অসমাপ্ত ঝিকিমিকি গল্প
সেবার আমাদের ডিপার্টমেন্ট থেকে ছেলেমেয়েদের জন্য ইন্টার্নশীপ অফার করা হয়েছিলো। প্রতিবছর এ অফার করা হয় না। ডানিডা নামের একটা প্রতিষ্ঠান আছে। শুধু ওরা যখন টাকা দেয়, তখন ছেলেমেয়েরা সুযোগটা পায়। আমাকে বলা হলো, ক্লাসের ফার্স্টবয় সজলের সঙ্গে ডেনমার্কে গিয়ে ইন্টার্নী করতে হবে। ভালো লাগলো। এই সুযোগে বিমানভ্রমণ হবে। কিছুদিন পোড়ামন নিয়ে পোড়া শহরে ঘুর ঘুর করতে হবে না এবং একই ছকে বাঁধা জীবনটাকে রিপিট করতে হবে না। অনিশ্চয়তা আর উত্তেজনা নিয়ে আমরা দু'জন ভাইকিংদের রাজ্যে পদার্পণ করার জন্য অপেক্ষা শুরু করলাম। ভিসা পেতে জটিলতা পোহাতে হলো না। ডানিডা'র সব বন্দোবস্ত যারপরনাই ভালো ছিলো।
বাল্টিক সাগরের ছোট্ট যে দ্বীপটিতে আমাদের ঠাঁই হয়েছিলো, সেটা মূলত খ্রিস্টান অধ্যূষিত একটি গ্রাম। সুন্দর, ছিমছাম। আমার অল্প ক'দিনের অবস্থানে দেখেছিলাম, সেখানকার জলবায়ু বেশ মৃদু। এমনিতেও ডেনমার্ক একটি নিচু দেশ। প্রায় জলমগ্নই বলা যায়। সাগর তাকে চারপাশ থেকে ঘিরে রেখেছে। সেখানকার বাতাসে আগুনে হলকার কথা কখনো চিন্তাই করা যায় না। আমাদের গ্রামটি ছিলো আরো হিমশীতল একটি জায়গা। গরমের দিনে সেখানে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ওঠে হিমাংক থেকে ১৫-১৬ ডিগ্রী সেলসিয়াস ওপরে মাত্র।
গ্রাম হিসাবে উল্লেখ করেছি যদিও, কিন্তু দ্বীপটি ছিলো আসলে অনেক বড়। সেখানে ছিলো ঢেউখেলানো পাহাড়ের সারি। দূরে দাঁড়িয়ে যেগুলোর দিকে তাকালে আমাদের কুমিল্লার বেতিয়ারা সীমান্ত কিংবা বান্দরবান-লামার পাহাড়ি পথের কথা মনে পড়ে যায়। আরো ছিলো সাজানো গোছানো গবাদি পশুর খামার। সেসবে শুকর, ভেড়া আর গরু লালন-পালন হয়। ছিলো বিস্তৃত গ্রামীণ সবুজ চারণভূমি। আসলে এসবের বর্ণনা দিয়ে শেষ করার সুযোগ নেই। একটা গল্পের সীমানায় তা আঁটবেও না। তাই পণ্ডশ্রমে গেলাম না।
একটি তথ্য দিই, পুরো ডেনমার্ক দেশটির কোন অংশ থেকেই সাগরের দূরত্ব ৬৪ কিলোমিটারের বেশি না। যে কারণে দেশটির সবখানেই বিরাজ করে উপকূলীয় আবহাওয়া। সারা বছরজুড়েই সেখানে চলতে থাকে বর্ষা, থাকে কুয়াশা আর মেঘাচ্ছন্ন আকাশ। কখনো কম, কখনো বেশি। এ অবস্থাকে স্বাভাবিক মেনে নিয়েই ক'টা দারুণ দিন কাটিয়েছিলাম বাল্টিক উপকূলের ওই দ্বীপটিতে। আর অল্প সময়ে ডেনিশ মেয়ে আনা মাতোভিচ হয়ে উঠেছিলো আমাদের প্রাণের বন্ধু।
