ডুবে আছি বিষাদে!
বাসায় অনেকদিন ধরেই আমি একা একা থাকি। সেই যে মামী গিয়েছে ঈদের সময় আর আসে নাই।অফিস থেকে বাসায় ফিরি, সন্ধ্যা গড়িয়ে সকাল আসে, কারোর মুখ দেখি না। কারন মামা থাকে অফিসের নানান ট্যুরে অথবা শ্বশুরবাড়িতে। বুয়ার মুড ভালো থাকলে আসে নয়তো নাই, তাই বাইরে বাইরে খেতে হয়্ কিংবা আলসেমীতে খাই না, এভাবেই যাচ্ছে দিন। আবার সেই চিলেকোঠার এক রুমের জীবনের স্বাদ পাচ্ছি। সেই ব্লগ লেখার জীবনের, যখন রাতে ব্লগ লেখা ছাড়া বাসায় আমার করার কিছু থাকতো না। খালি মনে হতো এই দিন গুলো নিয়ে কিছু কথা লেখা থাক। না লেখা থাকা দিনগুলোর আসলে ফেসবুক মেমোরী ছাড়া আর কিছুই স্পেসিফিক মনে আসে না। যা মনে আসে সবই ভাসাভাসা আর অনুমান নির্ভর। যেমন ২০১৪ সালের অক্টোবর মাসের শুরুর সপ্তাহে আমি কি করেছি মাথাতেই আসে না। যখন ব্লগে আসি তখন মনে হয়, ও আচ্ছা এই এই করে বেড়াচ্ছিলাম। এই এই ভাবছিলাম তখন দিনগুলোতে। তখন ভালো লাগে। আমার হাতে লেখা ডায়রী আছে, সেখানে মাত্র দুই চারটা এন্ট্রি লেখা থাকে।আমার কাছে আমার আব্বুর ডায়রী সবচেয়ে অদ্ভুত লাগে। তাতে চাকরীর কোন কোর্সে কবে ছিল, কবে কবে বিদেশ ছিল, কবে কোন পোস্টিং কবে ছুটি নিয়েছে শুধু সেই আলাপ। সেই ডায়রীর এক কোনায় একটা ডেট আমাকে মুগ্ধ করেছে, আমার আম্মুর সাথে একটা বড় ঝগড়া করেছে, ঝগড়া করে আমার পিতা বিরক্ত, সেই কথাটা লেখা। এই একটা এন্ট্রি অতি সাধারণ ডায়রীকে মানবিক করেছে। মনে হয়েছে ২৬ বছর আগের দিনটা আসলে কেমন ছিল। এই জন্যই যতঁ সামান্যই হোক ব্লগ লেখা অসাধারন জিনিস।
আসলে লেখার কিছু পাচ্ছি না। রিসেন্ট ইস্যু নিয়েও লিখতে ইচ্ছে করছে না। আসলে লেখাঝোকা এখন আমার কাছে অনেকটা রাতে হক থেকে নান গ্রীল কেনার মতো। দেরী হলে বিরক্ত লাগে, যখন পেয়ে যাই তখন মনে হয় এখন বাসায় যাও, গিয়েই খেতে বসো, কি বিশাল এক ঝামেলা, এরচেয়ে না খেয়ে থাকাই ভালো ছিল। ব্লগ লেখাকে খুব মিস করি, কিন্তু লিখতে বসলে মনে হয় কি লিখবো, একদম যা তা অবস্থা। অন্যদের মতো আমি কখনো বলবো না, আমি সময় পাই না। সময় পাই কম বেশী। কিন্তু লেখা আর হয়ে উঠে না। যে ডেস্কটপ ছাড়া আমার আগে দিন চলতো না, মনিটর ইচ্ছে করেই না কিনে তা ফেলে রাখছি। সিনেমা দেখতে খালি ল্যাপটপে বসা নয়তো নাই। স্মার্ট ফোনেই এখন সব কিছু।