ইউজার লগইন

নিজেদেরকে স্তব্ধ হয়ে যেতে দেয়ার ক্ষমতা আছে কেবল আমাদেরই

পথভ্রষ্ট কিছু মানুষ আর ভ্রান্ত কিছু ধারণা মানুষের পর মানুষের জীবন কেড়ে নিচ্ছে। গুলশান ট্র্যাজেডীর রেশ কাটতে না কাটতেই শোলাকিয়ায় হামলা হলো। প্রতিটি ঘটনায় এমন সব মানুষের মৃত্যু হচ্ছে, যারা শেষ মুহূর্তের আগ পর্যন্তও জানতো না, সময় শেষ হয়ে এসেছে।

সন্ত্রাসবাদ এখন পৃথিবীর সবচেয়ে আলোচিত ইস্যুগুলোর একটি। সমস্যার কারণ হিসেবে কতজন, কতোই না সমীকরণ দেখাচ্ছে। আমি শুধু দেখতে পাচ্ছি সমীকরণের আড়ালে চাপা পড়ে থাকছে মানুষের মরদেহ। নির্মমভাবে পৃথিবী ছেড়ে চলে যেতে হওয়ার হতাশার ছাপ স্থায়ীভাবে পড়ে যাওয়া মুখের মরদেহ। তাদের স্বজনদের বিহ্বল দৃষ্টি। অসহায়ের মতো নিজের জন্মদাত্রীকেকে মরে যেতে দেখা সেই যুবক কি তার চোখ দিয়ে পৃথিবীর কোনো রং আর কখনও দেখতে পাবে? আর কি কখনও তার পক্ষে মন খুলে হাসা সম্ভব হবে? আর কি কখনও সে পারবে ভালবেসে কারও জন্য হৃদয়ের আগল খুলে দিতে?

আমরা কোথায় যাচ্ছি? সবাই মিলে আমরা আসলে যাচ্ছি কোথায়? কিসের আশায় আমরা বালুকাবেলায় প্রাসাদ গড়ছি? একের পর এক ট্রমা আমাদেরকে নিশ্চল করে করে আসলে শেষ পর্যন্ত কি অর্জন করতে চায়? প্রকৃতি কখনও অপরিকল্পিতভাবে তো কিছু করে না।

খারাপ লাগছে ভীষণ। প্রিয় বাংলাদেশের অস্থিরমতি মানুষগুলো যারা আমারই স্বজন, আমারই স্বদেশি, আমারই সবচেয়ে আপনজন; তাদের জন্য এক ধরনের অব্যক্ত যন্ত্রণা অনুভব করছি। এরচেয়ে বেশি যন্ত্রণা আমি আমার জীবদ্দশায় আর কোনো কিছুর জন্য অনুভব করি নি। ঘরে, বাইরে কোথাও আমার প্রিয় মানুষগুলোর জীবনের নূন্যতম নিরাপত্তাটুকু নেই। কোথাও নেই একফোঁটা ভালবাসা অপেক্ষা করে কারও জন্য।

জীবনের কষাঘাতে জর্জরিত এক শ্রেণীর মানুষ এই ঘটনাক্রমের মধ্য দিয়ে যেতে যেতে চিন্তাশক্তিহীন নিম্নস্তরের বুদ্ধিজীবী প্রাণীতে পরিণত হয়েছে। উচ্চস্তরের বুদ্ধিজীবী প্রাণীদের সঙ্গে এ ধরনের ঘটনা ঘটাকে বলা হয় মতিভ্রম। মতিভ্রষ্ট সেই শ্রেণী এই মুহূর্তে কাউকে মাথায় তুলে নাচতে যেমন দুইবার ভাবছে না, পরের মুহূর্তেই তাকে আছড়ে মাটিতে ফেলতেও দ্বিধা করছে না। তারা পুরো পরিবেশটায় দ্বিধা আর বিভক্তি ছড়ানো ছাড়া আর কোনো বিশেষ কাজে আসছে না। তবে নিজেদের নির্বুদ্ধিতার স্বরূপ জনসমক্ষে উন্মোচন করে নিজেদেরকে তো ভালনারেবল করে তুলছে তুলছেই, সেই সাথে চিড় ধরাচ্ছে সমাজের যে অংশটুকুর মধ্যে এখনও চিন্তার ক্ষমতা বিদ্যমান তাদের আত্মবিশ্বাসেও।

