মন তার যতই নাচায়, যে পাখির বাঁচাই খাঁচায়, সেই বোঝে ভাঙা কত কঠিন।
শিরোনামের লাইনটা যথারীতি আমার মাথা থেকে উৎপত্তি না, উৎপত্তিস্থল শিলাজিতের গান, 'স্বাধীনতা' থেকে নেওয়া। গানটা আমার যেকোনো দিনই অসম্ভব প্রিয়, কি অসাধারণ লিরিক। প্রথম দু তিন লাইন এমনঃ 'তুমি হায় বুঝবে কি ভাই, ফুরফুরে দিন কেটে যায়, বোঝাচ্ছো স্বাধীনতার মানে/ যে অধীন দিনে রাতে, বুলেটে যে বুক পাতে, সে বুঝেছে স্বাধীনতার মানে!' আসলেই আমরা কতটুকু বুঝি এই স্বাধীনতার? আহমদ ছফার একটা কথা খুব মানি, যে গত দুই হাজার বছরের বঙ্গ অঞ্চল কিংবা বাঙ্গালীর ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হলো একটা রাষ্ট্র স্বাধীনতা যুদ্ধ করে পাওয়া! তিনি উদাহরণ দিয়েছিলেন কুর্দি জাতিদের, যে কুর্দিরা প্রচেষ্টা, এত সংগ্রাম সব ব্যর্থ একটা রাষ্ট্র পায় নি বলে। আমরা কথায় কথায় বলি- স্বাধীনতা খুজছি, কি লাভ হলো এই জিনিস পেয়ে, বাংলাদেশ ব্যর্থ, আমি সেই সব লোকরে সব সময় শুনাই, এই যে লাভ ক্ষতির হিসাব নিকাশ, স্বাধীনতাকে খোজা এইসবই প্রধান অর্জন, না হইলে আপনারা এইসব অবান্তর প্রশ্ন করতেন না কোনোদিন।
কাল সাড়াম্বরে ন্যাশনাল এন্থেম গাইলো লাখ তিনেক মানুষ। আমি যাই নি, আমার যাবার কথাও ছিল না। বেশীর ভাগই বিভিন্ন সংঘবদ্ধ গ্রুপ ধরে লোক নিয়ে গিয়েছে। তবে সকালে দেরীতে ঘুম থেকে উঠে মনে হলো যাওয়া উচিত ছিল, রোদ তো সহ্য করতে পারিই- এইটা নতুন কিছু না। দুলাল নামের এক ড্রাইভার আমাকে ফোন দিয়ে বলে উঠলো, মামা আপনি কই? গেইটে মানুষ আর মানুষ, আমি বলি- মামা আমি যাই নি। উনি বলে আমি তো ভাবছিলাম চেনাজানার ভেতরে আমার ধারনা ছিল আপনেই যাবেন, কারন আপনি তো সারাদিন দেশ দেশ করেন। আমার আর বলে হয়ে ঊঠে না, আমরা যে কত বড় ভন্ড তা তো আর আপনারা জানেন না, জানলে বুঝতেন। jago.com.bd নামের এক সাইট আছে তা খুলে বসেছিলাম দেখি : টিভিতে রেকর্ড ভাংগার খুশীতে কি হয়! দেখি মমতাজ বলছে আপনারা সাউন্ড সিস্টেম থেকে নামেন, ওইটা বসার জায়গা না, আপনারা ওইখানে বসে থাকলে গান গাইবো না! তারপর তিনি গাইলেন পান্খা পান্খা পান্খা হইলো মন! বাসা থেকে বের হয়ে দেখি ক্যাপ পড়া অজস্র মেয়ে ছেলে রোদে পুড়ে কাঠ হয়ে ফিরছে, তার ভেতর দেখা হয়ে গেল এক মহিলার সাথে, বারো সালের কিছুদিন যে আমাদের বুয়া ছিল, সে আমাকে দেখেই বলে উঠলো মামা কেমন আছেন? যান নাই, আমাদের গার্মেন্টস থেকে তো সবাইকে নিয়ে গেল! আমি বললাম খালা আপনারা আছেন বলেই আর দেশকে ভালবাসেন বলেই তো দেশটা টিকে আছে, নয়তো কবে আমরা সব খেয়েদেয়ে দেশটাকে শেষ করে দিতাম! খালা হাসে আর বলে মামা যে কি কন না। ক্যাপ ব্যাগ হাতে যারা ফিরছিলেন কি যে সুন্দর লাগছিলো তাঁদের। মনে হচ্ছিলো রোদে পুড়ে খাটি সোনা হয়ে আসছে!
