ইউজার লগইন

গল্প: আমি তো দিয়েছিলাম তোমায় কৃষ্ণচূড়া ফুল

পথচলা মঙ্গলময় হোক।
-আচ্ছা হবে। তোমাদের স্থবিরতাও ফলপ্রসূ হোক। একেকজন সোলার প্যানেলের মতো আরাম সংগ্রহ করে করে নিজের ভেতর জমিয়ে রাখো।
শুধুই নিজের সুখের চিন্তা। আমার ভেতরে যে বেড-বাগ বাসা বুনেছে, সে খবর আছে?
-তাই নাকি? কই এখনো টের পাই নি তো। বলো নি কেন?
বলি নি, দেখতে চেয়েছি তুমি নিজে নিজে বোঝো কি না। তোমার সিংহাসনের কতটুকু যত্ন তুমি আসলে নাও, সেটা কি জানো?
-বেড বাগরাও আলাপ করতে আসে নি। ওদের তো যুদ্ধ'র প্রস্তুতি নিয়ে চলে আসার কথা।
তুমি ভালো বন্ধু নও বলে কি অন্যরাও তাই? আমরা সবসময় তবু যেন তোমার কোনো কষ্ট না হয় সে চেষ্টা করি। তাই বিবি'দের দেখা পাও নি।
-আচ্ছা তোমাদের তাহলে রোদে রেখে যাই। রাতে ওষুধ এনে লাগিয়ে দেবো, কি বলো?
না টানাটানির দরকার নেই। শুধু ওষুধটা মনে করে নিয়ে এসো। আর ভালো থেকো। যাও তোমার দেরী হচ্ছে।

কথা হচ্ছিলো আমার সোফাচেয়ারটির সঙ্গে। ও খানিকটা অভিমানী টাইপ। কিন্তু সবাই ওর মতো নয়। সিঁড়ি দিয়ে নামতেই চিৎকার-চেঁচামেচিতে কান ঝালাপালা হবার জোগাড় হলো। কি হয়েছে দেখতে মেশিনরুমে উঁকি দিলাম। মেশিনে পানি উঠছে না। ওর গলা দিয়ে ঘরঘর ঘরঘর এক ধরনের শব্দ হচ্ছে। সুইচ অফ করে তাড়াতাড়ি পাশে গিয়ে একটু বসলাম। আহা আমার বুড়ো হয়ে যাওয়া পানি তোলার পাম্প।

এ বাড়িটা বানাবার সময় দাদু অনেক পয়সা খরচ করে ইতালী থেকে পাম্পটি আনিয়েছিলেন। তখন দেশে ইতালিয়ান পাম্প আমদানি হতো না। ওর অনেক বয়স হয়েছে। তাই মাঝে মাঝে কাহিল হয়ে পড়ে। এখন যেমন শরীরটা ভীষণ গরম হয়ে আছে।
বললাম, কি ব্যাপার? কোনো সমস্যা? খারাপ লাগছে?
কোনো উত্তর নেই।
আবার জানতে চাইলাম, সমস্যা থাকলে বলো। দেখি কি করা যায়।
হাত উঁচিয়ে নিজের পানি ঢালার নলটির দিকে দেখালো। সেখানে পানি দেয়া হয় নি। হতচ্ছাড়া নতুন দারোয়ানটি প্রায়ই এ কাজ করে। পুরোনো মেশিন, আগে বেশ খানিকক্ষণ পানি ঢেলে তারপর ছাড়তে হয়। ব্যাটাকে সেদিনও পই পই করে বুঝিয়েছি দ্বিতীয় কিংবা তৃতীয়বারের মতো। মাথাতেই ঢোকে না। কি আশ্চর্য!

