ইউজার লগইন

আমাদের হাতে বেশি সময় ছিল না

১.
আমি জীবনে খুব বেশি ভ্রমণ করি নি। অল্প কয়েকবার কক্সবাজার গিয়েছি। যার মধ্যে একবার ছিল হানিমুনের জন্য যাওয়া। সেটাই হচ্ছে কক্সবাজারে আমার সবচেয়ে আনন্দদায়ক আর উত্তেজনাকর ভ্রমণের স্মৃতি। তবে কক্সবাজার ভ্রমণের চেয়ে অনেক বেশি উত্তেজনার, আনন্দের আর শিহরণের ছিল প্রত্যেকটা বান্দরবান ভ্রমণের স্মৃতি।

দেশ ছেড়ে আসার আগে উত্তরবঙ্গটা চষে আসা হয়েছে মামা কাম ছেলেবেলার বন্ধু কাম চিরকালীন বন্ধু রিয়াল সওদাগরের সাথে। শুধু এপারেই না, অবৈধভাবে সীমানা পেরিয়ে চলে গিয়েছিলাম ওপারেও। ওই ভ্রমণটা বান্দরবান ভ্রমণের চেয়ে কোনো অংশে কম ছিল না। পুরো ভ্রমণটা হয়েছিল একটা ক্লাসিক এইচএস হান্ড্রেড মোটরসাইকেলের পিঠে চেপে। নিজেকে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন ঘটনায় আমার চে গুয়েভারা মনে হয়। গণজাগরণ মঞ্চের জেগে ওঠার দিনগুলোতে সে আমাকে একটা চে গুয়েভারা টুপি কিনে দিয়েছিল। সেটা মাথায় দিলেই, মনে হতো আমি দক্ষিণ আমেরিকায় চলে গেছি। মুক্তিকামী মানুষের মিছিলে অস্ত্র হাতে যোগ দিয়েছি।

যাহোক অনেক বড় দুই প্যারার ভূমিকা করে ফেললাম। কেন কে জানে। বলতে এসেছিলাম বার্লিন ভ্রমণের কথা। আমার ভ্রমণগুলো মূলত হুট করে হয়ে যায়। পরিকল্পনা করে খুব যে ভ্রমণ করেছি, তা নয়। পরিকল্পিত ভ্রমণগুলো সবসময়ই খুব যে আনন্দদায়ক হয়েছে তাও নয়। অপরিকল্পিত ভ্রমণগুলোই বরং বেশি উত্তেজনা এনেছে, বেশিরভাগ সময়। বার্লিন ভ্রমণটা ছিল পুরোই আকস্মিক ও অপরিকল্পিত। অনেক আগে উইফরইউ-এর মিটিংয়ে বলে রেখেছিলাম, বার্লিন ট্রিপ যাবো। বলে ভুলে গিয়েছিলাম পুরোপুরি। গত শুক্রবার (গতকালের আগের শুক্রবার) সকালে ঘুম ভাঙলো আমাদের দলনেতা স্টেফানের ফোন পেয়ে। ধরতেই কোনো ভূমিকা না করে সরাসরি জানতে চাইলো, আর কতক্ষণ সময় লাগবে?

আমি প্রায় অবাক হয়ে জানতে চাইলাম, কিসের জন্য?
-মানে?

আমি বেশ ভাল ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেলাম। মস্তিষ্ক তখনও পুরোপুরি ফাঁকা। ওটার কোনো দোষ নেই। সকালে উঠে এক মগ কফি পান না করা পর্যন্ত আমার সিস্টেম চালু হয় না। তবে ভাগ্যক্রমে সেদিন ব্যাকআপ সিস্টেম চালু হয়ে আমাকে তাৎক্ষণিকভাবে বিপদ কেটে বের হয়ে আসতে সাহায্য করেছিল। আমি কোনো কিছুই না জানা সত্বেও সবকিছু জানি ও বুঝি টাইপ গলায় স্টেফানকে বললাম, পাঁচ মিনিট। বলে ওকে আর কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে কেটে দিলাম।

