ইউজার লগইন

গল্প: যে কারণে বিশ্বাস হারানোর ক্ষমতা হারিয়েছি

জার্নালিজম ডিপার্টমেন্টের নিজস্ব ক্লাসরুম ছিলো একটাই। রুমটার নাম ছিলো হাজার আটাশি। এখন হাজার আটাশি অনেক আধুনিক চেহারা পেয়েছে। কিন্তু এক সময় সেখানে কেবল তক্তার তৈরি একটা প্ল্যাটফর্ম এবং তার ওপরে ছিলো অতি পুরোনো ধাঁচের একটা ডায়াস। পড়ানোর জন্য ব্ল্যাকবোর্ড আর সাদা চকই ছিলো স্যার-ম্যাডামদের একমাত্র ভরসা। তখন আমরা পশ্চিমমুখো হয়ে বসে ক্লাস করতাম। এখন সবাই পূর্বদিকে মুখ করে বসে এবং পড়াশোনা হয় প্রজেক্টরে-প্রজেক্টরে। স্যারেরা সবসময় ল্যাপটপ নিয়ে ক্লাসে আসেন। যেটা আমাদের সময় হাতেগোণা দু'একজন আনতেন।

আমাদের বাসা থেকে ইউনিভার্সিটির দুরত্বটা কখনোই বাড়ে নি। কিন্তু বছর বছর বেড়েছিলো রিকশার ভাড়া। প্রথম প্রথম আমি ২০ টাকা করে যেতাম। একদম কলাভবনের দোরগোড়া পর্যন্ত। বন্ধু তোজা নাকি একবার ১৫ টাকাতেও গিয়েছিলো। এই ভাড়াটা শেষতক ৪০ টাকায় গিয়ে ঠেকলো। এরপর কি হয়েছে আমি জানি না।

সে সময় একবার একটা ঘটনা ঘটেছিলো, যে কারণে আমি বিশ্বাস করি- একজন জনতাও পৃথিবীতে নগণ্য নয়। যে কারণে আমি স্বপ্ন দেখি- পরিবর্তন একদিন আসবেই। সেবারে পরিবর্তন শেষ পর্যন্ত আসে নি, কিন্তু কোনো একদিন যে আসবে সে ব্যপারে আমি নিশ্চিত হয়ে গিয়েছিলাম। আজো সে আশায় বুক বেঁধে আছি। ভূমিকা শেষ।

আগের দিন রাত থেকেই আমরা জানতাম, পরদিন পুলিশ আমাদের ওপর হামলা চালাবে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন গোপনে ওদেরকেই মদদ দিচ্ছে। কেননা প্রশাসনের কর্তাব্যক্তিদের নিয়োগটা আজ বহুবছর ধরেই রাজনৈতিক। কখনো বিএনপি'র সময়ে নীল দলের কেউ উপাচার্য, উপ-উপাচার্য বা কোষাধ্যক্ষ হয় না। প্রক্টরও হয় না, রেজিস্ট্রারও হয় না। সুতরাং বিষয়টা বোঝার জন্য আমাদের কাউকেই রাজনৈতিক বিশ্লেষক হতে হয় নি।

শুধু সারাদেশের অসংখ্য সাধারণ পরিবারের সন্তানদের হাতের মুঠো থেকে উচ্চশিক্ষালাভের এ যৎসামান্য জায়গাটি যেন বের হয়ে না যায়, সেদিকে তাকিয়ে আমরা আন্দোলনের ঝুঁকি নিয়েছিলাম। এ বিশ্ববিদ্যালয়টি যেন বাণিজ্যিক পোলট্রিফার্মগুলোর মতো না হয়ে যায়, সেটাই ছিলো আমাদের একমাত্র লক্ষ্য। নাহয় শিক্ষার মান ও গুণগত উৎকর্ষের জায়গায় একটু ছাড়ই দিলাম আমরা। আমাদের চাষা-ভুষো লোকেদের পান্তাখেকো সন্তানেরা কয়জনই বা পিএইচডি-ডি.লিট জোগাড় করতে চায়? চাই না পোলট্রিফার্মের উন্নতমানের শিক্ষা। তাও ফর্মের দাম-বছরের বেতন-বাসভাড়া-হলভাড়া-পরীক্ষার ফি-উন্নয়ন ফি বছর বছর একটাকা করেও বাড়ানো যাবে না। নোপ্। একদফা একদাবি।

