উইকেন্ডের গল্প
১.
এখন প্রতিদিন বেলা তিনটা থেকে রাত সাড়ে এগারোটা পর্যন্ত কাজ করি। মাঝখানে দুইটা ছোট ছোট ব্রেক। জার্মান ভাষায় বলে পাউজে। প্রথমে একটা ২৫ মিনিটের পাউজে, টানা চার ঘন্টা কাজ করার পর। তারপর একটা ২০ মিনিটের পাউজে। প্রথম পাউজের ঠিক আড়াই ঘন্টা পাঁচ মিনিট পর। প্রথম চার ঘন্টা টানা কাজ করাটাই বড় চ্যালেঞ্জ। বিশেষ করে সোমবারগুলোতে। মঙ্গল-বুধবারের দিকে অতোটা ক্লান্তি লাগে না, যতোটা লাগে সোমবারে। কারণ শনি-রবি দুইদিনের ছুটি শরীরটাকে অলস বানিয়ে দেয় ভালোভাবেই। আর যদি উইকেন্ডগুলোতে হানা দেয় বন্ধুরা, তাহলে তো সেরের ওপর সোয়া সের। সেই উইকেন্ডের পরের সোমবারটার মতো দুর্যোগ আর হয় না।
এই সোমবারে আমার অবস্থা হয়েছিল লিটারেলি- 'আম্মুউউউ বাসায় যাবো, হুহুহু'। একেকটা মিনিটকে মনে হচ্ছিল ৫০ কেজি ওজনের বাটখারা। ঠেলে সরানো যায় না। পরের মিনিটটাও আর আসার সুযোগ পায় না। উইল স্মিথের আই অ্যাম লিজেন্ড সিনেমার জম্বিদের মতো অবস্থা পুরাই। ইথিওপিয়ার ডাগ আর নাইজেরিয়ার আবদুল আমাকে দেখে দুর থেকে দুলে দুলে হাসছিল। আর যেসব 'হটি'দেরকে দেখলে আমাদের সবারই বুকে অল্পবিস্তর কম্পন সৃষ্টি হয়, তাদেরকে ডেকে ডেকে আঙুল তুলে আমার অবস্থা দেখাচ্ছিল। বন্ধুবান্ধব মহা-ত্যাদোঁড় টাইপ হলে যা হয় আরকি। অথচ আমি যে তাদের দিকে দাঁতে দাঁত পিষতে পিষতে ছুটে যাবো, তারও কোনো উপায় ছিল না। তারপর যখন এক সময় সাড়ে এগারোটা বাজলো, তখন হঠাৎ করে শরীরটা পাখির মতো হালকা হয়ে গেল। মনে হচ্ছিল, এখন আমি হারিয়ে যাবো ফুল বাগানে, করবে না কেউ মানা।
২.
গত বৃহস্পতিবার যখন কাজে ঢুকছিলাম, তখন দিনটা ছিল মেঘলা। তাপমাত্রার কাঁটা ওঠা-নামা করছিল মাইনাস তিন থেকে দুই ডিগ্রির মধ্যে। আমার সাধারণত ঠান্ডা একটু কমই লাগে। ঠান্ডা আমার মুডটাকেও লো বানিয়ে দেয়। সেটা চাইছিলাম না বলেই ম্যান্টিল, মাফলার, হাতমোজা ইত্যাদিতে চারিদিক কভার করে স্ট্রমট্রুপার হয়ে বের হয়েছিলাম। তবে কাজ হয় নি একরত্তিও। যখন গেটে কার্ড পাঞ্চ করে অফিসে ঢুকলাম, তখন খেয়াল করে দেখলাম মেজাজের মিটার নেমে গেছে মাইনাসের ২৫ ডিগ্রি নিচে। এখন কেউ আমাকে শিবরামের গল্প পড়ে শোনালেও হাসি আসবে না। বরং কুতকুতে চোখে তার দিকে তাকিয়ে বোঝার চেষ্টা করবো, ঘটনাটা কি? কেন ইনি আমাকে শিবরামের গল্প শোনাচ্ছেন?
