ইউজার লগইন

গল্প: ঢাকা শহরে যেটা একটা স্বাভাবিক ঘটনা

১.
ঢাকায় আসার পর প্রথম কয়েকমাসের কথা সানি কোনোদিন ভুলবে বলে মনে হয় না। উচ্চ মাধ্যমিক শেষের আগে থেকেই জানতো তারা পরীক্ষার পরই চলে যাচ্ছে ছোট্ট মফস্বল শহর ছেড়ে। বাবার বদলী হয়ে গিয়েছিল আগেই। শুধু ওর পরীক্ষার জন্যই ছোট বোনকে নিয়ে মা রয়ে গিয়েছিলেন সেখানে। বাবা আগেই ঢাকায় গিয়ে বাসা সাজিয়ে রেখেছিলেন।

পরীক্ষার সব আনুষ্ঠানিকতা শেষে একদিন ট্রাকে মাল-সামাল গুছিয়ে উঠে পড়লো ওরা বাপ-বেটা। মা আর বোন রওনা দিলেন বাসে। সন্ধ্যায় যখন ঢাকায় ঢুকছিল ওদের ট্রাক আমিনবাজার দিয়ে, তখনও তেমন কিছু মনে হয় নি ওর, সব স্বাভাবিকই লাগছিল। শুধু বড় বড় বিল্ডিংয়ের ঘনত্ব আশঙ্কাজনক হারে বাড়তে দেখে একটু অবাক হচ্ছিল সে। ওটাই জীবনে প্রথমবারের মতো ঢাকায় যাওয়া ওর। এর আগে নিজের শহরের আশপাশে ঘুরেছে ঠিকই। কিন্তু রাজধানীতে যাওয়া হয় নি, কিংবা অন্য কোনো বড় শহরেও না। যেখানে আকাশ ছোঁয়া দালান-কোঠাই শুধু দেখা যায় চারিদিকে, খোলা আকাশ বড় সহজে পাওয়া যায় না। জায়গাটাকে জৈবিক সত্তার কাছে প্রাকৃতিকভাবে পরিচিত লাগে না স্বভাবতই। তবে দূর থেকে একুশে টিভির ভবনটা দেখে একবারেই চিনতে পেরেছিল সানি, মনে হয়েছিল- অবশেষে ওরা ঢাকা পৌছেঁছে।

২.
ওখানে জীবনটা খুব সহজ ছিল না প্রথমদিকে। আগের শহরে জীবনটা ছিল বন্ধুবান্ধবে ভরা, ব্যস্ততায় ভরা, গতিশীলতায় ভরা এবং আরও বহুমাত্রিক ব্যপার ও বিষয়-আশয়ে ঘেরা। ওদের ছোট্ট শহরটার ছেলেমহলে, সবাই ছিল একেকটা ক্ষুদে গ্যাংস্টার। কিংবা কোনো না কোনো গ্যাং-এর মেম্বার। বাড়ির ছাদে ক্রিকেট খেলা, গলির মোড়ে আড্ডাবাজি, স্কুল-কলেজের নানান ঘটনাপ্রবাহের সাথে মিশ্রিত এক টাইট-ফিট সময়সূচী ছিল জীবনে। ওদিকে, নতুন শহরে ওর কাজ বলতে শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির জন্য কোচিং করা। সেটাও সকাল থেকে দুপুর অব্দি, তারপর ফ্রি। কোচিং সেন্টারের বন্ধুদের সাথে সন্ধ্যার পর চায়ের দোকানে বসে দেয়া আড্ডাটা ছিল দিনের একমাত্র আরেকটা কাজ; পড়াশোনার পর।

এর মধ্যে কোচিং সেন্টারের ক্লাস শেষও হয়ে গেল একটা সময়। বাসায় বসে ভর্তি পরীক্ষার জন্য পড়া ছাড়া আর কিছুই করার নেই। নতুন শহরে ততদিনে মহল্লার ছেলেপিলেদের সাথে পরিচিতি হয়েছে। তার দরুন খানিকটা সময় খেলাধূলা করে কাটানো যায়। বাকিটা সময় শুধু বসে বসে বোর হওয়া। ঢাকার জীবন অনেক কিছুই শিখিয়েছে ওকে। বোর হতে শেখাটা ছিল প্রথম শিক্ষা।