বাইরে থেকে ছাত্র ইউনিয়ন সংগঠনটাকে দুবলা-পাতলা দেখালেও, এর ছেলে-মেয়েদের সাহস কম ছিলো না কোনো অংশে। আর সেটাই ছিলো আমাদের একমাত্র শক্তি। পরিকল্পনাটা ছিলো কার্জন হলটাকে পুরোপুরি দখলে নিয়ে নেয়ার। সরকার দলীয় ছাত্র সংগঠনটির লেজুড়বৃত্তিকারীদের চেয়ে সেখানকার হলগুলোয় আমাদের ছেলেদের প্রভাব প্রতিপত্তি ছিলো অনেক বেশি। কারণ আমরা দীর্ঘদিন সেখানে সময় দিয়েছি। আমাদের মধ্যে থেকে ছেলেরা গিয়ে সেখানে কাজ করেছে। সাধারণ ছাত্র-ছাত্রীদের নেতা হয়েছে। তাদের বিপদে-আপদে পাশে থেকেছে। আর সরকারী পান্ডাগুলো টেন্ডারবাজি, হল পলিটিক্স, চাঁনখার পুলের ওষুধের দোকান থেকে ঘুমের ট্যাবলেট-কাশির সিরাপ কিনে 'ঝাকি' বানিয়ে খাওয়া এবং সপ্তাহে একদিন মিছিল নিয়ে মধুর কেন্টিনে বেড়াতে আসার মধ্যে নিজেদের কার্যক্রম সীমিত রেখেছিলো। এটা লক্ষ্য করেই আমরা কার্জনে নেতা গড়ে তোলার পরিকল্পনা হাতে নিয়েছিলাম। পরিকল্পনাটা একদিনে বাস্তবায়িত হয় নি। আস্তে আস্তে হয়েছে।

ইঞ্চি বেড়ের লোহার পাইপ আর জালিবেত কেনা হচ্ছিলো অনেক আগে থেকেই। কারণ আমরা দেখেছিলাম, প্রয়োজনের সময় এ জিনিসগুলোর অভাবে অনেকরকম ক্ষয়ক্ষতির মুখে পড়তে হয় আমাদেরকে। সঙ্গে আরো ছিলো প্ল্যাকার্ড লাগানোর চিকন হলদেটে রঙয়ের বাঁশগুলো। প্রয়োজনীয় আধলার মজুদও একদিনে গড়ে তোলা হয় নি। তাই ওগুলোর পরিমাণ নিয়ে আমাদের মনে কোনো সন্দেহ ছিলো না। পরিকল্পনাটা ছিলো, আমাদের মূল পরিকল্পনাটা টের পেতে না দেয়া কাউকেই। গভীর রাতে যেটা যেখানে যেভাবে রাখার, সেভাবে রেখে দেয়া হলো।

পরদিন সকালে বাসা থেকে বের হয়ে রিকশা ঠিক করেছিলাম ২৫ টাকা দিয়ে। হাইকোর্ট, শিশু একাডেমী, দোয়েল চত্বর পার হওয়ার সময় কিছুটা টেনশন কাজ করছিলো হৃৎপিণ্ডের ভেতরে। যেটা চাপা দেয়ার জন্য একটা সিগারেট ঝুলিয়ে রেখেছিলাম ঠোঁটে। আর ভাবছিলাম প্রিয়াংকার কথা। সবকাজ শেষ হয়ে গেলে, ও নিশ্চই আমার এই সিগারেট খাওয়া ঠোঁটেই একটা চুমু দেবে। সেই চুমুটা হবে পৃথিবীর সবচেয়ে অসাধারণ চুমু। আমি যেটাতে নিরন্তর ডুবে যেতে থাকবো এবং যেতেই থাকবো।

