ইউজার লগইন

অসমাপ্ত বাস্তবতা... ৬

গেল মাসের শেষ দুই সপ্তাহে সামার জব করতে গিয়েছিলাম একটা বিয়ার ফ্যাক্টরীতে। ইলমিনাউয়ের লোকাল বিয়ার, নাম ইয়েকলাইন (Jäcklein)। বাসা থেকে ১৫ মিনিট সাইকেল চালিয়ে গেলেই ফ্যাক্টরী। প্রতিদিন সকাল পৌনে আটটায় ফ্যাক্টরীতে গিয়ে পৌঁছুতে হতো। তারপর সবার সাথে বসে এককাপ কফি, পান করলে করলাম- না করলে নাই, কিন্তু বসতে হবে অবশ্যই। সবাই একসাথে বসে হাসি-ঠাট্টায় ঘুমটা হালকা করে নিয়ে, আটটা থেকে কাজ শুরু। জার্মানদের সম্পর্কে অনেক স্টেরিওটাইপই চালু আছে পৃথিবীজুড়ে। অামি নিজে দেশে থাকতে একাধিকবার শুনেছি ওরা নাকি পানির বদলে বিয়ার খায়। শুনে শুনে হয়তো বিশ্বাসও করেছিলাম খানিকটা। অথচ এখানে এসে শুনলাম, জার্মান ভাষায় প্রবাদ চালু আছে- কাইন বিয়ার ফর ফিয়ার। মানে হলো, বেলা চারটার আগে কোনো বিয়ার নয়।

তবে জার্মানরা যে রোবটের মতো কাজ করতে পারে- এটা সত্যি। রোবটের মতো বলতে যেটা বুঝিয়েছি সেটা হচ্ছে, নর্মালি আমাদের কাজ শুরুর আগে প্রস্তুতি নিতে নিতেই অনেকটা সময় পেরিয়ে যায়। রোবটের যেমন কোনো প্রস্তুতি লাগে না, জার্মানদেরও তেমন। এটা সবচেয়ে বেশি টের পাওয়া যায় ওদের পড়ার স্টাইল দেখলে। লাইব্রেরিতে আসবে, বই-খাতা বের করে ব্যাগটা লকারে ঢুকাবে, লাইব্রেরির মূল ভবনে ঢুকবে, একটা জায়গা খুঁজে নেবে এবং তারপর জাস্ট ডুবে যাবে বই-খাতা-ল্যাপটপ কিংবা টেবিলের ওপরের কম্পিউটারের ভেতর। ঠিক যে কয় ঘন্টা পড়তে চায়, পড়ে উঠে চলে যাবে অন্য কিছু করতে। একটা কিছু করার সময়, অন্য আরেকটা কাজে হাত দেয়া, ওরা একেবারেই পছন্দ করে না। কাজ শুরুর আগে প্রস্তুতির জন্য অবশ্যই একটু সময় নেবে। মাঝখানে কারও সাথে দেখা হয়ে গেলে হাসিমুখে কুশলাদি বিনিময়ও করবে। তবে যে কাজের উদ্দেশ্যে কোথায় যাওয়া, সে উদ্দেশ্য থেকে বিচ্যূত হবে না।

আমি যদি ওরকম হতাম, তাহলে দারুণ হতো! আজ সকালেই তো, ঘুম থেকে উঠছি-উঠবো করতে করতে বাজালাম ১২ টা। রেডি হয়ে লাইব্রেরিতে আসতে আসতে আরও এক ঘন্টা। তারপর এখন মাথাকে কেন্দ্রীভূত করার জন্য বসেছি ব্লগ লিখতে। বাজছে কিন্তু অলরেডি দুইটা। লাইব্রেরি শনিবার মাত্র বিকাল পাঁচটা পর্যন্ত খোলা থাকে। যখন চূড়ান্তভাবে পড়তে বসবো, তখন যে খুব বেশি সময় বাকি থাকবে না বিলক্ষণ জানি। যে সময়টাতে আমার পড়ার ইচ্ছা এবং ব্রেনের পড়া বোঝার ক্ষমতা- দু'টোই থাকবে সর্বোচ্চ চূড়ায়, সে সময়টায় ভরাট কণ্ঠে মাইকে ঘোষণা আসবে- Die bibliothek schließt in 15 minuten. এই লাইব্রেরিটি বন্ধ হয়ে যাবে ১৫ মিনিটের মধ্যে।

লাইব্রেরি বন্ধ হওয়ার পর সাধারণত রাস্তার উল্টোপাশের সুপার শপটায় যাওয়া হয়। বিশেষ করে শনিবার বিকেলে ওখানে একটা ঢু না দেয়াটা অন্যায়। রোববার থাকে সব বন্ধ। কিছু খেতে চাইলে, সেটা কিনে রাখতে হয় শনিবারেই। কিংবা বাসায় যদি টুথপেস্ট বা টয়লেট পেপারের মতো জরুরি কিছুর সংকট থেকে থাকে, সেগুলোও জোগাড় করার শেষ সুযোগ শনিবার। অন্যথায় রোববার দাঁত মাজা কিংবা টয়লেটে যাওয়ার মতো কাজগুলো কঠিন হয়ে দাঁড়ায় অনেকগুণ। জানে সবাই। তাই লাইব্রেরি বন্ধের পর পর সুপার শপটায় ভিড় হয় প্রতি শনিবার।