৩.
প্রকৃতির নিয়মকে সম্মান করেই একসময় সানির জীবনও পাল্টে গেল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির পর হঠাৎ একগাদা পরিবর্তন ঝড়ের মতো জীবনে ঢুকে ওকে পুরো গিলে নিয়েছিল। রাজনীতি আর পড়াশোনা। সকালে ক্যাম্পাসে যাওয়ার পর রাত ১০টা-১১টার আগ পর্যন্ত বাসায় ফেরার কথা মনেই পড়তো না ওর, সেই সব দিনগুলোতে। পরিবারের সাথে খানিকটা দুরত্ব তৈরি হলেও সেই সময়টা সানিকে দিয়েছে অনেক কিছুই। দেখতে শিখিয়েছে জীবনকে নতুনভাবে। আর ওর যোগাযোগ ছিল বাম রাজনীতির সঙ্গে। সরকার বা বিরোধীদলীয় ছাত্র সংগঠনের নেতা-কর্মীদের সানির কাছে মনে হতো স্বার্থলোভী, বোরিং, ক্লিশে সেইসব মানুষ, যাদেরকে সে ছোটবেলা থেকেই দেখে আসছে। বরং বাম সংগঠনের ওঁদেরকে অনেক বেশি আকর্ষণীয় মনে হতো ওর। সময় কাটাতে ভাল লাগতো ওঁদের সাথে। সন্ধ্যার পর টিএসসিতে বসে বাম সংগঠনের রিপন ভাই যখন গিটার বাজিয়ে গান ধরতো, তখন সে ঠিক ওই শিহরণটাই অনুভব করতো; যেটা এক সন্ধ্যায় প্রথমবার একুশে ভবনের নিচ দিয়ে ঢাকায় ঢোকার সময় অনুভব করেছিল সে।

৪.
পড়াশোনায় ফার্স্ট ক্লাস না হলেও; সবকিছু মিলিয়ে সানিকে তেমন ছেলেদের কাতারে সহজেই ফেলে দেয়া যেতো, যাদের সাথে সময় কাটাতে মানুষ আগ্রহই বোধ করে। বছরখানেকের মধ্যে ক্যাম্পাসে সে বেশ পরিচিত একটা মুখ হয়ে উঠলো। ওই সময়টা আরও একটা কারণে ওর জীবনে গুরুত্বপূর্ণ।

সে সময়েই প্রথম সানি সত্যিকার অর্থে কারও প্রেমে পড়েছিল। সে সময়ের আগে অল্পস্বল্প ভাল অনেককেই লেগেছিল। কিন্তু এমন হয় নি যে কারও কথা দিন-রাত সারাক্ষণ মনের ভেতর ঘুরে বেড়াতো। প্রথমবার অমন অনুভূতি টের পেরে স্বভাবতই ঘাবড়ে গিয়েছিল ছেলেটা। তাই যে মেয়েটির জন্য অমন অনুভব করতো, তাকেই গিয়ে বলেছিল- শোনো আমার না অদ্ভুত একটা সমস্যা হয়েছে ইদানীং। সবসময় খালি তোমার কথা মাথার ভেতরে ঘোরে। মেয়েটি আশ্চর্যান্বিত হয়ে বলেছিল, মানে কি? আমার কথা সবসময় তোমার মাথার ভেতরে ঘুরবে কেন? আজব!

মেয়েটিকে বোঝানোর সাধ্য ছিল না সানির। কিংবা হয়তো নিজের মনের কথা পরিস্কারভাবে বোঝার ক্ষমতা ছিল না তার নিজেরই। প্রথমদিন নিজের অনুভূতি অব্যক্ত রেখেই ফিরতে হয়েছিল ওকে।

যদিও ওরা দুইজন ভাল বন্ধু ছিল বলে বিষয়টা খুব বেশি প্রভাব ফেলে নি সানির ওপরে। জীবন আগের মতোই ক্লাস-পরীক্ষা, আড্ডা, রাজনীতি ইত্যাদিতে ব্যস্তসমস্ত ভঙ্গিতে দৌড়েঁ চলছিল। কিন্তু সানির মনে ওই সমস্যাটা রয়েই গেল।

