গল্প: প্রিয় বর্ষাকে নিয়ে দুই ছত্র
বর্ষা একটা দারুণ ঋতু। বিশেষ করে বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে হুডখোলা রিকশায় ঘোরার মজাই আলাদা। এ সংক্রান্ত একটি ছোট্ট সত্যি গল্প মনে পড়ে গেলো লীনা আপুর প্রকৃতি কথা... ব্লগটা পড়ে। ভাবলাম, লিখে ফেলি। উনাকে অনেকদিন কোনো পোস্ট উৎসর্গও করা হয় না। সেটাও করা হলো এই সুবাদে। 
---
সেবার নম পেন যেতে হয়েছিলো একটা আন্তর্জাতিক শিশু বিষয়ক সম্মেলনের ঢাকনা দিতে। কভার করার বাংলা হিসাবে এই কথাটা ব্যবহার করে আমি খুব মজা পাই। সম্মেলন শুরুর দিন সকালে আকাশে রোদ ঝিকমিক করছিলো। আর ছিলো ঠান্ডা বাতাস।
স্থানীয় পত্রিকার রিপোর্টার আফরীন ছিলো আমার সঙ্গে। তার বাসাও নম পেনেই। আশপাশের সবকিছু চেনেন। আমাকে ঢাকা থেকে বলে দেয়া হয়েছিলো ওখানে পৌঁছেই ভদ্রমহিলার সঙ্গে যোগাযোগ করার জন্য। অবশ্য ভদ্রমহিলা না বলে তাকে ভদ্রবালিকা বলা ঠিক হবে মনে হয়।
আমরা সম্মেলন কেন্দ্রে ঢোকার আগে শেষ সিগারেটটা ধ্বংস করছিলাম এবং কোন দেশ কি ধরনের রেডিমেড বিবৃতি নিয়ে সম্মেলনে হাজির হবে, তা নিয়ে গবেষণা করছিলাম। হঠাৎ দেখলাম পূর্বাকাশ ধীরে ধীরে কালো হয়ে আসছে। আফরীনকে বিষয়টা দেখানোর সঙ্গে সঙ্গে ওর মুখে ছোটদের মতো উল্লাসের ছায়া পড়তে দেখলাম। সে বললো, আপনার দিকজ্ঞান খুব কম। ওটা মোটেও পূর্বদিক নয়। ওটা ঈশাণ দিক। ওখানে যে কালো মেঘটা ঘুরপাক খাচ্ছে, সেটা অচিরেই একটা সাইক্লোন বা সুনামি হয়ে দেখা দিতে পারে।
শুনে আমার খুব আনন্দ হলো। আমি বাংলাদেশে শেখা একটা চোরাই বুদ্ধি আফরীনের সঙ্গে শেয়ার করলাম। পরিচিত কোনো রিপোর্টারকে সম্মেলনের সংবাদটা ই-মেইল করার অনুরোধ জানিয়ে, দু'জন কালবৈশাখী দেখার জন্য বের হয়ে পড়লাম। নম পেন শহরে আমাদের টেম্পুর মতো এক ধরনের যান চলাচল করে। সেটায় করে শহর থেকে বেশ খানিকটা দূরের একটা জায়গায় চলে গেলাম। জায়গাটা আফরীনের পূর্ব পরিচিত ছিলো।