শনিবার রাস্তায় পরিচিত মানুষজনের সাথে দেখা হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনাও বিপদসীমার উপরে থাকে। কারণ সবাই জানে, আজ হচ্ছে পার্টির রাত। আজ রাতে যা খুশি তাই করা সম্ভব, কারণ আগামীকাল স্কুল-কলেজ, অফিস-আদালত সব বন্ধ। আজ সারারাত পার্টি করে, রোববার সারাদিনে কোনোরকমে নিজেকে গুছিয়ে নিয়ে, সোমবার আবার ঢুকে পড়া যান্ত্রিক জীবনে।

ইলমিনাউ শহরে অবশ্য খুব বেশি কিছু করার সুযোগ নাই। বড়জোর ক্যাম্পাসের স্টুডেন্ট ক্লাবগুলোও ঢু দেয়া কিংবা শহরের কেন্দ্রে যে কয়েকটা ছোট-খাটো জায়গা আছে, যেখানে হই-চই হয়; সেখানে গিয়ে সময় কাটানো। তারপর এক সময় নিজের কুঠুরিতে ফিরে আসা কিংবা আলাপে মজে অন্যের কুঠুরিতে চলে যাওয়া। কিংবা অন্যদের নিজের কুঠুরিতে নিয়ে আসা। বিদেশ-বিভুইয়ে এসব খুব একটা বিরল কিছু না।

তবে সবচেয়ে সুলভ আর ভয়ংকর হচ্ছে রোববারের যুদ্ধটা। হ্যাংওভার, দুশ্চিন্তা, গিল্টি ফিলিং, ওয়াক অফ শেইম (যদি নিতে হয়)- সব মিলিয়ে সে এক কঠিন অবস্থা। ব্যাটল অফ দি বাস্টার্ডস্। আসলে ইন-জেনারেল সবার সিচুয়েশনই কম-বেশি এমন। আমার সিচুয়েশনটা সবার চেয়ে একটু বেশি খারাপ, কারণ ইদানীং একমাত্র যে গানটা শুনি সেটা হলো- লেট হার গো। রোববারের যুদ্ধের ওপর যদি এই গানটা শাকের আঁটি হয়ে চেপে থাকে তাহলে অবস্থা অন্যদের চেয়ে খারাপ হতে বাধ্য। গানের কথাগুলোকে এখন তো কথা নয়, যেন চাকুর ফলা মনে হয়।

Because you only need the light when its burning low
only miss the sun when it starts to snow
only know you love her
when you let her go...

যাহোক্ তিন মাস (থিসিস জমা দেয়ার ডেডলাইন) থেকে দুই দিন পার হয়ে গেছে। অগ্রগতি খুব সামান্য। তবে কিছু কিছু চলমান সংকটকে এজন্য অল্পবিস্তর দায়ী করা যেতে পারে। দ্রুত, খুব দ্রুত ইঞ্জিনটারে ফুল-স্টার্ট নেয়াতে হবে। বন্ধ করতে হবে একটানা 'লেট হার গো' শোনা। কিন্তু গানের লাইনগুলো এত সুন্দর যে উঠে আসতেও ইচ্ছে করে না।

Only know you've been high when you're feeling low
only hate the road when you're missing home
only know you love her
when you let her go...

প্রত্যেকটা লাইন যেন আমার জীবন থেকে ধার নেয়া। মাইকেল ডেভিড রোজেনবার্গকে ( মঞ্চে প্যাসেঞ্জার নামে পরিচিত) এই সময় সামনে পাইলে বলতাম, গেট আউট অফ মাই হেড, কি সমস্যা?

---

পোস্টটি ১ জন ব্লগার পছন্দ করেছেন

মন্তব্য করুন

(আপনার প্রদান কৃত তথ্য কখনোই প্রকাশ করা হবেনা অথবা অন্য কোন মাধ্যমে শেয়ার করা হবেনা।)
ইমোটিকন
:):D:bigsmile:;):p:O:|:(:~:((8):steve:J):glasses::party::love:
  • Web page addresses and e-mail addresses turn into links automatically.
  • Allowed HTML tags: <a> <em> <strong> <cite> <code> <ul> <ol> <li> <dl> <dt> <dd> <img> <b> <u> <i> <br /> <p> <blockquote>
  • Lines and paragraphs break automatically.
  • Textual smileys will be replaced with graphical ones.

পোস্ট সাজাতে বাড়তি সুবিধাদি - ফর্মেটিং অপশন।

CAPTCHA
This question is for testing whether you are a human visitor and to prevent automated spam submissions.

বন্ধুর কথা

মীর's picture

নিজের সম্পর্কে

more efficient in reading than writing. will feel honored if I could be all of your mate. nothing more to write.