স্ট্যাটাস লিখি, লোকজনের বাহবা পাই, চেনা গান গুলো শুনি, কাউকে মেসেঞ্জারে নক করি না দু একজন বন্ধু ছাড়া, এভাবেই চলে যায়। বন্ধুরা আসে, বিরিয়ানী-চাপ-চায়নিজ খাই, এক সাথে হাহা হিহি করি, রাতের বেলা বারেকের দোকানে চা খাই, ছোটোভাইদের কথা শুনি, বই পড়ি, দিন কেটে যায়। কিন্তু বিষাদ কাটে না। গন্ডায় গন্ডায় নানান জায়গায় যাবার দাওয়াত পাই, কোথাও যাই না। বাসায় থাকলে খেলা দেখি, বাইরে খেলা দেখি না, খেলার উত্তেজনা টানে না। এপ্সের কারনে খবর পাই নয়তো এত প্রিয় ইংলিশ প্রিমিয়ার লীগেরও ম্যাচ দেখা হয় না। তাহলে করা হয় কি, সেই উদাস হয়ে বসে থাকা। বিভিন্ন সময় নানান কিছু নিয়ে ভাবা। আগের চেয়ে এখন আমি বেশী ভাবি। আগে ভাবতাম না। আগে সব কিছুতেই আমার চিন্তা ছিল যা হবার হবে। এখন খালি ভাবি কি হবে, কি হবার ছিল। মানুষকে নিয়ে ভাবি, মুখোশ নিয়ে ভাবি, যদিও ভেবে কিছুই হয় না তাও ভাবি। ভেবে ভেবেই দিন গেল।
আল্লাহর দান বিরিয়ানীর দোকানের ছেলেটার কথা ভাবি। যে আমাকে রাইস বাড়িয়ে দেয়। ছেলেটার একটা বোন আছে, শরীয়তপুর থাকে। ক্লাস সেভেনে পড়ে। সে সময় পেলেই বোনের সাথে কথা বলে মোবাইলে। যা বেতন পায় তার হাফের বেশী মোবাইলেই লোড করে। তখন আমার মনে হয় ইশ আমার একটা বোন থাকলে কতঁ ভালো হতো। আবার আশিকের কথা ভাবি, যার একটা আজাইরা স্কুলজীবন কেটেছে, ক্লাসের সবাই ডাকতো তাকে 'মাসিক' বলে। সে বিরক্ত হলেও কিছু বলতো না।তার নরম স্বভাবের কারনে তার ক্লোজ বন্ধুর 'বান্ধবী' তাকে বানিয়ে দেয়া হয়ে সবাই কম বেশী মজা নেয়, ছেলেটা হেসেই উড়িয়ে দেয়। তার বাবা মারা গেল হুট করেই, আমার অফিস বাদ দিতে হলো। যে কান্না ছেলেটার। তখন আমার মনে হয়, মা বাবা এখনো বেঁচে আছে এইটাই দারুণ ব্যাপার। শোক আসলে উৎসব। গাড়ী হাকিয়ে লোকজন আসে, ডেকোরেটর থেকে চেয়ার আসে, বড়লোক আত্মীয়রা খাবার পাঠায়, জোর জবরদস্তি করে খাওয়ানোর চেষ্টা, সবার স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা। আমার অবশ্য এইসব বিরক্ত লাগে। যে কাঁদতে চায় সে কান্না করুক। কারন কান্নাই পারে অসীম শোককে ভুলিয়ে দিতে। কিন্তু এইদেশে কান্না করাও যাবেনা, কারন কাদলেই বলবে তুমি ভেঙ্গে পড়লে চলবে।