দিনের বেলা যখন ওরা দু'জন কাছাকাছি থাকে, তখন খুব একটা খারাপ লাগে না। বলতে কি সানির প্রায়ই মনেও থাকে না যে রাতে বাড়ি ফেরার পর মেয়েটির কথা ওর ক্রমাগত মনে পড়তে থাকবে। সেই মনে পড়া একসময় তীব্র হয়ে ওকে আচ্ছ্বন্ন ফেলবে ঠিক সেভাবে, যেভাবে ভার্সিটিতে ভর্তির পর পড়াশোনা আর রাজনীতি একবার গিলে নিয়েছিল ওকে। পার্থক্য হচ্ছে পূর্বেরটা ঘটেছিল একবার, এবারেরটা ঘটছে ক্রমাগত। প্রতি রাতে। চলতে থাকলো এই অবস্থা, সেই সময় পর্যন্ত যখন একসময় আশপাশের সবাই বুঝতে শুরু করলো, সানির কিছু একটা হয়েছে।

বাসার সবাই বলছিল বহুদিন ধরেই কিন্তু সানি গা করছিল না। পরিবারের সদস্যরা ভালটা অন্যদের চেয়ে একটু বেশই বাসে। তাই তাদের কাছে ছোট্ট একটু চোখের কোণে কালো দাগও অনেক বড় হয়ে ধরা দেয়। এটা সানি জানতো। কিন্তু একদিন যখন রেহনুমা ম্যা'ম, যিনি সবাইকে নিজের সন্তানের মতো দেখেন, ক্লাসশেষে জিজ্ঞেস করলেন, "মেয়েটার নাম কি?"- তখন ওকে বিষয়টা সিরিয়াসলি নিতেই হয়েছিল। ওদিকে ক্যাম্পাসের বন্ধুরাও অনেকদিন ধরেই বলছিল, দোস্ত তোর কোথাও কিছু একটা হয়েছে। দিন দিন পেইনফুল হয়ে উঠছিস। কি সমস্যা বলতো?

সব মিলিয়ে একটা খারাপ কিছু হয়ে যাওয়ার আগেই ব্যবস্থা নেয়ার উদ্দেশ্য সানি ঠিক করলো মেয়েটিকে মনের কথা লাইন বাই লাইন খুলে বলা হবে। একদম ব্যাখ্যামূলক উপস্থাপনা। কেননা আর কোনো উপায় নেই। আর কোনো অ্যাপ্রোচ সানির সাথে যায় বলে সে সময় মনে হচ্ছিল না।

এক সকালে একসাথে নাস্তা করে ক্লাসে যাওয়ার পথে সানি বড় করে দুইবার নিঃশ্বাস নিয়ে, ব্রেইনকে পর্যাপ্ত অক্সিজেন সরবরাহ করে শুরু করলো। এ্যাই তুমি ক্লাসে যাবার আগে আমার একটা কথা শুনে যাবে?

সাধারণত ঘুম থেকে উঠতে উঠতেই ওদের দুইজনের হাতে সময়ের টানাটানি শুরু হয়ে যেতো। তাই নাস্তাটা ক্যাম্পাসের আসার পর মধুর ক্যান্টিনেই সারতো দু'জন। তারপর তো কলাভবন মাত্র আধ-মিনিটের দুরত্ব।

মেয়েটি দাঁড়ালো। বললো, ক্লাসে যাবার আগেই শুনতে হবে?
-উম, সেটা ছাড়া পরেও হয়। ক্লাসের পরে হলেও সমস্যা নেই।
-আচ্ছা ঠিক আছে। বলো। এখনই শুনি। এমনিতেও ক্লাসের পুরো সময়টা নাহলে মাথায় এই কথাটাই ঘুরপাক খাবে এখন।