গরম যা পড়েছে, তুলনাহীন। এইসব গরমের দিন আমার অতি আপন। গরমের দিনে সারাদিন বাইরে থাকবো, ঘুরবো, গায়ের রংকে আরো তামাটে কালো করবো, আহ কি শান্তি। গরমের দিন আসলেই পরিচিত লোকেরা বলে, শান্ত যে কালা হইছোস, আমি মনে মনেই প্রশ্ন করি, ফর্সা ছিলাম কবে? এই সামান্য গায়ের রং নিয়ে বাঙ্গালীর যা কমপ্লেক্স তা দুনিয়ায় বিরল। ফর্সাদের মুখে আমি গাত্র বর্ণ নিয়ে তেমন কথা শুনি নাই, একটু শ্যাম বর্ণের মানুষেরা নিজেদেরকে যে হারে ফর্সা ভাবে আমার তাতে খুব অবাক লাগে। শ্যাম বর্ণ বলে এত আদিখ্যেতা করার তো আসলেই কিছু নাই, আমার মা শ্যাম বর্নের, আমি কালো, এই ব্যাপারে আমার তেমন গ্লানি -কখনোই আসবে না। তবে আম্মু সব সময় বলে আমি ভাইয়ার মতো না হলেও, ফর্সা ছিলাম, আমি জোরেই বলি 'কাম সারছে, শান্ত নাকি ছিল ফর্সা। ছোটবেলা থেকেই আমার বাহির ভালো লাগে, রোদে সারাদিন ছুটাছুটি করতে করতে বড় হয়েছি, তাই গায়ের রং যা আছে তাতেই খুশ, ফর্সা হওয়ার ক্রিম মেখে তামিমের মত মেয়ে পটানোর ডিউটি আমার না। তামিমদের কাজ ছিল খেলা, তা বাদ দিয়ে তারা কোন গু মাখতে বলে সেইটা তাঁদের ব্যাপার। তবে সাম্প্রতিক কালে একটা জিনিস নিয়েই কনসার্ন তা হলো ভুড়ি বাড়ছে। এত হাটি, রোদে বসে থাকি তাও ভুড়ি কমে না।
আজকের দিন গেল চৈত্র মাসের পারফেক্ট একটা দিন। সকালে বুয়া আসে নাই, বের হলাম চায়ের দোকানে। নিউ মার্কেটে যাওয়া হয় না মেলা দিন। সকাল সকাল দলবল নিয়ে কেনাকাটা করতে গেলাম, কিন্তু পকেটে টাকা নাই। আর নিউ মার্কেটের জিন্স আমার ভালো লাগে না। হয় ব্রান্ডের নয় বঙ্গবাজার, মাঝামাঝি কিছুতে শান্তি নাই। পুলক সাইফ কিনলো আমি কিনলাম। পাভেল, জেমস আসলো পুরাই চায়ের দোকান উঠিয়ে আনছি মনে হচ্ছে। আমিও সবার দেখাদেখি একটা প্যান্ট কিনলাম, হাটার জন্য কমদামী সেন্ডেল নাই, তা কিনলাম দুই জোড়া। তিনশো টাকা দিয়ে দুই জোড়া স্যান্ডেল পাওয়া যায় তাও আবার কি স্টাইলিশ, দেশে এই জিনিসই দেখলাম সস্তাই রয়ে গেল। লোকজন দেখি ধুমায়া কিনছে। মরনচাঁদ না আলাউদ্দিন নাম ভুলে গেছি, এই ভর দুপুরে গিললাম মিস্টি আর নিমকী ঢাসায়া। সাইফ আর জেমস কার্গো শর্টস কিনতে কোথায় গেল, এই ফাকে আমি পুলক পাভেল রওনা দিলাম। এইভাবে সংঘবদ্ধ ভাবে এসে কাউকে নিয়ে পালিয়ে যেতে খুব মজা। রিকশায় এই গরমে তিনজন এসে গলা শুকিয়ে কাঠ। কিন্তু বসার সু্যোগ ছিল না। বাসায় এসে ভাত খেয়ে, একটু পড়ে চলে গেলাম ভার্সিটি। বাসে বসে সৈয়দ শামসুল হকের 'তিন পয়সার জ্যোৎস্না' পড়তে পড়তে যাচ্ছি। সবাই লুক দেয় এমন মনে হয় আমি দুনিয়ার সেরা আঁতেল। গরমে বাসে সিদ্ধ হওয়াই যেখানে নিয়তি সেখানে বই পড়ে একটু সময় কাটালেও দোষ। ক্লাস ছিল, এক্সাম ছিল, ফেরার সময় বাস কারন দেখলাম রিকশায় গেলে এখন দোকানে চা খাওয়ার ও খাওয়ানোর টাকা থাকবে না। বাসে উঠে সিট পেলাম, রংধনু পুরাই লোকাল স্টাইল। এই গরমে মানুষ টেকে না, ঘামছি ঝপঝপ করে, আমার পাশের যাত্রী আমার বয়সী হবে হয়তো, বসে বসে পর্ণ দেখছে। শালার মাইনষের কি উত্তেজনা, দেখে হলাম, অবাক। কানে হেডফোন ঢুকিয়ে মেঘদল ব্যান্ড হজম করলাম, নেমে গিয়েই দেখি আড্ডা জমে ক্ষীর। আমি রাজীব, আবির, পুলক, সাইফ দারুন সময় নষ্ট করার আড্ডা দিলাম এগারোটা অবধি। বাসায় এসে ভাত খেয়েই নোটবুক নিয়ে বসা। এত গরমেও আমার দুই তিনটা জিনিসের বদল নাই, এক পাঞ্জাবী, দুই দিনে চার পাঁচ চা আর ব্লগে দিনলিপি লেখার পিনিক!





গানটা অনেক সুন্দর।
বাস জিনিসটা একটি জায়গাঅই!
এই পিনিকের যে কি দাম,
তা আমরা পাঠকেরা আর
লিখতে ভুলে যাওয়া লেখকেরাই বুঝি।
থ্যাঙ্কস বর্ণ!
তবে বুঝিলাম না এই পোষ্টে কমেন্টের ঘাটতি কেন?
(y)
মন্তব্য করুন