ইউজার লগইন

আন্দোলনের একদিন

শুক্রবার। বাসা থেকে বের হতে একটু দেরি হয়ে গেলো। আগের দিন রাত ৪ টা পর্যন্ত মনিটরের দিকে তাকিয়ে থাকার ফল। কাজের কাজ কিছু হয় নাই, এমনটা বলবো না। আন্দোলনের নানান দিক নিয়ে অসংখ্য আলোচনা মস্তিষ্কের নিউরণের ভেতর বানের পানির মতো প্রবেশ করেছে। ভাগ্যিস ইনফরমেশনের কোনো ভর থাকে না। নাহলে আমার মাথাটা এত ভারী হয়ে যেতো যে, নিশ্চিত সেটা আজ আর আমি বালিশ থেকে তুলতে পারতাম না।

পৌনে ১২টার দিকে দৈনিক বাংলা মোড় দিয়ে ঢুকে বায়তুল মোকাররমের সামনে একটা চক্কর দিলাম। শ্রম ভবনের দিকটা একেবারে পল্টন মোড় পর্যন্ত বন্ধ। উল্টা রাস্তায় সাইকেল চালাচ্ছি আর দেখছি হাজারো দাঙ্গা পুলিশ, রাব দাঁড়িয়ে আছে পজিশন নিয়ে। তাদের মধ্যে যুদ্ধের প্রস্তুতি। বায়তুল মোকাররমের সিঁড়ির ওপর দাঁড়িয়ে স্লোগান দিচ্ছিলো শ'পাচেক অল্পবয়সী পাঞ্জবি পড়া ছেলে। পুরো সিঁড়িই দখল করে ছিলো ওরা। সংবাদকর্মীদের অনেককেই দেখলাম মাথায় হেলমেট পড়ে ঘোরাঘুরি করছেন। নয়া দিগন্তের এক রিপোর্টারকে দেখলাম। দেখে মেজাজ খারাপ হলো। কেন, কে জানে?

প্রজন্ম চত্বরে গিয়ে হতাশ হতে হলো। কেবল শাহবাগ মোড় পুরোপুরি খুলে দেয়া হয়েছে। আস্তে আস্তে গাড়ি ও বাসের চলাচল বাড়ছে। আর সেই দৃশ্যটাই আমাকে দেখতে হলো! জাদুঘরের সামনে বানানো মিডিয়া সেলের ব্যানারটা খুলে ফেলা হয়েছে দেখলাম। সেখানে নতুন ব্যানার ঝুলছে। লেখা আছে, গণজাগরণ মঞ্চ গণস্বাক্ষর চলছে। মানে কি? ওরা কি এই মিডিয়া সেলটাকেই এখন মঞ্চ বানিয়ে ফেললো। সে সময় গোটা পঞ্চাশেক লোক ছিলেন আশপাশে। যাদের অধিকাংশই সম্ভবত নিয়মিত পথচারী। কেউ কেউ স্বাক্ষর করছিলেন গণজাগরণ মঞ্চের ফর্মে।

গেলাম ক্যম্পাসে। মধুর ক্যান্টিনের 'বিবিএ ওয়ারলেস' নামক ওয়াইফাই নেটওয়ার্কটা এ ক'দিন খুব ভালো সার্ভিস দিয়েছে। জুমের চেয়েও ভালো স্পীড। কিন্তু গতকাল (বৃহস্পতিবার) রাত থেকে সেটা আমার কম্পিউটারে কানেক্ট হচ্ছিলো না। রাতে তাড়াহুড়ো থাকায় বেশি চেষ্টাও করি নি। জুম দিয়ে কাজ সেরেছি। এবার ঠান্ডা মাথায় ব্যপারটা নিয়ে বসলাম। বেশিক্ষণ লাগলো না। উইন্ডোজ সাত'টা আসলে অপারেটিং সিস্টেম হিসাবে বেশ ভালো। ভিসতার চেয়ে তো কয়েকশ' গুণ ভালো। ছোটখাটো সমস্যা সমাধানের জন্য উইন সাতের ট্রাবলশুটারটা মোক্ষম। এক ছোটভাইয়ের কম্পিউটারের আগের দিন উইন্ডোজ আট দেখেছি। ইন্টারফেসটা দারুণ! দেখার পর থেকে লোভ লাগতে শুরু করেছে।

