ইউজার লগইন

সঠিক পরিবেশ আর অনুষঙ্গ

প্রতিদিন পাঁচ মিনিট লেখালেখি কর্মসূচি নামে একটা কর্মসূচি মাথায় ঘুরছে। আমাকে আজকাল উইপ আর শাফা ছাড়া আর কেউই মনে করায় দেয় না লেখালেখির কথা। ওরাও জানি না কি কারণে মনে করায়। লেখালেখির বিষয়টা কখনোই কিন্তু সেভাবে হাতে ধরা দেয় নি। যখন বোধহয় একটা সম্ভাবনা ছিল, কেন ছিল সেটাই আগে বলে নিই। তখন নিয়মিত লিখতে বসা হতো। প্রতিদিন প্রায়। পড়া হতো অনেক শব্দও। দৈনিক পত্রিকায়। অনেক লেখকের সঙ্গেই এই আবহ মিলে যাওয়ার কথা। সম্ভাবনা বলতে এটিই। সে সম্ভাবনাগুলোকে কি কি উপায়ে গলা টিপে হত্যা করেছিলাম, মনে করার চেষ্টা করি মাঝে মাঝে। অনেক কিছু মনে পড়ে, অনেক কিছু মনে পড়ে না। আমি মাঝে মাঝেই খেয়াল করি, পুরোনো অনেক ঘটনাই আমি মনে করতে পারি না। স্মৃতি থেকে মুছে গেছে। নিজে নিজে।

নিজের প্রিয় গানগুলোর কথাও এখন মনে পড়ে না সেই আগের মতো করে। ভাললাগা স্মৃতিগুলো তো প্রায় কিছুই মনে পড়ে না। পুরোনো স্মৃতি মনে করতে বসলে জীবনের কয়েকটা বড় বড় দুর্ঘটনার স্মৃতি মনে পড়ে সর্বাগ্রে। তারপরে আর চিন্তা-ভাবনা আগানো হয় না। যে কারণে পুরোনো স্মৃতি হাতড়ানোর চর্চাও কখনো আগ্রহভরে করা হয় না। জীবন চলার পথে অনেক মানুষের সঙ্গে মিশেছি, কিন্তু কারও সঙ্গে মেলামেশা কালোত্তীর্ণ হয়েছে চূড়ান্ত আন্তরিকতার সঙ্গে, যার কাছে আমার জীবনের স্মৃতিগুলোর গল্প আছে, এমন মানুষের সংখ্যা হাতেগোণা। পরিবারের বাইরে তো প্রায় একেবারেই নেই। হ্লা মং, শাফাদের মতো দু'একজনের গল্প ছাড়া, যারা মাঝপথ থেকে এ জীবনের সঙ্গে এসে জড়িয়ে নানান ঘাত-প্রতিঘাত এড়িয়ে আজতক রয়ে গিয়েছে। পরিবারের ভেতরেও সংখ্যাটা হাতে গোণা। মানুষের পরিবারের ভেতরে অনেক কাছের মানুষ থাকে। আমার সেটাও নেই।

আমার হিহিঠিঠি করার স্মৃতির গল্পগুলো কয়েকটা থাকতে পারে হাও মিংয়ের কাছে। আমরা দু'জন একদা বেশ কিছু স্মৃতির জন্ম দিয়েছিলাম একসাথে। রাইন নদীর তীরে। রেমাগেন শহরে। ওই শহরটা ছিল খুব অদ্ভুত একটা জায়গা। পশ্চিম জার্মানির রাইন নদীর তীর ঘেঁষে ঘেঁষে অনেক কিলোমিটার জুড়ে লম্বা শুয়ে আছে বছরের পর বছর ধরে। পাহাড়ের গায়ে। একপাশে নদী, একপাশে পাহাড় শহরটার। পাহাড়ের চূড়াগুলোয় মধ্যযুগের জীবন ও রাজা-রাজড়াদের শাসনামলের ছাপ। কোথায় ওয়াচ-টাওয়ার, কোথায় আস্ত একটা দুর্গ। নিচে নদীর পাড় থেকে পাহাড়ের ওপর তাকালে দেখা যায়। ওরা সগৌরবে দাঁড়িয়ে আছে, হাজার বছরের ইতিহাস আগলে রেখে।

