ইউজার লগইন

হে মানবজীবন, তুমি সমর্পিত হও

অবশেষে ষোড়শ সংশোধনী, নায়করাজ ইত্যাদি ইস্যূর দাপট খানিকটা কমেছে। এখন একটা প্রায় ইস্যূহীন সময়। মিয়ানমার সীমান্তে খানিক গন্ডগোলের আভাস পাওয়া যাচ্ছে। যদিও বড় কিছু হয়ে দাঁড়ানোর মতো বলে মনে হচ্ছে না। আর পাহাড়ের ওইদিকে কি হচ্ছে তা নিয়ে ওয়েস্টেরোসের রাজা-রাণীরা খুব চিন্তিত বলেও মনে হয় না। এই সময়টাকে তাই গান, গল্প, কবিতা, বই কিংবা সিনেমার সাথে কাটানোর মতো খানিকটা সময় হিসেবে চিহ্নিত করা যায়।

সামনেই কোরবানীর ঈদ। পশু কোরবানীর মাধ্যমে রূপকার্থে স্রষ্টার প্রতি মানুষের শ্রদ্ধা-ভক্তি ইত্যাদি প্রদর্শনের ঈদ। এর আগ পর্যন্ত মনে হয় না কেউ আর নতুন কোনো ইস্যূ চায়। অস্ট্রেলিয়ার সাথে টেস্ট ম্যাচ দেখতে দেখতে ঈদটা এসে পরলেই ভাল। কে আর সেধে সেধে গ্যাঞ্জাম আর স্ট্রেসফুল পরিস্থিতির মধ্যে পড়তে চায়?

আমাদের দেশটা কি একটা বিশাল লুপের মধ্যে আটকে আছে? একটার পর একটা ইস্যূর জন্ম হয় এখানে। মানুষের আগ্রহের পারদ থাকে উঁচুতে সেই ইস্যূকে ঘিরে। তারপর দ্রুতই আরেকটা ইস্যূ এসে দরজায় কড়া নাড়ে, এবং যথারীতি আগ্রহের গণপারদ ওইদিকে মুভ করে। কোনো কিছু থেকে শিক্ষা নিয়ে সেটাকে পাকাপাকিভাবে কাজে লাগানোর দিকে কারও নজর নাই। একটা উদাহরণ দিচ্ছি মাত্র। পারিবারিক ধর্ষণকাণ্ড ঠেকানোর জন্য যে একটা যুগান্তরী সামাজিক পরিবর্তন দরকার সেটা আমরা কেউ বুঝি নাই। আবার যখন কোনো একদিন খবর বেরুবে কোনো এক পাষণ্ড বাবা তার মেয়েকে দিনের পর দিন ভয় দেখিয়ে ধর্ষণ করছে- তখন আমরা নড়েচড়ে বসবো। ফেসবুকে বোমাসদৃশ্য লেখা ছাড়বো। তার আগ পর্যন্ত কিছুই করবো না। বিষয়গুলো নিয়ে পারিবারিক পরিমণ্ডলে গুরুজন-ছোটজন সবাই মিলে বসে আলাপটা পর্যন্ত না। অথচ এই সমস্যাগুলো আলাপের মাধ্যমেই সমাজ থেকে ঝাড়ু দিয়ে পরিস্কার করা সম্ভব। গবেষণা বলছে, যেসব দেশে শিশুদেরকে ছোটবেলা থেকে পরিস্কার যৌনশিক্ষা দেয়া হয়, সেসব দেশে পেডোফিলিয়ার মতো যৌনসংঘাতগুলো ঘটার হার কম।

সিরিয়াসলি, আমি যখন ফেসবুকে দেয়া বোমাসদৃশ্য কোনো লেখা পড়ি তখন কখনো রাগে ফুঁসি, কখনো কষ্টে কাঁদি, কখনো অক্ষম আক্রোশে হাত কামড়াই, চুল ছিড়ি। কিন্তু পরক্ষণেই, লেখাটা পড়া শেষ হলেই স্ক্রল করে নিচে চলে যাই। স্মার্টফোনের এই যুগে স্ক্রল করে নিচে চলে যাওয়া মানে পরবর্তী পোস্টটায় মনোযোগ দেয়া। অথচ আমার কিন্তু একজনের মৃত্যুসংবাদে কষ্টের ইমো দিয়ে, আরেকজনের চাকুরী পাবার খবরে একগাদা খুশির ইমো হাজির করার কথা ছিল না। কেমন একটা যন্ত্র যেন হয়ে উঠেছি আমি। সম্ভবত আমরা সবাই। যারা একটু স্বচ্ছল। স্মার্টফোন কেনার মতো ক্ষমতা রাখি।