বেলা দেড়টার দিকে যাবতীয় জাগতিক বিষয়াশয় সম্পর্কে আপডেট হয়ে আবার বের হয়ে পড়লাম রাস্তায়। বন্ধু-বান্ধবসহ। পার্কের দিকে হাঁটা ধরলাম। ক্ষুধাটা একটু একটু জানান দিচ্ছিলো। তাই আর দেরি না করে মোল্লার দোকানে ঢুকে রিফিল করে নিলাম পেটটা। এরপর ছবির হাটে গিয়ে চা খাওয়ার পালা। কি করা যায়, কি হবে, কিভাবে হবে- এসব নিয়ে বন্ধু-বান্ধবের সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনা শুরু হলো। মুহূর্মুহূ খবর আসছিলো পল্টন, একুশে হল-শহীদুল্লাহ হল আর দেশজুড়ে চলতে থাকা তাণ্ডবের। সেসব শুনে বেশিক্ষণ স্থির থাকা গেলো না।

শাহবাগে গিয়ে দেখি তখনো কোনো জটলা বড় হয়ে জমাট বাঁধে নি। একটা দল সড়কদ্বীপের সামনে থেকে মিছিল বের করার প্রস্তুতি নিচ্ছে। ততক্ষণে সবার মাঝে খবর ছড়িয়ে গেছে, জামায়াত-শিবির তিন দিক থেকে মিছিল নিয়ে শাহবাগের দিকে আসছে। পুলিশের সঙ্গে তাদের ব্যপক ফাইট চলছে। এক বন্ধু কাঁটাবন মোড় পর্যন্ত ঘুরে এসে জানালো, কাঁটাবন মসজিদের সামনে নাকি ছাত্রলীগ অবস্থান নিয়েছে। জামায়াত-শিবির ঠেকানোর জন্য।

দুইটা চল্লিশে সড়কদ্বীপের সামনের মিছিলটা মুভ করলো। পিজির সামনের রাস্তা দিয়ে কাঁটাবন পর্যন্ত ঘুরে সোজা এসে থামলো জাদুঘরের গেটের সামনে। এসে বসে পড়লো। শাহবাগ মোড়ের দিকে গেলো না। চাইলে তখনি মিছিলটা মোড় দখল করে বসে যেতে পারতো। মিছিলটা তার কক্ষপথে ঘুরে আসতে গিয়ে, দ্বিগুণের বেশি লোক জোগাড় করে এনেছিলো। মিছিলটা যখন আজিজ সুপার মার্কেটের নিচ দিয়ে পার হচ্ছিলো, তখন মার্কেটের ক্রেতা-বিক্রেতা সবাই বারান্দায় এসে দাঁড়িয়ে হাততালি দিয়ে উৎসাহ সরবরাহ করছিলেন।

ক্যম্পাস আর আশপাশে ঘুর ঘুর করি আজ মেরে-কেটে হলেও নয় বছর। সব মুখ পরিচিত। জাদুঘরের সামনে যারা এসে বসে পড়লো তাদের মধ্যে বিভিন্ন ছাত্র সংগঠনের নেতারাই বেশি ছিলো। ডা. ইমরান এসে পৌঁছুলেন ঠিক ৩ টায়। চলছে স্লোগান। মাইক ছাড়াই। ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক অনেকক্ষণ টানা স্লোগান দিলেন। আমরা যখন ক্যম্পাসে পড়াশোনা করি, তখন এই লোক প্রথম নজর কেড়েছিলো স্লোগান ভালো দিতে পারার গুণের কারণে। তাকে নিয়ে একটা পোস্টার ছাপা হয়েছিলো- স্লোগান মাস্টার .. ভাইয়ের 'মুক্তি চাই' বা 'মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার করো' কিংবা 'উপর হামলা কেন, প্রশাসন জবাব চাই'- তিনটার কোনো একটা ইস্যুতে।

যাই হোক, ডা. ইমরান এবং অন্যরা জাদুঘরের সামনে বসেই রইলেন বেলা সাড়ে ৫ টা পর্যন্ত। এদিকে ক্যম্পাসের ছেলে-পিলে তো সব রেগে কাই। এভাবে কি আন্দোলন হয়? ওরা সারাদেশে তাণ্ডব চালাচ্ছে আর আমরা প্রজন্ম চত্বর ছেড়ে জাদুঘরের সামনে সমাবেশ করছি! আমার মনেও প্রশ্ন এলো, কাঁহাতক আর সহ্য করা যায়?