কেটেই ফোন করলাম আরেকজন টিউটরকে। তার সঙ্গে সাকুল্যে ২০ সেকেন্ড কথা বলতেই সবকিছু পানির মতো পরিস্কার হয়ে গেল। বাকি চার মিনিট ৪০ সেকেন্ডে কিভাবে বক্সার পরা অবস্থা থেকে জুতা-মোজা-জিন্স-জ্যাকেটের ভেতর আমি নিজেকে গলিয়ে দিয়েছিলাম; কিভাবে দুইদিন টেকার জন্য প্রয়োজনীয় কাপড়, টুথব্রাশ, পার্ফিয়ুম ইত্যাদি ব্যাকপ্যাকে ভরেছিলাম এবং কিভাবে যে মার্ফিসাহেবকে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে যথাসময়ে রুমের চাবিটা খুঁজে পেয়েছিলাম; সেসব বৃত্তান্তে আর না যাই। শুধু বলে রাখি বার্লিন পৌঁছে ব্যাকপ্যাকে শুধুমাত্র চুলের জেল ছাড়া আর সবই খুঁজে পাওয়ার পর নিজেকে আরও একবার আমার 'জিনিয়াস' মনে হয়েছিল!

সোশ্যাল মিডিয়ার যুগ। বাসে উঠে ঝটপট একটা ভিডিও তুলে ফেসবুকে পোস্ট করে দিয়ে দিলাম লম্বা একটা ঘুম। তার আগে অবশ্য খানিকটা প্রকৃতি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছিল। প্রকৃতি জিনিসটা সব বিশ্বেই একই রকম সুন্দর। একবার উত্তরবঙ্গের পিচঢালা হাইওয়ে আর তার দু'পাশের বিছানো ধানক্ষেত দেখতে দেখতে যেভাবে আমার চোখের কোণায় চিকচিক করার জন্য যথেষ্ট পরিমাণ পানি এসে জমেছিল, অবাক হয়ে খেয়াল করলাম ল্যাঙ্গেভাইজেন স্ট্রাসে পার হয়ে আমাদের বাস যখন এ-নাইন হাইওয়েতে উঠে গেল তখনও ঠিক সমপরিমাণ এক মুহূর্তের চোখের কোণায় এসে দেখা দিয়ে গেল। দুই-তিনবার পলক ঝাপটে যখন সেটাকে আবার কর্ণিয়ার ভেতর ঠেলেঠুলে পাঠিয়ে দিলাম, তখন মনে পড়ে গেল ঠিক এভাবেই আরও অনেকবার আমি চোখের পানি ঠেলে ভেতরে পাঠিয়েছিলাম। অনেক রকম কারণে।

বার্লিন শহরটা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় লাল ফৌজের হাতে পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। জার্মানির অনেক শহরই আসলে মাটির সাথে মিশে গিয়েছিল সেসময়। সবগুলো শহর আবারও মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে। একেকটা শহর একেক রকম বৈশিষ্ট্য নিয়ে মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে। কোনোটা হয়ে উঠেছে প্রকাণ্ড এক মিউজিয়াম, রাস্তার মোড়ে মোড়ে ছড়ানো-ছিটানো ঐতিহাসিক নিদর্শন, পাশ দিয়ে হেঁটে গেলে মনে হয় এই বুঝি মুর্তিটা কথা বলে উঠবে; আবার কোনোটা হয়ে উঠেছে বিশাল যন্ত্রশহর, সেসব শহরের রাস্তায় হাঁটলে মনে হয় এই বুঝি হুভার বোর্ডে চড়ে ঘুরে বেড়ানো কারও সাথে দেখা হয়ে যাবে। বার্লিনেরও তেমন একটা বৈশিষ্ট্য আছে। পুরো শহরটা একটা আস্ত প্রদর্শনী। স্থাপত্যকলার। প্রত্যেকটা ভবনের ভিন্ন ভিন্ন ডিজাইন আছে। সেসব ডিজাইনের পেছনে ভিন্ন ভিন্ন গল্প আছে। শুধু সেসব ডিজাইন দেখে দেখেই শহরটাতে কয়েক সপ্তাহ পার করে দেয়া সম্ভব।

তবে আমাদের হাতে বেশি সময় ছিল না। যে কারণে বার্লিন প্রাচীর, শহরের কেন্দ্রবিন্দু আর স্প্রি নদী দেখে প্রথম দিনের দলবদ্ধ ঘুরাঘুরি শেষ করতে হয়েছিল। তারপর সবাই মিলে হৈ-হল্লা করতে করতে রওনা হয়েছিলাম হোস্টেলের পানে।

২.
আসলে আগের অংশটুকু লিখেছিলাম একটা পরিকল্পনা নিয়ে। সেটা হচ্ছে কিছু ছবি এই পোস্টটার সাথে যোগ করে দেয়া। আমি ঠিক নিশ্চিত না, কেউ কি এই লেখাটা পড়ছেন কিনা কিন্তু আমি টোটালি লেখাটা লিখছি অবজেক্টিভলেসভাবে। এলওএল।