ওই জায়গাটা আমারও পূর্ব পরিচিত ছিলো। কারণ সেটা ছিলো, ঠিক আমাদের গ্রামের মতোন একটা গ্রাম। কিন্তু গাছগুলো অনেক বড় বড়। পাতাগুলো অনেক বেশি সবুজ। দুই পাশে বিস্তৃত জমি। কিন্তু কোনো আইল নেই। জমিতে ধান চাষ করা হয়েছে। শীষগুলোতে এখনো বাদামি রঙ ধরে নি। কিন্তু যতটা লম্বা হবার, ততটা হয়েছে। ঝড়ের আগের মৃদুমন্দ বাতাসে সেই ধানগাছগুলো দুলছিলো। একটা অনেক মোটা মেঠোপথ জমিটার ভেতর দিয়ে চলে গিয়েছিলো। আর দুইপাশে লক্ষ লক্ষ বিঘা জমি জুড়ে শুধু সবুজ আর সবুজ। মেঠোপথের ধারে বেড়ে ওঠা পাম গাছগুলো প্রত্যেকটার দৈর্ঘ্য আমাদের দেশি নারকেল গাছের তুলনায় দ্বিগুণ।
আমি আর আফরীন হেঁটে যাচ্ছিলাম, ওই রাস্তাটা দিয়ে। জানতে চাইলাম, এই রাস্তা কোথায় গিয়ে পৌঁছেছে? ও বললো, এই রাস্তা গিয়ে মিশেছে উত্তরে সোখা বীচের সঙ্গে। সেখানে সমুদ্র এসে আছড়ে পড়েছে শহরের আঙিনায়।
আমরা হেঁটে চললাম। বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা হলো। ইনবক্সে এসে পৌঁছুলো এক রিপোর্টারের লেখা প্রতিবেদনের অনুলিপি। তাই ঘষামাজা করে দু'জন দু'জনের অফিসে দু'টো কপি পাঠিয়ে দিলাম।
মাঝে মাঝে বৃষ্টির ছাঁট এসে আমাদের মুখে লাগছিলো, কিন্তু ঝুম বৃষ্টি তখনো নামে নি। সন্ধ্যা পর্যন্ত হেঁটে ক্লান্ত আমরা মাথা গোঁজার ঠাঁই খুঁজতে গেলাম সিহানুক ভিলেতে। সুন্দর ছিলো সেই সিহানুক ভিলেটা। সবুজ পাম ছাড়াও ছিলো মাথা উঁচু নাম না জানা অসংখ্য গাছের সারি। নুড়ি-পাথর বিছানো রাস্তা। আমার এক দেখাতেই খুব বেশি পছন্দ হয়ে গেলো জায়গাটা।
সেদিন রাতে আকাশে অনেক গুড় গুড় শব্দ হচ্ছিলো। আফরীন জানালো, এই শব্দে নাকি কাম্বুজিয়ানদের মনে অনেক রকম শঙ্কা জাগে। ওরা এই শব্দকে ভয় পায়। ওদের চিত্ত উদ্বেল হয়ে ওঠে। আবার একই সঙ্গে এই শব্দই নাকি ওদেরকে আন্দোলিতও করে তোলে। তির তির করে কাঁপতে থাকে ওদের বুকের ভেতরটা। কেন এমন হয়, কেউ নাকি জানে না।
আমি শুনি আর বোঝার চেষ্টা করি, এই মেঘের গুড় গুড় কি আমার মনে কখনো ভিন্ন কোনো অনুভূতির জন্ম দেয়? চেষ্টা করতে গিয়ে অবাক হয়ে খেয়াল করি, আসলেই মনে এক ধরনের বিষণ্নতা এসে ভর করে। আশপাশটাকে ক্ষুদ্র মনে হতে থাকে এবং নিজের ক্ষুদ্রতা সবকিছুকে ছাপিয়ে বড় হয়ে দেখা দেয় আমার কাছে। জীবনের সব ব্যর্থতা ভেসে ওঠে চোখের সামনে। পৃথিবীর কাছে আজন্ম ঋণী এই আমি নিজেকে অনেকদিন ভুলিয়ে রেখেছিলাম। হঠাৎ করে মনের ভেতর থেকে একটা আস্তর উঠে যাওয়ায়, নিজের সংকীর্ণতাগুলো খুব অনায়াসে স্পষ্ট দেখে ফেলি। পুরোপুরি।
