ইউজার লগইন

অসমাপ্ত বাস্তবতা... ৭

মুড়ি আর চানাচুর খেয়েছি গতকাল। তিন বছর পর। শিশির নামের এক ছোটভাই নিয়ে এসেছিল দেশ থেকে। আমাদের দেশে যেভাবে ছোটভাই-বড়ভাই ইত্যাদি নিয়ম-নীতি মেনে চলা হয়, এখানে সেরকম না। সবাই মূলত সবাইকে নাম ধরে ডাকে। প্রফেসর, ডক্টর ইত্যাদি উপাধিধারীদেরকে যদিও নামের শেষ অংশের আগে উপাধি যোগ করে ডাকা হয়। আত্মীয়দেরকে সম্পর্ক উল্লেখপূর্বক নাম ধরে ডাকাটাও মোটামুটি সচল, যেমন আন্ট মারি বা আঙ্কেল টম, তবে ওইটুকুই। শ্বশুড়-শ্বাশুড়িকে কিন্তু সবাই এখানে সরাসরি নাম ধরে সম্বোধন করে। তবে নামের প্রথম অংশ ধরে না, শেষ অংশ ধরে। এই যেমন বন্ধু রবার্টের হবু শ্বশুড়ের নাম মিস্টার শাইড। সে উনাকে ডাকেও মিস্টার শাইড বলে। আর রবার্টের বাবার নাম মিস্টার আনটিশ, ওর বান্ধবী প্রিসকা উনাকে ডাকে শুধু আনটিশ বলে। জার্মানরা মিস্টার, মিস ইত্যাদি সম্বোধনেরও তোয়াক্কা করে না। আমি ভাবি যদি আমাদের দেশে কোনো মেয়ে তার হবু শ্বশুড়কে নাম ধরে ডাকে কিংবা বর্তমান শ্বশুরকে তাহলে কি হতে পারে? কোনো ছেলে যদি তার শ্বশুড়কে ডাকে তাহলেই বা কি হতে পারে? একটা সামাজিক এলার্জির মহামারী না দেখা দেয়!

আমারও একসময় হিউজ এলার্জি ছিল এই ইস্যূতে। যখন দেশে ছিলাম তখন। একবার আমাদের গ্যারেজে এসে যোগ দিল আবু হেনা। দেখতে বড়-সড় এবং বয়স্কও, কিন্তু ব্যাচওয়ারী সে আমার জুনিয়র। বিষয়টা কোথায় যেন মিললো না। সে আমাকে সরাসরি নাম ধরে ডাকা শুরু করলো। যদিও আমি দেখছিলাম আমারই ব্যাচের অন্যদেরকে সে ভাই-ভাই সম্বোধন করছে এবং বড়ভাই হিসেবে ট্রিট করছে কিন্তু আমাকে করছে না। ওর ব্যাচের ছেলেপিলেরা সবাই কিন্তু ঠিকই আমাকে বড়ভাই হিসেবে ট্রিট করে। কিন্তু আমার আর আবু হেনার মধ্যে কোথায় যেন দ্বন্দ চলে। আমি উপভোগ করা শুরু করলাম বিষয়টা। আমরা এমনিতেও বেশি কথা বলতাম না। পরোক্ষ ভাবে যোগাযোগটাই বেশি হতো। কিন্তু মাঝে মাঝে সে যখন আমাকে সবার সামনে নাম ধরে ডেকেই বসতো, তখন আমাকে এক প্রকার শঙ্কা ঘিরে ধরতো। কিছু বলতাম না। কারণ ভাবতাম, সেও তো একজন অ্যাডাল্ট। এই যে কাজটার মাধ্যমে সে যে একটা ইমব্যালান্স তৈরি করছে পরিবেশে, সেটা কি সে বুঝতে পারছে না?

