ইউজার লগইন

আপোষ ফুরোবে কখন, হিসেব করাই অপচয়!

শাহবাগের সেই অসাধারণ দিন গুলোতে একটা জনপ্রিয় স্লোগান ছিল- আপোষ না সংগ্রাম, সংগ্রাম সংগ্রাম (গগনবিদারী আওয়াজে আমাদের উত্তর)। স্লোগানটা যখনই শুনতাম বা এখন অনেকদিন পর যখন ভাবি তখন অবাক হতে হয়। এ যেন ভুতের মুখে রাম রাম। সেই একাত্তরের পর থেকেই আমাদের আপোষ ছাড়া আর তেমন কোনো ইতিহাস নাই যাদের, তারাই দাবী করছি সংগ্রামের কঠিন পথে যাবার। তাই কবি আর আবৃত্তিকারেরা যতই বলুক আপোষ করিনি কখনো এই আমার ইতিহাস। তাতে আমি বরং বিরক্ত হই। কে করি নি আপোষ? যে বলে আপোষ করে নি সেও তার কিছুদিন পর কারো না কারো পোষ মেনেছেই। এ ছাড়া উপায় কি? যে পরিবেশে আমরা বড় হই আর বেড়ে উঠি তাতে যতই আর এফ এলের চেয়ারে বসি না কেন, আমাদের মেরুদন্ড শক্ত নয়, দাঁড়াতেও পারিনা শক্ত করে। তাই আপোষের হিসেব করা অপচয়ই। কখনো ফুরোবেনা এই হিসাব, প্রতিদিনই তো করছি নানান মানুষ নানান ভাবে, জাতিগত ভাবে!

আমাদের তথাকথিত যে আপোষহীন নেত্রী আছেন উনাদের কথা আর কি বলবো। আপোষ তো দূরে থাক তিনি ও তার পুত্র যে কার পোষ আর কেমন মানের দল চালান তাই জানি না। আরেকদল সমন্ধে বোঝাই যায় তারা কার পোষ্য! তাঁদের নেতাকর্মীরাও তা মেনে নিয়েই কথা বলেন, বলেন দুনিয়ার সব চেয়ে বড় গনতান্ত্রিক বন্ধু রাষ্ট্রের পোষ্য হতে পেরে তাহারা খুশি। আমরা জনগনও কম কিসে? কেউ টাকার পোষ্য, কেউ বা বসের কেউ বা পরনারীর দেহের। তাই পোষ আর আপোষের হিসেব করা আসলেই অপচয়। কোনো লাভ নাই। আমাদের প্রভুর খুব দরকার না হলে আমাদের দিনই চলে না। ছোট বেলায় আমার এক বন্ধু ছিল ফয়সাল। বড়লোকের ছেলে, বাসায় দামী দামী সব জিনিস আর খেলনা, আমি তার সাথে সাথে খুব থাকতাম। ভালো লাগতো। কিন্তু ক্লাস ফোরের অন্য ছেলেরা তাতে জেলাস না হয় অন্য কিছু হয়ে বলে দিলো আমি নাকি ফয়সালের চামচা। কথাটা শুনলেই গায়ে লাগতো। আমি কেন মানুষের চামচা হতে যাবো? ফয়সালের সাথে মেশাই বাদ দিলাম। এখন বড় হয়ে বুঝতে শিখে জানছি, এই দেশে সবাই চামচা হতেই পড়াশুনা করে। যে যত বড় জায়গার চামচা তার তত দাম! কেউ কেউ কিছু না পেয়েই বিশাল চামচা হয়ে যায়, তাই করে করে দিন চলে যায়। এক হিন্দি সিনেমায় একটা ডায়লগ ছিল নায়কের-- যে লোক বন্ধু আর চামচার ভেতরে ডিফারেন্স বুঝে না তাঁদের আমি বন্ধু বানাই না। ভোগাস কথা এইসব, এইদেশে বেঁচে থাকলে পোষ্য আর আপোষের ভিতর দিয়েই আপনাকে যেতে হবে। এমন অনেক কিছুই করতে হবে যেখানে আপনার মনের বিন্দুমাত্র সায় নাই!