নদীর পাড়েই শুয়ে শুয়ে আরাম করতে থাকা শহরটার মূল রাস্তা একটাই। যেটা নদীটা ছুঁয়ে ছুঁয়ে দক্ষিণ জার্মানির সুইস সীমান্ত থেকে পশ্চিমে একদম নর্থ সী পর্যন্ত চলে গিয়েছে। সেই মহারাস্তার যতটুকু অংশ রেমাগেনের ভাগে পড়েছে তার পাশেই ওই শহরটা। হাও মিং আর আমি সেখানে গিয়েছিলাম একটা হোটেল চালু করতে।

পুরোনো একটা বন্ধ হয়ে যাওয়া পাঁচ তারকা হোটেল ছিল সেটা। চীনে রেঁস্তুোরা। হোটেল মালিক চৈনিক বুড়োটি ছিল একটা বদ্ধ উন্মাদ। বছরের পর বছর ধরে সিল-গালা মারা হয়ে যাওয়া ওই ভুতুড়ে হোটেলভবনটার সবচেয়ে উপরের তলায় একটা নোংরা বদ্ধ ঘরে, তিনি জীবনযাপন করছিলেন।

সমাজবদ্ধ জীব হিসেবে অনেক 'নোংরা' জীবনব্যবস্থাই আমি দেখেছি। আমার ওসব সহ্য করার ক্ষমতাও নেহায়েত কম নয়। কিন্তু সেই বৃদ্ধের ঘরে আমি যা দেখেছি, সেটা ভোলা বোধহয় কখনো সম্ভব না। ভুতুড়ে হোটেল ভবনটায় আমরা টিকেছিলাম সাকুল্যে দুই দিন। দ্বিতীয় দিন গভীর রাতে, আর কোনোভাবেই সম্ভব নয় বুঝতে পেরে, দু'জন চুপচাপ কেটে পড়েছিলাম। বৃদ্ধ আসলে আমার বন্ধু হাও মিংকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল যে, আমরা যদি হোটেলটা ঠিকঠাক করে নিতে পারি, তাহলে চালাতে দেবে। তাই আমরা গিয়েছিলাম চালু করতে। কিন্তু দীর্ঘদিনের অচলাবস্থার পর; ওই হোটেলের চেয়ার-টেবিল, বলরুমের সাজ-সজ্জা ইত্যাদির মতো জিনিসগুলো ঝেড়ে-মুছে কর্মোপযোগী করে নেয়ার সম্ভাবনা থাকলেও; পাঁচ তারকা হোটেলের যে প্রতিষ্ঠানিক কাঠামো দরকার, সেটা পুরোপুরি নতুনভাবে গড়ে তোলা ছাড়া উপায় ছিল না। রান্নাঘরগুলো ভেঙ্গে পড়েছিল। বিদ্যুত, পানি, গ্যাস- সবকিছুর সংযোগই পাঁচ বছরের বেশি সময় ধরে বন্ধ। ঝোপ-ঝাড়, আগাছা, বড় বড় গাছ- হোটেলের ভেতরে। দেয়ালজুড়ে গাঢ় মেরুপ্রদেশীয় সন্ধ্যা রংয়ের শ্যঁওলা। বোঝার ওপর শাকের আঁটির মতো বৃদ্ধের উন্মত্ততা। আমরা বুঝে গিয়েছিলাম ব্যাপারটা হাস্যকর। সময় থাকতে অনুর্বর আর কালক্ষেপক এই গড্ডালিকা থেকে বের হয়ে যাওয়াই উত্তম।

সেই রাতে আমি জীবনে প্রথম ২২৫ কিলোমিটার প্রতি ঘন্টা গতিতে চলমান কোন গাড়িতে বসেছিলাম। এর আগে বিমান আর উচ্চগতির ট্রেনেই ছিল আমার অমন গতি উপভোগের অভিজ্ঞতা। সেসবের তুলনায় একদমই অন্যরকম ছিল বন্ধুর ওই জাগুয়ারটার গতির কাঁটাকে ১৮০, ১৯০, ২০০, ২১০, ২২০- একের পর এক সংখ্যা পার হয়ে যেতে দেখা। রাতের রাস্তায় মেরুদণ্ডের ভেতর শিরশিরে একটা অনুভূতি। গ্যাস স্টেশনে দাঁড়িয়ে শৌচালয় ঘুরে আসলাম একবার দু'জনেই। স্টার বাকস্ ছিল গ্যাস স্টেশনের সাথেই। সেখান থেকে একটা লাটে মাখিয়াটো নিল হাও মিং। ক্যাফেইনের পরিমাণ অপেক্ষাকৃত কম। দুধ আর চিনির পরিমাণ বেশি। রাত জেগে গাড়ি চালানোর জন্য সর্বোত্তম।