যার যায় সেই বুঝে কষ্ট, ডায়লগ মারা সবসময়ই সোজা। ফেসবুকের লোকজনের শেয়ার কারনে বন্যা আপার রক্তাক্ত মুখের ছবির কথা আমার মাঝামাঝে মনে আসে কিংবা হোলী আরটিজানের সেই রক্তমাখা ফ্লোরে কথা, তখন যাবতীয় পজেটিভ এনার্জি ঠুনকো হয়ে আকাশে ভাসে। আমার এক বন্ধু ছিল, তার বাবা চাচারা বংশগত ভাবে ডোম, সে পড়াশুনা করে, মারচেন্ডাইজার, তার ডায়লগ ছিল, মানুষ নাইনটি পারসেন্ট জানোয়ার, দশভাগ মানুষ, দশভাগ দিয়ে কেউ কেউ ৯০ ভাগ কাভার করে, বেশীরভাগের ৯০ ভাগ টুকুই শুধু দেখা যায়। নয়তো বাশবাড়ীতে একটা ছেলের পেছনে হাওয়া দিয়ে মেরে ফেলার পর, সামান্য ১ লাখ টাকার লোভে বাবা মা সব কিছু মিউচ্যুয়াল করে ফেলে।
সবাই আয়নাবাজি সিনেমাটা দেখছে। আমিও হয়তো দেখবো সামনে, সময় পাচ্ছি না। আয়নাবাজিতে চঞ্চল ৬ টা চরিত্রে সুইচ করে।তার সব আলাদা কস্টিউম, আলাদা মেকাপ। আমি দেখি মানুষের মেকাপ কস্টিউম ছাড়াই অনেক রূপ। যে মানুষকে বন্ধু হিসাবে দেখি সজ্জন, সে দেখি কাজের বুয়াকে মেরে ২ দিন জেল খাটে। যে বড় বড় ধর্মের কথা বলে, সেই সামান্য কটা টাকার লোভ সইতে পারে না, যাকে ভাবি সেন্সিটিভ সেই দেখি শক্তিশালী আঘাতকারী। একটা মোবাইল চোরকে হাতেনাতে পেলে সবাই মারে, কিন্তু ধরা না পড়লে সব লোকই নিজেকে মহান দাবী করতে দু মিনিট সময় নেয় না। আমার কাছে নিজেকে লিমিটেড এডিশন ভন্ড ছাড়া আর কিছুই মনে হয় না। আর রেস্ট্রিকশনে বড় হবার কারনে অনেক কিছুই করতে রুচিতে বাধে। ভাগ্যিস রুচিটা ছিল, নয়তো চারটা অব্ধি না ঘুমিয়ে পোষ্ট লেখে আর কে?





বাহ
অনেক দিন পর ব্লগে এসেই শান্তর লেখা সবার আগে , সেই আগের মতোই !
সুমন ভাই, ভালো আছেন আশাকরি!
একদম, চারদিকে ভন্ডামির মহড়া চলছে। আমরা দেখি, ভাবি, একটু হতাশ হই এবং ভুলে যাই।
সাধারন একটা ডায়েরীর অসাধারন পার্টটাই ছিল অনন্যসাধারন যেটা আপনার বাবার জীবনের কোন একটা অংশ। সত্যিই কত রকম জীবন যাপন করতে হয় মানুষের, কিছুটা অভিনয় কিছুটা বাস্তবতা। নারী অধীকার ইস্যু নিয়ে একটা লেখা আশা করছি।
সুযোগের অভাবেই হয়তো ভালো থাকা হয়ে যায়, কথাটা মনে পড়লো হঠাৎ!
পুরান অভ্যাস ফেরত আসুক, অযথা লেখালেখির পুনর্জন্ম হোক। ভালো থাকো..
কি খবর বর্ণ? দেখি না কোথাও?
আল্লার দান বিরানীটা খাইতে হবে। রাইস বাড়ায় খাইনা কতো বছর!
দেশে আসো আগে, মালয়তে খালি ক্রাশ খায়াই দিন কাটাতে হবে!
মন্তব্য করুন