আলে গুটেন ডিঙ্গে জিন্ড দ্রাই
সেদিন সকালে হালকা বৃষ্টি হয়ে যাওয়ার পর বিল্ডিংয়ের-সামনের-রাস্তার-একপাশের ড্রেনটা উপচে ওঠা ছাড়া আর যা ঘটলো দেখে অবাক হয়ে গেলাম। দৃষ্টিসীমার ভেতর যত গাছ রয়েছে সবার একটা "পত্রপল্লব ধৌতকরণ" প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়ে গেল পুরোপুরি। সবুজ পাতাদের পরিপৃক্তি পৌঁছালো শ্রেষ্ঠ বিন্দুতে। চোখ ধাঁধানো রং। আমার মনে হয়, বৃষ্টির পর তেঁতুল পাতার সবুজ গাঢ়ত্ব যে কারও মনকে স্পর্শ করতে পারে। অন্য পাতাদেরও একই রকম জলে-সিক্ত সৌন্দর্য বেরিয়ে পড়েছে চারিদিকে। তাকিয়ে তাকিয়ে ইংরেজিতে যাকে বলে "স্টেয়ারিং"- সেইটিই করলাম খানিকক্ষণ, এক কাপ পিওর-ব্ল্যাক মর্নিং-টি হাতে নিয়ে।
তবে শুধু পাতাদের দেখে নয়, ভাল লাগলো মাটিদের দেখেও। টিলাদের শরীরে যে মাটিগুলো ধরে থাকে, ওদের রং ঘন হলুদ। অন্ধকারের মধ্যে যেন একটুখানি কাঞ্চনআভা। টিলাগুলো কেটে কেটেই আশপাশের পুরো আবাসন প্রকল্পটা গড়ে তোলা হয়েছে। 'পাহাড়খেকো' শিরোনামে বোধহয় এক সময় পত্র-পত্রিকায় অনেক প্রতিবেদনও হতো। সেসবের দিন আমাদের দেশ পেরিয়ে এসেছে। এখন বিষয়গুলো ডাল-ভাত। তবে এমনটা হওয়ারই হয়তো কথা ছিল। সাগরপাড়ে ধীরে ধীরে একটা বাণিজ্যিক শহর গড়ে উঠছে। একপাশে জনবসতি, একপাশে ট্যূরিস্ট জোন, একপাশে সামরিক ও আন্তর্জাতিক কর্মকাণ্ডের সমাবেশ, আর একপাশে এখনও ফাঁকাই বলা যায়। খুরুশকুল ব্রীজ পেরিয়ে স্থানীয়দের পুরোনো গ্রামের ভেতর দিয়ে, এবড়ো-খেবড়ো পাথুরে রাস্তা, বাজার, মুরগীর দোকান, খানিকটা পানিতে ডোবা রাস্তা পেরোলেই বায়ুকলদের দেখা মেলে। মাইলের পর মাইলজুড়ে ছড়ানো লবণক্ষেতের বুকে যান্ত্রিক দানবের মতো দাঁড়িয়ে আছে শ্বেতশুভ্র বায়ুকলগুলো। পথের দু'পাশে যতদূর চোখ যায় বায়ুকলদের বিশাল ডানার ধীরলয়ের বিরামহীন আবর্তন আর লবণের জমি। মাঝে মাঝে দেখা মেলে সবুজ ধানের শীষের। চিকন চিকন অর্বুদ সংখ্যক ধানের ডগা সবসময় একসঙ্গে, একই তাল ও লয়ে বাতাসের সাথে দোলে। বিশ্বে এমন চমৎকার দৃশ্য কমই আছে। অথচ কত সহজলভ্য, তাই না?
