ইউজার লগইন

মন কেমনের ধূসর গ্রিলে

একরকম কেটে যাচ্ছে সময়। এই কথাটা যখন একজনকে বললাম, সে বললো কিভাবে কাটে রক্তসহ নাকি রক্তপাতহীন? আপাত নিরীহ কথার এরকম ভায়োলেন্স মিনিং আমার জানা ছিল না। এককালে বন্ধুদের সাধারণ কথাকে ডাবল মিনিং বানিয়ে মজা নিতে পারতাম। আমি যে কী পরিমান অশ্লীল মিনিং আবিষ্কার করতে পারি তা দেখে ভার্সিটির বন্ধুরা বিস্মিত হতো প্রথম প্রথম। একটা এক্সাম্পল দেই, আমার এক বান্ধবী ফোন দিয়েছিলে বাসায় নেট ঢুকে না, আমি জবাব দিয়েছিলাম ভ্যাসলিন লাগা অবশ্যই ঢূকবে। এই ডায়লগ এক সপ্তাহ খুব বলাবলি ছিল। সবার ধারনার বাইরে ছিল এইসব কথা। পারফর্মেন্স যখন খুবই ফর্মে তখনই আমি এইসব কথা বলা ছেড়ে দিছি। তখন আগ্রহ ছিল গালি শিক্ষায়। পুরান ঢাকার যত গালি আছে উর্দু মিশ্রিত সব বন্ধু অমিতের কাছ থেকে জানলাম। অমিত ছেলে ছিল একটা, তার যাবতীয় রাগ গিয়ে পড়তো রিকশাওয়ালাদের উপর। চটাশ করে থাপ্পড় মারতো, আর পাঁচ মিনিট পর মেজাজ ঠান্ডা হলে বিরিয়ানী কোক খাওয়াতো, টাকাও দিতে হাতে রিকশা চালকের। আমি বলতাম, অমিত না মারলেই পারিস। 'চান্দি গরম হয়ে যায় ভাড়া শুইনা, ---- আরে আমি কি কম দিমু' অমিতের ছিল সোজা উত্তর। এই দুঃখে অমিত একটা পালসারই কিনে ফেলে। পালসার কেনার পর মেডিকেল কলেজ মুখী তার যাতায়াত। একদিন পা ছিলে, তো একদিন হাত ভাঙ্গে। শেষে ক্লাসে আসাই বাদ, অমিত নিয়ে এত কথা কেন বললাম, নয়াবাজারের মুখে তার পোষ্টার দেখে হলাম অবাক। বড় পোষ্টওয়ালা নেতা হয়ে গেছে ছাত্রলীগের। আমি জানি যতদূর বিবিএই কমপ্লিট হয় নাই। একেবারে পারফেক্ট ছাত্র নেতার যা থাকা উচিত মিলিয়ে দেখলাম সবই ওর আছে। নাম্বার খুঁজলাম, পেলাম না। আমার সভ্য চাকুরে বন্ধুরা অমিতের মত ছেলের নাম্বার রাখার প্রয়োজন অনুভব করে নি। আর আমার মত সুশীলরা তাঁর নাম্বার হারিয়ে ফেলেছে। বারেক সাহেবের এক ভাতিজা আছে কিউট বাচ্চা, কিন্তু যে খারাপ গালি শিখছে এইজন্যে কেউ কথাই বলে না। বারেক সাহেবকে জিগ্যেস করলে বলে ওর মামার বাড়ী থেকে শিখছে, আর ওর মা বলে- এই বাড়ীতে থাইকাই শিখলো। পুলক দারুন এক নাম দিলো আজ, দুই এরিষ্টোক্রেট ফ্যামিলীর লড়াই।

