ইউজার লগইন

কাকতালের পৃথিবী: অগভীরতা যখন সকলের আরাধ্য

১.
সৌন্দর্য্য এমন একটা বিষয় যেটার প্রতি পৃথিবীর সব মানুষের একটা আকণ্ঠ তৃষ্ণা রয়েছে। অথচ সৌন্দর্য্য বিচার করার স্বাভাবিক ক্ষমতা কিন্তু তাদের বেশিরভাগেরই নেই। সাধারণত আমরা চেহারার বৈশিষ্ট্য যেমন চোখ, মুখ ও নাকের আয়তনিক গড়ন, চুলের রং, দৈর্ঘ্য ও ঘনত্ব, শরীরের বলিষ্ঠতা ও রং-এর মতো কিছু বিষয়কে সৌন্দর্য্যের মূল প্রতিনিধি মনে করি এবং সেগুলোর উৎকর্ষকেই কেবলমাত্র গুরুত্ব দিই। এই বিচারে পৃথিবীর তাবত খাটো, কালো, নাকবোঁচা, টাকমাথা, ভুরিওয়ালা, দৃশ্যমান জায়গায় জন্মদাগ কিংবা জরুল সমৃদ্ধ সবাই বাদ পড়ে যায়।

অথচ একবার ভেবে দেখুন উল্লিখিত ওই চেহারার বৈশিষ্ট্যগুলোর কোনো একটিরও কি প্রকৃত কোন মূল্য রয়েছে? তারপরও আমাকে যদি উপরোক্ত বৈশিষ্ট্যসমূহে সমৃদ্ধ, কিন্তু মানসিকভাবে "দৈন্য" কোনো ব্যক্তির সঙ্গে সম্পূর্ণ বিপরীতধর্মী কারও তুলনা করে, একজনকে সঙ্গী হিসাবে বেছে নিতে বলা হয়, তাহলে আমি অবশ্যই দ্বিধায় পড়ে যাবো।

দ্বিধা কাটিয়ে শেষ পর্যন্ত আমি যে বিপরীতধর্মী ব্যাক্তিকেই বেছে নেবো জানি, তবে প্রথমে যে দ্বিধা দেখা দেবে সেটাও মিথ্যে না।

এটা কি বিবর্তনের ফসল? মনে হচ্ছে বিবর্তনের ওপর লেখা বইগুলো আবার পড়া শুরু করতে হবে। ইদানীং জানার ইচ্ছে বৃদ্ধি পেয়েছে কয়েকগুণ। সমগ্র পৃথিবীর ভর কতো- কে জানেন? প্রশ্নটার উত্তর কিন্তু 'আজ রবিবার' নাটকে দেয়া হয়েছিল। একদম শুরুতে। পৃথিবীর ভর হচ্ছে পাঁচ দশমিক নয় গুণ দশের বর্গ চব্বিশ কিলোগ্রাম।

আমার ছেলেবেলাটা খুব আকর্ষণীয় ছিল। সে সময়ের কৌতূহলী আমার দ্বারা কত ভুল-ত্রুটি হয়েছে তার ইয়ত্তা নেই। কিন্তু আশপাশের মানুষেরা সর্বদাই সাহায্যের হাত বাড়িয়ে রেখেছিল। এখন সে ব্যবস্থাটা উল্টে গেছে। তাই মাঝে মাঝে ভাবি পুরোনো সেই দিনগুলো মহাবিশ্বের এ সম্প্রসারণশীল স্থান ও কালের চাদরে কতোটা পেছনে পড়ে আছে? কিভাবে আর একবার ঘুরে আসতে পারবো সে সময়টা থেকে?

প্রযুক্তির উন্নতি, প্রযুক্তির উন্নতি চারিদিকে, প্রযুক্তির উন্নতিতে ভেসে যাচ্ছে সবকিছু- কত কথাই তো শুনি সারাদিন। পঞ্চাশের বিধ্বস্ত দশক, ষাটের রিফর্মেশন, তারপরের দক্ষিণী কার্টেলদের যুগ, মাইক্রোসফট-ম্যাকিন্টশের যুগ, ইয়াহু, গুগল, নকিয়া-স্যামসাং, ফেসবুক, আইফোন, স্টিভ, বিল, জেফ, মার্ক, ইলন, রকেট সায়েন্স- সব পাড়ি দিয়ে আজো নাকি ওই শিখরে 'উন্নতি'র ঝান্ডাই উড়ছে?

তাই যদি হয়, তবে কি 'উন্নতি' আমাদের একদিন সময় পরিভ্রমণ করে অতীত আর ভবিষ্যতে ঘুরে বেড়ানোর সুযোগ করে দিতে পারবে? বিজ্ঞান কিন্তু সরাসরি প্রশ্নটার উত্তর দেয় না। সম্ভাব্যতা জানায়। এই জায়গায় এসে ধর্ম আর বিজ্ঞানের একটা মিল দেখতে পাই। ধর্মগুলোর আর আপডেট হওয়ার সুযোগ নেই। নাহলে লড়াইয়ে টিকে থাকার আর সব উপাদানই তার ছিল।

যাক সেসব বড় বড় ভাবের কথা। আদার ব্যাপারির জাহাজের খবর রেখে লাভই বা কি?