সানি জাস্ট এই মুহূর্তটার জন্যই অপেক্ষা করছিল, শুরু করলো০

তোমাকে প্রথমবার দেখা থেকে নিয়ে এ পর্যন্ত প্রতিটি বার এক্সাইটেড ফিল করি নি-
এমন কখনও হয় নি। আমার কাছে মনে হয়, আমরা সম্ভবত নিজেদের খুবই ভাল বন্ধু ঠিকই, কিন্তু নিজেদের বেস্ট ফ্রেন্ড না। আমরা একে অপরের কাছ থেকে বন্ধুত্বেরও বেশি কিছু চাই। আমার মনে হয়, আমরা যদি একে অপরের প্রতি বন্ধুত্বসুলভ নির্লিপ্ততা দেখাই তাহলেই সেটা পরিস্কার হয়ে যাবে। কিন্তু আমরা এখনও যেহেতু কয়েক মাসের বেশি পুরোনো বন্ধু হয়ে যাই নি, তাই সেটা পরখ করে দেখার সুযোগ হয় নি। যাহোক আমি যেটা বলতে চাইছি সেটা হচ্ছে, আমি জানি তুমিও একা। ঠিক আমার মতোই। কিন্তু জানি না, তুমি কি কাউকে খুঁজছো কিনা। কিংবা কারও সাথে নিজের জীবনটাকে জড়ানোর ইচ্ছে তোমার ভেতর এখনও জন্মেছে কিনা। কিন্তু আমরা সবাই পৃথিবীতে এসেছি খুব ছোট্ট একটা সময়ের জন্য। এই সময়ের ভেতর নিজের জীবনকে গুছানো, অর্পিত দায়িত্বগুলো মেটানো, এবং কর্তব্যগুলো সারার পাশাপাশি এমন একজনকে খুঁজে বের করা সত্যিই কঠিন- যাকে ভালবেসে বাকেট লিস্টের সবগুলো কাজে টিকচিহ্ন বসিয়ে দেয়া যায়।

কথোপকথনের এই পর্যায়ে মেয়েটি সানিকে থামিয়ে দিয়েছিল মুখে হাত দিয়ে। এবং হালকা হেসে মাথা নেড়ে সায় দিয়েছিল ওর প্রস্তাবে। বলেছিল, হয়েছে। যথেষ্ট। ক্লাস করে আসছি। ভালোই দেরি হয়ে যাচ্ছে।

বলেই মেয়েটি চলে গিয়েছিল। একমুঠো হাসির রেশ বাতাসে ছড়িয়ে রেখে। সানির কিন্তু তখনও সম্বিত ফেরে নি। ও তখনও প্র্যাকটিস্ করে আসা লাইনগুলো মনে মনে আউড়ে চলছে, আমি যখন তোমার কথা ভাবি, তখন মনে হয় তুমিই সেই মানুষটি যাকে ভালবেসে কোনোদিন আমার মন পুরোপুরি ভরবে না। কোনোদিন মনে হবে না যথেষ্ট ভালবেসেছি, আর ভালবাসতে পারছি না।

তারপর অনেকক্ষণ আনন্দে দুই দিকে দুই হাত প্রসারিত করে চক্রাকারে ঘুরেছিল ছেলেটি। ওই জায়গায়ই, মধুর ক্যান্টিন থেকে কলাভবনে যাওয়ার পথের মাঝামাঝি।

৫.
প্রেমের শুরুর দিন থেকেই নাকি সবকিছুই অন্যরকম লাগা শুরু হয়। সানি খেয়াল করে দেখলো, আগে যেখানে রিকশাওয়ালা পাঁচটা টাকা বেশি চাইলে সে গাঁইগুই করতো, এখন সেখানে বাড়তি টাকাটা দিতে পারার জন্য নিজেকে ভাগ্যবান লাগে। আগে ক্লাসের পড়ার কথা মনে পড়লে একরাশ বিরক্তি ছেঁকে ধরতো, আজকাল সকালে উঠেই আগে ক্লাসের পড়ার না শেষ করলে বরং নিজের ওপর একধরনের বিরক্তি লাগে। আগে সপ্তাহান্তে মা বাজারে যেতে বললে একশো' একটা অজুহাত দাঁড় করাতো ছেলেটা। এখন শুক্রবার সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর থেকে শুধু বাজার না, আর কি কি কাজের মাধ্যমে সেদিন নিজেকে ব্যস্ত রাখা যায় খুঁজতে থাকে সে। কারণ শুক্রবার ক্যাম্পাস বন্ধ। ওই মেয়েটি আসবে না। ওকে ছাড়া দিন কাটানো বড়ই সমস্যা।

ততোদিনে ঢাকা শহরকে হাতের তালুর মতো চেনা হয়ে গেছে সানির। সংগঠন করার দরুন যেমন জানা হয়েছে অনেককিছু, তেমন মেয়েটির সঙ্গে ঘুরে ঘুরে জানা হয়ে গেছে শহরের সব এলাকার বড় বড় খাবারের দোকান এবং তাদের বিশেষত্ব। আর বন্ধু-বান্ধব তো আছেই শহরের বিভিন্ন প্রান্তে। তাদের সাথে দেখা করতে যাওয়া মানেও নতুন নতুন রাস্তা-ঘাট আবিস্কার করা। প্রতিনিয়তই বাড়ছিল ঢাকা শহরের সাথে সানির সম্পর্ক। পাল্লা দিয়ে বাড়ছিল মেয়েটির সাথে ওর গভীরতা।