পরে অবশ্য আবু হেনা বিষয়টা বুঝতে পেরেছিল এবং ভাই সম্বোধনে সুইচ করেছিল এবং যথারীতি সেটা জীবনের আরও একটা সুন্দর ছোটভাই-বড়ভাই সম্পর্ক হয়ে দাঁড়িয়েছিল। তবে সবক্ষেত্রেই এমনটা হয় নি। কিছু কিছু সম্ভাবনাময় সম্পর্ক অঙ্কুরে বিনষ্ট হয়েছে এই সংকটের কারণে। সেগুলোর জন্য খারাপও লাগে কিন্তু কিছু করার নেই আই গেস্।

যাহোক্ মজার বিষয় হচ্ছে আবু হেনা হয়তো বছর খানেকের ছোট হবেই বা, নাও হতে পারে; যে কারণে ওর কাছ থেকে স্বনামে সম্বোধন সহ্য হতো না তা হলো- ওর বন্ধুরা ছিল আমার চেয়ে মাত্র এক ব্যাচ জুনিয়র। ক্যাম্পাসের সেশন অনুযায়ী। আর এখন বিদেশে ঝাড়া ১০ বছরের ছোট পোলাপানের কাছ থেকেও নাম ধরে ডাকা শুনে কিছু মনে হয় না। কানটা এমনভাবে পাল্টে গেছে যে নাম ছাড়া অন্য কিছু শুনলেই বরং কিছু একটা মনে হতে পারে। সম্ভাবনা আছে।

এই যে পরিবর্তনটা, এটাকে আমি ভাল একটা পরিবর্তন হিসেবেই দেখি। আশা রাখি দেশে যখন ফিরবো তখনও আমার চিন্তা-ভাবনা এমনই থাকবে। কিংবা যদি পরিবর্তন ঘটে, তাহলে যেন আরও ভাল কোনোকিছুর দিকে পরিবর্তিত হয়। উল্টোপথে না হাঁটে। কারণ আগের সিচুয়েশনটা আমি পছন্দ করি না। যেটা মানুষকে না চাইলেও ক্ষেত্রবিশেষে বিব্রতকর একটা পরিস্থিতির মধ্যে ঢুকিয়ে দেয়ার ক্ষমতা রাখে। সামাজিক নিয়মকানুন মূলত সমাজে আমাদের বসবাসকে সহজ করার জন্য ঠিক করা হয়েছিল, কঠিন করে তোলার জন্য না। বাংলাদেশের অনেক নিয়ম-কানুন আছে, যেগুলো আসলে হয় মেয়াদোত্তীর্ণ হয়ে গেছে কিংবা কখনো প্রয়োজনই ছিল না।

তিন বছর পর মুড়ি আর চানাচুর খেতে কেমন লাগলো জিজ্ঞেস করে নিজের কাছ থেকে নতুন যে কথাটা শুনলাম, যেটা মুড়ি সংক্রান্ত কোনো আলাপে আমি আগে কখনও শুনি নি; সেটা হচ্ছে মুড়ি জিনিসটা ভিগান (vegan)। চানাচুরও। কারণ চানাচুর মূলত বেসনে তৈরি। নেহায়েত প্রাণীজ তেলে ভাজা না হলে মুড়ি-চানাচুরের ভিগান না হয়ে আর কোথাও যাওয়ার জায়গা নেই। এবার দেশে গিয়ে প্রচুর পরিমাণ মুড়ি-চানাচুর নিয়ে আসতে হবে। বিয়ার কিংবা হালকা স্ক্রু-ডাইভারের সাথে সরিষার তেলে মাখা মুড়ি-চানাচুর এখনও অদ্বিতীয়।

ঢাকা শহরের যে বিষয়গুলো আমার সবচেয়ে প্রিয় ছিল তার মধ্যে রাস্তাটা অন্যতম। কত শত শত গভীর রাতে আমি আমার মোটর বাইকে করে ছুটে বেড়িয়েছি মতিঝিল শাপলা চত্বর, হীরাঝিল হোটেলের আশপাশ, রাষ্ট্রপতির বাসভবন আর দিলকুশা এলাকার মধ্যের চিকনগলি দিয়ে বের হয়ে হকি স্টেডিয়ামের সামনে, তারপর গুলিস্তান, নগর ভবন পার হয়ে বঙ্গবাজার। এরপর হয় সোজা, নাহয় ডানে, নাহয় বামে; মানে আমার সবদিকেই যাওয়ার প্রয়োজন ছিল সময়ভেদে। সবখানেই প্রচুর পরিমাণ যাওয়া হতো। আর আমি খুব ভাগ্যবানও ছিলাম কারণ, আমাদের বাসাটা ছিল শহরের কেন্দ্রের খুব কাছাকাছি। শহীদবাগে। খুব বার্নিং একটা এরিয়া। প্রচুর ডানপন্থী রাজনীতিবিদদের বসবাস ছিল মহল্লায়। আমার দেশের বাড়ি বগুড়াও ডানপন্থী রাজনীতির বিশাল ডেরা হিসেবেই চিহ্নিত ছিল এই কয়েক বছর আগ পর্যন্তও। কবে থেকে তা জানি না। সত্তুরের দশকের শেষ থেকেই হওয়ার কথা।