আমি নিয়েছিলাম ফ্রিজের ঠান্ডা একটা 'ক্রোমবাখার'। পাতলা টিন দিয়ে তৈরি হয় বিয়ারের ক্যানটা। ফ্রিজ থেকে বের করলেই শরীরজুড়ে ছোট ছোট ঘামের মতো জলকণা দেখা দিতে শুরু করে। ঠিকঠাকমতো ঠান্ডা হলে গলা দিয়ে নামার সময় তরল মিছরির মতো অনুভূতি, আর হালকা চিরতার মতো স্বাদ পাওয়া যায়। সেই সঙ্গে দু'শো বছরের পুরোনো এ জার্মান ভাটিখানাটির চোলাইপন্থাজনিত ভিন্নতা যোগ করে ইতিহাসে গন্ধ আর সংস্কৃতির স্বাদ- ঠিক তার নিজের মতো করে।

আমার একটা নিজস্ব ধারণা হচ্ছে; সঠিক পরিবেশে এ ধরনের অনুষঙ্গগুলো মানুষের ভেতর যে অনুভূতিগুলোর জন্ম দেয়, সেসব অনুভূতির দেখা পেয়েই মানুষ স্বর্গ-নরক ইত্যাদির কথা কল্পনা করতে শিখেছে। ধীরে ধীরে সেই কল্পনাগুলো গিয়ে মিশেছে ধর্মের সঙ্গে। গড়ে উঠেছে স্বর্গপ্রাপ্তি কিংবা নরকযাত্রার কংক্রীটসদৃশ্য রাস্তার আধিপত্য। পূর্বে মানুষ তার সীমিত গন্ডির ভেতর পাওয়া ক্ষুদ্র ঘটনাবলীর ভেতরেই সুখ-দুঃখ, স্বর্গ-নরকের ধারণা মিলিয়ে নিতো।

আসলে স্মৃতি হাতড়াতে বসলে আজকাল খুব বেশি কিছু মনে করতে পারি না। নিজের গল্প ভুলে যাচ্ছি নিজেই আমি। সেজন্যই কি আজ সকালে প্রতিদিন পাঁচ মিনিট লেখালেখি কর্মসূচি নামে একটা কর্মসূচি মাথায় ঘুরছিলো!

---

মন্তব্য করুন

(আপনার প্রদান কৃত তথ্য কখনোই প্রকাশ করা হবেনা অথবা অন্য কোন মাধ্যমে শেয়ার করা হবেনা।)
ইমোটিকন
:):D:bigsmile:;):p:O:|:(:~:((8):steve:J):glasses::party::love:
  • Web page addresses and e-mail addresses turn into links automatically.
  • Allowed HTML tags: <a> <em> <strong> <cite> <code> <ul> <ol> <li> <dl> <dt> <dd> <img> <b> <u> <i> <br /> <p> <blockquote>
  • Lines and paragraphs break automatically.
  • Textual smileys will be replaced with graphical ones.

পোস্ট সাজাতে বাড়তি সুবিধাদি - ফর্মেটিং অপশন।

CAPTCHA
This question is for testing whether you are a human visitor and to prevent automated spam submissions.

বন্ধুর কথা

মীর's picture

নিজের সম্পর্কে

স্বাগতম। আমার নাম মীর রাকীব-উন-নবী। জীবিকার তাগিদে পরবাসী। মাঝে মাঝে টুকটাক গল্প-কবিতা-আত্মজীবনী ইত্যাদি লিখি। সেসব প্রধানত এই ব্লগেই প্রকাশ করে থাকি। এই ব্লগে আমার সব লেখার কপিরাইট আমার নিজেরই। অনুগ্রহ করে সূ্ত্র উল্লেখ না করে লেখাগুলো কেউ ব্যবহার করবেন না। যেকোন যোগাযোগের জন্য ই-মেইল করুন: bd.mir13@gmail.com.
ধন্যবাদ। হ্যাপি রিডিং!