ইউজার লগইন

ঈদ এসে ঈদ চলে যায়!

ঈদ শেষ হয়ে গেলো। মুক্তি পেলাম। এখন ঈদ আমার কাছে একটা দিন যেদিন ভোর বেলায় গোসল করে সকাল নামায পড়া, সারাদিন টিভি দেখে, আম্মুর হাতে ভাল খাওয়া আর হাসি সুখীময় মুখ নিয়ে বসে থাকা! অনেকেই বলবেন ভালোই তো যাচ্ছে, বাবা মার কাছে বাড়ীতে একাকি এত আতিথেয়তায় দিন কাটানোর সুযোগ সময় কয়জনের হয়? তা অবশ্য ঠিক। কিন্তু ঠিক বেঠিকের এই দোলাচলে বন্ধু বান্ধব ছাড়া দিন পার করা আমার পক্ষে কষ্ট। কতটা কষ্ট তা বলা কঠিন! তবে এই গত তিনবছর ধরে ক্রমাগত ঈদে এই একাকি ঈদ পালন করতে যেয়ে বড্ড বোর হচ্ছি। নানুবাড়ীতে গেলেই অবশ্য সমস্যার সমাধান, সেখানে মামা আছে আরো অনেক মানুষ। কিন্তু যেতেই ইচ্ছা করে না। কি অদ্ভুত আমার নিস্পৃহতা। সারাদিন টিভি আর বই পড়েই ঈদের দিন গুলো পার করলাম। টিভিতে আসলে দেখার মত কিছুই হয় না। তাও অনবরত চ্যানেল পাল্টে গেছি, ভুষি মাল মার্কা সব প্রোগ্রাম গিলে খেয়েছি। গিলে আবার মনেও রেখেছি ঢাকায় ফিরে লিখবো বলে । আমার মত পিছ জগতে বিরল এইসব রদ্দি মাল দেখে তা নিয়েও কেউ এতো সময় নষ্ট করে আবার লিখবে! তবে ভালো হতো ফেসবুকের মতো সাথে সাথে লিখে ফেলতে পারলে। তাতে ভালো লেখা যায়। সাত আট দিন পড়ে যখন লিখবো তখন কিছুটা আরোপিত ভাবনা মনে হবে। তাত্‍ক্ষনিক প্রতিক্রিয়ার যেই ভাবনা গুলো ছিল তা টোটালি মিস।