ছবির হাটে খবর গেলো। সঙ্গে সঙ্গে এসে পড়লো রঙয়ের কৌটা। ছেলে-পিলে গিয়ে অবস্থান নিলো শহীদ জননী জাহানারা ইমামের বিশালায়তন ছবিটির নিচে। তখনো শাহবাগ মোড় দিয়ে গাড়ি-ঘোড়া চলছে। অগ্রজপ্রতীম অতনু শর্মাকে আমি জীবনে প্রথম একটা কাজ ঠিকঠাকভাবে করতে দেখলাম। অনেকদিন ধরে লোকটাকে চিনি। কোনোদিন কোনো কাজ ঠিকমতো করতে পারে নাই, কোনো কথা ঠিকমতো রাখতে পারে নাই, কোনো কিছুকে জীবনে সিরিয়াসলি নিতে পারে নাই। সেই লোক হুট বলতে ৫০ টা জোয়ান মর্দ নিয়ে হাজির হয়ে গেলো শাহবাড় মোড়ে! তাজ্জব হয়ে গেলাম তার রকম-সকম দেখে।

সঙ্গে সঙ্গে হাতে হাত ধরে গোল হয়ে দাঁড়িয়ে গেলো সবাই। একদম শাহবাগটাকে মাঝখানে রেখে। একদল লেগে গেলো রঙতুলি নিয়ে। মুহূর্তে লেখা হয়ে গেলো, চলতি অধিবেশনে জামাত-শিবির নিষিদ্ধ করো এবং আরো বেশ ক'টি লাইন। লেখালেখির এই পর্যায়ে জাদুঘরের সামনে সমাবেশ করছিলো যারা, তারা সবাই উঠে এলো প্রজন্ম চত্বরে। গোল হয়ে বসে গেলো আবার। শুরু হয়ে গেলো উত্তাল স্লোগান। ফাঁসি ফাঁসি ফাঁসি চাই, রাজাকারের ফাঁসি চাই। জামাত-শিবির-রাজাকার, এই মুহূর্তে বাংলা ছাড়। একটা-একটা শিবির ধর, ধইরা ধইরা ধোলাই কর।

গণমানুষের আন্দোলনের একটি অনন্য বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, এর রূপ প্রতি মুহূর্তে পাল্টায়। এর আগেও দেখেছি, এই আন্দোলনকে মুহূর্তের মধ্যে অন্যরূপ ধারণ করতে। শুক্রবার আবারও দেখলাম। এতক্ষণ যেটা চলছিলো জাদুঘরের গেটের সামনে, সাড়ে ৫টার পর থেকে সেটা শুরু হয়ে গেলো প্রজন্ম চত্বরে। দেখে-শুনে ভালো লাগলো। এটাই চাচ্ছিলো মানুষ। ক্যম্পাসের ছেলে-পিলেদের আরো অনেক প্রস্তুতি ছিলো। তারা সেসবসহ একপাশে অবস্থান নিলো। কিন্তু বেশিক্ষণ সেসব চালানো গেল না। ধীরে ধীরে বাড়তে লাগলো মানুষ। বাড়তে লাগলো ভীড়।

সন্ধ্যা সোয়া ছয়টায় ডা. ইমরান এক তাৎক্ষণিক ঘোষণায় আগামী ২৪ ঘন্টার মধ্যে মাহমুদুর রহমানের গ্রেফতারসহ বেশ কিছু দাবি জানিয়ে বৈঠকে বসার উদ্দেশ্যে পিজির দিকে চলে গেলেন। ক্যম্পাসের ছেলে-পিলেও গেলো মিটিংয়ে অংশ নিতে।

আমি হাঁটা ধরলাম আবারো সেই সুনির্দিষ্ট গন্তব্যের পানে। ওই রাজাকারদেরকে ফাঁসির দড়িতে ঝুলাতে হবেই। নিষিদ্ধ করতে হবে ওই ঘৃণ্য জামায়াত-শিবির-যুদ্ধাপরাধীদের চক্রটিকে। এর আগ পর্যন্ত রণে ভঙ্গ দিতে পারি না।
---

পোস্টটি ১৪ জন ব্লগার পছন্দ করেছেন

জ্যোতি's picture


জামায়অত-শিবিরের তান্ডব দেখেছি টিভিতে। রাগে, দু:খে, ক্ষোভে জ্বলেছি। প্রতিবাদ করতে বের হতে পারিনি কাল। যারা রাজপথে ছিলেন, প্রতিবাদ করছেন তাদেরকে স্যালুট। তবে মনটা আছে সব প্রতিবাদকারেদের সাথে। জয় হবেই। হতেই হবে। জানোয়ারেরা ধর্মের ধুয়ো তুলে লন্ডভন্ড করে দিয়েছে...এসব মেনে নেওয়া যায় না।