জীবনের ওই পর্যায়টাকে সানি মনে করে সোনালী সময়। সে সময় না ছিল বড় কোনো চিন্তা, না ছিল কোনো কিছু পরোয়া করার প্রয়োজনীয়তা, না ছিল কাউকে কেয়ার করার অাবশ্যকতা। আর ছেলে হিসেবে কখনোই খারাপ না হওয়ার কারণে, ওকে পছন্দ করা মানুষের সংখ্যাই বেশি ছিল। হেটাররা ছিল সংখ্যালঘু। সময়টাকে উপভোগ করেছে যেমন, কাজেও লাগিয়েছিল সে তেমন। বিশ্ববিদ্যালয় জীবন শেষ করার আগেই সুন্দর একটা চাকরীর অফার পেয়ে গিয়েছিল সে একটা কর্পোরেট অফিসে। বেতনাদি এতোটাই ভাল ছিল যে, ওরা দুইজন জীবনের পরবর্তী পর্যায়, অর্থাৎ বিয়ে করে সংসারী হওয়ার কথা ভাবতে শুরু করে দিয়েছিল প্রায়।

৬.
কিন্তু জীবন তো সবার সবসময় সমান যায় না। এক সকালে ঘুম থেকে উঠে ফোনে মিষ্টি একটা মেসেজ দেখে মনটা আনন্দে ভরে গিয়েছিল সানির। মেয়েটি লিখেছিল, হবুজামাই, আজ আমার ঘুম ভেঙ্গেছে তোমায় স্বপ্নে দেখে। মনে হচ্ছে এখুনি ছুটে যাই তোমার কাছে। কিন্তু যেহেতু আমরা এখন ক্যাম্পাসের সেই ক্রেইজি-কাপলটি আর নেই, তাই অপেক্ষা করে আছি। বিকেলে বের হবো। ঠিক পাঁচটায় তোমার অফিসের নিচে অপেক্ষা করবো। মনে থাকবে তো?

ওরা দু'জনই বড় বড় চিঠিরুপী মেসেজ লিখতে পছন্দ করতো।

সেদিন, মেসেজটা দেখার পরের মিনিটে বিছানা ছাড়া থেকে শুরু করে বিকেল চারটা ঊনষাট মিনিটে অফিসের ডেস্ক পরেরদিনের কাজের জন্য শতভাগ প্রস্তুত করে বের হয়ে যাওয়া পর্যন্ত পুরোটা সময় সানির মাথায় ঘুরেছিল ওই মেয়েটির চেহারা। সে কিন্তু জানে যে, ওর গার্লফ্রেন্ড পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দরী মেয়েটি না। তার গায়ের রং দুধের মতো সাদাও না। কিংবা ফ্যাশনেও ওর গার্লফ্রেন্ড এমন না যে কোনো স্টেটমেন্ট বহন করে। তারপরও সানির কাছে ওর গার্লফ্রেন্ড অনন্য। আর সবার থেকে আলাদা। অন্যরা ওর সম্পর্কে যাই ভাবুক, সে সানির হৃদয়ের রাজকন্যা।

নিচে নেমে অফিসের ঠিক সিড়িঁর সামনেই জটলা করে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেছিল কিছু মানুষকে সানি। সেই জটলার ভেতর থেকে বেরিয়ে আসছিল এমন একটা শব্দ, কিংবা একটা বাতাস, কিংবা একটা শক্তি যেটাকে সানি চায় না তার জীবনে। এক ফোঁটাও চায় না। এক মুহূর্তের জন্যও না।

সানিদের অফিস ভবনের একটা পুরোনো অংশ ভেঙ্গে নতুন করে গড়া হচ্ছিল।
জায়গাটির ঠিক নিচেই ছিল পথচারীদের নিরাপত্তার জন্য বানানো টিনের ছাদ। তারপরও ইটের গতিবেগ বেড়ে টিনসহ নিচের পথচারীদের মাথায় আঘাত হেনেছিল সেদিন বিকেলে।

