অনন্য অপুর পাঁচালী!
কিছু লেখার জন্য মন উশখুশ করছে। যুতসই একটা স্ট্যাটাস ফেসবুক দিতে পারলেও শান্তি লাগতো। তাও মাথায় আসছে না। বসে বসে মুনতাসীর মামুনের ঢাকা স্মৃতি-১ পড়ছিলাম। ভালো লাগছিল না। তাই নোটবুক নিয়ে বসলাম। সেই ঘুরে ফিরে ফেসবুক। ফেসবুক যে বোরিং লাগে আজকাল। কি করবো বুঝে উঠি না। অবিরাম লাইক দেই মানুষের নানান পোষ্টে তাতেই মানুষ খুশী। যখন যারে মন চায় ব্লক মারি আর আনফ্রেন্ড করি, তাতেও থ্রিল পাই না। মজা পাই এখন এক বন্ধুর সাথে আলাপ করতে দিনের বেলা তো তাঁর অফিস। রাতে সেও ব্যাস্ত আমিও, তাই কথা হয় কম। আর কিছু খোজ খবর নিতে হয় নানান বন্ধুদের, তা রুটিন বেসিসে করে যাই। নেটে ডাটা নাই, গ্রামীনের সিমকে ওয়াইফাই বানিয়ে চালাই নাই তাতে সিনেমা দেখা তো দূরে থাক, প্রিয় ইউটিউবে গান দেখি না কতদিন! ভাত খেলাম জোর করে, মুখে রুচি নাই। মামা বাসায় নাই, গিয়েছি মামীদের বাসায়। বিশ্রী রকমের একা লাগে আজকাল।
আমি সিনেমার মজুদ রাখি না নোটবুকে। তাই খুব ভুল করি। দেখার মতো সিনেমাই নাই হাতের কাছে। যা আছে তা একটাও জাতের কিছু না। এখন মনে হচ্ছে জীবনের সব চেয়ে বড় ভুল অনলাইনে সিনেমা দেখা। টরেন্ট দিয়ে নামিয়ে যদি দেখতাম তাহলে সবই থাকতো। খালি সময় লাগতো বেশী। আগে মামাও প্রচুর সিনেমা নামাতো অফিস থেকে। সাংসারিক ও অফিস ব্যস্ততায় মামার সিনেমা নামানোতেও এখন ভাটা। কি আর করা, মনের দুঃখে টাইমস অফ ইন্ডিয়াই ভরসা। টাইমস অফ ইন্ডিয়া ভর্তি নানান সিনেমার ইনফরমেশন ও ডাটাবেইজে। খুঁজে খুঁজে দেখি। টাইমস অফ ইন্ডিয়ার রিভিউয়ের সাথে আমার মতামত অধিকাংশ সময় মিলে যায়। তবে কৌশিক গাঙ্গুলীর সিনেমা 'অপুর পাঁচালী' দেখে আমার মিলে গেছে ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের সাথে। এক্সপ্রেস বলছে, সিনেমাটা ভালো কিন্তু আরো ভালো হতে পারতো। আমি বলবো সিনেমাটা অসাধারণ তবে আরো ভালো হতে পারতো। সিনেমাটার ভালো প্রিন্ট নাই। আশরাফ রাসেল ভাই মাস খানেক আগে শেয়ার দিয়েছিল হলপ্রিন্ট ডাউনলোড লিঙ্ক। তাই ভরসা। প্রিন্টটা হলো অনেকটা চায়ের স্বাদ গরম পানিতে মেটানোর মত আর কি। পানীয়ইতো দুটো।
অপুর পাঁচালী সিনেমার ট্রেইলার যারা দেখছেন তাঁরা বুঝেই গেছেন কাহিনী কি নিয়ে। বিখ্যাত ক্লাসিক পথের পাঁচালী তে অপু ক্যারেক্টারে যে অভিনয় করেছে চাইল্ড আর্টিস্ট তাঁর জীবন নিয়ে। তবে তা কতটা সুবীর ব্যানার্জীর জীবনের সাথে মিলে গেছে তা আমার জানা নাই। তবে এখানে মুলত দেখানো হয়েছে বিখ্যাত অপুর ট্রিলজীর সাথে পথের পাঁচালীর অভিনয় করা সেই অভিনেতার জীবনের মিল ও ট্রাজেডী। সিনেমার প্লটটাই সাংগাতিক ভালো। এরকম ইউনিক আইডিয়া নিয়ে কেউ ভাবে না এই উপমহাদেশে। সিনেমাটায় তরুন অপুর চরিত্রে অভিনয় করেছে পরমব্রত আর বয়স্ক অপুর ভুমিকায় অরনেন্দু ব্যানার্জী। আমার কাছে সব চাইতে ভালো লেগেছে বৃদ্ধ অপুকেই। কি দারুন অভিনয় ভদ্রলোকের। কলকাতার