ইউজার লগইন

বসার জায়গার ডানদিকে সাগর

বসার জায়গাটা থেকে মাথা ডানদিকে ঘুরালেই সবুজ কলাপাতা দেখা যায়। সারাক্ষণ বাতাসে দুলছে চিরল কলাপাতার দল। বড়-সড় ঘন একটা দল ঠিক আমার জানালার নিচেই মাথা তুলেছে। তার সামনে রাস্তার ওপার জুড়ে পুরোটাই নানান রকম পাতার সমাহার। পাতাদের প্রদর্শনী।

সবার আগে চোখ পড়বে তেতুঁল পাতার একটা ভীষণ বড় ঝাড়ের ওপর। গাছটার বয়স হবে ২০ বা তারও বেশি। চক্ষুসীমার মধ্যখানটায় উঠেছে তেঁতুল গাছটা। সাততলা থেকে তার পুরোটাই এবং আশপাশেরও পুরোটাই দেখা যায়। আমগাছ, নিমগাছ, লিচুগাছ, খেজুর গাছ, পেঁপে গাছ, নাম না জানা গাছ নং ১, নাম না জানা গাছ ২- বলতেই থাকা সম্ভব। মাটিতে বহুমিশালী ঝোপ-ঝাড়। তার অধিকাংশ জুড়ে রয়েছে কচুর ঝাড়। বড় বড় ঘন সবুজ কচুপাতা মাথা উচুঁ করে দাঁড়িয়ে আছে।

এরই মাঝে চলছে জনজীবন। ছোট ছোট গল্পগুলো লেখা হচ্ছে প্রতি মুহূর্তে। একটু আগে দেখলাম, বসার জায়গা থেকে ডানদিকে তাকালে যে মাটির গলিপথটা চোখে পড়ে, যেটা দূরে গিয়ে ঐ টিলাগুলোয় ওঠার রাস্তাদের সাথে মিশে গিয়েছে, যে টিলাগুলোর ওপরে মানুষের বসতবাটি- সেই গলিপথটার ভেতর থেকে দু'টো বোন বের হয়েছে। পর পর। একসাথে না। এগিয়ে আসছে বড় রাস্তার দিকে। আমি বসে বসে ওদের এগিয়ে আসতে দেখছি। পুরো গলিপথটা শুয়ে আছে চোখের সামনে।

দুই বোনের বড়টা, যার বয়স সাত-আট হবে, স্কুলে যাচ্ছে। ওর পেছনে ছোটটা, বয়স বড়জোর পাঁচ হবে, কমও হতে পারে, দৌড়ে দৌড়ে আসছে। কিন্তু একটু দুরত্ব বজায় রেখে। বড় বোন বকা দিচ্ছে। ওকে বাসায় চলে যেতে বলছে। কিন্তু ছোটটার সে কথা শোনার ইচ্ছে থাকলে তো। ওর বয়স মাত্র পাঁচ। বোন ঘুরে দাঁড়িয়ে চোখ গরম করলে, ও-ও দাঁড়িয়ে পড়ে। দেয়ালের মধ্যে এমনভাবে মিশে যেতে চায় যেন অদৃশ্য হতে চাইছে। আবার বোন হাঁটতে শুরু করে ও-ও হাঁটে। বোনের সঙ্গে তাল মিলাতে পারে না সবসময়। তাই কয়েক 'পা হেঁটেই দিতে হয় দৌড়, যখন দেখে দুরত্ব বেশি হয়ে যাচ্ছে। বড়টা গলির মুখের বড় রাস্তায় উঠে যাওয়ার আগে শেষবার পেছনে ঘুরে তাকায়। রাস্তা থেকে পাথর তুলে ছোঁড়ার মতো কিছু একটা করে। দেখে এবার ছোটটা কয়েক পা পিছিয়ে যায়। তারপর বড়টা ঘুরে তার স্কুলের রাস্তায় পা বাড়ায়। পিচ্চিটা কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে দেখে বড় বোন বড় রাস্তায় উঠে চলে গেল। যেই মাত্র বোন চোখের আড়াল হয়েছে, আর দেখা যাচ্ছে না তাকে; পিচ্চিটা দিলো আবার দৌড়।

আমি উপর থেকে খানিক উদ্বেগই অনুভব করছিলাম যে, এটাও আবার বড় রাস্তায় না চলে যায়। সে উদ্বেগ বেশিক্ষণ টেকার সময় পেল কই! বড়বোন চোখের আড়াল হওয়া মাত্র ছোটটা দৌড়ে আদতেই বড় রাস্তায় উঠে আসলো। আহ, এবার আবার বোনকে দেখা যাচ্ছে! এবার সে বড় রাস্তা দিয়েই হেঁটে হেঁটে বোনকে অনুসরণ করলো, যতক্ষণ বোন বামের আরেকটা রাস্তায় না ঢুকে গেল। তারপর সেই রাস্তাটা পর্যন্ত গিয়ে দাঁড়িয়ে থেকে আসলো পাঁচ মিনিট। বসে বসে দেখলাম পুরোটাই। পাঁচ মিনিট পর, ওই পিচ্চিটা বড় রাস্তা হয়ে গলিপথ দিয়ে দৌড়ে আর অল্প-সল্প হেঁটে তাদের বাড়ি ফিরে যাওয়ার সময় একবার শুধু একদল পথকুকুরের সামনে পড়া ছাড়া তেমন কোন বিপদে পড়ে নি।