আজকাল কারোই কিছু যায় আসে না অন্যের জন্য। নিজের সাথে কিছু ঘটলে তাই আমরা কাউকে কাছে পাই না সাহায্যের জন্য। সেই গল্পটার মতো জীবন আমাদের; নাৎসিরা যখন ইহুদীদেরকে মেরে ফেলতে এসেছিল তখন আমি তাদের ঠেকাতে যাই নি কারণ আমি তো ইহুদী নই, কমিউনিস্টদেরকে মেরে ফেলতে এসেছিল তখনও আমি এগিয়ে যাই নি কারণ আমি তো কমিউনিস্ট নই; তারপর একসময় ওরা যখন আমাকে মারতে এসেছিল তখন অন্য কেউ এগিয়ে আসে নি। কারণ আমি তো অন্য কারও মৃত্যু ঠেকাতে করি নি কিছুই। অন্তত নিজের জায়গায় দাঁড়িয়ে ছাড়ি নি একটা হাঁকও।

দক্ষিণ আফ্রিকার ছেলে ইয়োহান মনে করে আমরা যেভাবে বানর থেকে বিবর্তনের মাধ্যমে আজকের অবস্থায় এসেছি, ঠিক সেভাবে রোবোটেরা এক সময় আমাদের বিবর্তনের ফল হিসেবে পৃথিবীতে চড়ে বেড়াবে। আমাদের বিবর্তনটা যেভাবে উন্নতিকে পথ করে দিয়েছে, রোবোটের বিবর্তনটাও ঠিক সেভাবে উন্নতিকে পথ করে দেবে। হয়তো সে সময় আজকের সংকীর্ণ সংকটগুলো, যেগুলো আসলেই খুব সহজে সমাধান করা যেতো, জাস্ট একটু সম্মিলিত প্রচেষ্টার দরকার ছিল; সেগুলো আর থাকবে না। তবে সেই সুসময় দেখে যাওয়ার জন্য আমরা থাকবো না। ইভেনচুয়ালি একটা সময় মানুষেরও শেষ প্রজন্ম আসবে। যারা এখনকার মানুষদের থেকে অনেক দূরবর্তী একটা প্রজাতি হবে। অনেকগুলো দিন হয়তো তারা রাজত্ব করবে। তারপর এক সময় পুরোপুরি যন্ত্রের হাতে মনুষ্যকুলের ঝান্ডা সমর্পিত হবে। হয়তো দু'য়েকজন বিজ্ঞান কল্পকাহিনীর নায়ক-নায়িকারা মানুষের এখনকার যে অবস্থা, সেটিকে টিকিয়ে রাখার জন্য লড়াই করবে। যেসব লড়াই আমরা সাধারণত সাই-ফাই ঘরানার সিনেমা আর বইগুলোতে পাই।

আমরা চাইলে অবশ্য এই সময়টাকেও ভালভাবে যাপন করতে পারতাম। অর্থনীতি, রাজনীতি, ভুগোল, সামাজিক শিক্ষা- ইত্যাদির মতো মানুষকে আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে থাকা চলকগুলোকে যদি এখন যেমন আছে তা থেকে পাল্টে "সকলের তরে সকলে মোরা, প্রত্যেকে মোরা পরের তরে" নীতিতে নিয়ে আসা যেতো, তাহলে সময়টা আরও ভালভাবে কাটানো কঠিন ছিল না। আমার চোখে তো পুরো বিশ্বকেই আসলে একটা সুতোয় গাঁথা বলে মনে হয়। শুধু আমরা সুতোটাকে অসংখ্য মাত্রায়, এবং প্রতিটি মাত্রাকে অসংখ্য ভাগে ভাগ করে রেখেছি। সব ঝেড়ে ফেলে যদি পুরো পৃথিবীটাকে এক বিন্দুতে নিয়ে আসা যেতো! যদি আমরা সবাই ভেদাভেদ ভুলে একটা পৃথিবী গড়ে তোলার পেছনে কাজ করতে পারতাম! তাহলে এমনকি পৃথিবীতে বেকারত্বও থাকতো না। সবারই কিছু না কিছু করার থাকতো। বিবর্তনে সবার দৃশ্যমান ও সক্রিয় অংশগ্রহণের সুযোগ হতো। এমন একটা পৃথিবীর স্বপ্ন কতোটা অলীক আমি জানি না। তবে আমি মাঝে মাঝে একটা একজাতিভিত্তিক পৃথিবীর স্বপ্ন দেখি। হয়তো প্রচুর রিক অ্যান্ড মর্টি-টাইপ টিভি সিরিয়াল দেখার ফলাফল এইটা। কিন্তু আমি দেখি। মনে হয় একদিন আসলে এমনটাই ঘটবে। হয়তো আজ-কাল বা পরশু নয়, কিন্তু কোনো একদিন ঘটবেই।

