ইউজার লগইন

ভালিটোভা নদীর তীরে

মাথা ফ্রেশ করার জন্য লিখার প্যানেল খোলার চেষ্টা। সূর্য্যের আলোটা গায়ে মাখতে এখনটার মতো ভাল বছরের আর কোনো সময়ই লাগে না। আর গাছের পাতাগুলোর যে বর্ণিল বাহার, তার ভাষায় রূপান্তর অসম্ভব। ঝরা পাতায় ঢেকে আছে সবুজ ঘাসেভরা মাঠ। এমন দিনে ভরসকালে ঘুম থেকে উঠে দৌড়ে ঘর থেকে পালিয়ে চলে যাওয়া যায়। অনেকদূর।

ট্রেনে করে এরফুর্ট শুধু গেলে হবে না। তারপর ট্রামে করেও শহরের শেষ প্রান্ত পর্যন্ত চলে যেতে হবে। ইউরোপাপ্লাট্জ্। ওখানে গিয়ে থামতে হবে। আশেপাশে ধু ধু চরাচর। সেখানে দূরে দূরে ঘূর্ণায়মান বাতাসের কল। আর হাইওয়ে, আর শাঁ শাঁ করে বের হয়ে যাওয়া দ্রুতগতির গাড়ি। আর চরাচর। আর গাড়ি।

সেই খানটাতে গেলে দেখা পাবো ওর। টানা টানা চোখে কাজল। আর হাতভরা লাল-নীল চুড়ি। বসে আছে আমার জন্য। হাতে পেপার নিয়ে অপেক্ষা করছে। আমরা ওই খান থেকে ব্লাব্লায় করে প্রাগে যাবো। প্রাগৈতিহাসিক প্রাগ।

এতোটা দূর আসা লাগতো না আসলে। প্রাগের বাস কিন্তু ট্রেনস্টেশনের পাশ থেকেই ছাড়ে। প্রতিদিন একবার। কিন্তু আমাদের প্ল্যানটা যে হয়েছে মূহুর্তের মধ্যে। ঠিক এই মুহূর্তে যেতে পারলে যাবো, নাহলে এই কাজটা আর কখনও করা হবে না। এইরকমই ছিল শর্ত। কিন্তু সেটা নানান চিন্তার বেড়াজালে ঘেরা। সে কারণেই ব্লাব্লা কারের অপশনে চোখ বুলানো। যখন দেখলাম সত্যি সত্যিই বিকেল ৫টায় একটা গাড়ি আছে যেটা ইউরোপাপ্লাট্জ্ থেকে ছাড়বে, তখন মনে হয়েছিল, এটা কি একটা সাইন? অবাক হয়েছিলাম।

তারপরও তো সমস্যা শেষ হয় না। হুট করে কোথাও যাওয়ার যতোগুলো সমস্যা থাকা সম্ভব, তার সবগুলোই একটার পর একটা এসে হাজির হয়েছিল। কোনোটাই শেষ পর্যন্ত টিকতে পারে নি। রাত সাড়ে দশটা কি এগারোটার মতো একটা সময়ে, যার গাড়ি সে আমাদের জিজকভ টেলিভিশন টাওয়ারের নিচের নামিয়ে দিয়ে ঠিকই চলে গেল। আমরা এতক্ষণ অন্য অনেকে সাথে ছিলাম, তাই সময়টা ঠিক কিভাবে পার হয়েছিল টের পাইনি। কিন্তু এখন আমাদের দুইজনকে মিলিতভাবে হোটেলে যাওয়ার রাস্তা খুঁজে বের করতে হবে। ফোনের রোমিংটা চালু না করে কোনো উপায় ছিল না। আগে সময়ও পাই নি, নাহলে বাসায় কাজটা করে আসা যেতো। ইন্টারনেট চালু হতেই ঝাপটার মতো সব তথ্য এসে ভিড় করলো। ট্রাম, বাস সবকিছু কোনটার পরে কি, কোথা থেকে কখন ছাড়বে, একটা থেকে আরেকটার কাছে যেতে কোন পথ ধরতে হবে হাঁটার জন্য; সব দ্রুত মাথায় গেঁথে নেয়ার ফাঁকে ফাঁকে পথে যেন হারিয়ে না যাই এজন্য ওর হাতটা শুধু ধরে রেখেছিলাম।