এমন ঘটনাবলী চাইলে দেখা যায় যেকোন সময়। হাতের সব কাজ-কুজ শেষ করে, নিরিবিলিতে ওই জানালাটার সামনে গিয়ে শুধু একটু বসা। ঘটনাবলী পর্যবেক্ষণ এ কৌতূহলী মনের আজন্ম মুদ্রাদোষ। সেদিন সৈকতে কথা হচ্ছিল কারখানায় কাজ করতে গিয়ে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে পঙ্গুত্ব বরণে বাধ্য হওয়া একজন মানুষের সঙ্গে। ঘুরে ঘুরে সাহায্য চাচ্ছিল। বললো, আর নাকি ২৭ হাজার টাকা দরকার অপারেশনের জন্য। তাহলে পঙ্গুত্বকে পাশ কাটিয়ে যতোটা স্বাভাবিক জীবনের ফেরা সম্ভব, সেটার চেষ্টা করা হবে।

বাড়ির নিচে সেদিন কথা হচ্ছিলো একজন প্রাক্তনের সঙ্গে। বুলেট বাহিনী নামে তার একটা বাহিনী ছিল একসময়। সে বাহিনীর প্রধান হিসেবে এক সময় তাকে মন্ত্রীসভার সদস্য হওয়ার দৃষ্টান্ত স্থাপন করা ব্যাক্তিত্বরাও সমীহ করতো। তেমন এক সদস্যের গালে একবার সপাটে চড় হাঁকানোর অতীত রয়েছে তার। এখন দ্বাররক্ষক পেশায় নিয়োজিত। বাড়ির ভাড়াটেরা তাকে দিয়ে মুদি দোকানের সদাইপাতি আনান প্রায়শই। ভাবীরা "কাপড় শোকানোর দড়িতে অন্যের কাপড় কেন" সে অভিযোগে অশালীন কুবচন আর অপভাষা ব্যবহার করেন। কিন্তু তার মনের দুঃখ অন্যত্র। জীবনে একটা প্রেম হলো না কখনো।

ফার্মাসিস্ট দাশবাবু বয়সে ২৫ থেকে ৩০ এর মধ্যে হবেন। কিন্তু তার কাঁধে অনেক বড় দায়িত্ব। পুরো এলাকার গরীবের ডাক্তার তিনি। তার এ খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ার গল্পও দুর্দান্ত। নিজের ফার্মেসী থেকে একবার এক শিশুর এক সমস্যায় উনি একটি ওষুধ প্রস্তাব করেছিলেন। শিশুর পিতা তা স্বীকার করেন নি। বড় ডাক্তারকে দেখাতে নিয়ে যান। সেখানে গিয়ে বড় ডাক্তারকে মাত্র সাড়ে আট হাজার টাকা দর্শনীর বিনিময়ে একই ওষুধের পরামর্শপত্র হস্তগত করে ফিরে এসে ওই শিশুর বাপ পুরো এলাকায় ছড়িয়ে দেন ফার্মাসিস্ট দাশবাবুর গুণগান। তারপর থেকে তার কাছেই প্রথমে যায় এলাকার সবাই।

আর তরমুজ নিয়ে বসে থাকে যে লোকটা সারাদিন, তার বোধহয় কোন ঘর নেই। ওই রাস্তার পাশের তরমুজগুলোকে তেরপল দিয়ে ঢেকে তার ভেতরেই ঘুমায় রাতে। সকালে তেরপল উঠিয়ে দেয়। তাই তার দোকান ভোর ছয়টা থেকে রাত ১২টা পর্যন্ত খোলা থাকে। আমার মনে হয়, তার পুরো পরিবারই আশপাশের রাস্তার উপর শাক, লেবু এসব বিক্রি করে একইভাবে থাকে। এটাই তাদের স্বাভাবিকতা। মানবজীবন তো আর সবসময় ব্রহ্মাণ্ডের দুইটি নক্ষত্রের মতো এক সরলরেখায় থাকে না। তাই না?

বসার জায়গাটা থেকে মাথা ডানদিকে ঘুরালে সাগরের নীল জলরাশি দেখা যায়। আমার মনে হয়, উথাল-পাতাল চিন্তারাজির উৎস সেটাই। আর কিছু না।

---

মন্তব্য করুন

(আপনার প্রদান কৃত তথ্য কখনোই প্রকাশ করা হবেনা অথবা অন্য কোন মাধ্যমে শেয়ার করা হবেনা।)
ইমোটিকন
:):D:bigsmile:;):p:O:|:(:~:((8):steve:J):glasses::party::love:
  • Web page addresses and e-mail addresses turn into links automatically.
  • Allowed HTML tags: <a> <em> <strong> <cite> <code> <ul> <ol> <li> <dl> <dt> <dd> <img> <b> <u> <i> <br /> <p> <blockquote>
  • Lines and paragraphs break automatically.
  • Textual smileys will be replaced with graphical ones.

পোস্ট সাজাতে বাড়তি সুবিধাদি - ফর্মেটিং অপশন।

CAPTCHA
This question is for testing whether you are a human visitor and to prevent automated spam submissions.

বন্ধুর কথা

মীর's picture

নিজের সম্পর্কে

স্বাগতম। আমার নাম মীর রাকীব-উন-নবী। জীবিকার তাগিদে পরবাসী। মাঝে মাঝে টুকটাক গল্প-কবিতা-আত্মজীবনী ইত্যাদি লিখি। সেসব প্রধানত এই ব্লগেই প্রকাশ করে থাকি। এই ব্লগে আমার সব লেখার কপিরাইট আমার নিজেরই। অনুগ্রহ করে সূ্ত্র উল্লেখ না করে লেখাগুলো কেউ ব্যবহার করবেন না। যেকোন যোগাযোগের জন্য ই-মেইল করুন: bd.mir13@gmail.com.
ধন্যবাদ। হ্যাপি রিডিং!