মেয়েটি লম্বায় ছিলো একদম আমার ঠিক সমান সমান, আর একটুও মোটা না হলেও শক্ত দেহবল্লরী ছিলো তার। ঝকঝকে দুই সারি দাঁত ছিলো এবং হাসলে সত্যিকারের মুক্তো ঝরতো। এই কারণে আমি ওকে হুমায়ুন আজাদ স্যারের ঝিনুকের জ্যোতির্ময় ব্যাধি লেখাটি অনুবাদ করে শুনিয়েছিলাম। ও শুনে মুগ্ধ হয়েছিলো। এবং সেজন্য সে আমাকে স্যারের শ্রেষ্ঠ কবিতা বইটি থেকে প্রায়ই বিভিন্ন কবিতা অনুবাদ করে শোনানোর জন্য উৎপাত করতো। আমি ওকে অনুবাদ করে শুনিয়েছিলাম-
"আমাকে ছেড়ে যাবার শুনেছি তুমি খুব কষ্টে আছো।
যে-গাধাটার সাথে তুমি আমাকে ছেড়ে চ'লে গেলে সে নাকি ভাবে
শীততাপনিয়ন্ত্রিত শয্যাকক্ষে কোনো শারীরিক তাপের
দরকার পড়ে না। আমি জানি তোমার কতটা দরকার
শারীরিক তাপ। গাধারা জানে না।"
এবং আরো অনেক কবিতা। ওকে কবিতাগুলো অনুবাদ করে শোনাতে এবং সেগুলো নিয়ে আলোচনা করতে আমার ভালো লাগতো। সজলও খুব আগ্রহসহ সেসব আলোচনায় অংশ নিতো।
আনাদের একটা পশু-খামার ছিলো। যদিও সে কোনোদিন দুধ খেতো না। জিনিসটা নাকি অসহ্য। ওর প্রিয় খাবার ছিলো আলু ভাজা। আমারও। কারণ ওটাই ডেনিশরা সবচে' দারুণ করে বানাতে পারতো। সসেজ আর আলু ভাজা। সঙ্গে মেয়োনেজ দিয়ে বানানো একটা সস্। এই ছিলো জনপ্রিয়তম খাদ্য ওদের। আরেকটা খাবার সবাইকে খেতে দেখতাম। বেশ কয়েক ধরনের সবজি দিয়ে বানানো সালাদ। তাতে ডিমও দেয়া থাকতো। অর্ধসেদ্ধ সবজিগুলো খেতে কচকচে হলেও সুস্বাদু ছিলো।
আনা কখনো বিফ বা আর কোনোকিছুর স্টেক খেতো না মুটিয়ে যাবার ভয়ে। অথচ বিফস্টেক, ল্যাম্বস্টেক, পর্ক এগুলো সব ছিলো ওখানকার দূর্দান্ত সুস্বাদু জিনিস। তবে দুপুরের দিকে এসব খাওয়া ওখানে এক রকম নিষিদ্ধই ছিলো বলা যায়। এগুলোকে ভারী খাবারের ক্যাটেগরীতে ফেলে, তুলে রাখা হতো সন্ধ্যায় ডিনারে খাবার জন্য। তারপরে সারারাত শক্ত-নরম-মাঝারি পানীয়, স্ন্যাকস্ ইত্যাদি খাও। মজাসে গান গাও। যদিও আমাদের থাকাকালীন সময়ে এই রুটিন খুব কমই মেনেছি। একেকদিন ক্যানোলায় খেয়ে ফিরতে ফিরতে আমাদের মাঝরাত পেরিয়ে যেতো।
তবে একথা ঠিক যে, ওই ঝিরিঝিরি সামুদ্রিক হাওয়া পরিবেষ্টিত গ্রামটিতে মানুষের জীবনটা খুব সুখের ছিলো। ওদের চোখে-মুখে লেগে থাকতো সেই সুখের ছায়া। আনা ছিলো সবসময়ের জন্য হাসিখুশি, প্রাণোচ্ছল আর মারকুটে ধরনের একটি মেয়ে। আমি যে প্রিন্টিং মেশিনটার কারিকুরি বইয়ে পড়ে-টড়ে ওখানে গিয়েছিলাম, সেটার কাজ হাতে-নাতে শেখার জন্য; সেই মেশিনটার সেন্ট্রাল অপারেটরের মেয়ে ছিলো সে। আমি ওই মেশিন চালানো শেখার জন্য এতদূর পথ পাড়ি দিয়ে এসেছি শুনে সে হেসেই বাঁচে না। সে নাকি পাঁচ বছর বয়স থেকে মেশিনটা চালাতে জানে এবং ছোটবেলায় নাকি নিজের ছবির খাতার আঁকি-বুকিগুলো মেশিনের ওয়েস্টপেপারে প্রিন্ট করে রাখাটা ওর একটা মজার খেলা ছিলো।