আটপৌরে বুড়োরা যেমন হয় তেমন ঢংয়েই তাঁর সব কিছু। সিনেমাতে পরিচালক সত্যজিতের অপুর ট্রিলজীর যথেষ্ট সিন ব্যাবহার করেছেন মিলিয়ে মিলিয়ে। সংগীতও সেখান থেকে প্রচুর নেয়া। দারুন লাগে। কাহিনী বিন্যাস, মেকিং, চরিত্রের বিস্তৃতি সব কিছুই সত্যজিতের কাছাকাছি। সব্যসাচীর ছেলের অভিনয় অত্যন্ত যুতসই। তরুনরা যেমন ভাবে চিন্তা করে তেমন করেই সে কথা বলে একজন হারিয়ে যাওয়া প্রতিভাবান চাইল্ড আর্টিস্ট কিন্তু বর্তমানে জীবনযুদ্ধে পরাজিতে এক মধ্যবিত্ত বুড়োর সাথে। পার্নো মিত্রের স্ক্রীন উপস্থিতি মুগ্ধ করে, ঋত্বিকের অভিনয় চলে যায়। সিনেমার থিম একটাই আসলে, সেলুলয়েডে অপুর ট্রাজেডীর সাথে বাস্তবে অভিনয় অপুর ট্রাজেডি ভিন্ন সময়ের হলেও মিলে গেছে একই প্রান্তে। জার্মান মুলুক থেকে সম্মান জানাবে এই উসিলাতেই আসলেই জানা যায় অপুর জীবনের নির্মম উপ্যাখান। সিনেমাতে যখন অল্প করে দেখায় সৌমিত্রকে। মুগ্ধ হই। আগেও যেমন মুগ্ধ হয়েছি এখনও। আমার বিশ্বাস ভারতে বেঁচে থাকা শ্রেষ্ঠ অভিনেতার ভেতরে উনি প্রথম। জীবনে প্রথম যখন অপুর সংসার দেখেছিলাম। চোখ দিয়ে পানি টপটপ করে পড়ছিল। এই কিছুদিন আগেও রিসেন্ট এক সিনেমা দেখলাম 'রূপকথা নয়'। কি চমৎকার তাঁর অভিনয়। সেই সিনেমার একটা ডায়লগ আমি ঝেড়ে দেই চান্স পেলেই, 'শুনেছি ব্যাবসা করেও লোকজন প্রচুর টাকা হারায়, সেটাও নিশ্চয় দারুন এক থ্রিলিং ব্যাপার'।যাই হোক আসল কথায় আসি। সিনেমাটা অসাধারণ তবে আরো ভালো হয়তো হতে পারতো। তবে যা হয়েছে আমার ধারনা 'শব্দ' র পর, পরিচালকের আরেকটা জাতীয় পুরুষ্কার পাওয়া উচিত, অলরেডি এই সিনেমা অনেক উৎসবে গিয়েছে। ৪৪ তম আন্তর্জাতিক ভারতীয় চলচ্চিত্র উৎসবের সেরা ডিরেক্টর হয়েছেন তিনি। পরিচালকের সব সিনেমাই আমার দেখা। আমার মতে তাঁর সেরা সিনেমা হয়তো এটাই। এই সিনেমা নিয়ে দারুন এক কথা বলেছেন প্রিয় শিল্পী কবীর সুমন। আমারও একই কথাই মাথায় আসছিল, কিন্তু আমি প্রতিভাহীন মানুষ তাই উনার মতো লিখতে পারি নাই।
বন্ধুরা, গত পরশু আমি কৌশিক গঙ্গোপাধ্যায়ের ছবি অপুর পাঁচালি দেখলাম। আমার একান্ত অনুরোধ ছবিটি সকলে দেখুন। আমি অন্তত ভাবতেও পারিনি এমন একটি কাহিনীচিত্র হওয়া সম্ভব - এমন একটি কাহিনী আমাদের হাতের কাছেই ছিল।আছে। কয়েক দশক আগে একটি ইংরিজি পপ্ গান শুনেছিলাম, ভারি সুন্দর। তার মর্মার্থ : আমি জানতামই না যে পঁচিশটা বছর আমি এলিসের পাশের বাড়িতেই ছিলাম। - সুবীর বন্দ্যোপাধ্যায় যে পথের পাঁচালির অপুর ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন এবং তিনি যে এই শহরেই ছিলেন, আছেন - আমি জানতামই না। ভেবেও দেখিনি। আমার ধারণা আরও অনেকে আমারই মতন জানতেন না, কোনওদিন সেভাবে ভেবেও দেখেননি। কী-যে একটা কাণ্ড করে বসলেন কৌশিক গঙ্গোপাধ্যায়। ইন্দ্রদীপ দাশগুপ্ত, সঙ্গীতকার, আবহ সংগীত করেছেন। পথের পাঁচালিতে আচার্য রবিশঙ্করের সুরে সেই যে