কলাভবনের মূলফটক দিয়ে ঢোকার পরে, মূলসিঁড়িটাকে ডানপাশে রেখে একটা বড় ক্লাসরুম পার হলেই- বামদিকের করিডরটা আমাদের ডিপার্টমেন্টের করিডর। প্রথমে আমাদের সেমিনার কক্ষ, এরপরে ডানদিকে চলে গেছে আরেকটা ছোট্ট কিন্তু জনপ্রিয় করিডর। এটাকে নিয়ে হিস্ট্রির ছেলেপিলেরা প্রায়ই টানাটানি করে। আমাদের ডিপার্টমেন্টের ভিতরে অবস্থিত, অথচ এটা নাকি ওদের করিডর! এটারই শেষ মাথায় আমাদের সবেধন নীলমণি- হাজার আটাশি। এটা আসলে রুমটার নাম্বার। ছেলে-পিলের মুখে চলতে চলতে এটাই নাম হয়ে গেছে। কলাভবনের একেবারে পশ্চিম কোণায় অবস্থিত এ রুমটার পরে রয়েছে একটা টয়লেট আর একটা ছোট্ট সেমিনার রুম। ব্যস্ তারপর ভবন শেষ। বামদিক দিয়ে সোজা বেরিয়ে সর্বপশ্চিমের গেট। এটাকে আমরা কলাভবনের তিন নম্বর গেট বলতাম। এই গেট দিয়ে বেরোলে ডানপাশেই ক্যাম্পাস শ্যাডো, গেটটা পার হলে মল চত্বর, তারপরে আইইআর, তারপরে মুহসীন হল, এফ রহমান হল, গাউসুল আজম- এরকম অনবরত বলতে থাকা যায় চাইলে।

হাজার আটাশির ভেজানো দরজাগুলো দেখেই বুঝতে পারলাম সবাই মোটামুটি চলে এসেছে। আমি ঢুকে আগে প্রিয়াংকার কাছে গেলাম। ওর আগের দিন থেকে জ্বর হয়েছে। এর মধ্যেও এসেছে। জানি না ওকে সামলে রাখা যাবে কিনা, জানি না নিজেই শেষপর্যন্ত ঠিক-ঠাক থাকবো কিনা; তাও ওর পাশে গিয়ে একটু বসলাম। আমি জানি এটা দু'জনের জন্যই এখন ভীষণ দরকার।

বেশিক্ষণ বসতে পারলাম না। সামনে থেকে পোলাপান 'দীপ্ত' 'দীপ্ত' বলে ডাকাডাকি শুরু করে দিলো। সিনিয়ররা সবাই এসেছেন। এমনকি যারা পিঠটান দেয়ায় ওস্তাদ, তারাও বাদ যান নি। দেখে ভালো লাগলো। লুকিয়ে থাকার জন্য এই জায়গাটা ঠিক করা হয়েছে অনেক হিসেব করে। পুলিশ ক্যম্পাসে ঢুকে পড়লে তাদের ওপর অতর্কিত আক্রমণগুলো চালানোর জন্য, আমরা ভাগ ভাগ হয়ে এমন কয়েকটা জায়গায় অবস্থান নিয়েছি সকাল থেকেই। আজ রাস্তায় কোনো মিছিল নেই, কোনো অবরোধ নেই। পুরো ক্যম্পাস আমাদের ঘোষণায় অনানুষ্ঠানিকভাবে বন্ধ। কর্তৃপক্ষ জোর করে খুলে রেখেছে। কিন্তু জেনারেল স্টুডেন্টদের উপস্থিতি নগণ্য। যারা এসেছে তারা ইতস্তত এদিকে-ওদিকে ঘুরাঘুরি করছে। দু'একজন বিভিন্ন ক্লাসরুমে উকি-ঝুঁকি মেরে দেখছে, কোনো ক্লাস হয় কিনা। কোথাও কোনো ক্লাস হচ্ছে না। নোটিশবোর্ডগুলোর সামনে এ ধরনের ছেলেপিলেরা ভীড় করছে বেশি। আমাদের মনিটরিং-ও চালু আছে। কলাভবনের ভেতর নেটওয়ার্ক খুবই দুর্বল। তাই টেক্সট করে করে খবরাখবর নিচ্ছি-দিচ্ছি। এতে খবর পেতে-পেতে দেরী হয়ে যাচ্ছিলো বারবারই।