৩২-এ পা দিলাম গতকাল। অনেকটা সময় পেরিয়ে গেল জীবনের। যদিও আমার পরিপক্বতা এখনও ২৫ থেকে ২৭-এর ঘরে। ৩২-এ মানুষ সাধারণত, বলছি একদম 'অ্যভারেজ' মানুষদের জীবনে যা ঘটে তার কথা; নিজের পরিবারের পত্তন ঘটায়। বিয়ে, চাকুরী, গাড়ি-বাড়ির চিন্তার মতো চূড়ান্ত কিছু সামাজিকতার মধ্যে নিজেকে বেশ ভালভাবেই জড়িয়ে থাকা অবস্থায় আবিস্কার করে। আমি ঘুম থেকে উঠে নিজেকে মাস্টার থিসিসের শেষ সময়ের ব্যস্ততায় জর্জরিত, গার্লফ্রেন্ডের সাথে ব্রেক-আপের ঠিক পরের দিনগুলোর মেন্টালিটিতে আক্রান্ত, পাসপোর্ট নবায়নের বিরক্তিকর পেপারওয়ার্কেও যুক্ত, এবং ডর্মিটরির অপরিস্কার রান্নাঘর নিয়ে উত্যক্ত একটা পরিস্থিতিতে আবিস্কার করেছি। হোয়াটস্-অ্যাপ, ম্যাসেঞ্জারে আরও কিছু জৈবিক উপাদান নিহিত ছিল, যেমন: কি করছি বিকেলে কিংবা সন্ধ্যায় বাইরে যাওয়ার কোনো প্ল্যান আছে কিনা টাইপের প্রশ্ন। কোথাও ৩২-এর ছোঁয়া ছিল না। ২৫ থেকে ২৭ বছরের মধ্যে থাকা অদ্ভুত এক ব্যক্তির লাইফস্টাইলের ছোঁয়া যেন সবখানে। যার জানা নেই সামনে কি অপেক্ষা করে আছে, কিন্তু বিশ্বাস আছে যাই থাকুক না কেন সেটাকে ঠিকই সামাল দেয়া যাবে।

খারাপ না, তাই না? বেঁচে তো আছি। সামনের দিনগুলোকে দেখার জন্য দু'টো চোখতো এখনও সচল। ভালোই লাগছে। যতো দিন যাচ্ছে, ততো যেন শক্ত হচ্ছি। জীবনের মানে বুঝতে পারছি। আমার নিজের কর্ণারটা খুঁজে পাওয়ার কাছাকাছি পৌঁছাচ্ছি। ইয়োহান বলে আমাদের সবারই এই পৃথিবীতে নিজের একটা কর্ণার খুঁজে বের করা উচিত। তারপর জাস্ট নির্বিবাদে বাকি সময়টা কাটিয়ে দেয়া। যে ছেলের জানাশোনার মাত্রা এতোখানি যে রোবোটিক বিবর্তনের আইডিয়া যখন-তখন মাথা থেকে বের হয়, সেই ছেলে যখন অমনধারা 'হারানো সুরের' গান গায়, তখন মনে হয় আসলে আমরা সবাই লাইনেই আছি। ফেসবুক, ইন্সটাগ্রাম দিয়ে নিজেদেরকে ঢেকে রেখেছি। এটাই ছিল আমাদের যাত্রাপথের ছবি। বিবর্তনের পথে আমাদের হেঁটে যাওয়াকে যদি কখনও অন্য কোনো মাত্রার অন্য কোনো জীব দেখতে চায় তাহলে তারা এই সময়ে আমাদেরকে এভাবেই দেখার কথা ছিল। ট্রাম্প আর পুতিনেরই লৌহ সিংহাসন নিয়ে লড়াই করার কথা ছিল।

ছবিটা দেখতে আরও ভাল হতে পারতো। কিন্তু হয় নাই। ব্যক্তিপর্যায় থেকে হয়তো ভালোর পথে সেই পরিবর্তনের হাঁটা শুরু করাও সম্ভব না। কিংবা হয়তো সম্ভব। কিন্তু ব্যক্তিজীবনে ভাল পরিবর্তনের পথে হাঁটা শুরু করা সবসময়ই সম্ভব। আমরা সবাই যেন সেই পথ খুঁজে পাই। অন্য কোনো মাত্রার অন্য কোনো জীব যদি জুম-ইন করে কোনো ব্যক্তির পথচলা দেখতে চায়, তাহলে যেন দেখে অবাক হয়। বলতে বাধ্য হয়, মানুষটা আসলেই তো কুল ছিল! আই লাইক হিম/হার।

থাকলো সবার জন্য শুভেচ্ছা। ভালবাসা। শুভকামনা। অফুরান, অফুরান।
---

মন্তব্য করুন

(আপনার প্রদান কৃত তথ্য কখনোই প্রকাশ করা হবেনা অথবা অন্য কোন মাধ্যমে শেয়ার করা হবেনা।)
ইমোটিকন
:):D:bigsmile:;):p:O:|:(:~:((8):steve:J):glasses::party::love:
  • Web page addresses and e-mail addresses turn into links automatically.
  • Allowed HTML tags: <a> <em> <strong> <cite> <code> <ul> <ol> <li> <dl> <dt> <dd> <img> <b> <u> <i> <br /> <p> <blockquote>
  • Lines and paragraphs break automatically.
  • Textual smileys will be replaced with graphical ones.

পোস্ট সাজাতে বাড়তি সুবিধাদি - ফর্মেটিং অপশন।

CAPTCHA
This question is for testing whether you are a human visitor and to prevent automated spam submissions.

বন্ধুর কথা

মীর's picture

নিজের সম্পর্কে

more efficient in reading than writing. will feel honored if I could be all of your mate. nothing more to write.