ইউজার লগইন

মোস্তাক শরীফের- আবু তোরাবের দৌড়ঃ জীবনের গল্প যাপনের গল্প

বলা যায় মোস্তাক শরীফকে আমাদের লেখক। আমাদের লেখক কিভাবে? কারন যখন থেকে তিনি উপন্যাস লিখে প্রকাশক মনোনীত পুরষ্কার পেলেন, তখন থেকেই আমরা তাঁর পাঠক। সেই তো 'সেদিন অনন্ত মধ্যরাতে' থেকে শুরু করে। এরপর থেকে তার উপন্যাস বেড়িয়েছে প্রতি বছরেই, পড়া হয়েছে ভালো ভাবেই। এই ব্লগেই লিখেছি কত রিভিউ। তার লেখার যে বেড়ে উঠা তা আমাদের চোখের সামনেই। উপন্যাসিক হিসাবে তিনি সফল, এবার তিনি উপন্যাস লিখেন নি। লিখেছেন গল্প গ্রন্থ। নাম দিয়েছেন-- আবু তোরাবের দৌড়। মেলা থেকেই সংগ্রহ করেছি। তারপর পড়া শেষ হয়ে গেল আগেই। কিন্তু লিখবো লিখবো করেও লেখা যাচ্ছে না ব্যস্ততায়। আজ মাথা ব্যাথা প্রচন্ড। কাজে যাই নি, আজ ভাবলাম লিখে ফেলি।

মোস্তাক শরীফের মোট আটটি গল্প নিয়ে গ্রন্থটি। এর ভেতরে সবকটি গল্পই আসলে গল্প হয়ে উঠেছে। চার পাচটা গল্পের কথা তো সহজে ভুলবোই না। উপন্যাসিকদের জন্য গল্প লেখা সহজ কাজ নয়, কারন একেকটা ছোট গল্পের ভেতরেই একেকটা উপন্যাসের বীজ থাকে সীমিত পরিসরে, তা এড়িয়ে লিখতে হয় গল্প। প্রথম গল্প- 'সনাতনের ঘর'। সবহারা আত্মীয়হীন সনাতনের জেদ আমাকে মুগ্ধ করেছে। লেখকও সনাতনের প্রতি মায়াময়। তবুও সনাতন মানবসৃষ্ট দুর্ভাগ্য এড়াতে পারে না এই দুর্বিনীত সময়ের হিংসা বিদ্বেষ, জেদের মুল্য দেয় ঘর পুড়িয়ে। তবুও ভালো মানুষেরাও আছে কিন্তু তারা সংঘবদ্ধ হতে পারে না। এরপরের গল্পটা- 'আমি তাকে যে কারনে খুন করেছিলাম'। গল্পটা একজন খুনীর সাদামাটা বিবরনী। যে বন্ধুকে খুন করেছিল খুনী- তার গ্রামের বাড়ীতে যাওয়া, সেই চেনা জনপদে ফেরত আসা, খুন হওয়া বন্ধুর পিতৃগৃহে আতিথ্য গ্রহণ, পরে আবার নিজের অপরাধবোধে হুট করেই ফিরে আসা। গল্পটা পড়তে মনে হয়, গল্পটা আমাদের, গল্পটা মানুষের। হিংসা- দোষে গুনে পাপবিদ্ধ মানুষদের গল্প। 'নারগিস বেগমের লাইফের হিস্ট্রি' গল্পটা মনোরম। এক সাধারণ হাউজওয়াইফের গল্প। বেঁচে থাকার জন্য কত রকমের আপোষ করতে হয় তা নিয়ে গল্পটা। 'চা' গল্পটা আমার মনে ধরেছে। নিজে খুব চা পান করি বলে নয়, গল্পটা আমার কাছে লেগেছে বেদনার। এক সাধারণ নিম্নবিত্ত ছাত্রের প্রথম টিউশনির গল্প, টিউশনিতে করাতে গিয়েই পরিচিত হয়- পোর্সেলিনের সাদা কাপে দেয়া অসাধারণ চায়ের সাথে। তার অতিসাধারণ দিন যাপন মধুর হতে থাকে এই এক কাপ অসাধারণ চায়ের বদান্যতায়। টিউশনিটা আর থাকে না, ভবিষ্যতের অর্থকষ্ট ও আর সেই বাসার অসাধারণ চা না খাওয়ার দুঃখ ছেলেটাকে নিয়ে যায় এক বিষাদের শহরে। এই যে আমাদের জীবন যাপনে সামান্য কিছু বিষয় আমাদেরকে কিভাবে মায়ায় জড়িয়ে ফেলে তা এই গল্পটায় এসেছে সুনিপুণ ভাবে।