আগের মতো ইন্টারেস্টিং সময় আর কাটাতে পারি না। দেখি ঋত্বিক রোশনের 'হি' বডি স্প্রে লাগাতে হবে, কারন সেখানেই বলতে শুনি- বি ইন্টারেষ্টিং। আমাদের সময় এখন সিনেমার প্রেমে ব্যর্থ নায়কদের মত একঘেয়ে। তবে আমার সুবিধা হলো, আমার সাথে কারো দেখা হলেই বলে, 'ভালোই আছোস তাইলে'। মেজাজ খারাপ হয়ে যায়, ঝাড়া দিয়ে বলে উঠি তোদেরকে ভালো থাকতে মানা করে কে? আমি ভালোই থাকি। সারাদিন এখন কাটে বাসাতে। বই পড়ি চা বানাই আর নেটে বসি। বারেক সাহেবের দোকানে গেলেও থাকা হয় সর্বসাকুল্যে ১ ঘন্টা। থ্রি এমবিপিএসের লাইন, ধারনা ছিল চালিয়ে ফাটায় ফেলবো। কিন্তু করার মতো কিছু পাই না। কিছুক্ষণ বসে এরপর শহীদুল জহির নিয়েই বসে থাকি। অনেক আগেই আমার শহীদুল জহির সমগ্র পড়া খতম। তাও পড়ি কারন উনার প্রতিটা লাইন একেকটা গল্পের মতো। এরকম লাইন বারবার পড়া যায়। আর পড়ি অ্যাডর্ণ থেকে কেনা নন ফিকশন সিরিজ। আদিম মানুষ নিয়ে বই, দাসপ্রথা নিয়ে, প্রাচীণ পুরাণ নিয়ে, বিভিন্ন সভ্যতা নিয়ে। পড়তে মজা লাগে। তবে কিছুই মনে রাখতে পারি না। আমার এক কাছের বন্ধু বই মার্ক করে পড়তো, এখন আমি বুঝি কেন বই মার্ক করে পড়া। কারন মনে থাকে না। চার পাঁচ দিন আগে পড়া বইয়ের মুলভাব টুকুই শুধু মনে আসে। কত চমৎকার কিছু বিষয় ছিল সব ভুলে যাই। সবাই আমরা ভুলে যাই সব কিছু। অলরেডি নিউজফিড থেকে হারিয়ে গেছে অভিজিত রায়ের খুন, হারিয়ে গেছে আরো কত কিছু। আমার এক এগনস্টিক বন্ধু বছর পাঁচেক আগে আমাকে বলেছিলো, স্রষ্টা দুনিয়ার বাইরে থাকে, বাইরে থেকে সবাইকে দেখে তাই মানুষ কম বেশী মনে রাখে। যদি তিনি দুনিয়ায় থাকতেন তবে মানুষ ভুলে যেত উনার কথা। সাগর রুনী ভাগ্যবান তাঁরা সাংবাদিক হবার কারনে হোক আর মন্ত্রীদের উল্টো পালটা কথায় হোক অনেক দিন ছিল পত্রিকার পাতায়। অভিজিত রায় অলরেডী পত্রিকার ভেতরের ৬-৭ পাতায় চলে যাচ্ছেন কদিন পর হারিয়ে যাবেন। তারপর ফেব্রুয়ারী মাসের বইমেলার উচ্ছাসের শেষ দিনগুলোতে আমাদের মনে পড়বে যে উনাকে বছর খানেক আগেই হাজার হাজার মানুষের সামনে নৃশংস ভাবে খুন করা হয়েছিলো। এভাবেই আমরা ভুলে যাই আর আগামীর আরো বড় শোকের উপলক্ষের অপেক্ষায় থাকি।

