ইউজার লগইন

তিক্কি!

'তিক্কি' শব্দটা জামালপুর- শেরপুরের মানুষদের মুখেই বেশি শুনেছি আমি। আমার আম্মুও ইউস করে, এর অর্থ হলো খুব মনে লাগছে যাকে বলা যায় আঁতে ঘা লাগা। কিছুটা 'সাময়িক উত্তেজনায় মেজাজ খারাপ' এমন কিছু। ঢাকার আম জনতার ভাষায় বলতে গেলে 'বিগাড়' উঠা। গতকালকে আমারও তেমন 'তিক্কি' উঠছিলো নিজের উপরেই। প্রচন্ড শীত জামালপুরে, ঘুম থেকে উঠতে হলো দেরী, মোবাইলে ও ল্যাপটপেও চার্জ নাই এক ফোটা, অনেক দিন পর ভাবলাম বাংলাদেশের খেলা দেখবো টিভিতে তা আর হলো কই? সকাল থেকে রাত আটটা পর্যন্ত কারেন্ট নাই। এতসব দুর্বিপাকে নিজের উপরে তিক্কি উঠছিলো, অনেক ক্ষণ একা একা রাগে ফোস ফোস করলাম, আম্মুর সাথে বেহুদা চিল্লিচিল্লি করলাম, রাত ১০টায় মেজাজ ঠান্ডা হলো।সালমানের 'জয়হো' দেখলাম। হিন্দি চুলের সিনেমা বানাইছে, তেলেগু সুপার স্টার চিরঞ্জীবীর 'স্টালিন' সিনেমার থার্ডক্লাস রিমেক,সালমান খান তার 'জয়হো' সিনেমাতে বলছে কাউকে থ্যাঙ্ক ইউ না বলে অন্য তিন লোকের কোনো উপকারে আসতে ও তাদেরকেও ইন্ডিভিজ্যুয়ালী তিন লোকের উপকার করতে, এইভাবে চেইন চলতে থাকবে। আমার দাবী সালমান নিজেই আগে নিজের উপকার করুক, একটা বিয়া করুক, আর কতোকাল নিজেকে ভার্জিন দাবী করে যাবে!

বাড়ীতে আসার ১ দিন পরেই মনটা খুব খারাপ ছিল, পুলকের চাচতো বোনের এক কাজিন, মাত্র ১৪-১৫ বছর বয়স, ধবেধবে ফর্সা মেয়েটা গলায় ফাঁস দিয়ে সুইসাইড দিলো। পুলক নিজে যেয়ে লাশ বের করছে, পুলিশের গেঞ্জাম ট্যাকেল দিছে, লাশ গ্রামের বাড়ীতে পাঠাইছে, আত্মীয় স্বজন দের সামলিয়েছে, ব্যাপক ধকলের উপরে ছিল দুইতিন দিন। মেয়েটাকে আমি কখনো দেখি নাই সামনা সামনি, পুলক অনেকবার ওর গল্প বলতো, নানান বিয়ের দাওয়াতেই শুধু দেখা হতো আর ওরা সব ভাইবোন মিলে খুব মজা করতো, এইসবের অনেক আলাপ ই আমার জানা। সেই না দেখা মেয়েটা কোন তিক্কি উঠে মারা গেল তাই নিয়ে ভাবছি। জানি না বিস্তারিত তবে পুলকের মন মেজাজ খুব খারাপ, আমারও মন খারাপ হয় এই ভেবে কি এমন হলো যে মরতে হবে, মরলেই তো শেষ। মরণের চেয়ে নির্মম কোনো স্বাভাবিক ঘটনা আমার জানা নাই। অজস্র মানুষের কত কষ্ট করে বেঁচে থাকতে হয়, আর কিছু মানুষ আছে যারা খালি মরার বাহনা খুজে। বাহনা পেলেই হলো ঝুলে মরলো। মাঝে মাঝে আমারো মরতে ইচ্ছা করে পরে ভাবি নিজে না হয় মরলাম কিন্তু পরিবারকে এক শোকের কাভার্ড ভ্যানের নিচে রেখে গিয়ে নিজে কব্বরে ঢুকে থাকবো কোন সুখে! মানুষের কেন যে এত তিক্কি উঠে?