তখন আমি একটা সিগারেটে অগ্নি সংযোগ করে যেই না কামরার উত্তর মুখী জানলাটা খুলেছি, আর সঙ্গে সঙ্গে এক ভীষণ দমকা হাওয়া ঘরে ঢুকে সিগারেট কেস-লাইটার-চশমার মতো ছোট ছোট বেশ কিছু জিনিসকে স্থানচ্যূত এবং ঘরটাকে এলোমেলো করে দিলো। আফরীন বললো, এইবার বোধহয় শুরু হবে।
এভাবেই ওই দেশে বৃষ্টি হয়। বৃষ্টি আসার অনেক আগে থেকে শুরু হয় মেঘে মেঘে ঠোকাঠুকি। তারপর এক সময় ঘোষণাপত্র পাঠ। সবকিছুকে ছুঁয়ে সবশেষে আকাশ ভেঙ্গে অঝোর ধারায় ঝরতে থাকা। এমন বৃষ্টি আমি আমার দেশে দেখি নি।
সিহানুক ভিলেতে আমরা আটকে ছিলাম পাক্কা সাত দিন। একটানা বৃষ্টি ঝরেছে। এক মুহূর্তের জন্য বিরাম ছিলো না। আমাদের নড়চড়া করার কোনো সুযোগ ছিলো না। মাঝে মাঝে শুধু বৃষ্টিতে ভিজতে বের হতাম। ভিজতে ভিজতে চলে যেতাম সাগরপাড়ে। সাগরের স্বচ্ছ নীল জল আর বৃষ্টির বড় বড় ফোঁটা আমাদেরকে একদম পুরোপুরি ভিজিয়ে দিতো।
মাঝে মাঝে চোখে পড়তো জেলেদের নৌকা। ছোট জেলেরা বড় বারান্দাওয়ালা বেতের টুপি পড়ে কাঁধে মাছ বহনের ঝোলা নিয়ে সাগরপাড়ে ঘোরাঘুরি করতো। বড় জেলেরা ঝড়-বৃষ্টিকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে চলে যেতে মাঝ দরিয়ায়। আমাদের দু'জনের কাজ ছিলো সেই সব দৃশ্য খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখা।
সিহানুক ভিলেতে যারা থাকতে আসতো তাদের আমাদের মতো দুর্দশা ছিলো না। তারা এক-দুইদিন থেকে আবার চলে যাচ্ছিলো। কিন্তু আমাদের আসলে যেতেই ইচ্ছে করছিলো না। আমাদের কামরায় উত্তরমুখী বারান্দাও ছিলো একটা। ঝুম বৃষ্টিতে সেই বারান্দায় দাঁড়িয়ে গরম চায়ের কাপে চুমুক দেয়ার অভিজ্ঞতা আসলে ভাষায় বর্ণনা করা সম্ভব না। ওই দেশে চায়ের সঙ্গে দুধ বা চিনি মেশানোর কোনো চল ছিলো না। শুধু চায়ের পাতা আর গরম পানি। সেটাও আমার খারাপ লাগে নি। সিগারেটের প্রাচুর্য্য ছিলো। বিশেষ করে গোল্ড লীফটা একদম হাতের নাগালে। আমার আর বেশি কিছু চাইবার ছিলো না।
মাঝে মাঝে আফরীন জানতে চাইতো, এই যে অফিস-কাজ-দেশ-ফ্যামিলি সব ফেলে পৃথিবীর নির্জন এক প্রান্তে এসে পড়ে আছি, তাও খুবই অচেনা একজন মানুষের সঙ্গে; এতে কি আমার খারাপ লাগছে কিনা?