আবার বাসায় ঢুকলাম। বালতিতে করে পানি এনে মেশিনে দিলাম। এবার চালু হলো এবং মনোরোম শব্দে পানি ওঠাতে শুরু করলো। আমি সরে যাবার সময় সে বুড়ো গলায় বললো, থ্যাংকস্। কই যাও? বললাম, জানি না কই যাই। উদ্দেশ্যহীন বের হওয়া। ও বললো, এটা ভালো। আজ-কাল মানুষ এত ব্যস্ত যে উদ্দেশ্য ছাড়া ঘর থেকে বেরই হতে চায় না। মাঝে মাঝে অকারণেই বের হওয়া ভালো। রাতে তাড়াতাড়ি ফিরে এসো। তোমার জন্য সবাই চিন্তা করে।

শরীরে গুরুজনের আদেশ মেনে নেয়ার একটা ভঙ্গি ফুটিয়ে কেচি গেট পেরিয়ে আসলাম। প্রথমে সরু গলিপথ, এরপরে মাঝারি একটা গলিপথ এবং সবশেষে বড় বড় অসংখ্য গলিপথ। এ শহরে কোনো রাজপথ নেই। শহরে কোনো রাজা নেই তো, তাই সব গলিপথ আর অলিপথ।

অবশ্য আমার জন্য ওর একটা বিশেষ ব্যবস্থা আছে। সেটা এক্সক্লুসিভ বলেই কি না, সবসময় এচিভেবল নয়। হয়তো খুব মাঝে মাঝে, গভীর রাতে বাসায় ফেরার সময়; আমি একটা বিট দেয়া পথের দেখা পাই। সে পথে কোনো কৃত্রিম আলোকচ্ছটা থাকে না কিন্তু জ্যোৎস্নার আলোয় ওরা উদ্ভাসোন্মুখ হয়ে থাকে। আমি যখন ও'র আলিঙ্গনে প্রবেশ করি, তখন ও লাল-নীল আতশবাজির ফুলকিতে ছড়িয়ে পড়ে। আমার প্রস্থানের পর দ্রুত আগের মতো হয়ে যায়। হলুদ ল্যাম্পপোস্টের নিচে শুয়ে থাকা মধ্যরাত্রির পিচ-কার্পেট।

বের হয়ে চোখে পড়ে রাস্তার দুদর্মনীয় পরিস্থিতি, তবে সেটা দেখে আমি ভড়কাই না। এমনই হবার কথা ছিলো। অনেকদিন আগে একবার এমন হতে দেখে কষ্ট পেয়েছিলাম। সেটা রিপিটেডলী বছরের পর বছর হয়ে আসছে। এখন আর এত স্পর্শিত হবার মতো অবস্থা নেই। বিরক্তিও লাগে না। নিস্পৃহ মুখে যমুনার সামনে একটা রাস্তার কাছে জানতে চাই, কি খবর?
সে বলে, এইতো, চলে যাচ্ছে। আপনার কি খবর।
-আছি। কোনোরকম।

আমার যন্ত্রটা ফুট কাটলো, আসলে ভালো নেই। সারাদিন কাম নাই-কাজ নাই, খালি ঘুরতে থাকে আর ঘুরতেই থাকে। যত যন্ত্রণা, পোহাই আমি।
রাস্তাটা ওকে বলে, তুই সব জায়গায় না গেলেই পারিস। নিজে তো কখনো পিছু ছাড়তে পারিস না। আবার খালি দিস উনার দোষ!
-হ, তোমারে আপন মনে কইরা একটা দুঃখের কথা কইলাম, আর তুমি কি না ঠেসতেছো আমারেই?
ঠিকই আছে। দুইজন সারাদিন একসঙ্গে থাকিস, মিলে-মিশে থাকবি।
ততক্ষণে জ্যাম ছুটে গেছে। আমি বিদায় নিলাম; ঠিক আছে, আজ তবে আসি। যমুনার সামনের নিশ্চল-বিস্তৃত রাস্তা আমায় বিদায় দিলো, আবার আসবেন কিন্তু অবশ্যই।

আমি এবার যন্ত্রটাকে চেপে ধরলাম, তুমি আর ভালো হইলা না। যেখানে-সেখানে ঘরোয়া ক্যাচাল শুরু করে দাও। মানুষ-জন কি ভাববে, অ্যাঁ?
-তোমার লগে ঘরোয়া ক্যাচাল করনের আমার টাইম নাই। এইবার হুদাহুদি ঘুরা বন্ধ করে চলো কোথাও বসে চা খাই।

