পনেরোই আগষ্ট, মান্টোর শ্রেষ্ঠ গল্প!
শোক দিবসের এই সকালে ঘুম থেকে উঠেই চা খেতে খেতে এই পোষ্ট লিখতে বসলাম। কি লিখবো তা আসলে এখনো মাথাতে আসে নি, আর পনেরোই আগষ্টের সকালে লেখা খুব সহজ না। সেই দুঃসহ স্মৃতি যা আজো বাঙ্গালীর এক ভয়াবহ ট্রাজেডীর নাম। আমি অবশ্য খুব শোকার্ত হই না। কারন এই নির্মম হত্যাকান্ডের এক যুগ পরেই আমি দুনিয়াতে আসছি। নিতান্তই আওয়ামী মনস্ক পরিবারে না জন্মালে এই ব্যাপারটা নিয়ে তেমন জানারই সুযোগ রাখে নি সেই সময়ের রাষ্ট্রক্ষমতার মানুষেরা। ছোটবেলায় জিয়ার ক্যাপ সানগ্লাস পড়া ছবি দেখছি ততবার বঙ্গবন্ধুর ছবিও দেখি নি। সেই শিশু মনে আমার জিয়াকেই বেশী গ্ল্যামারাস লাগতো। ৯৬ এর ইলেকশনের পর আমি বঙ্গবন্ধু চিনতে শুরু করি। তা টিভির কল্যানেই। টিভিতে যখনই সাতই মার্চের ভাষন দেখাতো সেই বজ্রকন্ঠের আহবানে শিহরিত হতাম। আমার ক্লাস ফাইভ সিক্সের রাফ খাতা যদি পাওয়া যায়, তবে দেখা যাবে সুযোগ পেলেই আমি এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তি সংগ্রাম এমন লাইন গুলো লিখে রাখতাম। একবার এক টিচার এই জিনিস দেখে তিরস্কারের সুরে বলছিল তুই কি পলিটিশিয়ান হতে চাস? তাহলে ঠিক আছে, পড়াশুনাতে তূই এমনিতে ভালো না এখন বাদই দিয়া দে। রাজনীতি করতে তো আর পড়াশুনা লাগে না। আমি তখন শিশু মনে অতো কিছু বুঝি না, যদি এমন একটা ভাষন দিতে পারতাম!
সুনীল সবসময় একটা কথা তার উপন্যাসে কিংবা ইন্টারভিউতেই বলে রাখে যে কোন মহাপুরুষই জন্ম থেকেই মহান হয়ে থাকে না। পরিবেশ পরিস্থিতি কিংবা সময়ের কারনেই তিনি মহাপুরুষ হন। সেই মহাপুরুষের ভেতরে তিনি আদতে দোষে গুনে একজন মানুষই। বঙ্গবন্ধু সমন্ধেও আমার মুল্যায়ন বা অভিমত সেই রকমেরই। শেষ বিচারে তিনি একজন মানুষই, কিন্তু অসাধারন এক মানুষ। যার ব্যার্থতা ছিল কিন্তু আকাশের চেয়েও বিশাল হৃদয় ছিল। সব কিছুকেই তিনি জয় করতেন সেই হৃদয়ের গভীরতম ভালোবাসা দিয়ে। যুগ যুগ ধরে বাঙ্গালী জাতিকে আর কেউ ভালোবাসা দিয়ে জয় করতে পারেনি ও স্বপ্ন দেখাতে পারে নি। তার যত ব্যার্থতা তা মুলত রাজনৈতিক, মানুষ হিসাবে তার চেয়ে বলিষ্ঠ ও মহান মানুষ বাঙ্গালী জাতিতে আর কেউ আসে নি। পাকিস্তানের কারাগারে যখন তার চোখের সামনে তার কবর খোড়া হচ্ছে তাতেও তিনি সামান্য বিচলিত হননি। সেই মহান মানুষকে সপরিবারে নৃশংস খুন করলাম সেই আমরাই। তার অনেক কাছের মানুষই তা জানতো এবং অধীর অপেক্ষায় ছিল পনেরোই আগষ্টের। আমি সবচেয়ে অবাক হই তা জেনে যে মোশতাকের কেবিনেটে অনেক আওমালীগের নেতারা ছিলেন যারা দুই তিন দিন আগেই ছিলেন মুজিববাদের কঠিন ভক্ত। মীর জাফরের এই রক্তের ধারা সব যুগে বাঙ্গালীর ভেতরে বিদ্যমান। আমি সেই সময়ের বড় বড় মানুষদের প্রতিও ঘৃনা পোষন করি, কিভাবে তারা এত বড় বর্বরতা সহ্য করে গেছে। এই মানুষেরাই উনসত্তরে সীমাহীন দমন পীড়নের ভেতরেও বঙ্গবন্ধুকে মিথ্যার বেসাতির মামলার ভেতরেও গন অভ্যুত্থানে জেল থেকে মুক্ত করে আনছে। আর সেই জনতাই এত নীরব হয়ে গেলো। সামরিক শাসকেরা ভুলেই দিয়েছিল যে শেখ মুজিব নামের কেউ ছিল। তবে আওয়ামীলীগ রাষ্ট্রক্ষমতাতে এসেও আর পারে নি বঙ্গবন্ধুকে মুল্যায়িত করতে। তার নাম নিয়ে ব্যাবসা চলেছে, অসত্ রাজনীতিবিদেরা শোক প্রকাশের নামে উনার উপরে ভর করে নিজেদের প্রচার প্রসার করেছে। বঙ্গবন্ধু ও তাজউদ্দীনদের যে আওয়ামী লীগ তা থেকে এখন তার দল যোজন যোজন দুরে। বলা যায় এই আওয়ামীলীগ হলো মোশতাক-ঠাকুর~ একে খন্দকারদের চেতনার আওয়ামীলীগ। বিএনপি একটা ঠগ লুটেরা হিংসাত্বক জনবিচ্ছিন্ন দল বলেই আওয়ামী লীগ পাওয়ারে আসে। তবুও বঙ্গবন্ধুর তুলনা শুধু তিনিই। বিনম্র শ্রদ্ধা জানাই এই মহত্প্রান শ্রেষ্ঠ বাঙ্গালীকে!