চিরকাল ডানপন্থী আবহর মধ্যে থেকেও আমি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম বর্ষে গিয়ে নাম লিখিয়েছিলাম ছাত্র ইউনিয়নে। অ্যাকটিভলি সংগঠন করেছিলামও কিছুদিন। খুব বেশিদিন না যদিও। সংগঠনের সাথে মিছিল-মিটিং-পাঠচক্র, এদিক-ওদিক যাওয়া ইত্যাদি কাজের মধ্যে আমার সবচেয়ে ভাল লাগতো রাতে ক্যাম্পাসের দেয়ালে দেয়ালে চিকা মারতে। ছাত্র ইউনিয়নের চিকা মারার মতো মজার কাজ আসলে আমি সারা জীবনেই খুব কম করেছি। মনে আছে মলয়দা' দারুণ চিকা মারতে পারতেন। আমিও শিখছিলাম কিন্তু আমাকে তখনও রং-তুলি নিয়ে দেয়ালে লিখতে দেয়া হতো না। হয়তো কিছু দিন পর দেয়া হতো, কিন্তু আমি তো তার আগেই পগার পাড়! এরপর আর সেভাবে রাজনীতি করা হয় নি কখনও। শুধু গণজাগরণ মঞ্চের জেগে ওঠার সময়টায় আরেকবার ভেতরের ক্রোধ ফুঁসে উঠেছিল। সমাজকে আগাগোড়া ভেঙ্গে আবার নতুন করে গড়ার একটা আকুলি-বিকুলি সে সময় মনের ভেতর সবসময় টানা চলতো। সে সময় আমার ব্যক্তিগত জীবনটাও একটা বিশাল পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল। দুইটার মিশ্রণ সময়টাকে আসলেই একটা বিশালতা দিয়ে রেখেছে।

এটা সত্য যে ঢাকার রাস্তাদের সাথে আমার একটা বন্ধুত্বপূর্ণ জগত ছিল। মাঝে মাঝে জ্যামে বসে রাস্তাদের সাথে আলাপ করার কথা বললে কি কেউ আমাকে পাগল ভাববেন? আমি করতাম তো। জীবনে যতো পাগলামি করেছি, সেগুলোর তুলনায় এটাকে নিরীহই বলা চলে। এখনও মাঝে মাঝে করি। তাই নিশ্চয়তা দিচ্ছি না যে আমার পাগলামির কথা মানুষ আর কখনও শুনবে না। অবশ্যই শুনবে। শুধু সেগুলোর ভাইব থাকবে পজিটিভ- এইটুকু বলতে পারি। কারণ এটাই আমি ট্রাই করছি।

---

মন্তব্য করুন

(আপনার প্রদান কৃত তথ্য কখনোই প্রকাশ করা হবেনা অথবা অন্য কোন মাধ্যমে শেয়ার করা হবেনা।)
ইমোটিকন
:):D:bigsmile:;):p:O:|:(:~:((8):steve:J):glasses::party::love:
  • Web page addresses and e-mail addresses turn into links automatically.
  • Allowed HTML tags: <a> <em> <strong> <cite> <code> <ul> <ol> <li> <dl> <dt> <dd> <img> <b> <u> <i> <br /> <p> <blockquote>
  • Lines and paragraphs break automatically.
  • Textual smileys will be replaced with graphical ones.

পোস্ট সাজাতে বাড়তি সুবিধাদি - ফর্মেটিং অপশন।

CAPTCHA
This question is for testing whether you are a human visitor and to prevent automated spam submissions.

বন্ধুর কথা

মীর's picture

নিজের সম্পর্কে

more efficient in reading than writing. will feel honored if I could be all of your mate. nothing more to write.