একটা বিশাল যুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে আরও একবার। পৃথিবীটা এখন আর আগের মতো সরল নেই। তাই এই যুদ্ধের প্রতিপক্ষও একরৈখিক নয়। এক পক্ষকে কাবু করে আনতে আনতে অন্য আরেক পক্ষ ময়দানে আবির্ভূত হচ্ছে। অপেক্ষাকৃত ভয়াবহ চেহারা নিয়ে। এ যেন গ্রীক পুরাণের সেই সাতমাথার জলদানব হাইড্রা। এক মাথা কেটে আরেক মাথার দিকে অগ্রসর হতে যাওয়ার মাঝের সময়টুকুতেই কেটে ফেলা ঘাড় থেকে আবার গজাচ্ছে এক নতুন মাথা।

যুদ্ধটা আমাদেরকে লড়তে হবে ওদের মতো করেই। ওদেরকে দেখে যেমন মস্তিষ্ক প্রক্ষালক যন্ত্রের মধ্য দিয়ে আসা বোধবুদ্ধিহীন জড় মাংসপিণ্ড মনে হয়, আমাদেরকে দেখেও ঠিক তেমনি বোধসম্পন্ন, মানবিক, প্রাণশক্তিতে ভরপুর, অকুতোভয় সৈনিক মনে হতে হবে। আমাদেরকে দেখে যেন হতোদ্যম মনে না হয়। হতাশ এবং ভেঙ্গে পড়া সৈন্যবাহিনীর মতো যেন না দেখায়। এই অবস্থা অর্জনের জন্য আমাদের সবাইকে মূলত; যে যা করছি, তাই করে যেতে হবে; তবে আগে যতোটুকু করতাম, তার চেয়ে অনেক গুণ বেশি ইফোর্টের সাথে। প্রতিপক্ষের আমাদের ক্ষতি করার ক্ষমতা নেই, যদি না আমরা নিজেরাই নিজেদেরকে ক্ষতিগ্রস্থ হিসেবে তুলে ধরি। শোককে পরিণত করতে হবে শক্তিতে। অমানুষের মতো পরিশ্রম করে অর্থনীতি, শিক্ষা, সংস্কৃতি, শুভবুদ্ধির চর্চা, মুক্তচিন্তা আর ভালবাসার চাকায় সঞ্চার করতে হবে ইতিহাসের সর্বোচ্চ বেগ।

প্রিয় স্বদেশ আজ তার সন্তানদের কাছে এটাই চায়। তার সৈনিকেরা লড়াই করুক যুদ্ধের ময়দানে, তার মাটি আরও একবার রঞ্জিত হোক বীর সন্তানদের রক্তে, তার শিল্পীরা তুলি হাতে ছড়িয়ে পড়ুক দিকে দিকে, শ্রমিকেরা কারখানায় পাগলের মতো কাজ করুক, সাধারণ মানুষ ভুলে যাক তাদের অতীত সাধারণ জীবনের কথা। এটা একটা যুদ্ধাবস্থা। এই অবস্থাকে জয় করার একমাত্র উপায় হলো, প্রতিপক্ষ আমাদের যেটা বানাতে চায়, সেটা না হওয়া।

ওরা আমার কণ্ঠ রুদ্ধ করে দিতে চায়। শুধুমাত্র এ কারণেই আমাকে আজ আগের চেয়ে অনেক বেশি জোরে গলা ফাটিয়ে নিজেকে জানান দিতে হবে। ওরা আমার লেখার অধিকার কেড়ে নিতে চায়, তাই আমায় আজ আগের যেকোন সময়ের চেয়ে বেশি করে লিখতে হবে। ওরা আমার দেশের অগ্রগতির সবগুলো সূচককে স্থবির করে দিতে চায়। আমার দেশের সব পেশাজীবীকে তাই আজ নিজের পেশায় যুদ্ধংদেহী মনোভাব নিয়ে কাজ করতে হবে। ঠিক যেভাবে সৈন্যরা মাঠে-ময়দানে যুদ্ধ করে প্রাণ দিচ্ছে, সেভাবে অন্যরা যারা এই যুদ্ধে দেশের পক্ষ থাকতে চায়, তাদেরকে নিজ নিজ কর্মক্ষেত্রে মন-প্রাণ ঢেলে দিতে হবে।