খিলক্ষেত থেকে নিকুঞ্জ হয়ে ক্যান্টর্মেন্ট স্টেশন অবধি ট্রেনে কাটা পড়ার পারফেক্ট প্লেস। পত্রিকার ভাষ্যমতে ও পুলিশের হিসেবে সেখানে গত দশ বছরে ট্রেনে কাটা পড়ে মরেছে এক হাজারেরও বেশি। কেউ কেউ হয়তো না বুঝে মরেছে তবে আমার ধারনা বেশীর ভাগই স্বেচ্ছায় মরছে। বাংলাদেশ তথা ঢাকা নিজেই এক মরনের জায়গা -এইখানে জীবনের সেরকম কোনো নিরাপত্তাই নেই, সেইখানে নিজে আগ বাড়িয়ে মরার কি দরকার তা আমি বুঝি না। শুধু শহরেই না, গ্রামেও আজকাল মহাপাপ জেনেও মানুষ প্রচুর আত্মহত্যা করে। আমাদের এখানের কথাই ধরেন, এক মেয়ে ক্লাস টেনে পড়ে, গত মাসের কথা, মা বকা দিছে, জামালপুরের মানুষ হয়তো নিম্নমানের গালি গালাজও করছে, মা শপিংয়ে গেছে এই সুযোগে মেয়েটা ইন্স্যাক্টিসাইড খেলো তাতেও সাথে সাথে মরে নাই, সারাদিন একা একা ব্যাথায় কাতরানোর পর সন্ধ্যায় সবাই জানতে পারছে সে বিষ খেয়েছে, তড়িগড়ি করে হাসপাতালে নিলো সবার ধারনা ছিল এই যাত্রায় বেঁচে যাবে, তার মা হাসপাতালে বসেও মেয়েও খিস্তি শুনাচ্ছিলেন 'মাগী মরে যাইতি সাথে সাথেই, হাসপাতালে নিতে ওইলো কেন?'তার বাপ আবার তার মাকে মোবাইল করে বলছে 'মার্কেটে যখন গেছস, তাইলে কাফনের কাপড় সহ কিনিস' যাই হোক মেয়েটা মরেই গেল। থানা , কেস কারবার, কান্নাকাটি হল্লাহাটি, ঢোমের খুবই কাচা সেলাই সব মিলিয়ে এই পাড়ায় এক আতংকের সময় গেছে। সন্ধ্যের পর কিছুদিন মানুষ বাইরেই বের হইনি ভয়ে। এই পুরো গল্পটাই আমার আম্মুর মুখে শোনা। আম্মুর মুখেই গল্প শুনতে আরাম, ব্লগ লেখার মতো করেই মজা করে কথা বলে। কিন্তু এই কাহিনী শুনে আমার অবশ্য মেজাজ খারাপ হলো। বেচারী মেয়ের কি তিক্কিটাই উঠছিলো যে সকালে বিষ খেয়ে রাতে মরলো।