এই লেখা আমার অনেক বড় করে লেখার প্ল্যান ছিল। কিন্তু কিবোর্ডে আঙ্গুল চলছে না। বিশ্রী ধরনের মেজাজ খারাপ। সপ্তাহে একদিনই বিকেলে ঘুমালাম, উঠে ভালোই লাগছিল। কিন্তু কি মনে করে বিডি নিউজ দেখলাম মোবাইলে, গা গুলিয়ে আসছিল। বমিও করলাম। কারন লাশ ভেসে উঠছে নারায়ণগঞ্জে গুম হওয়া হাফ ডজন মানুষের। আল্লাহর কাছে কোটি শুকরিয়া টিভি নাই ঘরে, টিভি থাকলে এইসব জিনিস হজম করতেই হয়। তার আগের দিনই আমি সকালে উনত্রিশ এপ্রিলের জলোচ্ছাস নিয়ে ভাবছিলাম। কি অবিশ্বাস্য এক দিন ছিল আমার শিশু মনের জন্য। বয়স আমার তখন চার, তাও দিব্যি মনে পড়ে দিনটা। বিশাল বিশাল সব গাছ দুলছে, সমানে বিশাল বিশাল খাম্বা গুলো নিচে পড়ছে, আকাশে যেন আগুন ধরেছে তীব্র বাতাসে। অন্ধকারে আমার আব্বু তালা পাচ্ছিলো না, গামছা দিয়ে দরজা আটকায়। এপ্রিল মাসে আমাকে একটা সোয়েটার পড়ানো হয়েছিল। আমি দেখছিলাম পানি কিভাবে উঠছে উপরে, আব্বুকে প্রশ্ন করছিলাম আব্বু আমরা কি পানিতে ভাসবো? আমার শিশু মনে তখন কত আজাইরা ভাবনা, পানিতে করে জাহাজে চড়বো আব্বুর সাথে। সেসব কিছুই হলো না, আমাদের পিচ্চিদের পাঠানো হলো তিন তলায় আরেকটা বাসায়। হারিকেনের আলোয় আমরা পিচ্চিরা আল্লাহ আল্লাহ করছি শুধু, বড়রা শিখিয়ে দিয়েছে। এক আন্টি আমাদের শুনাচ্ছে নুহের নৌকার গল্প, আর বাইরে এত বাতাসের শব্দ কিছুই শুনছি না। পরের দিন থেকে হলো আমার খুশীর দিন দোতালা ছুই ছুই পানি। যা মনে চায় ঘরের সব পানিতে ঢেল মারি। আম্মুর রান্না করতে হয় লাকরির চুলায়। কিভাবে জানি পানি চলে গিয়েছিল, তার পর দেখি ট্রাকে ট্রাকে খিচুড়ি আসে, আমার খুব ইচ্ছে করতো খেতে, প্লেট নিয়ে দাড়ালেই হয় কিন্তু আম্মুর তীব্র নিষেধ, সেই সময় নানান মানুষের এত টিভি ফ্রীজ নষ্ট হইছে, এত কিছু ভেসে গেছে তা নিয়ে কত গল্প শুনতাম। ভাইয়া বলতো হাজার হাজার মানুষ মরেছে। আমি অবাক হয়ে ভাবতাম মরা জিনিসটা কেমন দেখলাম না তো। বড় হয়ে জেনেছি লাখ খানেকের মত মানুষ মরেছে, লাশের গন্ধে নাকি টেকা যেত না, লাশ কাফনের কাপড় দিয়ে অনেক কমিশনার মেলা টাকার মুখ দেখেছে। আমার এক বন্ধুর বাবা এখনো সেই দিনের কথা বলতে গেলে চোখের পানি আটকাতে পারে না। কারন উনারা প্রচুর চেষ্টা করেছে মানুষ বাচানোর, অনেকেই বেঁচে ছিল, অনেকেই চোখের সামনে মরে গেছে। এইসব নিয়ে ভাবলে এই দেশ আর জগত সংসার সব জাহান্নাম মনে হয়। আমাদের এইসব আপোষ পাপোষের বেঁচে থাকার আসলেই তেমন কোনো মুল্য নাই। তাই যাদের লাশ আজ ভেসে উঠলো খুন গুম হয়ে তাঁদের কথা দুদিনের ভেতরেই ভুলে যাবো। রানা প্লাজার কথাও একানব্বইয়ের জলোচ্ছাসের মত ভুলে যাবো। নাসিম ওসমান কিংবা শামীম ওসমান, এমপি বদি কিংবা তারেক রহমান সব নষ্ট মানুষেরাই একদিন মারা যাবে, তবে দেশটাকে ধ্বংস করে।