বলতাম, হুম খুবই। চলো চলে যাই।
কিন্তু মনে মনে আমি চাইতাম এই বৃষ্টি আর না থামুক। আর কোনোদিন বৃষ্টিটা না থামুক। আমি ঠিক ওই কামরাটাতেই রয়ে যাবো আজীবন। মাঝে মাঝে বের হবো। সাগরের পাড়ে গিয়ে ক্ষণকাল বসে থাকবো। যেদিন ভিজতে ইচ্ছে করবে না, সেদিন আফরীনের শাদা স্বচ্ছ ছাতাটা হাতে নিয়ে বের হবো। এমন অসংখ্য সুখ কল্পনায় বুদ হয়ে থাকতেই আমার বেশি ভালো লাগতো। আর বাইরে একটানা নিঝুম ধারায় বৃষ্টি পড়ার শব্দ তৈরি হতো। ফরেস্ট গাম্পকে ভিয়েতনামে একটানা ২৭ দিন বৃষ্টির ভেতর কাটাতে হয়েছিলো।
সেই সাত দিনে আফরীন হৃদয়ের খুব কাছের বন্ধু হয়ে উঠেছিলো। একজন অসাধারণ বন্ধু। ওর আর আমার বোধহয় বলার মতো আর কোনো কথা বাকি ছিলো না, এত কথা আমরা ওই ক'দিনে বলেছিলাম। তারপরও আমরা কথা বলেই যাচ্ছিলাম, থামছিলাম না।
---





ভাইরে ভাই দুনিয়ার সব জায়গাতেই দেখি বান্ধবী রাইখা আসছো


=====================
লেখা বরাবরের মতোই।
===================
পোস্টটা পড়ে এই ঠান্ডার মধ্য বৃষ্টিতে ভিজতে ইচ্ছা করলো
এটা আসলে, মানে, আপনে খুব খ্রাপ লুক।
পড়ে মনে হলো সেন্সর বোর্ড অনুমাদিত
মূল ঘটনাতেও যে সেন্সর্ড হবার মতো কোনো উপাদান ছিলো না। এখন আমি কি করবো বলেন?
যাউগ্গা, বড় বোনের ব্লগ পড়ে সাথে সাথে একটা গল্প নামানো, এইটা আসলেই অসাধারণ
আপনাদের হাততো দেখি যাদুর হাত... লেখালেখি কইরা বৃষ্টি নামাইয়া ফেলতেছেন
উত্তরাতে এখন বৃষ্টি হচ্ছে
বর্ষারে ডাকতে ডাকতে বৃষ্টি নামায়ে ফেললেন আর আমি এখন আম্মার ওষুধ কিনতে গিয়ে পথের কাদা পানিতে স্লিপ কেটে কাদা মাখিয়ে আসলাম।
আসল কমেন্ট হইলো...রাসেল ঠিক কথাই বলছে তো। তবে গল্পটা কিন্তু একদম ছবির মতো, গল্পের মতোই। আহা! জীবন কত সুন্দর! কত সুন্দর স্মৃতি!
আহা! দারুন বৃষ্টি বন্দনা। কি চমৎকার গল্প লেখে লোকটা!
লেখাটা পড়তে পড়তে আজ সন্ধ্যায় হঠাৎ বৃষ্টিতে ভেজার কথা মনে পড়ে গেল!
সিম্পলী দারুন!
যাদুর হাতে লেখা সব সময়ের মতই দারুণ লাগলো
ভাইয়া, বিবাহ করিয়া ফেলিয়াছেন বলিয়া জানিতে পারিলাম? দাবাত ইত্যাদি পাবার উছিলায় আপনাকে দেখিতে পাইবো বলিয়া যে ক্ষীণতম আশা ছিলো, উহা ধুলিস্মাৎ হইয়া গেলো...
(লেখা নিয়ে কিছু বললাম না, কারণ লেখাটা পইড়া জেলাস হইসি)
কি সুন্দর বৃষ্টি বিলাস! অনেক হিংসা দিলাম! দারুণ লিখেছেন!
বিদেশি বৃষ্টি ভিজে দারুন ফ্রেশ লাগতেছে।
আড়াইশো তম পোস্টের জন্য অভিবাদন।
এই শুভক্ষণে আপনার
বক পাখির ডানায়
গল্পটা ফিরায় দেন। প্লিজ..
ভাইরে ভাই দুনিয়ার সব জায়গাতেই দেখি বান্ধবী রাইখা আসছো

=====================
লেখা বরাবরের মতোই।
মূহুর্তেই কি দারুন একটা গল্প লিখে ফেললেন! সুপার্ব!
মন্তব্য করুন