জার্মান ভাষায় একটা প্রবাদ আছে: 'আলে গুটেন ডিঙ্গে জিন্ড দ্রাই'। সব ভাল জিনিস তিনটা করে আসে। বাণিজ্যিক শহরটার ওই একপাশের ফাঁকা অঞ্চলটা দিয়ে হালকা ধরনের এক-দেড়শো সিসির একটা বাইক চালিয়ে যেতে থাকলে অনায়াসে পাওয়া যায় বায়ুকল, বিস্তৃর্ণ লবণের প্রান্তর আর বাতাস পরিচালিত কচি ধানের ডগার দলীয় নৃত্য। তিনটা ভাল জিনিস একসাথে অপেক্ষা করে আছে সকলের জন্য। একদম বিনামূল্যে।
সেদিন আমাদের বৃষ্টিরা খুব ভালবেসেছিল। সকাল থেকে সারাদিন ঝরেছে। আশপাশের পাতাদের স্নান করিয়েছে, স্পা করিয়েছে, মেসেজ ওয়েল লাগিয়ে দিয়েছে, তারপর আবার স্নান করিয়েছে, তারপর সবশেষে যখন পাতারা বৃষ্টির হাত থেকে ছাড়া পেলো তখন প্রায় সন্ধ্যা ছুঁই ছুঁই। সূর্য্যটা শুধু ডুবে যাওয়া বাকি। আর সবার সব প্রস্তুতি নেয়া সম্পন্ন।
আমি দেখলাম, আকাশের মেঘগুলো লম্বা লম্বা হয়ে, একে অপরের কাছ থেকে আলাদা, কাছে-দূরে নানা মাত্রায় গিয়ে দাঁড়ালো। তাদের কারও শরীরে বেশি পানি, কারও শরীরে কম। দিনের সর্বশেষ দীর্ঘ ও শক্তিশালী সূর্য্যরশ্মিটি তাদের কারও শরীরে প্রতিফলিত হয়ে লাল রংয়ের গাঢ়তর বর্ণগুলোর প্রতিচ্ছটা সৃষ্টি করবে আর কারও শরীরে প্রতিফলিত হয়ে ঘটাবে হালকা বর্ণগুলোর বিচ্ছুরণ।
দূরে সাগরের দিগন্তের প্রায় কাছাকাছি একটা জাহাজও এসে নোঙর করলো দৃশ্যটাকে পূর্ণতা দেয়ার জন্য। সেই সময়, সূর্য্যের সেদিনের শেষ আলোকরশ্মির প্যাকেটটা যখন আমাদের বায়ুমণ্ডলে প্রবেশ করলো, তখন গিয়ে বৃষ্টি পুরোপুরি ছেড়ে দিয়েছিল এলাকার পাতাদেরকে।
আলোর প্যাকেটের চারিদিকে ছড়িয়ে পড়া আর পাতাদের বৃষ্টির হাত থেকে বেরিয়ে আসার ঘটনা, একই মুহূর্তে ঘটায় সেসময় আমার মাথাটা সামান্য বিরতি নিয়েছিল কাজ থেকে। সৌন্দর্যাঘাতে আহত নিউরণগুলো হঠাৎ কাজ থামিয়ে গালে হাত দিয়ে হা করে দেখতে শুরু করেছিল পাতাগুলোকে।
তেজী আর ঘন সবুজের মায়ায় একেবারে বিকল হয়ে যাওয়া যাকে বলে আরকি! মানুষের সঙ্গে নাকি অমন সময়গুলোতেই প্রকৃতির সবচেয়ে শক্ত সংযোগ ঘটে থাকে। কে জানি বাপু। আমার মস্তিস্কের নিউরণগুলো তো খানিক পরপরই বিকল হয়। বসার জায়গায় এসে জানালা দিয়ে বাইরে তাকালে দেখার মতো কিছু না কিছু পেয়েই যাই।
তবে আমি মাঝে মাঝে আলাদা করে ভাবি, জীবন একটা টাট্টুঘোড়ার খামার তো নয়, যে এখানে সারাক্ষণ আনন্দ আর হাসি-হুল্লোড় লেগে থাকবে। ওঠা-নামাই এ জীবনের অগ্রযাত্রার সূত্র। সবাই আমরা সেই সূত্রেই এগিয়ে চলেছি। যেন এক বিশাল বায়ুকল যা সময়ের বাতাসে ঘুরতে ঘুরতে সামনের দিকে এগিয়ে চলেছে। আর সেই মহাযজ্ঞের ভেতর কিনা আমার নিউরণগুলো মাঝে মাঝেই গালে হাত দিয়ে আশপাশের সৌন্দর্য্য দেখতে বসে যায়! কি আশ্চর্য বৈপরীত্য!
---





মন্তব্য করুন