বাঁশিটি বেজেছিল - যে বাঁশির সুর গ্রামবাংলার শুধু নয় নগর-বাংলারও আত্মার সুর বলে আমি মনে করি, ইন্দ্রদীপ সেই সুরটিকে নিয়ে একটি লাইট মোটিফ রচনা করেছেন যা উপমহাদেশের শুধু নয় বিশ্ব-চলচ্চিত্রে এক ঐতিহাসিক অবদান। শুনবেন, কিভাবে তিনি অন্যান্য যন্ত্র এবং একটি নম্র 'বেস' (Bass) প্রয়োগ ক'রে ঐ বাঁশির সুরের মেজাজটিকে সম্পূর্ণ সম্মান জানিয়ে একটি রচনা বানিয়ে নিয়েছেন যা সমকালীন অথচ উচ্চকিত নয়, কোনও সাহেবী কায়দার দাস নয়। তেমনি এটাও আমার মনে হয়েছ যে ঐ থীম অতোবার প্রয়োগ না করলে আরও ভালো হতো। এটা অবশ্য নিতান্তই এই অধমের মত। কী করে আজকের প্রযোজক ও পরিচালকদের বোঝাবো যে ব্যাকগ্রাউণ্ড মিউজিক কম থাকলে ভাল হয়। ইরাণের ছবিগুলো দেখুন। ব্যাকগ্রাউণ্ড মিউজিক প্রায় নেই। থাকলেও কত কম। - এইসব মিলিয়ে আমি এ-বেলা পত্রিকার জন্য একটি লেখা দিয়েছি। হয়তো ছাপাবেন তাঁরা। আমার সমালোচনাটা নিন্দে নয়। অতীতেও অনেক বিখ্যাত ছবির নেপথ্য সংগীত রসের ব্যাঘাত ঘটিয়েছে বলে আমি মনে করি। এখন প্রশ্ন হলো আমি কে হরিদাস পাল। আমি নেহাতই আনাড়ি লোক। আমার কথা কখনওই শেষ কথা নয়। মোদ্দা কথা - অপুর পাঁচালি ছবিটি সকলে দেখুন। দেখুন, এই আকালেও কেমন বহুস্তর-বিশিষ্ট অথচ সহজ-সুন্দর একটি ছবি বানানো সম্ভব। বড্ডো জরুরি ছিল এই ছবিটি। ভাগ্যিস ইন্দ্রদীপ আমায় জোর করে দেখালেন। চারদিকে বড্ড পচ্যতা। সবকিছু কী-তাড়াতাড়ি অধঃপাতে যাচ্ছে, প'চে যাচ্ছে, নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। সুনীল লিখেছিলেন: তেত্রিশ বছর কেটে গেল কেউ কথা রাখেনি... বন্ধুরা, এই অধমও লড়াই করেছিল আপনাদের অনেকের মতো 'পরিবর্তনের' জন্য। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের কাছে ক্ষমা চেয়ে: 'পরিবর্তন কেটে গেল, কেউ কথা রাখেনি।' - যেদিকে তাকাবেন অসভ্যতা, ইতরোমি, ডাকাতি, পুকুরচুরি, অকল্পনীয় সব বাস্তবতা যা বিশ্বাস করতেও কষ্ট হয় অথচ যা সত্য। এরই মধ্যে কৌশিক গঙ্গোপাধ্যায়ের অপুর পাঁচালি যেন মরুদ্যান। কী আইডিয়া। জিনিয়াস। তেমনি কী অভিনয়!! সকলকে অভিনন্দন! বন্ধুরা, দেরি করবেন না, দেখুন। যদি মনে করেন বিজ্ঞাপন করছি - তাইই ভাবুন। ভালো জিনিসের বিজ্ঞাপন করেও সুখ। Enjoy!!!





নামিয়ে রেখেছি, দেখা হয়নি এখনো, সৌমিত্রকে আমি দুই বাংলার শ্রেষ্ঠ অভিনেতা মনে করি আর অপরনা ছিলেন যার যোগ্য সাথী ..... আর কনকনাকেতো আমি ভালবাসি .....অনেকেই বলেন মেঘের মত দেখতে
সবগুলো কথার সাথে একমত রে আফা।
তাহলে কিছু খাওায়ও
আসলেই তো মেঘের সাথে ভালো মিল
কবে দেখবো এত এত সিনেমা?
জুলাই থেকে!
অপুর প্যাচালী দেখতে হবে।
হার্ড ডিস্কে একগাদা ছবি। দেখতে বসলে টেনে টেনে দেখার দিকে মন চলে যায়। ছবি দেখার ইচ্ছাটাই মরে যাচ্ছে দিন দিন।
লেখার জন্য ধন্যবাদ।
ভালো প্রিন্ট না পাইতে পাইতে মুভি দেখাই ছাইড়া দিতে হইব মনে হয়..
সবুরে মেওয়া ফলে
মন্তব্য করুন