বন্ধু বান্ধব আর ঢাকা শহর ছাড়া আমার ঈদ হলো আব্বুর আম্মুর সাথে থেকে চার দেয়ালের মাঝে স্বেচ্ছায় নির্বাসিত থেকে টিভি দেখা আর ভালো খাবার খেয়ে চলা। আরো দুইটা কাজ করি তা হলো এলপি গ্যাসে নিজে নিজের চা বানাই আর ঈদসংখ্যা ও বই নিয়ে বসে থাকি। তবে রিমোট টেপা নিয়ে ব্যাস্ত থাকলে চা ও ঠান্ডা হয়ে যায় আর বই পড়াতেও অমনোযোগ আসে। বাড়ীতে সব বাংলা হিন্দী চ্যানেল নাই। তাও আমি যত টিপি আমার মনে হয় ক্যালকুলেটারে ক্লাস নাইনের রেওয়ামিলের যোগ করতেছি। আমার রিমোট টেপার অত্যাচারে বাবা মা অতিষ্ট। এইজন্যে আমি টিভি দেখতে বসলে কেউই রুমেই আসে না। আব্বু আম্মু আমাকে নিয়ে দুশ্চিন্তা তাও টিভি দেখতে বসলে জানায় না। কারন আগে জানিয়ে, তারাই পড়ছে ফ্যাসাদে। কারন সামান্য কথাতেই আমি যে সিরিয়াস রেনসপন্স করি তাতে তাদের ভালো শিক্ষাই হইছে। তাই টিভি দেখি বই পড়ি গান শুনি চা খাই সব আমার মত করে। আব্বু আম্মু খালি উপদেশ দেয় এটা কর ওটা কর, আমি খালি শুনে যাই। বাড়ীতে আসলে পাচ ওয়াক্ত নামায পড়া হয় তা মুলত মায়ের আদেশ পালনেই। মসজিদে যেতে বলে তা আর যাই না ঘরেই ঐ কাজটা করে ফেলি। নিজে নিজে ভাবি বেকার তাও কত ভাব আমার, চাকরী বাকরী করলে তো তাদের আর বিপদ ছিলো আমার তাফালিংয়ের চোটে। তবে এই বেকার বেকার থেকে লম্বা সফরে আসলে আমারই মন খারাপ থাকে। আর কতদিন আমাকে নিয়ে চিন্তায় থাকবে বাবা মা। এত চিন্তার কোন কারন দেখি না তাও তাদের চিন্তা। তখন আমার মনে হয় এত সুখ সচ্ছল জীবনে আমার এই মাস্টারসের ঝক্কিতে মনে হয় এই ছাত্র বেকারত্বই পথের কাটা। তাই মাঝে মাঝেই অহেতুক মরে যেতে ইচ্ছা হয়। তবে আত্মহত্যার সাহস আর তার যৌক্তিক কারন কখনোই পাই না। তাই মিছে মিছে এত ভাবনায় তাড়িত হই। বাবা মা ছাড়া অবশ্য আমাকে নিয়ে এত আর কেউ ভাবে না। ভাবার কারনও নাই। কারন সবাই মনে করে আমার মতো সুখী কে আছে? কত আরাম আর আনন্দের জীবন আমার। কিন্তু নিজ ভুবনে বিষাদগ্রস্থ একেকটা দিন পার হয়। এই বিষন্নতা এড়াতেই বই পড়ি ক্লান্তিহীনভাবে, টিভি দেখে দিন চালাই অবিরাম। তবে ঢাকায় থাকলে এইসব আমার মাথাতেই আসে না। আড্ডা মেরে, ক্লাস আর এক্জামেই দিন কেটে যায়। এমনি সময় বাড়ীতে আসলেও এতো বিষাদ লাগে না। কিন্তু ঈদের দিন গুলাতেই এত ভাল খাবার, এত আদর আপ্যয়নেও মন হয় কিছুই হবে না আমাকে দিয়ে! ঈদে তাই ফোনে বন্ধুবান্ধব কাছে কিংবা দুরের সবাইকে কল দেই, মোবাইলে ফেসবুকে বসে থাকি, অযথা আড্ডা জমাই। কিন্তু আজ সারাদিন অনলাইন হয়ে বসেই ছিলাম তেমন কেউ নকই করলো না। এত মানুষকে এত টেক্সট দেই এত খাতির কিন্তু একটা টেক্সট ও আসলো না সারাদিন। দুপুরে তাই আশ্রয় নিলাম বইয়ের কাছে। সন্ধ্যার ঠিক আগে আগে বইটা শেষ করলাম। মান্টোর শ্রেষ্ঠ গল্প পড়ে আর ঘুমিয়েই দিন চলে গেল। ঘুম থেকে উঠে মনে হলো বই পড়ার চেয়ে শ্রেষ্ঠ আশ্রয় আর কোথায় পাবো?

ঈদ অবশ্য আমার গত সাত আট বছর যাবতই ভালো কাটে না। যতদিন যাবত ঢাকায় থাকছি। আমার মনে আছে প্রথম যে ঢাকায় ঈদ করলাম। নামায শেষে আমার কান্না পাচ্ছিল। একটা মানুষ নাই কোলাকুলি করার এত বড় মসজিদে। বাসায় শুয়ে কেদেছি চিটাগাংয়ের বন্ধুদের জন্য। তার পরের বছর থেকেই অজস্র বন্ধু বিকালে আড্ডা জমিয়ে দারুন কাটে। তারপরের বছর পেয়ে যাই বন্ধু এহতেশামকে। দুই বন্ধু ঘুরে বেড়াই ঢাকা শহরে শুধু রিকসায়। কতো গল্প আমাদের। ওর মুখে শুনি কলিজিয়েট স্কুলে ওর বেড়ে উঠার গল্প আর আমি বলি আমার কিশোর বেলার গল্প। কি যে মজা লাগতো এই লম্বা সময়ের আড্ডাতে। কোরবানীর ঈদে ঘটতো বিপত্তি। কারন কোরবানী সংক্রান্ত সব কিছু আব্বুই করে। আমি ফ্রি। বন্ধু তো আর আজাইরা না তার সেদিন অনেক দ্বায়িত্ব। কি আর করা একা একা টো টো করে ঘুরে বেড়াতাম। তাতীবাজারে এক বন্ধু তার ছাদে বসে টুয়েন্টি নাইন খেলতাম। তাস খেলা আমি ভালো পারিও না আর ভালোও লাগে না খেলাটা। তাও সময় তো কাটে, সেই উসিলায় আরো কিছু বন্ধু জুটে যায়। তারা গাজা মদ খেয়ে পিনিকের সময় কাটায় ঈদে, আমি ছাদে শুয়ে থাকি। রাতের আকাশ দেখে আর তাদের মাতলামি দেখে মজা পাই। জীবনে খালি বন্ধুদের এইসব জিনিস খেতেই দেখলাম নিজে ভুল করেও ট্রাই করি নাই। এইসব আমার সংস্কার। খুব মেনে চলি, তা বেহেশতে যাবার আশায় না নিজের সাথে সত্‍ থাকার আশায়। এভাবেই ঈদ গুলো কেটে গেল ঢাকার। তারপর থেকে বাড়ীতে আসা ঈদ শুরু। ছোট্ট একটা ঈদ গা আমাদের। ইমাম চাদার আর দানের টাকা সমানে পকেটে গুজে আর বয়ান দেয়। প্রতি ঈদে একি বয়ান একই সুর। আমার একই ধরনেই ঈদে শুধু সময় পার করতে আসা বাবা মায়ের সাথে!

