ইউজার লগইন

এই শহরের স্বপ্নগুলো লুকিয়ে যায় সব আঁধারে!

লিখছি না, লিখছি না করে চলে গেল এক সপ্তাহ কিংবা তারও বেশী কিছু দিন। না লিখলেও নিয়ম করে ব্লগ দেখি। নতুন লেখা আসলে পড়ি, পুরোনো লেখাও পড়া হয় মাঝে মাঝে। নিজের লেখা পড়ি কম, কি পড়বো সব একই কথা বারবার নানান শিরোনামে লেখা। বৈচিত্র্যতা নেই একদম। তাই নতুন লেখা লিখতে বসেই এখন ঝুকি নিতে হয় নিজের কাছেই। যে একই কথা আর কতবার লেখবো! তাও সময় পেলেই সে সহজ ঝুকিতেই গা ভাসিয়ে লিখতে বসি। লিখি কি আর করা যাবে। লিখতে পারিনা তেমন ভালো কিছু। আমার মতো প্রতিভাহীন মানুষ না হয় একটু ভাড়ামী করে একই কথা একই রকমের দিনলিপি লিখেই গেল একটা শীতল ব্লগে। তাতে কার আর কি আসলো গেল?

মনটা অত্যন্ত বিষণ্ণ। কারন গত তিন দিন ধরে নান্নু সাহেব নিখোঁজ। গত তিন দিন ধরে তাকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না কোথাও। সাবেক চা দোকানদার নান্নুর চার ভাই তাকে খুঁজে বেড়াচ্ছে সমানে, হাসপাতাল মর্গ, থানা পুলিশ বেওয়ারিশ লাশ সব খানেই ব্যাপক খোজ খবর চলছে কিন্তু নিউজ নাই । তার বউ কেঁদে কেঁদে অস্থির, আমারও মন খারাপ। কিন্তু যত খারাপ হবার কথা তত না, আড্ডা মারছি বাসায় থাকছি- টিভিতে গুপ্তকেশের সব অনুষ্ঠান দেখছি কোথাও মন খারাপ হয় না। মানুষ নাকি সেলফিস জিন দিয়ে গঠন করা, আজ তার প্রমান পেলাম আবার। আশাকরি খারাপ কোনো খবর শুনবো না, এতকিছুর পরেও হঠাৎ হঠাৎ গলাটা শুকিয়ে আসে, স্রষ্টা যেন কোনো খারাপ খবর আমাকে না শুনায়। কারন এই মানুষটা আমাকে যে পরিমান ভালোবাসছে তার ঋণ এক ছটাকও শোধ দিতে পারি নাই। বিপদের কথা আরো বেশী, নান্নুর ওয়াইফ এক্সপেক্টিং। উনাকে আমি একবারই দেখেছি বিয়ের সাজ পোষাকে, কাল যখন দেখলাম তখন বিশ্বাস হচ্ছিলো না। এই মহিলাই নান্নুর বউ কিনা? জীবন যুদ্ধে প্রতিনিয়ত লড়াই করতে করতে এক -দেড় বছরের মাথাতেই এই উনিশ বিশ বছরের মেয়েটা কেমন জানি বুড়িয়ে গেছে। আল্লাহ না করুক নান্নুর যদি কিছু হয় তাহলে এই তরুনীর আগামী দিনগুলো কি ঘোর অন্ধকার, তা ভেবে মনটা বিষিয়ে গেল। এক অদ্ভুত শহরে থাকি আমরা, যে শহরে মানুষই সব চেয়ে সস্তা জিনিস যা না চাইতেই হারিয়ে যায়। মানুষের জীবন এমনিতেও তেমন গ্লোরিফাইং কিছু না, এই শহরে সেই জীবন, সেই থাকা না থাকা আরো বেশী অনিশ্চিত। আমার এক বন্ধু বলছিল, 'দোস্ত বোনের বিয়ে দেবো তবে তার আগে ওর জন্য একটা চাকরী খুজছি, সেও খুজছে। আমি আমার বোনকে ইনসিকিউর রাখতে চাই না'। শুনে ফিক করে হাসি পেল, এই দেশে কবে কখন কোন আদম কিংবা হাওয়ার জীবন সিকিউর ছিল বা আছে? আস্ত একটা মরার দেশে দাঁড়িয়ে আমরা সবাই স্বপ্ন দেখছি বাঁচার, সেইখানে সিকিউর আর ইনসিকিউর ভেবে ফায়দা কি?