মতিঝিলে বন্ধুর অফিসের নিচে চাএর দোকানে গিয়ে থামলাম। সামান্য চা খাওয়ার জন্য আমি যে এতটা দূর এসেছি তাতে যন্ত্রটা একটুও বিরক্ত নয়। আমার এই বন্ধুটাকে সে খুব পছন্দ করে। আমি চাএর কাপ হাতে নিয়ে, একটা অগ্নিকাণ্ড ঘটিয়ে, বন্ধুকে ফোন করলাম; কি রে কি করিস?
-কাজ করি।
কখন শেষ হবে?
-বিকালে।
তো আমি এতক্ষণ কি করবো?
-যা মন চায় তাই কর, আমার কাছে জানতে চাস ক্যানো? তুই কি আমার অফিসের নিচে?
ওইজন্যই তো জানতে চাইলাম।
-ওহ্ সেটা আগে বলবি না। দাঁড়া নামছি।

ঠিক সে সময়, অফিসটার সামনে একটা প্রকান্ড গ্র্যান্ড চেরোকি এসে থামলো। চোখ টেনে নিলো ওর গ্লেইজি মেরুন রং। কি রোশনাই, আহা সাধু। মুগ্ধ নয়নে জীপ-শোভা দেখছি। এমন সময় সেটা থেকে তীক্ষ্ণ কমপ্লিট স্যূটেড এক ভদ্রলোক বের হলেন। পুরা ড্রাইভিং সিট থেকে। জিভ ঝুলে পড়ার মতো অবস্থা। কিন্তু লোকটাকে কোথায় যেন দেখেছি মনে হলো। একবারেই চিনে ফেলতে পারলাম না কিন্তু জোরালোভাবে মনে হতে লাগলো; কোথায় যেন দেখেছি ভদ্রলোককে। হঠাৎ বিদ্যূৎচমকের মতো ঘটনাটা মনে পড়ে গেল।

সেদিন, অনেকদিন পর রাস্তায় ওকে দেখেছিলাম। ইচ্ছে হয়েছিলো চলন্ত যন্ত্রটা থেকেই লাফ দিয়ে নেমে দৌড়ে গিয়ে জড়িয়ে ধরি। মনে মনে যখনই কাজটা ঠিক হলো না ভুল, সেটা পরে ভাবা যাবে -এমন সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছি; তখনই দেখি এক কালোস্যূট পরা ঝা চকচকে ভদ্রলোক এসে ও'র হাত ধরে নিয়ে গেলেন। সেই লোক।
---

পোস্টটি ৭ জন ব্লগার পছন্দ করেছেন

লীনা দিলরুবা's picture


ঝা চকচকে লোক গল্পে আবার এলে ওকে আমার অনুরোধে ভিলেন বানাবেন এবং একটা কঠিন মাইর দেবেন, আরেকজনের সম্পত্তি নিয়ে যায় কেন লোকটা?

এই গল্প প্রথম পাতায় নেই কেন?

মীর's picture


হ, আমার গ্র্যান্ড চেরোকি'টা ব্যাটায় নিয়ে গেছে, চিন্তা করেন। Angry

লীনা দিলরুবা's picture


আমি তো ভিলেন কে কোন অনুকম্পা দেখাই না, গল্পে পোলাও খেলে ঘি কম কেন Smile এবার ওরে শাস্তি দিয়া একটা গল্প লিখবেন, নইলে বিদ্রোহী একটা কবিতা।

জ্যোতি's picture


Sad

লীনা দিলরুবা's picture


Smile এইতো প্রথম পাতায়।

জ্যোতি's picture


জীবনের ভিলেনেরা। Sad

লীনা দিলরুবা's picture


হলুদ ল্যাম্পপোস্টের নিচে শুয়ে থাকা মধ্যরাত্রির পিচ-কার্পেট।

আহা! উপমা গুলো কোত্থেকে আসে? যদি পারতাম আর ক'বার বলবো!

মাহবুব সুমন's picture


মীরের লেখার উন্নতি চোখে পড়ার মতো এবং অবশ্যই ভালোবাসা যুক্ত ইর্ষা মিশ্রিত লেখার হাত। পড়ে আরাম পেলাম।

লিজা's picture


আপনে যন্ত্রের সাথেও কথা কন? লেখা সবসময়ের মতই সুন্দর ।

১০

সামছা আকিদা জাহান's picture


লেখা ভাল লাগলো। ধন্যবাদ।

১১

জ্যোতি's picture


মন ভালো করার একটা পোষ্ট দেন তো!

