যায়।
ভোর আসুক, রোদ উঠুক- ঝলমলে রোদ!!
হুমম সেটাই। ভোর হোক মুছে যাক সব গ্লানি!
ব্লগে ঢুকতে ইচ্ছে হচ্ছিল না। কোন লেখা পড়ি নাই। তোমারটা সামনে খোলা ছিল, কখন খুলেছি জানিও না। জানি না কখন পড়ে ফেললাম! টাকা পয়সা দিতে না পার, যেতে না পার সাভারে, তাতে কোন সমস্যা নাই। এই যে তুমি ওদের জন্য এত ফিল করলা এটাই বা কম কিসের? একদিক দেইখ অনেক টাকা আসবে, দুয়া করি, সেই দিনও যেন তুমি এইভাবেই ভাব। আল্লাহ তোমার ভাল করুক!
ভালও থাকবেন ভাইয়া আপনিও। পোস্টানো থামায়েন না!
বাংলাদেশ টেস্ট জিতছে। কিন্তু কিছুতেই আনন্দ নাই। সব যেন বিষাদের দিন যাপন।
থ্যাঙ্কস শমসীর ভাই। খালি খালি আমার লাইগা আপনার এত পেরেশানী!
একটা কিছু করতে না পারার যণ্ত্রনার অনুভূতি সবারই বোধহয় অনেকটাই কাছাকাছি! :'(
ভোর আসবেই। ইন শা আল্লাহ।
হুমম সেটাই। দেখা যাক কবে আসে?
আজ ৫ মে. বসে বসে টিভিতে শুয়োরের পাল দেখছি। মনটা তীব্র খারাপ হল
খাটি কথা
খাটি কথার বেইল নাই। গুজব আর স্টান্টবাজীর বেইল আছে এখন!
মন্তব্য করুন