আর কলাভবনের ভেতর পুলিশ ঢুকবে না জানি, তাই দুশ্চিন্তাও হচ্ছিলো না খুব একটা। আমাদের সবার লাঠিগুলো রুমের ভেতরে দেয়াল ঘেঁষে ঘেঁষে ফেলে রাখা হয়েছে। যাতে যখন প্রয়োজন তখন যেন একটু নিচু হলেই জিনিসগুলো পেয়ে যাই। হঠাৎ বাইরে বিষম হুটোপুটি, বুটের খটরমটর শব্দ এবং অনেকগুলো কণ্ঠের একত্রে পুলিশ-পুলিশ বলে আর্তচিৎকার দেয়ার আওয়াজ শুনতে পেলাম। নেটওয়ার্কটা খুব ঝামেলা করছে। আমার হাতে ধরা মোবাইলের স্ক্রীনে তখন কেবল একটা টেক্সট এসে পৌঁছালো- ১টা পুলিশের ভ্যান রোকেয়া হলের উল্টাদিকের লাইব্রেরী-গেট দিয়ে ভেতরে ঢুকেছে।

সবাইকে শান্ত থাকতে বললাম। পুরো কলাভবনে আমাদের এই একটাই পজিশন। সুতরাং জানা না থাকলে সহজে খুঁজে পাবে না ওরা। দরজার ফাঁক দিয়ে দেখার চেষ্টা করলাম। ধারণা ঠিকই আছে। দোতলার করিডরে একটা দল দৌঁড়াচ্ছে অযথাই। সবার হাতে হলুদ লাঠি। পেটোয়া বাহিনী। এটা ভালো হয়েছে। গুলি-বন্দুক দেখলে অনেকে মানসিকভাবেও দুর্বল হয়ে পড়ে।

প্ল্যান 'বি' নিয়ে বসে পড়লাম। আমাদের সার্জেন্ট দুর্জয়, সেইন্ট সুমন আর মিজান সাঁইকে দুইটা দরজা আগলে বসার জন্য বলা হলো। ওদের প্রত্যেককে তিন-চারজন মিলে সাহায্য করবে। দেবুদা' উঠে ডায়াসের দিকে এগুনো শুরু করলেন। তিনি এখন আমাদের টিচার এবং আমাদের ক্লাস নেবেন। আমরা সুবোধ বালকের মতো টেবিল-চেয়ারে বসে ক্লাস করবো। পাশাপাশি খবর নেয়া চলছে- আর কোথায় কত পুলিশ রয়েছে?

টিএসসি'র সামনে দুইটা ভ্যান দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু ভেতর থেকে কেউ নামে নি। রোকেয়া হলের সামনে এসেছিলো দুইটা। এর একটা ঢুকেছে। সোজা কলাভবনের সামনে এসে থেমেছে। আরেকটা এখনো রোকেয়া হলের সামনেই আছে। খবরাখবর নেয়া হয়ে গেল চটজলদিই। কিন্তু দেবুদা' হঠাৎ মাঝপথে আটকে গেছেন কেন? ঠাহর করে দেখলাম, ততক্ষণে আতংকে জমে গেছেন তিনি। সামনের দিকে পা ফেলতে পারছেন না।

আতংকিত হওয়ার কারণ ছিলো। আমাদের রুমের বাইরেই তখন পুলিশের চিৎকার-চেঁচামেচি শোনা যাচ্ছিলো। আমরা ভেতরে বসে বসে 'এই ক্লাসের ভিতর কয়েকটা আছে', 'নীচতালায় নীচতালায়'; এরকম শব্দ পাচ্ছি এবং কে কি করবো ভাবছি- এমন সময় মিজানের দরজাটায় দুইজন দামড়া পুলিশ একসঙ্গে কাঁধ দিয়ে ধাক্কাতে শুরু করে দিলো। ঠিক সে সময়ে মিজানও উঠে দাঁড়িয়ে রুখে দেয়ায় দরজা পুরোপুরি খুলে গেল না। ওর সঙ্গে হাত লাগালো আরো কয়েকজন। দুর্জয়-সুমনেরা আরেকটা দরজা আগেই ভেতর থেকে আটকে ধরলো। জং ধরা ছিটকিনিগুলোর ওপর আসলে ভরসা করার কোনো সুযোগ নেই। তাই আমাদের গায়ের জোরে ওদেরকে আটকে রাখা ছাড়া আর কিছু করার ছিলো না।