জাস্ট কিডিং। তবে এটা ঠিক যে, আসলেই কেন যেন কিছুই ভাল লাগছিল না। টানা চারদিন কাজ করার কারণে অমনটা হয়ে থাকতে পারে। ব্রাইট সাইডে চারদিনের কাজের পেমেন্ট যোগ হয়েছে- ভেবে নিজেই নিজেকে চিয়ার আপ করার চেষ্টা করলাম। লাভ হলো না। সর্বশেষ অস্ত্র হিসেবে- এভাবে কাজ করতে থাকলে মাসে বাংলাদেশি টাকায় দেড় লাখ করে করে আয় হবে, ভেবে খুব একটু আমোদ লাভের চেষ্টা চালালাম। বিরক্তি বাড়লো বই কমলো না। নিজেকে প্যাথেটিক প্যাথেটিক লাগা শুরু হয়ে যাওয়ার আগেই তাড়াতাড়ি একটা স্ক্যানার খুঁজে, নিজের ব্যাজটা স্ক্যান করে ফেললাম। সাথে সাথেই ওখানে কাজের ইন্সট্রাকশন ভেসে উঠলো। চারতলায় গিয়ে প্রথমে একটা ব্লেন্ডার পিক করতে হবে। নিজেকে নিজেই বললাম, যাক শুরুটা অন্তত খারাপ হয় নি। প্লাস্টিকের পুরুষাঙ্গ তো পিক করতে বলে নি।
৩.
চারঘন্টা শেষে যখন প্রথম পাউজের জন্য বের হয়ে আসলাম, তখন নিজেকে মনে হচ্ছিল একগাদা মাছি দিয়ে ঘেরা একটা জন্তু। যে মাছিগুলোর ওপর এতো বিরক্ত যে, আশপাশে আসলে কি ঘটছে সেদিকে নজর দেয়ারও সুযোগ পাচ্ছে না।
লকার থেকে টিফিন বক্সটা বের করে দেখলাম সেখানে দুই স্লাইস্ শুকনা পিৎজা পড়ে আছে। আবার একবার পিৎজা-জীবন শুরু হয়েছে লাইপছিশে আসার পর। রেডি কিংবা ফ্রোজেন ফুড ছাড়া আর কিছু খাচ্ছি না একদমই। রান্না-বান্না, ধোয়ামোছার ঝামেলায় যেতে ইচ্ছে করে না মোটেও।
পিৎজায় কামড় দিতে দিতে মুঠোফোনে এদিক-ওদিক টেপাটেপি করছিলাম। হোয়াটস্অ্যাপ জানালো প্রচুর সংখ্যক নতুন টেক্সট এসেছে। খুলে দেখি বেশিরভাগই গ্রুপ ম্যাসেজ। ওইসব পড়ার মতো সময় বা ইচ্ছে কোনোটাই ছিল না। ইরাবতী ডলফিনের ম্যাসেজটা খুললাম। প্রথমে লিখেছে, ওই তোমার উইকেন্ডের প্ল্যান কি? তারপর লিখেছে, প্ল্যান যাই হোক সেটার সাথে আমাকে যোগ করে নাও। সবশেষে লিখেছে, নাহলে খবর আছে।
আমি এক মুহূর্ত দেরি না করে লিখে পাঠালাম, নোওওও। পুরো সপ্তাহ কাজ করে আমি প্রচণ্ড ক্লান্ত। উইকেন্ড কাটবে সলিড ঘুমে। তুমি অন্য কোনো দিকে ফ্লাই করো। তারপর ফোনটা বন্ধ করে লকারে ঢুকিয়ে আবার কাজে চলে গিয়েছিলাম।
সেদিন কাজ শেষ বের হওয়ার পর মনেই ছিল না যে ফোন বন্ধ ছিল। বাসায় এসে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম জাস্ট চাবি দিয়ে দরোজার তালা, আর বিছানায় বসে পায়ের জুতা খুলে। সকালে উঠে মনে পড়লো, ফোন বন্ধ প্রায় ১৪-১৫ ঘন্টা।
যা ধারণা করেছিলাম, তাই। ক্ষুব্ধ ইরাবতী গোটা দশেক ম্যাসেজ পাঠিয়ে হাল ছেড়েছে। রাজ্যের যতো 'ভাল' 'ভাল' শব্দ আছে সেগুলোর কোনোটা জুড়ে দিতে ভুল করে নি। আমি বিনিময়ে শুধু একটা হাসির ইমো দিয়ে রাখলাম।
৫.