ধূসর's picture


দুর্ভাগ্য হলেও সত্যি যে আমাদের কে জাতীয় পতাকার ছিঁড়ে ফেলার সংবাদ শুনতে হয়েছে, যে ভাষায় আজ লিখছি সে ভাষা অর্জনকারীদের স্মৃতিস্তম্ভ ভাঙার দৃশ্য দেখতে হয়েছে। বাংলা মায়ের কাছে আমরা কতোটা অপরাধী হয়ে গেলাম!!!
অবাক করা বিষয় ছিল গতকাল হামলাকারীদের বেশিরভাগই ছিল মাদ্রাসা-ছাত্র যাদের কে টেলিভিশন দেখতে দেয়া হয় না, বর্তমানে দেশে ঘটে যাওয়া বিষয়গুলো নিয়ে তারা সঠিক কোন ধারনাই রাখে না(তথ্যগুলো সংগৃহীত)...এমনকি মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কেও না। তারা কেবল এতটুকুই জানে যে ইসলাম নিয়ে অপপ্রচার চলছে। এমন পরিস্থিতিতে দোষ কাদের দেয়া উচিত?

একজন মায়াবতী's picture


অবাক করা বিষয় ছিল গতকাল হামলাকারীদের বেশিরভাগই ছিল মাদ্রাসা-ছাত্র যাদের কে টেলিভিশন দেখতে দেয়া হয় না, বর্তমানে দেশে ঘটে যাওয়া বিষয়গুলো নিয়ে তারা সঠিক কোন ধারনাই রাখে না(তথ্যগুলো সংগৃহীত)...এমনকি মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কেও না। তারা কেবল এতটুকুই জানে যে ইসলাম নিয়ে অপপ্রচার চলছে। এমন পরিস্থিতিতে দোষ কাদের দেয়া উচিত?

আরাফাত শান্ত's picture


দারুন লাগলো দিনলিপিটা!

উচ্ছল's picture


আপডেট চলুক.......নিয়মিত চাই..... আমরা যারা নিয়মিত যেতে পারি না তাদের জন্য ......... ভালো থাকবেন।

তানবীরা's picture


দারুন লাগলো দিনলিপিটা!

নিভৃত স্বপ্নচারী's picture


দারুন, এভাবেই চলুক প্রতিদিনের দিনলিপি!

বিষণ্ণ বাউন্ডুলে's picture


প্রত্যেকদিন এরকম একটা দিনলিপি পোস্ট চাই। চাই না, এটা দরকার।

মন্তব্য করুন

(আপনার প্রদান কৃত তথ্য কখনোই প্রকাশ করা হবেনা অথবা অন্য কোন মাধ্যমে শেয়ার করা হবেনা।)
ইমোটিকন
:):D:bigsmile:;):p:O:|:(:~:((8):steve:J):glasses::party::love:
  • Web page addresses and e-mail addresses turn into links automatically.
  • Allowed HTML tags: <a> <em> <strong> <cite> <code> <ul> <ol> <li> <dl> <dt> <dd> <img> <b> <u> <i> <br /> <p> <blockquote>
  • Lines and paragraphs break automatically.
  • Textual smileys will be replaced with graphical ones.

পোস্ট সাজাতে বাড়তি সুবিধাদি - ফর্মেটিং অপশন।

CAPTCHA
This question is for testing whether you are a human visitor and to prevent automated spam submissions.

বন্ধুর কথা

মীর's picture

নিজের সম্পর্কে

স্বাগতম। আমার নাম মীর রাকীব-উন-নবী। জীবিকার তাগিদে পরবাসী। মাঝে মাঝে টুকটাক গল্প-কবিতা-আত্মজীবনী ইত্যাদি লিখি। সেসব প্রধানত এই ব্লগেই প্রকাশ করে থাকি। এই ব্লগে আমার সব লেখার কপিরাইট আমার নিজেরই। অনুগ্রহ করে সূ্ত্র উল্লেখ না করে লেখাগুলো কেউ ব্যবহার করবেন না। যেকোন যোগাযোগের জন্য ই-মেইল করুন: bd.mir13@gmail.com.
ধন্যবাদ। হ্যাপি রিডিং!