ওপাশ থেকে গালিগালাজ শুনতে পাচ্ছিলাম। আমাদের উদ্দেশ্যে সমানে 'শুয়োরের বাচ্চা', 'কুত্তার বাচ্চা', 'সবগুলারে ধইরা নিয়া পুটকি মারুম আজকা'- এমন কথা বলছিলো ওরা। এরইমধ্যে মিজানের দরজার একটা কপাট অর্ধেক ভেঙ্গে গেলো। শুয়োরগুলো প্রায় ঢুকে পড়ছে ভেতরে। আমি জানি, একটা পজিশন নষ্ট হয়ে গেলেই সবাই ভয় পেয়ে যাবে। আন্দোলন থেমে যাবে এখানেই। তাই সেটা কোনোভাবে হতে দেয়া যায় না। একটা লাঠি নিচু হয়ে তুলে নিলাম। লোহার পাইপই উঠে আসলো হাতে। যাক্ এখন আসলে বাছ-বিচারের সুযোগ নেই। একবার শুধু মনে মনে বলে নিলাম, ওস্তাদ, আমার হাত দিয়ে অন্তত নরহত্যা ঘটায়ো না।

বলতে বলতে ভাঙ্গা কপাটের ফাঁকটুকু দিয়ে লাফিয়ে বের হয়ে আসলাম। সে সময় কার মাথায় আর কার ঘাড়ে যে পা দিয়ে বেরিয়েছি, জানি না। আমার শুধু একটাই লক্ষ্য ছিলো লাফ দিয়ে বের হয়ে যেতে হবে। এই ক্লাসরুম থেকে এখনই সবাইকে বের করার একটা ব্যবস্থা না করতে পারলে সামনে সমূহ বিপদ।

বেরোনোর সময় মোবাইলটা ছুঁড়ে দিয়ে এসেছি প্রিয়াংকার দিকে। প্ল্যান করাই আছে। যদি ট্যাকল দিতে না পারি, সবাই মিলে স্লোগান দেয়া শুরু করবো। এ এলাকার প্রত্যেকটা পজিশন থেকে আমাদের ছেলেরা বের হয়ে আসবে লাঠি-সোটা হাতে। তবে যতক্ষণ পারি পজিশন আনক্লোজ করবো না আমরা।

লাফিয়ে বাইরে বের হয়ে চমকে গেলাম। মাত্র তিনজন তিনজন- ছয়জন দুইটা দরজা আটকে রেখেছে আর আরেকজন ওয়াকিটকিতে আরো ফোর্স চাইছে। মনে হয় জায়গাটা চেনাতে পারছে না ঠিকমতো। যে কারণে সে খুবই উত্তপ্ত। আর আমরা ভেতর থেকে ভাবছিলাম অসংখ্য পুলিশ বুঝি আমাদের আক্রমণ করেছে।

ওয়াকিটকিওয়ালা আমাকে খেয়াল করার আগেই দুই হাতে সজোরে লোহার পাইপ বসিয়ে দিলাম ওর ওয়াকিটকির ওপর। জিনিসটা ভেঙ্গে বোধহয় মুখে ঢুকে গেল। কোনো অঙ্গের স্থায়ী ক্ষতি হয়ে গেলে মানুষ যেভাবে আর্তনাদ করে, সেভাবে আর্তনাদ করে উঠলো সে। আমি খেয়াল করার চেষ্টা করলাম হারামজাদার কোমরে কোনো পিস্তল-হোলস্টার আছে কিনা। নেই। থাকার কথা ছিলো। সাধারণত পিস্তলওয়ালাগুলোর কাছেই ওয়াকিটকি থাকে।