পোস্টটি ৭ জন ব্লগার পছন্দ করেছেন

টোকাই's picture


খুব মজায় দিন কাটাচ্ছেন বাড়িতে, বুঝতে পারছি। যতক্ষন পারেন কাটিয়ে নেন বা্বা মায়ের সাথে। আবার তো ঢাকার ব্যস্ত জীবনে ব্যস্ত হয়ে যাবেন, তখন তো আর মায়ের তদারিক চাইলেও পাবেন না।

আরাফাত শান্ত's picture


তা অবশ্য ঠিকই বলছেন। আপনারও দিন ভালো কাটুক। আসলে মানুষের যখন যেটা থাকে না, তার জন্যই চিন্তা করে। যা যা আছে তা হারালেই বোঝা যায় কি দামী জিনিসটা হারালাম!

তানবীরা's picture


কারন সবাই মনে করে আমার মতো সুখী কে আছে? কত আরাম আর আনন্দের জীবন আমার। কিন্তু নিজ ভুবনে বিষাদগ্রস্থ একেকটা দিন পার হয়। এই বিষন্নতা এড়াতেই বই পড়ি ক্লান্তিহীনভাবে, টিভি দেখে দিন চালাই অবিরাম।

এরকম সিচু্য়েশনে অনেকেই আছে Big smile

আরাফাত শান্ত's picture


সবার যদি যায় তাহলে ত ভালোই। আপনার যেন না যায়। ভালো থাকেন, শুভকামনা!

তানবীরা's picture


আমি আর ডিপ্রেশান .।.।.।.।.।.।.।। কে কার অলংকার Big smile

আরাফাত শান্ত's picture


অলংকার হয়েন না, দুরে থাকা মেঘের মতই এর থেকে দুরে দুরে থাকেন!

নিভৃত স্বপ্নচারী's picture


এবার ঈদ হয়নি আমাদের। মা-বাবা, শ্বশুর আগেই বিদায় নিয়েছিলেন, আর ঈদের ঠিক আগের দিনই শ্বাশুরি চলে গেলেন.. Sad Sad Sad

আরাফাত শান্ত's picture


আপনার এই দুসংবাদের পোষ্টটা পড়ে আমারই মন খারাপ হলো!

শওকত মাসুম's picture


ঈদে তিনদিন ছুটি পাই এটাই বড় প্রাপ্তি

১০

আরাফাত শান্ত's picture


আপনাদের জন্য অবশ্য ছুটিটাই মুখ্য, আরাম আয়েশে কাটিয়েছেন তো?

১১

বিষণ্ণ বাউন্ডুলে's picture


কালকে পরশু আমার আবার ঈদ!
নানাবাসা যাবো, তাই। Smile

১২

আরাফাত শান্ত's picture


তাই নাকি? ভালো, আনন্দে কাটান!

মন্তব্য করুন

(আপনার প্রদান কৃত তথ্য কখনোই প্রকাশ করা হবেনা অথবা অন্য কোন মাধ্যমে শেয়ার করা হবেনা।)
ইমোটিকন
:):D:bigsmile:;):p:O:|:(:~:((8):steve:J):glasses::party::love:
  • Web page addresses and e-mail addresses turn into links automatically.
  • Allowed HTML tags: <a> <em> <strong> <cite> <code> <ul> <ol> <li> <dl> <dt> <dd> <img> <b> <u> <i> <br /> <p> <blockquote>
  • Lines and paragraphs break automatically.
  • Textual smileys will be replaced with graphical ones.

পোস্ট সাজাতে বাড়তি সুবিধাদি - ফর্মেটিং অপশন।

CAPTCHA
This question is for testing whether you are a human visitor and to prevent automated spam submissions.

বন্ধুর কথা

আরাফাত শান্ত's picture

নিজের সম্পর্কে

দুই কলমের বিদ্যা লইয়া শরীরে আমার গরম নাই!