১২

নজরুল ইসলাম's picture


আইডিয়াটা ভালো লাগলো

১৩

বাতিঘর's picture


গাছের লগে, পিঁপড়ার লগে, কখনো হাতা-খুন্তির লগে একা একা কথা কই আর নিজেরে পাগুল ঠাউরাই! অখন তো দেখি এরাম পাগুল দুনিয়াত আরো দুই/একজন আছেন! এরাম কিছু লেখা আমিও লেখছি, কিন্তু তা পরিবেশন যোগ্য নহে.....আপনে যাই দেন তাই দেখি উপাদেয় লাগে..রহস্য কী, আপনের গুরু কেডায়? টমিমিয়া-নাকি সিদ্দিকা আন্টি? ........ক্ষমা পাওয়ায় অতীবও খুশি হইছি গো ভাই! নইলে মরেও শান্তি পেতাম না , পেতাম না(ইকো হপে) হুক্কা

১৪

তানবীরা's picture


মীরের লেখার উন্নতি চোখে পড়ার মতো এবং অবশ্যই ভালোবাসা যুক্ত ইর্ষা মিশ্রিত লেখার হাত। পড়ে আরাম পেলাম।

১৫

নাজমুল হুদা's picture


"আমার মত পাগল আরও আছে দেখি"।
যন্ত্র বা গাছপালাদের সাথে কথা বলতেই আরাম বেশি।
মীর যা লেখে তাই-ই পড়তে ভালো লাগে ।
ভালোবাসা যুক্ত ইর্ষা ।

১৬

নাজ's picture


হুম! সোফা, পানির পাম্প, রাস্তা..... বেশ বেশ বেশ লাগলো লেখাটা!

১৭

হাসান রায়হান's picture


জটিল সব আইডিয়া তোমার মাথায় আসে। লাভ য়ু ম্যান।

১৮

জেবীন's picture


আইডিয়াতে গিজগিজ করে দেখি মীরের মাথা!...  লেখা পছন্দ হইছে... 
আগেরদিনে কবিরা বলো প্রকৃতির সাথে, গাছপালা, নদী, চাদঁ এদের সাথে,   আপ্নে পুরা ডিজিটাল...সোফা, পানির মটার, রাস্তা... Smile

১৯

টুটুল's picture


পড়তেছি

২০

সাহাদাত উদরাজী's picture


টিপ সই

মন্তব্য করুন

(আপনার প্রদান কৃত তথ্য কখনোই প্রকাশ করা হবেনা অথবা অন্য কোন মাধ্যমে শেয়ার করা হবেনা।)
ইমোটিকন
:):D:bigsmile:;):p:O:|:(:~:((8):steve:J):glasses::party::love:
  • Web page addresses and e-mail addresses turn into links automatically.
  • Allowed HTML tags: <a> <em> <strong> <cite> <code> <ul> <ol> <li> <dl> <dt> <dd> <img> <b> <u> <i> <br /> <p> <blockquote>
  • Lines and paragraphs break automatically.
  • Textual smileys will be replaced with graphical ones.

পোস্ট সাজাতে বাড়তি সুবিধাদি - ফর্মেটিং অপশন।

CAPTCHA
This question is for testing whether you are a human visitor and to prevent automated spam submissions.

বন্ধুর কথা

মীর's picture

নিজের সম্পর্কে

স্বাগতম। আমার নাম মীর রাকীব-উন-নবী। জীবিকার তাগিদে পরবাসী। মাঝে মাঝে টুকটাক গল্প-কবিতা-আত্মজীবনী ইত্যাদি লিখি। সেসব প্রধানত এই ব্লগেই প্রকাশ করে থাকি। এই ব্লগে আমার সব লেখার কপিরাইট আমার নিজেরই। অনুগ্রহ করে সূ্ত্র উল্লেখ না করে লেখাগুলো কেউ ব্যবহার করবেন না। যেকোন যোগাযোগের জন্য ই-মেইল করুন: bd.mir13@gmail.com.
ধন্যবাদ। হ্যাপি রিডিং!