কালাপাহাড়মতো একটা পুলিশ সামনের দিকে মিজানের ওপর ৪৫ ডিগ্রী এ্যঙ্গেলে ঝুঁকে দরজা ভেঙ্গে ক্লাসের ভেতরে ঢোকার চেষ্টা করছিলো। ওর চোখে পড়েছিলো ভেতরে অনেকগুলো মেয়ে আছে। আমি আগেও দেখেছি, এই জানোয়ারেরা কিভাবে এ ধরনের সুযোগগুলোর সদ্ব্যহার করে থাকে।

লোহার পাইপের একমাথা ঢুকিয়ে দিলাম ওর হাঁটুর মাংসপেশীর ভেতরে। একদম আরেকদিক দিয়ে বের না হয়ে আসা পর্যন্ত দু'হাতে ঠেসলাম জিনিসটা। ব্যস্ যথেষ্ট। এবার বাকি দু'টাকে মিজান একহাতে তুলে ছুঁড়ে মারতে পারবে বলে আমি বিশ্বাস করি।

সুমনদের দরজার সামনে গিয়ে মাঝখানেরটার দুই পা ধরে দিলাম হ্যাঁচকা টান। দাঁড়িয়েছিলাম পুলিশটার দিকে উল্টা হয়ে। যাতে টেনে নিজের দুই পায়ের নিচ দিয়ে তাকে বের করতে পারি। সারা গায়ের শক্তি এক করে টান দিয়েছিলাম। পুলিশটা সামনের দিকে অনেকখানি ঝুঁকে সর্বশক্তি দিয়ে দরজার কপাট ঠেলছিলো। কিছু বুঝে উঠা ও তাল সামলানোর আগেই নাক-ঠোঁট নিয়ে দমাস করে কংক্রীটের মেঝের ওপর আছাড় খেলো। একসঙ্গে হাড় ও দাঁত ফাটার চমৎকার একটা শব্দ এসে আমার কানে ঢুকলো।

ইন দ্য মীন টাইম, মিজানের দরজা দিয়ে বেরিয়ে এসেছে অনেকেই। হাতে বোধহয় বেশিক্ষণ সময় পাবো না। কারণ ওয়াকিটকিওয়ালা ম্যাসেজ দেয়ার পর এতক্ষণে অন্তত দেড় মিনিট পেরিয়ে গেছে। আর আমাদের পজিশনটা খুব বেশি দুর্গমও নয়। সুখের কথা হলো, দুর্জয়দের দরজাটাও ততক্ষণে ক্লিয়ার হয়ে গেছে প্রায়। সবাইকে দ্রুত বের হয়ে শ্যাডোর দিকে চলে যেতে বললাম। যে দু'তিনটা পুলিশ অক্ষত ছিলো তখনো, তারা আর লাগতে আসার সাহস করলো না।

সবাই দৌঁড়ে মধুতে গেলাম। পেছনে পেছনে কলাভবনের মেইন গেটে দাঁড়ানো ভ্যানটা আসলো। যদিও সেটার ভেতরে পুলিশ খুব বেশি ছিলো না। কারণ ঐ ভ্যানের পুলিশেরা তখনো কলাভবনের ভেতরে আমাদেরকে খুঁজছে। আর সি মজুমদার থিয়েটারের নিচ দিয়ে পার হওয়ার সময় পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী, দো'তলায় লুকিয়ে থাকা আমাদের আরেকটা গ্রুপ তিন-চারটা পঁচিশ-সেরী পাথর ভ্যানের ইঞ্জিন ও বনেট লক্ষ্য করে ছুঁড়ে দিলো। আর তাতেই ভ্যানটা হাওয়া ছেড়ে বসে পড়লো রাস্তায়। এই গ্রুপে খেলন নামের আমাদের সবচেয়ে শক্তিশালী ছেলেটাকে রাখা হয়েছিলো। ওকে আমরা আদর করে 'হালুম' নামে ডাকতাম। সে নেমে এসে কেরোসিনের গ্যালন খালি করে আগুন ধরিয়ে দিলো বসে যাওয়া ভ্যানটাতে।