এইসব মেজাজ খারাপের দিন আরো বেশী খারাপ করে তুলে আশেপাশে। রিকশার জন্য দাঁড়িয়ে ছিলাম, কেউ যেতে চায় না। পাশেই এক রেষ্টুরেন্ট, হঠাৎ করে এক ছেলের চিল্লাচিল্লি শুনতে পেলাম। সেটা করছে কার সাথে- তার বউয়ের সাথে। দেখলাম তার ফ্যামিলীর আরো মেম্বার ও বন্ধু বান্ধব। ছেলেটা গগনবিধারী চিৎকার দিয়ে বলছে ' আমি ফাইনাল করতে ও সাইন দিতে ও নিতে আসছি, তোদের নাটক দেখতে আসি নাই'। আরো বিশ্রী অসভ্য ভাষায় মেয়েকে গালাগালি করছে সবার সামনে। মেয়েটা দেখতে নিঃসন্দেহে সুন্দর। ভদ্র ও সুস্থির ভাবে চোখে পানি ফেলতে ফেলতে শুনে চলছে সেই ইতর জামাইয়ের বয়ান। খালি বলছে, ' আস্তে কথা বলো'। কিন্তু সেই ইতর তা আর শুনে কই, সে আরো হুংকারে বলেই চলছে গালিগালাজ ও মিনিং লেস ইংলিশ কথাবার্তা। ছেলের সব চাইতে প্রিয় লাইন, 'আই ডোন্ট কেয়ার'। ঘটনার ব্যাপারে আগ্রহ জন্মালো খুব। সেই রেষ্টুরেন্টের ক্যাশে যে বসে তাকে আমি চিনি। গায়ে পড়েই জিগেষ করলাম, ভাই ঘটনা কি? সেই ভাই বলে, 'আমি তো জানি না। এরেঞ্জ ম্যারেজ হয়েছে ছমাস আগে তবে ছেলে মেয়ের ডিভোর্স হয়ে যাবে, তার আগে মেয়ের ফ্যামিলী চেষ্টা করতেছে মিউচুয়াল আন্ডারস্ট্যান্ডিং করে কিছু আবার ঠিক হওয়ানো যায় কিনা। তাই দুই পক্ষের লোকজন আসছে আলাপ করতে। তখনো ছেলেটার অকথ্য গালিগালাজ চলছেই, মেয়েটা খালি তাকিয়ে তাকিয়ে কেঁদেই চলছে, কেউ থামাচ্ছে না, লোকজনের জমায়েত হয়ে গেছে, সবার মুখে হাসি ও উপভোগের আমেজ। মেজাজটা আরো খারাপ হলো, মন চাইছিলো ছেলেটাকে ধরে মারি রাম চটকানা। আগের মত ফর্ম নাই, থাকলে কিছু একটা অবশ্যই করতাম। পরে মেজাজটা খারাপ হলো মেয়ে ও তার বাড়ীর লোকদের উপরে, এরকম ফাতরা লোকের কাছে মেয়ে বিয়ে দেয়ার মানে কি? পরে ভাবলাম আমি কে এদের ভিতরে যে নাক গলিয়ে ভাবছি? রিকশা পেয়ে গেলাম এসে পড়লাম বাসায়। কিন্তু গোটা রাত সেই মেয়ের মলিন কান্নারত মুখটার কথা ভেসে আসছে। হয়তো এই জীবনে আমার আর তাকে দেখা হবে না, হয়তো আগামীতে সে সুখেই থাকবে, কিন্তু এই মুখের স্মৃতি আর এই ইডিয়ট খবিশ ছেলেটার সিনক্রিয়েট জীবনে ভুলবো না।