সাদত হাসান মান্টোর নাম আমি অনেক আগেই শুনেছি। পাবলিক লাইব্রেরীতে বইও দেখেছি কিন্তু পড়তে ইচ্ছা হয় নি। কেন জানি না আমার বিদেশী সাহিত্যর বাংলা অনুবাদ পড়তে অনীহা। এই অনীহার তেমন একটা কারন নাই। আমার ফেসবুকে এক বন্ধু ছিল সে মাঝে মধ্যেই মান্টোর গল্প পড়া নিয়ে উচ্ছাস দেখাতো আমি অবাক হতাম। কারন কৃষন চন্দরের নামই আমি শুনছি উর্দু সাহিত্যর সেরা লেখক হিসাবে। আহমদ ছফা রাষ্ট্র সভা গত বছর মান্টোর জন্মশতবর্ষ হিসেবে এক অনুষ্ঠান করে আমি তাতে যেতে পারি নাই ব্যাস্ততায়। তবে মনে মনে ধারনা করতাম যে পড়তে হবে মান্টোর গল্প। প্রতীক্ষার হলো অবসান, প্রিয় বন্ধুর বুক শেলফে পেয়ে যাই মান্টোর শ্রেষ্ঠ গল্প নামে একটা বই- জাফর আলম অনুদিত। আহমদ পাবলিশিং হাউস থেকে বের হওয়া দাম ১৬০টাকা। বইটা বাড়ীতেই এক বসাতেই পড়ে শেষ করি। কি অসাধারন সব গল্প পড়েই ভক্ত বনে গেলাম। আমি শত ভাগ নিশ্চিত যদি উর্দু ভাষ জানতাম তবে গল্প গুলোর স্বাদ আরো ভালো করে পেতাম। জাফর আলমের অনুবাদ মোটামুটি এবং তা আমার মতো অপাঠককে মুগ্ধ করতে যথেষ্ট। বইটার শুরুতেই মান্টোর একটা জীবনী আছে। খুব সুন্দর ভাবে লেখা। তা পড়ে আমার ধরা পড়ে মান্টো পড়াশুনাতে খুব ভালো ছিলেন না, উচ্চশিক্ষায় আগ্রহ ছিল না, অভাব অনটন আর মদ্যপানেই তার দিন কেটেছে, লিভার পচেছে, বেচে থাকতে মোটেও মুল্যায়িত হন নি, বরং তার লেখা গল্প অশ্লীলতার দায়ে অভিযুক্ত, জরিমানা দিতে পারেন নি বলে জেল খেটেছন। এত কিছুর পরেও তার লেখনীর যে হাত সে কারনেই তিনি উর্দু সাহিত্যর সেরা গল্পকার। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ও দেশভাগের যন্ত্রনায় যে অভাবপীড়িত মানুষ, তারাই তার গল্পের চরিত্র। তাদের ভেতরে নৈতিকতার বোরখা চাপিয়ে মহান বানান নি তিনি। বরং ক্ষুদায় পীড়িত আশ্রয়হীন মানুষগুলো কিভাবে বেচে থাকার সংগ্রামে জর্জরিত হয় সেই ছবিই একেছেন। তার গল্প ঠান্ডা গোশত, খুশীয়া, কালো শলওয়ার, টোবাটেক সিং, ধোয়া, গন্ধ, সন্তান, শহীদ, ভেজাল, নতুন আইন, লাইসেন্স প্রভৃতিতে যে স্বার্থকতার সাথে সেই সময়ের গল্প বলেছেন তা মুগ্ধ না হয়ে পারা যায় না। এত বিচিত্র তার গল্পের চরিত্র, একটার সাথে একটার কোন মিল নেই। এত অনুপম ভাবে তিনি মানুষের ক্ষুদা আর দারিদ্রর কঠিন রুপ কে দেখেছেন তা আর কেউ পারে নি!





মহান টিচার।
আজকের লেখাটা অসাধারণ হয়েছে। তুমি বরং দিনলিপি লেখা কমিয়ে দিয়ে এধরনের লেখা বাড়িয়ে দাও। মাসুম ভাইয়ের মতো ইউনিক
আমি আবার কি করছি বাজি
অনুকরনীয় ও অনুসরনীয় দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন!
আসলেই মহান। তবে এখন উনি কি অবস্থায় আছেন তাঁর খোজ জানি না!
থ্যাঙ্কস আপু। কমেন্ট পেলেই ভালো লাগে। ভালো খারাপ মিলেই তো লেখালেখি!
মীরজাফররা যুগে যুগে জন্মায় বলেই এখনো বাংলাদেশের রাজনীতির এই অবস্থা।
মান্টো সম্পর্কে চমৎকার বর্ননা ভাল লাগলো।
ধন্যবাদ ভাইয়া!
সুন্দর লেখা...
ধন্যবাদ ভাইয়া!
মন্তব্য করুন