এক সময় যুদ্ধ ছিল সরল। আমাদের পূর্বপুরুষেরা হাতের কাছে যে যা পেয়েছে, তাই নিয়ে একটা সিস্টেমিক সৈন্যবাহিনীকে রুখে দিয়েছিল এ দেশটা দখল করে ফেলা থেকে। এখন সময়টা হয়ে গেছে কঠিন। প্রযুক্তির উন্নতি এর মূল কারণ। তাই এখন সব ফেলে গেরিলা ট্রেনিং নিয়ে সবার মাঠে নেমে পড়ার সময় নয়। সেটা বরং দীর্ঘমেয়াদে আমাদের বিপদই বাড়াবে কেবল। এখন সময় নতুন করে ভাবার। যুদ্ধ জয়ই এখন একমাত্র লক্ষ্য নয়। ওয়ান্স অ্যান্ড ফর অল, যুদ্ধগুলোকে কবরচাপা দেয়াটাও এখন সমান গুরুত্বপূর্ণ একটি লক্ষ্য।

মনে রাখতে হবে, যারা কাজ করে, ভুল তাদেরই হয়। যারা কাজ করে না, তাদের কিন্তু ভুলও হয় না। তাই ভুলের ভয়ে কাজ করা থেকে, এই যুদ্ধে অংশগ্রহণ করা থেকে বিরত থাকা চলবে না কারোই। মতিভ্রষ্টরা কী-বোর্ড আর চায়ের কাপে ঝড় তুলে নিজের চারপাশ অন্ধকার করে রাখুক। শুধু নিশ্চিত করতে হবে, তারা যেন আমার অমূল্য সময় আর মনোযোগের নাগাল না পায়। মনে রাখতে হবে আরও, দেশের পক্ষে থেকে ভুল-ভাল করে ফেললেও অসুবিধা নেই। সবসময়ই বেশি বেশি কাজ করে সেসব চাপা দিয়ে দেয়ার সুযোগ খোলা আছে সবার সামনে।

আমরা সবাই মিলে যদি নিজের নিজের জায়গায় আরও বেশি পরিশ্রম দিই, দিনশেষে ঘরে ফিরে নিজের বেঁচে থাকাটাকে উদযাপন করি, আর নিজের ভেতর পরের দিন আবার নিজেকে লড়াইয়ের ক্ষেত্রে আরও তেজ সহকারে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়ার উদ্দীপনার জন্ম দিতে পারি; তাহলে মন হয় না আমাদের কোনো সংসদ ভবনজীবী কৌতুকাভিনেতাগোষ্ঠীর মুখের পানে চেয়ে অপেক্ষা করে দিনশেষে হতাশ হতে হবে। তাদেরকেও তাদের মতো থাকতে দিই। তারা আরও লেইম লেইম কৌতুক নিয়ে দেশ ও জাতির সামনে হাজির হওয়া চালু রাখুক। মাস্টার করুক সেটায় তারা। আমরা নিজেদের বাঙালি জীবনে মাস্টার করি। যেন ভুলে না যাই, নিজেদেরকে স্তব্ধ হয়ে যেতে দেয়ার ক্ষমতা আছে কেবল আমাদেরই।

---

পোস্টটি ৯ জন ব্লগার পছন্দ করেছেন

মন্তব্য করুন

(আপনার প্রদান কৃত তথ্য কখনোই প্রকাশ করা হবেনা অথবা অন্য কোন মাধ্যমে শেয়ার করা হবেনা।)
ইমোটিকন
:):D:bigsmile:;):p:O:|:(:~:((8):steve:J):glasses::party::love:
  • Web page addresses and e-mail addresses turn into links automatically.
  • Allowed HTML tags: <a> <em> <strong> <cite> <code> <ul> <ol> <li> <dl> <dt> <dd> <img> <b> <u> <i> <br /> <p> <blockquote>
  • Lines and paragraphs break automatically.
  • Textual smileys will be replaced with graphical ones.

পোস্ট সাজাতে বাড়তি সুবিধাদি - ফর্মেটিং অপশন।

CAPTCHA
This question is for testing whether you are a human visitor and to prevent automated spam submissions.

বন্ধুর কথা

মীর's picture

নিজের সম্পর্কে

স্বাগতম। আমার নাম মীর রাকীব-উন-নবী। জীবিকার তাগিদে পরবাসী। মাঝে মাঝে টুকটাক গল্প-কবিতা-আত্মজীবনী ইত্যাদি লিখি। সেসব প্রধানত এই ব্লগেই প্রকাশ করে থাকি। এই ব্লগে আমার সব লেখার কপিরাইট আমার নিজেরই। অনুগ্রহ করে সূ্ত্র উল্লেখ না করে লেখাগুলো কেউ ব্যবহার করবেন না। যেকোন যোগাযোগের জন্য ই-মেইল করুন: bd.mir13@gmail.com.
ধন্যবাদ। হ্যাপি রিডিং!