তাই আমি কাপুরুষেরই দলে, যতই দুর্দিন আসুক মরার কোনো খায়েশ নাই আমার। আল্লাহ যেই দিন আজরাইল পাঠাবে সেইদিনই মরবো। জীবনের সময়ই বড় অল্প তার ভেতরে এত আগে ভাগে তিক্কি উঠিয়ে নিজেকে মুর্দা বানানোর কোনো খায়েশ নাই। যদি এমন হতো যে প্রথমবার মরলে আবার জীবন পাওয়া যাবে তাহলে একটা টেস্ট দিতাম, জীবনে কি আর আছে! কিন্তু জীবন যেহেতু একটাই আর তাতে আমি চাই বা চাই মরতে হবেই, তাই স্বেচ্ছায় মরন আমার জন্যে না। আর আমি সেরকম আশিকী টুও না যে প্রেমিকার ক্যারিয়ারের কথা ভেবে নিজে পানিতে ঝাপ দিবো। নিকোলাস স্পার্কের এক উপন্যাস আছে নাম সেইফ হেভেন। তাতে নায়কের প্রথম বউ যে অনেক দারুণ জীবন ছিল কিন্তু ক্যানসারেই মরে যায়, পরবর্তীতে যে নায়িকা আসে তার সাথে ভুত হয়ে ঘুরে বেড়ায় ও কথা বলে, বন্ধু হয়। আমার সেরকম ভুত হবার কোনো খায়েশ নাই, যতই নিম্নমানের দিনযাপনই হোক আমার জীবন আমার কাছে খুবই অসাধারণ। নিজের কারনে সেই অসাধারণ বিষয়টা আমি হারাতে চাই না। যতই দুর্দিন আসুক আর যতো দুর্যোগ ও অনটনেই থাকি না কেন আমরা সবাই বেঁচে থাকতেই চাই, আমিও চাই। কারন দুনিয়াতে আমি তেমন বলার মতো পুন্য করি নাই যে পরকাল বেহেশতে অসাধারণ কাটবে। অসাধারণ দুনিয়া কাটিয়েই আমি পরকালের জন্য প্রস্তুত হতে চাই!

পোস্টটি ১১ জন ব্লগার পছন্দ করেছেন

তানবীরা's picture


খারাপ লাগছে মেয়ে দুটোর জন্য ....... আহারে Puzzled

আরাফাত শান্ত's picture


আমারো খারাপ লেগেছে, কি আর করার!
তাই পোষ্টটা লিখলাম!

জাকির's picture


..আমার বাড়ি ময়মনসিংহে জামালপুরের কয়েক জনকেও জানি কিন্তু তিক্কি প্রথম শুনলাম!
তিক্কি উটতেছে আমারও...

আরাফাত শান্ত's picture


তাই নাকি? আমি তো জামালপুরেই আছি এখন, অনেকের মুখেই শুনছি শব্দটা। তাই মনে ধরছে!

প্রিয়'s picture


আমারও তিক্কি উঠসে Big smile

আরাফাত শান্ত's picture


আশা করি এতদিনে নেমে গছে তিক্কি!

নিভৃত স্বপ্নচারী's picture


হুম, আমার তো প্রায়ই তিক্কি উঠে Big smile

আরাফাত শান্ত's picture


দোয়া করি কম কম করে তিক্কি উঠুক!

pavel's picture


অনেকদিন পর আপনার লেখা পড়লাম!

১০

আরাফাত শান্ত's picture


ভালো তো!

মন্তব্য করুন

(আপনার প্রদান কৃত তথ্য কখনোই প্রকাশ করা হবেনা অথবা অন্য কোন মাধ্যমে শেয়ার করা হবেনা।)
ইমোটিকন
:):D:bigsmile:;):p:O:|:(:~:((8):steve:J):glasses::party::love:
  • Web page addresses and e-mail addresses turn into links automatically.
  • Allowed HTML tags: <a> <em> <strong> <cite> <code> <ul> <ol> <li> <dl> <dt> <dd> <img> <b> <u> <i> <br /> <p> <blockquote>
  • Lines and paragraphs break automatically.
  • Textual smileys will be replaced with graphical ones.

পোস্ট সাজাতে বাড়তি সুবিধাদি - ফর্মেটিং অপশন।

CAPTCHA
This question is for testing whether you are a human visitor and to prevent automated spam submissions.

বন্ধুর কথা

আরাফাত শান্ত's picture

নিজের সম্পর্কে

দুই কলমের বিদ্যা লইয়া শরীরে আমার গরম নাই!