৭.
ওই আঘাতের পর স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে খুব কষ্ট করতে হয়েছে সানিকে। বাবা-মা-বোনসহ আরও অনেকের অনেক সাধ্য-সাধনায় কোনমতে ফিরেছে স্বাভাবিক জীবনে। শুধু মাঝে মাঝে ওই মেয়েটির কথা সম্পর্ক শুরুর পূর্বের দিনগুলির মতো করে মনে পড়লে, বেচারাকে শেকল পড়িয়ে রাখে সবাই মিলে। নাহলে অনেক সমস্যা এড়ানো সম্ভব হয় না ওর পরিবারের পক্ষে। পরিবারের একজন সদস্য মেন্টালি ব্রোকেন, এটাই তাদের বাস্তবতা।

যে ভবনের ইট পড়ে ওই মেয়েটির মৃত্যু হয়েছিল, সে ভবনের মালিক মাঝে মাঝে খোঁজ-খবর নেন ওই মেয়েটির পরিবারের। ভদ্রলোক সদাশয় মানুষ। যেকোন সময় যেকোন সাহায্যের প্রস্তাব দিয়ে রেখেছেন। আর কীইবা করতে পারেন তিনি? ঢাকা শহরে এমন একটা ঘটনা তো খুব অস্বাভাবিক কিছু না। ঘটে প্রায়ই, যখন ঘটে তখন কিছুদিন এটা নিয়ে কথাবার্তা হয়, তারপর আর কথাবার্তা হয় না। কথাগুলো চাপা পড়ে থাকে শুধু যারা হারিয়ে যায় তাদের স্বজনদের বুকে। আর যাদের হারায় না তারা কখনও এটা নিয়ে কথাই বলে না।
---

পোস্টটি ৪ জন ব্লগার পছন্দ করেছেন

মন্তব্য করুন

(আপনার প্রদান কৃত তথ্য কখনোই প্রকাশ করা হবেনা অথবা অন্য কোন মাধ্যমে শেয়ার করা হবেনা।)
ইমোটিকন
:):D:bigsmile:;):p:O:|:(:~:((8):steve:J):glasses::party::love:
  • Web page addresses and e-mail addresses turn into links automatically.
  • Allowed HTML tags: <a> <em> <strong> <cite> <code> <ul> <ol> <li> <dl> <dt> <dd> <img> <b> <u> <i> <br /> <p> <blockquote>
  • Lines and paragraphs break automatically.
  • Textual smileys will be replaced with graphical ones.

পোস্ট সাজাতে বাড়তি সুবিধাদি - ফর্মেটিং অপশন।

CAPTCHA
This question is for testing whether you are a human visitor and to prevent automated spam submissions.

বন্ধুর কথা

মীর's picture

নিজের সম্পর্কে

স্বাগতম, আমার নাম মীর রাকীব-উন-নবী। এটি একটি মৌলিক ব্লগ। দিনলিপি, ছোটগল্প, বড়গল্প, কবিতা, আত্মোপলব্ধিমূলক লেখা এবং আরও কয়েক ধরনের লেখা এখানে পাওয়া সম্ভব। এই ব্লগের সব লেখা আমার নিজের মস্তিষ্কপ্রসূত, এবং সূত্র উল্লেখ ছাড়া এই ব্লগের কোথাও অন্য কারো লেখা ব্যবহার করা হয় নি। আপনাকে এখানে আগ্রহী হতে দেখে ভাল লাগলো। যেকোন প্রশ্নের ক্ষেত্রে ই-মেইল করতে পারেন: bd.mir13@gmail.com.
ও, আরেকটি কথা। আপনার যদি লেখাটি শেয়ার করতে ইচ্ছে করে কিংবা অংশবিশেষ, কোনো অসুবিধা নেই। শুধুমাত্র সূত্র হিসেবে আমার নাম, এবং সংশ্লিষ্ট পোস্টের লিংকটি ব্যবহার করুন। অন্য কোনো উপায়ে আমার লেখার অংশবিশেষ কিংবা পুরোটা কোথায় শেয়ার কিংবা ব্যবহার করা হলে, তা প্ল্যাজিয়ারিজম হিসেবে দেখা হবে। যা কপিরাইট আইনে একটি দণ্ডনীয় অপরাধ।
ধন্যবাদ। আপনার সময় আনন্দময় হোক।