সেদিন ছিল শুক্রবার। কাজ করতে খুব একটা খারাপ লাগছিল না। বন্ধু-বান্ধবদের সাথে খুনসুটিও কম হচ্ছিল না। সময়টা কোনদিক দিয়ে পেরিয়ে গেল বুঝতেই পারলাম না। কাজ শেষে বের হয়ে আসার পথে, আমাদের কার উইকেন্ডের প্ল্যান কি ইত্যাদি নিয়ে বেশ আলাপ হচ্ছিল। নাইজেরিয়ার গ্যারি ছিল সবচেয়ে খুশি কারণ ওর গার্লফ্রেন্ড, যে কিনা আমাদের সাথেই ইলমিনাউয়ে পড়ে, সে আসছে বেড়াতে। ডাগ যাবে ইয়াহিয়া গ্যাল্ডিয়েটরের র্যাগে পার্টিতে। ইয়াহিয়া জ্যামাইকান। আর সব জ্যামাইকানের মতোই র্যাগে সিঙ্গার। তবে ওর পারদর্শীতা গাঁজা টানায়, আর আসর জমিয়ে গল্প করায়। পরদিন অর্থাৎ শনিবার লাইপছিশের একটা ক্লাবে ওর গান গাওয়ার কথা। আবদুল যাবে জিএফ-এর বাড়িতে বেড়াতে। অরোরার বিএফ আসবে শনিবারে, চলেও যাবে শনিবারে। তারপর রবিবারে সে যাবে চার্চে। আমার কিছু করার নেই। অরোরা বললো, ইচ্ছে হলে আমি রবিবার ওর সাথে চার্চে যেতে পারি। মাথা ডানে-বামে নাড়লাম। নো থ্যাংকস্। সিরিয়ার তাইমা বললো, শনিবার ও বোনের সাথে দেখা করতে যাবে। বোন লাইপছিশ ইউনিভার্সিটিতে পড়ে, ডর্মিটরিতে থাকে। ওদের প্ল্যান হচ্ছে, ক্রিসমাস্ মার্কেট ঘুরে দেখা, রাস্তার ধারের দোকান থেকে মজার মজার খাবার কিনে খাওয়া, তারপর সন্ধ্যায় বোনের রুমে গিয়ে সীসা সেবন করা। পুরো প্ল্যান ব্যাখ্যা করে আমাকে জিজ্ঞেস করলো, জয়েন করতে চাও? আমি এতক্ষণ পোকার ফেস ধরে বসেছিলাম। যেই উইকেন্ডটা একটু ঘুমিয়ে কাটাবো ঠিক করেছি, সেই একেকজন তাদের প্ল্যানের বাহার মেলে বসেছে আমার সামনে। ধুর ছাই। তাইমাকেও মানা করে দিলাম। 'নাহ জি, স্যরি। আমার উইকেন্ড কাটবে বালিশ আর বিছানার সাথে, কম্বলের নিচে। দুই-একটা অ্যানিমেশন মুভি, গোটা দশেক ফ্যামিলি গাই এপিসোড, চিকেন উইং, ফ্রেঞ্চ ফ্রাই আর টমেটো কেচাপের সাথে। থাগ লাইফ!'