রাজন নামের একটা ছেলেকে আমি চিনি। আমার সামনেই এরা বড় হয়েছে। স্কুলে যাওয়া বন্ধ করে ক্লাস থ্রি থেকেই এরা টুকটাক কাজ করা শুরু করেছে। তখন চায়ের দোকানের পাশে একটা গ্যারেজ ছিল। সেই গ্যারেজে কাজ করতো। এখন তার বয়স চোদ্দ বা পনেরো হবে। এখন সে লেগুনার হেল্পার। গত দুই দিন ধরে সেই ছেলেটাও মোহাম্মদপুর থানা হাজতে। সেই ছেলেটা রাত বারোটা পর্যন্ত কাজ করে একটার দিকে বন্ধুদের সাথে আড্ডা মারছিলো স্ট্যান্ডে বসে, পুলিশ ধরে নিয়ে গেছে তাঁদের চারজনকে। সাথে কিছুই পায় নি। নেভী সিগারেট ছাড়া। তিনজনকে ছেড়ে দিলো তার পরের দিনই এক হাজার টাকা জনপ্রতি বিনিময়ে। ছাড়া পায় নাই শুধু রাজন, কারন তার বাবা কিছুটা পাগল কিসিমের তাই টাকা ম্যানেজ করতে পারে নাই। কাল টাকা ম্যানেজ করে আরেক লোক যাবে আশা করি মুক্তি পাবে। কিন্তু জীবন থেকে যে তিনদিন থানা হাজতে থাকার নিদারুন কষ্টের অভিজ্ঞতা, তা তাকে যদি আগামীতে অপরাধী বানিয়ে ফেলে খুব একটা অবাক হবার কিছু নাই। এক হাজার টাকাতে এখন কি হয়, এক বেলা ভালো মন্দ খেতেই তো এরচেয়ে বেশী টাকা লাগে। তাও সেই সামান্য টাকার জন্যই একটা ছেলে গ্রেফতার বাণিজ্যের শিকার হয়। এই পুলিশই নাকি আবার জনগনের বন্ধু, এরকম বন্ধু থাকার চেয়ে গোটা বিশেক খারাপ লোক শত্রু থাকা ভালো। রাজনের সেই ছোটবেলার নিস্পাপ মুখটা কথা ভেবে মনটা আবার খারাপ হয়ে যায়। যে সেই ২০০৮ সালে আবদার করে বলতো, 'শান্ত ভাই একটা রুটি কলা খাওয়ান, খুব খিদে পাইছে।' আমি হেসে বলতাম, ' এই দুপুরে রুটি কলা খেয়ে পেট ভরে রে? সে হেসে জবাব দিত, আপনেগো ভরে না আমগো ভরে!'

পোস্টটি ১১ জন ব্লগার পছন্দ করেছেন

রাসেল আশরাফ's picture


নান্নুর ব্যাপারটা নিয়ে আমারও মন খারাপ হয়েছিলো। যাই হোক তাকে পাওয়া গেছে এইটাই সুখবর. কি হয়েছিল ডিটেইলস লিখো।

আরাফাত শান্ত's picture


লেখবো ভাইয়া। আপনার জন্যেও শুভকামনা!

মুনীর উদ্দীন শামীম's picture


-----একই কথা একই রকমের দিনলিপি লিখেই গেল একটা শীতল ব্লগে। তাতে কার আর কি আসলো গেল?

শীতলব্লগ, নামটা খারাপ না। আর দিনলিপি তো আমরা মনোযোগ দিয়েই পড়ি। Smile Smile

আরাফাত শান্ত's picture


আপনে পড়েন তা আমি জানি ভাইয়া। অনেক অনেক শুভকামনা ভাইয়া!

বিষণ্ণ বাউন্ডুলে's picture


Sad

আরাফাত শান্ত's picture


Sad

প্রিয়'s picture


আমার গায়ের চামড়া মনে হয় খুব মোটা হয়ে গেছে। এগুলা পড়লে এখন আর খারাপ লাগে না কোন।

আরাফাত শান্ত's picture


Sad

মন্তব্য করুন

(আপনার প্রদান কৃত তথ্য কখনোই প্রকাশ করা হবেনা অথবা অন্য কোন মাধ্যমে শেয়ার করা হবেনা।)
ইমোটিকন
:):D:bigsmile:;):p:O:|:(:~:((8):steve:J):glasses::party::love:
  • Web page addresses and e-mail addresses turn into links automatically.
  • Allowed HTML tags: <a> <em> <strong> <cite> <code> <ul> <ol> <li> <dl> <dt> <dd> <img> <b> <u> <i> <br /> <p> <blockquote>
  • Lines and paragraphs break automatically.
  • Textual smileys will be replaced with graphical ones.

পোস্ট সাজাতে বাড়তি সুবিধাদি - ফর্মেটিং অপশন।

CAPTCHA
This question is for testing whether you are a human visitor and to prevent automated spam submissions.

বন্ধুর কথা

আরাফাত শান্ত's picture

নিজের সম্পর্কে

দুই কলমের বিদ্যা লইয়া শরীরে আমার গরম নাই!