এমনিতে আমার তেমন কোনো কাজ ছিলো না সেখানে। বেলা পর্যন্ত পড়ে পড়ে ঘুমাতাম। ঘুম থেকে ওঠার পর ওখানে গিয়ে কেনা সেলফোনটা দিয়ে আনাকে ফোন করতাম। ও'ও আমার মতোই ঘুমকাতুরে মেয়ে, যে কারণে বেলা পর্যন্ত ঘুমাতো। আমি ফোন করে ওর ঘুম ভাঙাতাম। ততক্ষণে সজল উঠে পড়েছে। আমাদের জন্য ব্রেকফাস্ট বানিয়েছে। আমি সজলকে ধন্যবাদ এবং প্রেম প্রেম একটা লুক দিয়ে ব্রেকফাস্টটা খেতাম। ছেলেটা আসলেই খুব কো-অপারেটিভ ছিলো। আর ছিলো সাদাসিধেও ভীষণ। ব্রেকফাস্টের পর বসে বসে টুকটাক হাতের কাজ, ইন্টার্নীর কাজ শেষ করে রাখতাম। বিকেল হওয়ার আগেই, দেখতাম টমবয়টা একটা সাইকেল চালিয়ে চলে এসেছে। মাথায় পেশাদার সাইকেল চালকদের মতো হেলমেটও আছে তার। ওর সিঁড়ি দিয়ে দুদ্দাড় উঠে আসা শুনলেই বুঝতে পারতাম, শুরু হতে যাচ্ছে দিনের নৈমিত্তিক কুরুক্ষেত্রটি।
ভেতরে ঢোকার পর একটা পূর্ণ তুলকালাম বাঁধিয়ে দিতে ওর সর্বাসাকুল্যে সময় লাগতো তিন থেকে চার মিনিট। প্রথমে বেচারা সজলকে একদফা হেনস্থা করে সে মনোযোগ দিতো আমাদের ঘরটার দিকে। ওটা কোনো এক বিচিত্র কারণে কখনোই সুশ্রী অবস্থায় থাকতো না। এজন্য যাবতীয় দোষ আমার এবং আমাদের দু'জনের গে অ্যাটিটিউডের ঘাড়ে চাপিয়ে দিয়ে সে ঠা ঠা করে খানিকক্ষণ হাসতো এবং তারপর ফ্রীজ খুলতো। এরমধ্যে সে একবার আমার কাজের টেবিলটার ওপর উঠে পা দুলাতে দুলাতে, 'হাই সুইটহার্ট! হাউ আর ইয়া?' বলে কৃত্রিম আহ্লাদ দেখিয়ে গেছে। ফ্রীজটা খোলার পরপরই হুট-হাট ভাল্লুকের ক্যানগুলো ছোঁড়া শুরু করতো আমাদের দিকে। সেগুলো ছোঁড়ার আগে একটু সঙ্কেতও দিতো না। যে কারণে আমরা খুব টেনশনে থাকতাম। কখন মাথায়-কপালে লেগে যায় বা ল্যাপটপের মনিটরে। অবশ্য ক্যাচ মিস হলে ওর জ্বালা ধরানো হাসিটা সহ্য করতে হবে-এই ভয়টা কাজ করতো আরো বেশি।
এরই মধ্যে দেখতাম সে ফস করে একটা সিগারেট জালিয়ে ফেলেছে। ম্যাচের কাঠিটা কোথায় ছুড়ে মেরেছে তার কোনো ইয়ত্তা নেই। ওসব নিয়ে আমার কোনো দুশ্চিন্তা না থাকলেও সজল সন্ত্রস্তভাবে কাঠিটাকে অনুসরণ করতো। ফোমের গদিটার ওপর গিয়ে পড়লে সারাঘরে আগুন লেগে যেতে পারে- এই আশঙ্কাটা যে সে করে সেটা আমি জানতাম। সে নিজেই একদিন আমাকে বলেছিলো। 'দোস্ত কবে যে ঘরে-গুদামে আগুন লেগে পুড়ে মারা যাই, গড নো'স্!'