আমার প্ল্যান শুনে গ্যারি সরু চোখে তাকিয়ে জানতে চাইলো, রিয়েলি? আমি উপর-নিচে মাথা নাড়ালাম। তাই দেখে সে বললো, ও ম্যান, আই নো ইউ আর গনা রক ইট। গুড লাক।
তারপর আমরা দু'জনে প্রায় একসাথেই কার্ড পাঞ্চ করে বের হয়ে আসলাম সেই কয়েদখানা থেকে। মুক্ত হাওয়ায়। বুক ভরে একবার নিঃশ্বাস নিয়ে ছাড়তেই দেখি খানিক দূরে একগাল হাসি মুখে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে ইরা। রাত বাজে সাড়ে এগারটা। তাপমাত্রা কাঁটায় কাঁটায় শূন্য ডিগ্রি সেলসিয়াস। এই সময় এই মেয়ে এখানে কি করে? জানলোই বা কিভাবে যে আমার অফিস এখানে? ঘটনা কি সত্যি, নাকি হ্যালুসিনেশন?
গ্যারির দিকে তাকালাম। গ্যারি, আমি, ইরা- আমরা সবাই ইলমিনাউয়ের একই ডিপার্টমেন্টের শিক্ষার্থী। দেখলাম সে মিটিমিটি হাসছে। এইবার আমার কাছে খানিক আগে গ্যারির বলা কথাটার অর্থ পরিস্কার হলো। আই নো ইউ আর গনা রক ইট। তাই না? তোমরা তলে তলে আমার বিরুদ্ধে দল বেঁধেছো? গ্যারির গার্লফ্রেন্ড জুলিয়া আসছে উইকেন্ডে। ইরা জানতো গ্যারি আমার সাথেই কাজ করে। আমি যখন উইকেন্ডে ঘুমিয়ে কাটাবো বলে ফোন বন্ধ করে দিয়েছিলাম, তখন সে গ্যারির সাথে যোগাযোগ করে আমাদের অফিসের ঠিকানা এবং সময়সূচিটা নিয়েছে। তারপর জুলিয়ার সাথেই গাড়িতে করে লাইপছিশ চলে এসেছে। তারপর আমাকে সারপ্রাইজ দেয়ার জন্য ঠিক গেটের সামনে দাঁড়িয়ে হাসি হাসি মুখে আমার দিকে তাকিয়ে আছে।
এক মুহূর্ত সময় লেগেছিল আমার বোঝার জন্য যে, এখন কি করতে হবে। তারপর জাস্ট মেয়েটিকে খুব কাছে টেনে এনে ঠোঁটের ওপর ছোট্ট একটা চুমু এঁকে দিয়েছিলাম। আর ও বলেছিল, তুমি যদি পুরো উইকেন্ডে এক ঘন্টাও ঘুমানোর কথা ভেবে থাকো তাহলে ভুলে যাও। তোমার আগামী দুইটা দিন আমার, শুধুই আমার।
৬.
তারপর সোমবারে যখন কাজ করছিলাম, তখন বন্ধুরা আমার দিকে তাকিয়ে যে খুব হাসাহাসি করছিল; তাতো বলেছিই আগে। অমন ধারার উইকেন্ড আসলেই বিপজ্জনক। কেননা তারপরের সোমবারে বন্ধুরা আপনাকে নিয়ে লিটারেলি 'যেকোন' মজা করতে পারে। আপনার কোনকিছুই বলার বা করার অধিকার থাকে না।
---





অনেকদিন পর ব্লগে এলাম। বলা যায় বছর দুয়েক পর। বেশ ভাল একটা অভিজ্ঞতা এবং ঝরঝরে লেখায় পুরানো প্রবাসের দিনগুলোকে মনে করিয়ে দিল। শুভকামনা মীর ভাই
মন্তব্য করুন