২.
আমি মানুষের সৌন্দর্য্য খুঁজে খুঁজে দেখি কারণ এর ভেতর এক অদ্ভুত দ্বিমুখী এক মজা আছে। বাহ্যিক সৌন্দর্য্যের কথা বলছি না। কেউ হয়তো বাহির থেকে আর দশজনের মতে 'অসুন্দর', কিন্তু একসাথে সময় কাটালে বোঝা যায়, তার ভেতর কোমল একটা মন আছে। অনেক সময় পাওয়া যায় আরো চমৎকার সব মানবীয় গুণের দেখা। কেউ হয়তো আজীবন চুপে চুপে নিজেকে বিলিয়ে দিয়ে যাচ্ছেন অন্যের তরে অকাতরে। তার কমর্কান্ড দেখলে অজান্তেই চোখের কোণে পানি চলে আসে। কিংবা কেউ হয়তো সারাক্ষণই মজার মজার সব কান্ডকারখানা চলেছেন মাথার ভেতরে, সেই মানুষটার আশপাশে থাকার মধ্যেও এক অন্য রকমের মজা আছে! আবার অনেকে হন দীঘির জলের মতো শান্ত প্রকৃতির মানুষ। অমন মানুষের পায়ের কাছে ঠাঁয় বসে থাকার ভেতরেও মানুষের অনেক অধরা শান্তি লুকিয়ে আছে।

তবে মানবচরিত্রের এসব মণি-মুক্তা আবিস্কার করতে চাইলে বাহ্যিকতা পরিহার করে একটা মানুষের ভেতরে উঁকি দিয়ে দেখতে হয়। পৃথিবীর প্রতিটি মানুষের ভেতরেই তার নিজস্ব বৈশিষ্ট্য রয়েছে, যা এক ও অদ্বিতীয়। আর কারো সঙ্গে মেলে না। সে বৈশিষ্ট্যগুলোর দেখা পেতে চাইলে সময় নিয়ে নিজেকে নিবেদন করতে হয়। বিনিময়ে কোন কিছু পাওয়ার আশা বাদ দিয়ে। কাজটা কঠিন না, তবে ধৈর্য, শ্রম ও সময়-সাপেক্ষ।

মানুষের সেদিকে আগ্রহ কম। আজকাল সবকিছু 'ধর তক্তা, মার পেরেক' টাইপ হয়ে গিয়েছে। সবাই ছুটছে চাকচিক্য, বস্তুগত প্রাপ্তি আর বাহ্যিক সৌন্দর্য্যের পেছনে। অন্যের কিংবা এমনকি নিজের জন্যও, আমরা আজকাল আর 'সলিড' কিছু খুঁজি না! অগভীরতাই যেন আজকাল সকলের আরাধ্য। যতোদিনে মানুষ আসল বিষয়টা বুঝতে পারছে, ততোদিনে অনেক দেরি হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু কারোরই কিছু করার নেই। কারণ মানুষের মনের মতো জটিল আর কোনোকিছুই হতে পারে না। সব জেনে বুঝেও সে বারবার আগুনে ঝাপ দিতে চায়। তাকে কেউ ঠেকাতে পারে না।

৩.
পুরোনো সিনেমাগুলো রিভিশন দিলাম কয়েকদিন। ইনসেপশনটা দ্বিতীয়বার দেখে প্রথমবারের চেয়েও ভালো লাগলো। কেন কে জানে? অবাস্তব গল্প একটা পুরাই। তারপরও জাস্ট হা করে পুরো সিনেমাটা গিলে ফেললাম!

কলাম্বিয়ার মাদকসম্রাট পাবলো এস্কোবারকে প্রথম সীজনে ধরতে পারে নি ডিইএ'র চৌকস গোয়েন্দারা। পরের সীজনে কি হবে বুঝতে পারছি না। ভাল সম্ভাবনা আছে বেশি টানতে গিয়ে গল্পটাকে বোরিং বানিয়ে ফেলার। তারপরও নারকোস্-এর পরের সীজনের জন্য অপেক্ষা করছি। দেশে নেটফ্লিক্স চালু হয়েছে জেনে হালকা আনন্দ পেয়েছি, কিন্তু আমার মনে হয় না মানুষ ভারতীয় রদ্দি সিরিয়ালের নেশা থেকে সহজে বের হতে পারবে।

তুষার ঝরলো কয়েকদিন তুমুলবেগে। এখন সবকিছু এক হাঁটু বরফের নিচে ডুবে আছে। গভীর রাতে বরফের বুকে পায়ের ছাপ ফেলে ফেলে হাঁটতে অদ্ভুত লাগে। তুষারকণাদের মতো কোমল জিনিস পৃথিবীতে কমই আছে। আমি যে মানুষটাকে একসময় ভালবেসেছিলাম, তার হাতের কাছাকাছি মাত্রার কোমল। তুষারকণার সাথে সেই মানুষটার হাতের আরেকটা মিল আছে। ধরে রাখলে দু'টোই অল্প কিছুক্ষণের মধ্যে আপনার হাতের মুঠো ভিজিয়ে দেবে।