মধুতে আমরা দুই গ্রুপ এসেই আবার বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়লাম। এখনো অনেকটা লড়াই বাকি। মসজিদের সামনের গেট দিয়ে একটা দল মিছিল নিয়ে বের হবে। আরেকটা দল আইবিএ'র দেয়াল টপকে চারুকলায় যাবে। সেখানে আধলার বস্তাগুলো রাখা আছে। ওরা সেগুলো নিয়ে চারুকলার গেট দিয়ে বের হয়ে রাস্তা পার হবে। তারপর ছবির হাট (তৎকালীন মোল্লার দোকান) পার হয়ে টিএসসি'র গেটে গিয়ে পজিশন নেবে। আমরা সামনে থেকে মিছিল নিয়ে যাবো, ওরা পেছন থেকে আধলা চালাবে। আমাদের সবার হাতে আছে একটা করে লোহার পাইপ। যাদের হাতে পাইপ নেই তাদের হাতে একাধিক লাঠি। টিয়ার শেলের যন্ত্রণা থেকে বাঁচার জন্য ভেজা রুমালে নাক ঢেকে রেখেছি সবাই। দেখা যাক্ কি হয়। পুলিশগুলোকে মেরে তক্তা বানিয়ে তাদের ভ্যানগুলো পুড়িয়ে দেয়ার পর আমরা কার্জন হলের দিকে এগিয়ে যাবো। সেখানে তৈরি হয়ে আছে আমাদের পুরো সংগঠন। যুদ্ধ করার জন্য। কেউ ঘূর্ণাক্ষরেও টের পায় নি আমাদের পরিকল্পনা। তাই ঐ পাড়াতে কোনো নড়াচড়াই নেই কারো।

ততক্ষণে বিরোধী দল সমর্থক ছাত্র সংগঠনের পাণ্ডাগুলোও এসে আমাদের পাশে দাঁড়িয়ে গেছে। আন্দোলন সফল করার জন্য এখন আমাদের অবশ্যই ওদেরকে দরকার। আমি ওদের মধ্যে সম্প্রতি 'স্লোগান-মাস্টার' খ্যাতিপ্রাপ্ত কালো-মোটামতো একটা ছেলেকে একটা পাইপ দিয়ে বললাম, মরতে ভয় পেলে এখনো সময় আছে, পালা। আর ভয় না পেলে এই পাইপ দিয়ে ট্রাই করে দ্যাখ্, কয়টা ঘিলু ফাটাতে পারিস।

আমি দেখলাম ছেলেটা নির্লিপ্ত চোখেই আমার হাত থেকে পাইপটা নিলো। প্রিয়াংকাও একটা বড় দেখে লোহার পাইপ খুঁজে নিয়ে, বীরাঙ্গনাদের মতো দাঁড়িয়ে ছিলো মধুর সামনে। ও নাকি যত-যাই হোক আমার পাশে থাকবেই, নড়বে না।

কি আশ্চর্যের কথা!
---

(লীনা আপুকে উৎসর্গিত। অতীব সত্য একটা কথা হচ্ছে, মাঝে মাঝে তিনি আমাকে ভীষণভাবে অনুপ্রাণিত করতে পারেন! Smile )

পোস্টটি ৬ জন ব্লগার পছন্দ করেছেন

তৌহিদ উল্লাহ শাকিল's picture


অনেক দিন পরে এলাম । এসে আপনার লেখাটা পড়লাম । বেশ লিখেছেন । ভাল লেগেছে । সেই সাথে ঈদ পেরিয়ে ঈদের শুভেচ্ছা ।

মীর's picture


অনেক ধন্যবাদ শাকিল ভাই।
আর অনেকদিন পর পর আসা কমাতে হবে কিন্তু Big smile

প্রিয়'s picture


বাহ বাহ বেশ বেশ।

মীর's picture


উত্তম। ধইন্যা পাতা..Smile

মাহবুব সুমন's picture


এই গল্পে দেখি গান্ধিবাদী বাদ দিয়ে আমার মতো সুভাষ বোস বাদী হয়ে গেলেন !