নতুন বাসায় আপাতত একাই থাকি। মামী এখনও আসে নাই। নিজের আলাদা এক জগত বানিয়ে অবস্থান এই বাসায়। রাতে নিয়ম করে দুঃস্বপ্ন দেখি। সকাল বেলা ঘুম থেকে উঠি এক মেজাজ খারাপ নিয়ে। মনে হয় আগেই ভালো ছিলাম। মাঝ রাতে ঘুমাতে যেতাম, স্বপ্নই দেখতাম না কোনো। ঘুম ভাঙতো বুয়ার নকে। এখন বুয়া আসে কখন যায় কখন, দরজা খুলে মামা। আমার ঘুমানো ছাড়া করার কিছু থাকে না। তবে এই বাসার একটা আনন্দ আছে, তা হলো নিঃস্তব্ধতা উপভোগ করা যায়। চার তলার পেছনের সাইডের পেছনের রুম আমার। নিজে শব্দ না করলে একদম শুনশান। আগের বাসার মতো জানলা দিয়ে আকাশ দেখা যায় না, দেখা যায় শুধু পাশের বিল্ডিংয়ের ময়লা বারান্দা। সূর্যের আলো আসে ঘরে, কিন্তু কোথা হতে এত আলো আসছে বুঝে নেয়ার উপায় নেই। সাজানো গোছানো পরিপাটি একটা রুমের মালিক আমি। তবে তেমন আত্মপ্রসাদে ভুগি না, মনে হয় সেই ছাদের ঘরটাই ভালো ছিলাম। এমন গরমের দিন গুলোতে সেদ্ধ হতাম, উপরে টিন ছিল, এক রুমে আমি আর মামা থাকতাম, গাদাগাদি বই পিসি হাড়ি পাতিল প্লেটের এক অদ্ভুত অবস্থান। মানুষের জীবনই এমন, খালি পুরোনো সময়কেই দামী মনে হয়। খেলা চলে বিশ্বকাপ, ধারনা ছিল দেইখা ফাটায় ফেলবো। ভালোই লাগে না। আস্তে আস্তে ক্রিকেট প্রেমেও মরিচা ধরলো, বাংলাদেশের খেলা বাদে আর কোনো ক্রিকেট খেলাই আমি মন দিয়ে দেখি না আর। আপডেট জানি, হাইলাইটস দেখি টুকটাক, কিন্তু ওটাকে দেখা বলে না। আর্জেন্টিনা হারের পর থেকে ফুটবল খেলাও দেখা বাদ দিয়েছি, বঙ্গবন্ধুর গোল্ডকাপের ফাইনাল দেখলাম তাতেই হেরে বসলো। টিভিও দেখা বাদ, যাও দেখতাম অভিজিত রায়ের হত্যা কান্ডের পর লাইভ আপডেটের অত্যাচারে একদমই বাদ তা। দিন হতে দিন সামনে আসলেই কঠিন। দিন যাচ্ছে বোরিং আর ইরিটেটিং সময় পার করছি।

পোস্টটি ৭ জন ব্লগার পছন্দ করেছেন

তানবীরা's picture


বোরিং হোক আর ইরিটেটিং সময় কেটে যায়

আরাফাত শান্ত's picture


সেটাই!

জ্যোতি's picture


আমি যে কী পরিমান অশ্লীল মিনিং আবিষ্কার করতে পারি তা দেখে ভার্সিটির বন্ধুরা বিস্মিত হতো প্রথম প্রথম।

আমিও বিস্মিত।

এভাবেই আমরা ভুলে যাই আর আগামীর আরো বড় শোকের উপলক্ষের অপেক্ষায় থাকি।

মানুষের জীবনই এমন, খালি পুরোনো সময়কেই দামী মনে হয়।

এত দামী কথা মনে আসে কেমনে তোমার!!!

আরাফাত শান্ত's picture


সবসময়ই আসে দামী সব কথা, সবসময় তা লেখা হয় না!

মন্তব্য করুন

(আপনার প্রদান কৃত তথ্য কখনোই প্রকাশ করা হবেনা অথবা অন্য কোন মাধ্যমে শেয়ার করা হবেনা।)
ইমোটিকন
:):D:bigsmile:;):p:O:|:(:~:((8):steve:J):glasses::party::love:
  • Web page addresses and e-mail addresses turn into links automatically.
  • Allowed HTML tags: <a> <em> <strong> <cite> <code> <ul> <ol> <li> <dl> <dt> <dd> <img> <b> <u> <i> <br /> <p> <blockquote>
  • Lines and paragraphs break automatically.
  • Textual smileys will be replaced with graphical ones.

পোস্ট সাজাতে বাড়তি সুবিধাদি - ফর্মেটিং অপশন।

CAPTCHA
This question is for testing whether you are a human visitor and to prevent automated spam submissions.

বন্ধুর কথা

আরাফাত শান্ত's picture

নিজের সম্পর্কে

দুই কলমের বিদ্যা লইয়া শরীরে আমার গরম নাই!