পোস্টটি ১০ জন ব্লগার পছন্দ করেছেন

বিষণ্ণ বাউন্ডুলে's picture


সব লেখায় আসলে একটা কিছু বলার থাকে না, চুপচাপ মন খারাপ করে পড়ে যেতে হয়..

আরাফাত শান্ত's picture


হুমম বুঝলাম

জ্যোতি's picture


ধর, আমরা কিছুই ভুলে গেলাম না, মনে রাখলাম সবই, তাতে কি লাভ হবে? আমরা কি কেউ? দেশ তো এখন লাগামহীন চলছে, বেঁচে যারা থাকি এই শুকরিয়া। মেরে ফেললেও কিছু করার নেই কারো, যাদের করার কথা তারা তো শুধু নির্লজ্জের মত ক্ষমতা আঁকড়ে বসে আছে, থাকবে। তাদের কোন দায় নেই, দায়িত্ব নেই।

আরাফাত শান্ত's picture


খাসা বলেচেন দিদি!

তানবীরা's picture


আমাদের তথাকথিত যে আপোষহীন নেত্রী আছেন উনাদের কথা আর কি বলবো। আপোষ তো দূরে থাক তিনি ও তার পুত্র যে কার পোষ আর কেমন মানের দল চালান তাই জানি না।

Smile

এক আন্টি আমাদের শুনাচ্ছে নুহের নৌকার গল্প

নোয়া মুভিটা এই মীথ এর ওপর করা

আরাফাত শান্ত's picture


মামাকে বলবোনি ভালো প্রিন্ট নামিয়ে আনতে!

প্রিয়'s picture


অনেক ভালো থাকবে তুমি যদি পারো গন্ডারের জীবনটাকে ধারণ করতে। যা হবে সব মেনে নিবে কিছুতেই কষ্ট পাবেনা বা রাগ হবেনা। জীবনে অনেক সুখী হবে তুমি তখন।। Smile

আরাফাত শান্ত's picture


দারুন বলেছেন!

মন্তব্য করুন

(আপনার প্রদান কৃত তথ্য কখনোই প্রকাশ করা হবেনা অথবা অন্য কোন মাধ্যমে শেয়ার করা হবেনা।)
ইমোটিকন
:):D:bigsmile:;):p:O:|:(:~:((8):steve:J):glasses::party::love:
  • Web page addresses and e-mail addresses turn into links automatically.
  • Allowed HTML tags: <a> <em> <strong> <cite> <code> <ul> <ol> <li> <dl> <dt> <dd> <img> <b> <u> <i> <br /> <p> <blockquote>
  • Lines and paragraphs break automatically.
  • Textual smileys will be replaced with graphical ones.

পোস্ট সাজাতে বাড়তি সুবিধাদি - ফর্মেটিং অপশন।

CAPTCHA
This question is for testing whether you are a human visitor and to prevent automated spam submissions.

বন্ধুর কথা

আরাফাত শান্ত's picture

নিজের সম্পর্কে

দুই পয়সার মানুষ।চায়ের দোকানেই দিন পার করি তাই!