আবু তোরাবের দৌড়, নামের গল্পটা এই গ্রন্থের সবচেয়ে শক্তিশালী গল্প। এর নামে বইটার নাম রাখা, একদম যথার্থ। গল্পটা বলবো না, কিন্তু এর বর্ণনা অসাধারণ। লেখক মোস্তাক শরীফ গল্পতেও অনেক দূর যাবেন এই নিয়ে আশাবাদী হওয়া যায় গল্পটা পড়লে। 'অহম' আর 'পাথর' দুটি মানবিক মায়াময় গল্প। 'পাথর' গল্পটা আমাকে মনে করিয়ে দেয় বিখ্যাত লেখক শওকত ওসমানকে। শওকত ওসমান এই ধরণের গল্প লিখতেন কিশোরদের জন্য। গল্পটা পড়ে আমার সেই কিশোর সুমনের জন্য মনটা উদাস হয়। 'অহম' গল্পটা হুমায়ুন আহমেদের মত করে লেখা, উনার যেকোনো গল্পের মতোই ভালো। কিছু হালকা স্যাটায়ার গল্পটাকে একই সাথে সুখপাঠ্য ও করুণ করেছে। শেষ করবো লেখাটা আমার সব থেকে প্রিয় গল্প এই বইয়ের সেটা হলো-- 'একটি অসামান্য ভ্রমনের গল্প'। এই বছরে আমি এত ভালো গল্প পড়ি নি আর। একজন খুন হওয়া মানুষ বলে যাচ্ছেন তার আটপৌড়ে জীবনের কথা, তার দশটা পাচটা অফিসের জীবন, টুকটাক অভাব তারপরেও মায়ার সংসারের আলাপ, কলিগের সাথে রেষারেষি তার কারনেই খুন হয়ে নদীতে ভেসে চলা। দারুণ সুন্দর বিবরণ লেখক দিয়েছেন। মনে হচ্ছিলো, আমরাও যেদিন মরে যাবো সেদিন আমরাও বলবো এইভাবে কথাগুলো।

তরুণ অনেক লেখকদের বলতে শুনি, আমরা গল্পটা জানাতে চাই পাঠকের কাছে, সাহিত্য করতে আসি নি। সেই বেকুব তরুণ লেখকরা জানবেও না, ভাষাই আসল। গল্প বলাটা পরের। লেখক হবার জন্য অভিজ্ঞতাটা জরুরী না, লিখতে পারটা জরুরী। লেখক মোস্তাক শরীফ তেমনি একজন লেখক। যিনি দক্ষ ভাষায় বলে গেছেন জীবনের গল্পগুলো। লেখালেখির ভূবনে তিনি লম্বা রেসে অনেকদিন দৌড়বেন।

মন্তব্য করুন

(আপনার প্রদান কৃত তথ্য কখনোই প্রকাশ করা হবেনা অথবা অন্য কোন মাধ্যমে শেয়ার করা হবেনা।)
ইমোটিকন
:):D:bigsmile:;):p:O:|:(:~:((8):steve:J):glasses::party::love:
  • Web page addresses and e-mail addresses turn into links automatically.
  • Allowed HTML tags: <a> <em> <strong> <cite> <code> <ul> <ol> <li> <dl> <dt> <dd> <img> <b> <u> <i> <br /> <p> <blockquote>
  • Lines and paragraphs break automatically.
  • Textual smileys will be replaced with graphical ones.

পোস্ট সাজাতে বাড়তি সুবিধাদি - ফর্মেটিং অপশন।

CAPTCHA
This question is for testing whether you are a human visitor and to prevent automated spam submissions.

বন্ধুর কথা

আরাফাত শান্ত's picture

নিজের সম্পর্কে

দুই কলমের বিদ্যা লইয়া শরীরে আমার গরম নাই!