৪.
আমাদের ক্যাম্পাসের ক্যাফেটেরিয়ায় একেকদিন একেক রকম খাবার রান্না হয়। আর প্রতিদিন ছয়-পাঁচ রকমের খাবার থাকে। যার যেমন খেতে ইচ্ছে, সে তেমন খাবার লাইনে দাঁড়িয়ে সংগ্রহ করে। আমি যেসব দিন ক্যাফেটেরিয়ায় যাই, দেখা যাবে বেছে বেছে সেসব দিনই পৃথিবীর যতো খারাপ খাবার আছে, রান্না করা অবস্থায় রাখা থাকে। কো-ইনসিডেন্স নিশ্চই।

পৃথিবী ভরে আছে কো-ইনসিডেন্সে। সেদিন লাইব্রেরীর লবিতে বসে ফেসবুক চালাচ্ছি, একটু আগে ক্যাফেটেরিয়া থেকে মোৎজারেলা স্টিক আর পাস্তা দিয়ে লাঞ্চ সেরে এসেছি; কিন্তু ভুল করে পানির বোতল নিয়ে বের হওয়া হয় নি। পকেটের অবস্থা সঙ্গিন বলে মেশিন থেকে পানির বোতলও কিনছিলাম না কিন্তু পানির পিপাসা পেয়েছিল ভালোই। এমন সময় দেখি বাইরে জিমি দাঁড়িয়ে আছে। হাতে ছয় বোতল পানি। দোকান থেকে কেনা। সম্ভবত সারা সপ্তাহের জন্য। সে আমাকে বাইরে থেকে দেখে, কাঁচের দেয়ালে নক করছিল। ওর বোতলের সংখ্যা দেখেই মন ভালো হয়ে গেল। বের হয়ে তাড়াতাড়ি একটা রেখে দিলাম।

আমাদের করিডোরে নতুন একটা ছেলে এসেছে। নাম সাইফেদ্দিন। বাড়ি মরোক্কো। ছেলেটা সারাদিন হাসে। দেখা হলেই হাসিমুখ। কি খবর, কেমন চলছে দিনকাল, পড়াশোনা কেমন হচ্ছে, ইত্যাদি প্রশ্ন। আমিও অবশ্য হাসাহাসি পছন্দ করি। ওর প্রথাগত প্রশ্নের জবাব শেষে শুরু হয় আমার প্রথাবিরোধী আলাপ, যার বেশিরভাগই সেক্স, নারীদেহ ইত্যাদি সংক্রান্ত। ফলে অবধারিতভাবেই হাসতে হাসতে অবস্থা খারাপ হয়ে যায় একেকজনের। আমি মাঝে মাঝে ভাবি, এতো যে হাসি সেজন্য কি ভবিষ্যতে পস্তাতে হবে? যতো হাসি ততো কান্না?
---

পোস্টটি ১৮ জন ব্লগার পছন্দ করেছেন

টুটুল's picture


এখনতো খুদাপেজ বলারও কেউ নাই... সব্বাই যার যার মত বিজি Smile

মীর's picture


কথা ঠিক টুটুল ভাই, তবে বিজি থাকাও ভালো Wink
অলস মস্তিষ্ক শয়তানের কারখানা Crazy Crazy

শারমিন's picture


সিরিয়াসলি পড়লাম।

মীর's picture


সিরিয়াসলি থ্যাংকস্ কোক

মন্তব্য করুন

(আপনার প্রদান কৃত তথ্য কখনোই প্রকাশ করা হবেনা অথবা অন্য কোন মাধ্যমে শেয়ার করা হবেনা।)
ইমোটিকন
:):D:bigsmile:;):p:O:|:(:~:((8):steve:J):glasses::party::love:
  • Web page addresses and e-mail addresses turn into links automatically.
  • Allowed HTML tags: <a> <em> <strong> <cite> <code> <ul> <ol> <li> <dl> <dt> <dd> <img> <b> <u> <i> <br /> <p> <blockquote>
  • Lines and paragraphs break automatically.
  • Textual smileys will be replaced with graphical ones.

পোস্ট সাজাতে বাড়তি সুবিধাদি - ফর্মেটিং অপশন।

CAPTCHA
This question is for testing whether you are a human visitor and to prevent automated spam submissions.

বন্ধুর কথা

মীর's picture

নিজের সম্পর্কে

স্বাগতম। আমার নাম মীর রাকীব-উন-নবী। জীবিকার তাগিদে পরবাসী। মাঝে মাঝে টুকটাক গল্প-কবিতা-আত্মজীবনী ইত্যাদি লিখি। সেসব প্রধানত এই ব্লগেই প্রকাশ করে থাকি। এই ব্লগে আমার সব লেখার কপিরাইট আমার নিজেরই। অনুগ্রহ করে সূ্ত্র উল্লেখ না করে লেখাগুলো কেউ ব্যবহার করবেন না। যেকোন যোগাযোগের জন্য ই-মেইল করুন: bd.mir13@gmail.com.
ধন্যবাদ। হ্যাপি রিডিং!