এদিকে সোফার একপাশে হয়তো আমি বসে আছি। আনা আরেকপাশে এমন বেমক্কা একটা লাফ দিয়ে এসে বসতো যে, উল্টাদিকের স্প্রিঙয়ের উপর বসে থাকা আমি খানিকটা টলোমলো হয়ে যেতাম। সে সময় যদি ভাল্লুকের ক্যানটা মুখে ধরা থাকতো তো একদলা ভাল্লুক একবারে চলে যেতো পেটের ভেতর। খানিকটা ঢুকে যেতো নাক দিয়েও। আর তা হলেই হয়েছে। হাসতে হাসতে বিষম খেতো দস্যিমেয়ে। আর সজল উইন্ডো-টেবিলের আড়াল থেকে মেয়েটির দিকে বিস্ফোরিত চোখে তাকিয়ে থাকতো। আসলে স্বৈরিণী মেয়েটি যখন আমাদের ঘরে ঢুকে লাফালাফি-ঝাপাঝাপি, হাহাহিহি শুরু করে দিতো তখন, আমাদের দু'জনেরই হতাশ চোখে তাকিয়ে থাকা ছাড়া বিশেষ কিছু করার থাকতো না।
ঠিক সন্ধ্যে নামার মুখে আমরা বাসা থেকে বের হতাম। পাহাড়ী সমুদ্রতীরে তিনজনে মিলে ঘুরে বেড়াতাম। পটকা সজলটা বসে বসে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্য অবলোকনেই বেশি স্বচ্ছন্দ্য ছিলো। আমি আর আনা মারপিট, দৌঁড়ঝাপ ইত্যাদিতে সময় পার করতাম। সমুদ্রতীরটা বৃত্তাকার পথে পুরো গ্রামটাকে ঘিরে রেখেছিলো আর মাটির ভেতর থেকে উঠে আসা কালো কালো পাথরগুলো ছিলো মানুষের বসার জায়গা। ছিলো শোঁ শোঁ শব্দসৃষ্টিকারী বাতাসুৎপাদক নারিকেলের সারি। আমরা এর মধ্যে দৌড়াদৌড়ি করতে করতে মাঝে মাঝে সজলকে চ্যাংদোলা করে সমুদ্রের পানিতে ছুঁড়ে মারতাম। আনা ভালো সাঁতার পারতো। আমিও মোটামুটি পারি। আর সজলটা একদম আনাড়ি। বেচারা আমাদেরকে ভয় পেতো। তবে তিনজনেই যখন ভিজে যেতাম, তখন সঙ্গে করে আনা ওডকা'র বোতল খুলে বড় বড় দুই ঢোক গলায় ঢেলে দেয়া লাগতো। সবারই। নাহলে যে শরীর ঠান্ডায় জমে যাবে সেটা আমরা জানতাম।
রাতে ফেরার পথে আমি হেডফোনে আনাকে ইন্ডিয়ান মিউজিক শোনাতাম। বাংলাদেশের সঙ্গীতকেও ওরা এই ক্যাটেগরীর মধ্যেই ফেলতো। আর সবশেষে কোনো একটা ক্যানোলায় ঢুকে সসেজ-স্টেক-আলু ইত্যাদি দিয়ে রাতের খাবার সারতাম। তারপর বাসা। সে সময় গ্রামের পাথর বিছানো পথে ভাল্লুকের ক্যান হাতে আমাদের সরব-প্রণোচ্ছল-হাস্যজ্জ্বল পদচারণা গ্রামবাসীদের মুগ্ধ করতো। অবশ্য চিল্লাচিল্লি-হইচই-অট্টহাসি এগুলো সব আনাই করতো। তারপরও গ্রামবাসী আমাদেরকে পছন্দ করেছিলো মূলত, এত স্বতঃস্ফূর্তভাবে ওদের সঙ্গে মিশে যেতে পারার জন্য। আমি অবশ্য আনাকে বলেছিলাম, এর পুরো কৃতিত্ব আসলে তোমার। তুমি একটা অদ্ভুত ভালো মেয়ে বলে তোমাকে সবাই পছন্দ করে। আর আমরা তোমার বন্ধু বলে আমাদেরকেও।
(আর গল্প লিখতে ইচ্ছে করছে না। মন ভালো নাই।)
---





তারপর কী হৈলো

জলদি বলেন মিয়া
তারপরে আমার মনে পড়ে গেলো, মানুষজন কথা দিয়ে কথা রাখে না।
কবিদের প্রায়ই মন ভালো থাকেনা। আমারো , যদিও আমি কবি নই।
আহ েব্রা দারুন গল্প....দম ফাইটা যাইতাছে তাড়াতাড়ি বাকিটুকু পোস্ট কইরা ফালান.....
মন ভালো হয়ে যাক লেখেন তো মাশাল্লাহ!
এটা কি গল্প নাকি নিজের কথা? তারপর কি হলো?
মন কেন ভালো নাই? কি হইছে? আজ আমারো মন ভালো নেই। ভালো থাকার মিষ্টি সময়গুলি কেমন দ্রুত শেষ হয়ে যায়
যাক সেসব। আপনার কি হৈলো? মন ভালো করেন। বন্ধুদের সাথে আড্ডান, ঘুরে বেড়ান, মুভি দেখেন। ভালো থাকেন সবসময়।
আপনার মন খারাপ আছে থাক, গল্পটা ঠিক করে শেষ করেন
আপ্নের উপন্যাসটা শেষ করেন।
হুম
আপনার মন খারাপের দৈত্যটা যেন জলদি জলদি আপনাকে ছেড়ে যায়।
ভালো থাকবেন---খুউউউউউউউউউউউব ভালো
গল্প বলার ধরনটা চমকপ্রদ।
দুর্দান্ত ধারাবর্ণনা।
তাড়াতাড়ি শেষ করেন এইটা। আপনেরে প্লিজ লাগে!
মন্তব্য করুন