কোন একদিন একটা মন ভাল করা সকাল ছোঁবো
প্রতিদিন পাঁচ মিনিট লেখালেখি কর্মসূচি নামে শুরু হলেও, এ কর্মসূচি নিয়ে বসলে পাঁচের বেশি মিনিট পেরিয়ে যায় মুহূর্তে। আজ থেকে চেষ্টা থাকবে সেটা না হতে দেয়ার। কারণ এমনটা হতে থাকলে খুব সম্ভাবনা রয়েছে, আগামীকালই হয়তো আর লিখতে বসতে ইচ্ছে হবে না।
কিন্তু পাঁচ মিনিটের সময়সীমার ভেতর একটা সমস্যা রয়েছে, সেটি হলো লেখার বিষয়বস্তুতে পৌঁছুনোর আগেই সময় শেষ হয়ে যায়। এই যেমন ইতোমধ্যে এক মিনিট পেরিয়ে গেছে। আমি একদিকে লিখছি আরেকদিকে পাখির কলতান শুনছি। বসার জায়গাটা থেকে ডানে তাকালে সাগর দেখা যায়। আর সকালের নিরিবিলিতে মিশে থাকে অসংখ্য অজস্র পাখির কুজন। দু'একটার ডাকই চিনি মাত্র। কোকিল, চড়াই, কাক- এগুলোর ডাক ছাড়া আর কারোটা চিনতে পারি না। কিন্তু আলাদা করতে পারি বিভিন্ন পাখির নানারকম ডাক। যতগুলো ডাক আলাদা আলাদা করে আমার কানে ধরা দেয়, তাতে মনে হয় অন্তত ১৫-২০ রকম পাখি তো আছেই। আরও বেশিও হতে পারে।
অমলকান্তি রোদ্দুর হতে চেয়েছিল। আমি চেয়েছিলাম পরিব্রাজক হতে। আমরা কেউই হতে পারি নি যা চেয়েছি জীবনে হতে। জীবন যা বানাতে চেয়েছে সেটিই হয়েছি। আদতে আমাদের ক্ষমতা মহাবিশ্বের অসীম ক্ষমতার তুলনায় কিছুই না। সীমিত বললেও অর্বুদগুণ বাড়িয়ে বলা হয়। তাই আজকাল কোন শিশুকে জিজ্ঞেস করি না, "বড় হয়ে কি হতে চাও?"
জিজ্ঞেস করে কোন লাভ নেই। বড় হয়ে যা হতে চায়, তাই হয়েছে এমন কাউকে চেনারজানার মধ্যে সেভাবে দেখেছি বলেও মনে পড়ে না। কোন এক বিচিত্র ঢাকাই বিকেল, সন্ধ্যা কিংবা রাতে কর্ণফুলি সুপার মার্কেটের সামনে দিয়ে রিকশা করে কাকরাইল মোড়ের দিকে যাওয়ার বেলায়, তার ক'দিন আগে দেখা একটা বাংলা নাটকের তৌকির আহমেদ অভিনীত একটা দৃশ্যের কথা ভাবতে ভাবতে ঠিক করেছিলাম, সাংবাদিক হবো। তখনও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হই নি, ভর্তি পরীক্ষাও দিই নি। কেবল মৌচাকের ইউসিসি কোচিংয়ে কোচিং করতে যাই। ভিকারুন্নিসার মেয়েদের পাশে বসে কোচিং করি। ওই বয়সে ওইটুকু মনকে যেভাবে আন্দোলিত করতো, আজ তার অনেক বেশি কিছুর দিকেও মন ফিরে তাকায় না দ্বিতীয়বার।
যাহোক, আবছা মনে থাকা সেই বিকেলে কর্ণফুলি সুপার মার্কেটের সামনে দিয়ে রিকশায় চড়ে যেতে যেতে ভাবা ভাবনাটা প্রায় ফলেই গিয়েছিল বলা যায়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিষয়ে অনার্স-মাস্টার্স শেষ করাও হয়ে যায়। সেসব শেষের আগে থেকেই একাধিক জাতীয় গণমাধ্যমে কাজের হাতেখড়িও সম্পন্ন হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু জীবন ঘড়ির কাঁটাটাকে শৃঙ্খলিত গতিতে আনার কাজটা কখনও সম্পন্ন হয়েছিল বলে জানি না।
কিছুদিন পর পর মন উড়াল দিতো, কিন্তু কোথায় কেউ জানতো না। জানতাম না আমিও। শহরের রাস্তায়, অলিতে-গলিতে, চায়ের দোকানে, বন্ধুদের আড্ডায়, অফিসের কাজে, প্রিয়তমার হাত হাতে নিয়ে রিকশা ভ্রমণের কালে- সবখানেই আমার শরীরি উপস্থিতি থাকলেও; মনটা যে কোথায় গিয়ে উড়ে বেড়াতো, কখনো বুঝতেই পারতাম না। মাঝে মাঝে যখন লেখালেখির মাধ্যমে সে জগতের সঙ্গে যোগাযোগে চেষ্টা করতাম, আর কিছুই কাজ করছে না দেখে; তখন খুব হালকা আর আবছা দেখতে পেতাম সেই জগতটা। অশরীরি, অতিপ্রাকৃতিক, চেনাজানার বাইরে কোন একটা জায়গা। বিশ্বের কোন গল্প, কবিতা বা সিনেমায় সে জগতকে ধরার চেষ্টা হয় নি কখনো। হবেই বা কি করে, সেটা তো আমার জগত! আজই বোধহয় লেখার মধ্যে দিয়ে খুব শক্তভাবে চেষ্টা করছি, সেই জগতটা কেমন ছিল বোঝার। কিন্তু হায়! পেরিয়ে এসেছি দেড় যুগের মতো সময়। দেড়ঘন্টা আগের কথাও ঠিক ঠিক মনে রাখতে পারি না আজকাল। আর তো দেড়যুগ আগের ঘটনা!
সকালের মিষ্টি রোদ কেটে গিয়ে তীব্র রোদ বাড়লে, পাখিদের কুজন কমে আসে একটু। বিল্ডিংয়ের সামনের রাস্তায় গাড়ি-ঘোড়া বাড়ে। ব্যাটারিচালিত অটোরিকশাগুলো সংখ্যাই সবচেয়ে বেশি। এছাড়া সৈকতে চড়ে বেড়ানো এবং পর্যটকদের বিনোদনে ব্যবহৃত ঘোড়াগুলোকেও দেখা যায় সামনের রাস্তায় ঘোরাঘুরি করতে। ঘোড়াগুলো এ এলাকাকে চেনে, ওদেরকেও বোধহয় এলাকার সবাই চেনে। ওগুলো একাই ঘুরে বেড়ায় এদিকে-সেদিকে।
জীবনে ছুঁতে চেয়েছিলাম অনেক কিছুই। ছোঁয়া হয় নি সেসব। কোন একদিন একটা মন ভাল করা সকাল ছোঁবো। খুব মন ভাল করে দেয় এমন একটা সকাল। কোন একদিন ছুঁয়ে দেবো অবশ্যই। ক্ষুদ্র এ মানবজীবনের কাছে আর কিইবা চাওয়ার থাকতে পারে? আর বেশি কিছু চাওয়ার নেই।
---





মন্তব্য করুন