মীর's picture


আমি আগেই আপনারে বলছি, আমি কোনো পন্থায় বিশ্বাসী না। আপনে একটা পন্থায় বিশ্বাস করেন জাইনা খুশি হৈলাম। আমার ধারণা ছিলো, আপনে এখনো পন্থা খুঁজতেসেন।
তবে আমি বিশ্বাস করি, দ্য বেস্ট ওয়ে টু প্রেডিক্ট আবাউট ইওর ফিউচার ইজ টু ক্রিয়েট ইট। Smile

ঈশান মাহমুদ's picture


টান টান উত্তেজনাময় শ্বাসরুদ্ধকর কাহানী। পইড়া মজা পাইলাম। প্রিয়াংকা কি শেষ পর্যন্ত আপনার বিড়ি খাওয়া ঠোঁটে চুমা খাইছিলো ? Big smile Wink Laughing out loud

মীর's picture


ধইন্যা পাতা
আর ঐটা গল্পের ছেলেটা বলতে পারতো। কিন্তু সে তো গল্প শেষ করে গ্যাছে গা।

লীনা দিলরুবা's picture


কি আশ্চর্যের কথা!

এত রোমহর্ষক গল্প একবেলায়ই বের হয়ে যায়!!! কতবছর পর গল্পে ফিরলেন খেয়াল আছে? এইবার চটজলদি আরো কিছু লেখেন।

আমার নগন্য কমেন্ট যদি সত্যিই অনুপ্রেরণা যোগায়, তবে বিখ্যাত গল্পকারকে কয়েক হাজার করে কমেন্ট করা যায় Smile

১০

মীর's picture


সেটাই আসলে। একবেলাতেই বের হয়ে গেল, চিন্তা করেন!
থ্যাংকস্ এগেইন বস্।

১১

হাসান রায়হান's picture


আপনে তো এখনো জার্নালিজমে তাই না Laughing out loud Wink

১২

মীর's picture


ইয়াপ Big smile
রায়হান ভাই, কত কতদিন পর! আছেন কেমন?

১৩

রশীদা আফরোজ's picture


ভালো লাগলো। শিরোনামটা বেশি ভালো।

১৪

এস এম শাহাদাত হোসেন's picture


সংঘর্ষ কত সুন্দর!

১৫

বিষণ্ণ বাউন্ডুলে's picture


গল্প যখন পড়তে পড়তে আর গল্প মনে হয় না,তখনি তা এমন গল্প হয়ে দাড়ায়। অসাধারণ..

১৬

নিশ্চুপ প্রকৃতি's picture


সত্যি হউক ...আর গল্প,
অসাধারণ, Star Star

মন্তব্য করুন

(আপনার প্রদান কৃত তথ্য কখনোই প্রকাশ করা হবেনা অথবা অন্য কোন মাধ্যমে শেয়ার করা হবেনা।)
ইমোটিকন
:):D:bigsmile:;):p:O:|:(:~:((8):steve:J):glasses::party::love:
  • Web page addresses and e-mail addresses turn into links automatically.
  • Allowed HTML tags: <a> <em> <strong> <cite> <code> <ul> <ol> <li> <dl> <dt> <dd> <img> <b> <u> <i> <br /> <p> <blockquote>
  • Lines and paragraphs break automatically.
  • Textual smileys will be replaced with graphical ones.

পোস্ট সাজাতে বাড়তি সুবিধাদি - ফর্মেটিং অপশন।

CAPTCHA
This question is for testing whether you are a human visitor and to prevent automated spam submissions.

বন্ধুর কথা

মীর's picture

নিজের সম্পর্কে

স্বাগতম। আমার নাম মীর রাকীব-উন-নবী। জীবিকার তাগিদে পরবাসী। মাঝে মাঝে টুকটাক গল্প-কবিতা-আত্মজীবনী ইত্যাদি লিখি। সেসব প্রধানত এই ব্লগেই প্রকাশ করে থাকি। এই ব্লগে আমার সব লেখার কপিরাইট আমার নিজেরই। অনুগ্রহ করে সূ্ত্র উল্লেখ না করে লেখাগুলো কেউ ব্যবহার করবেন না। যেকোন যোগাযোগের জন্য ই-মেইল করুন: bd.mir13@gmail.com.
ধন্যবাদ। হ্যাপি রিডিং!