বার্লিনের হাইলাইট কি ছিল জানতে চাইলে আসলে আমি ওই টেকনো ক্লাবটা ছাড়া আর কোনো কিছুকে সেভাবে এক্সপ্লেইন করতে পরবো না। তবে সেই ক্লাবটা ছিল অন্যরকম। অদ্ভুত এবং এমন একটা কিছু যেটা আমার ধারণার বাইরে। অনেকটা স্টার ওয়ার্স-এর মতো। কোনোভাবে আপনি যদি একবার স্টার ওয়ার্স দেখা শুরু করেন তাহলে আপনি সেটা থেকে বের হতে পারবেন না। প্রথমে আপনাকে চতুর্থ পর্ব দেখতে হবে এবং তারপর আপনি পুরোপুরি বিষয়টার মধ্যে ঢুকে যাবেন এবং আপনার নিজের ওপর কোনো কন্ট্রোল থাকবে না। আমি খুবই আপসেট কারণ আমি কাজটা আমার কলিজার সাথে করি নি। কিন্তু তাতে আমার খুব বেশ দোষ নেই জানেন? আমি তখন অনেক ছোট ছিলাম এবং মাত্র মুভিজগৎ ডিসকভার করছিলাম। এমনকি পার্ফিয়ুম কিংবা ফরেস্ট গাম্পের মতো মুভিকে আমার ফেভারিট মুভি মনে করছিলাম। সে সময় আসলে কতোটা নেয়া যায়?

বার্লিনের ক্লাবটায় ফিরে আসি। আমাদের ইলমিনাউয়ে কয়েকটা ক্লাব আছে। ক্যাম্পাসে আছে চারটা স্টুডেন্ট ক্লাব। ইলমিনাউয়ের ক্লাবগুলোকে আমি আসলে বিয়ার শপ হিসেবে দেখি। আসল ক্লাব না। আসল ক্লাব পেতে চাইলে যেতে হবে বড় শহরে। বার্লিনে যে ক্লাবটায় আমি গিয়েছিলাম সেটার নাম হচ্ছে ট্রেজর। ক্লাবটায় প্রথমে আমাকে ঢুকতে দিতে চাচ্ছিল না। এটা হয়। যদি আপনি ড্রাংক অবস্থায় কোনো ক্লাবে ঢোকার চেষ্টা করেন। ওরা প্রথমে আপনাকে ঢুকতে দেবে না, কিন্তু আপনার কিছু একটা করতে হবে যাতে ওরা বুঝতে পারে আপনাকে।

পোস্টটি ২ জন ব্লগার পছন্দ করেছেন

মন্তব্য করুন

(আপনার প্রদান কৃত তথ্য কখনোই প্রকাশ করা হবেনা অথবা অন্য কোন মাধ্যমে শেয়ার করা হবেনা।)
ইমোটিকন
:):D:bigsmile:;):p:O:|:(:~:((8):steve:J):glasses::party::love:
  • Web page addresses and e-mail addresses turn into links automatically.
  • Allowed HTML tags: <a> <em> <strong> <cite> <code> <ul> <ol> <li> <dl> <dt> <dd> <img> <b> <u> <i> <br /> <p> <blockquote>
  • Lines and paragraphs break automatically.
  • Textual smileys will be replaced with graphical ones.

পোস্ট সাজাতে বাড়তি সুবিধাদি - ফর্মেটিং অপশন।

CAPTCHA
This question is for testing whether you are a human visitor and to prevent automated spam submissions.

বন্ধুর কথা

মীর's picture

নিজের সম্পর্কে

স্বাগতম। আমার নাম মীর রাকীব-উন-নবী। জীবিকার তাগিদে পরবাসী। মাঝে মাঝে টুকটাক গল্প-কবিতা-আত্মজীবনী ইত্যাদি লিখি। সেসব প্রধানত এই ব্লগেই প্রকাশ করে থাকি। এই ব্লগে আমার সব লেখার কপিরাইট আমার নিজেরই। অনুগ্রহ করে সূ্ত্র উল্লেখ না করে লেখাগুলো কেউ ব্যবহার করবেন না। যেকোন যোগাযোগের জন্য ই-মেইল করুন: bd.mir13@gmail.com.
ধন্যবাদ। হ্যাপি রিডিং!