প্রথম ট্রামটা ছিল বাইরের রাস্তার চেয়ে দুই তলা নিচে। একতলা নিচে নামলে একটা ট্রামের লাইন। তার নিচে আরেকটা লাইন। মাটির অতোখানি নিচে এমনিতে তো কোনো কাজ না পড়লে যাওয়া হয় না। যদিও যান্ত্রিক সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে নিচে নেমে যাওয়ার সময় খুব ভাল করে খেয়াল না করলে বিষয়টাকে ছোট-খাটো মাপের অস্বাভাবিক কিছু বলেও মনে হয় না। অনেক শহরের মানুষই প্রতিদিন সকালে বাড়ি থেকে বের হয়ে একবার, এবং রাতে বাড়ি ফেরার আগে একবার মাটির নিচে ঢুকেন। ব্যাপারটা তেমন কিছু না। সেই ট্রামটা থেকে নেমে উঠে আসতে হয়েছিল উপরে। সেখান থেকে বাসে খানিকটা পথ। শহরের প্রায় অন্য এক প্রান্তে, ডেচিনস্কা এলাকায়, ছিল আমাদের দুইদিনের থাকার জায়গা।

একটা কাঠের তৈরি দোতলা বাড়ি। দূর থেকে দেখতে গ্রামের ছোট্ট কুঁড়েঘরের মতো লাগে। সেই বাড়ির চিলেকোঠায় রয়েছে একটি ঘর। বাড়ির মালিক একজন কাউচ-সার্ফার। নিজের বাড়ির একটা ঘরও ছেড়ে দিয়ে রেখেছেন কাউচ-সার্ফারদের জন্য। সেদিন আমাদের প্ল্যানটা যে মুহূর্তের হয়েছিল, সে মুহূর্তে এই বাড়িটার অ্যাডটাই সর্বপ্রথমে এসে বসেছিল, সার্চরেজাল্টের লিস্টিটায়।

বাড়ির মালিক একাই থাকেন। পয়তাল্লিশ-ছেচল্লিশ বছরে এক জাঁদরেল বাসচালক। নাম মার্টিন হোরভিচ। তার বাসে করেই ওই এলাকায় যাই নি। তবে তিনিও বাস চালান। ইন্টারনেটের প্রতি ভয়াবহ আসক্ত। বাস চালানো ছাড়া আর যে একটি মাত্র কাজ তিনি করেন তা হলো সারাদিন কম্পিউটারের মনিটরের সামনে বসে থাকা। শুধু বসে থাকা বলা যায় না, রীতিমতো ডুবে থাকা। তবে কাজের সময় কোনো স্মার্ট যন্ত্র সাথে নেন না তিনি। কাজের সময় কাজ, খেলার সময় খেলা। অনেকটা এমনই তার চিন্তার ধারা। আমাদের সাথে অবশ্য বেশ প্রাণ খুলে কথা বলেছিলেন। তবে খুব বেশি সময়ের জন্য নয়।

আমাদের দু'জনের থাকার জায়গা, রান্নাঘর, টয়লেট, সবই ছিল দোতলায়। মার্টিন ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে পুরো বাড়িটা দেখালো। বাড়ির ইতিহাস শুনে দু'জনই অবাক হলাম। সেই ১২৫৭'র বোহেমিয়া-বাভারিয়ান যুদ্ধে পরাজিত হবার পর কিংডম অব বোহেমিয়ার রাণী নির্বাসিত হয়েছিলেন ওই বাড়িটিতে। সে সময় থেকে নানা হাত ঘুরে, নানা ইতিহাসের অংশীদারীত্ব বগলদাবা করে এখনও স্বমহিমায় দাঁড়িয়ে আছে ছোট্ট ওই দোতলা বাড়িটি। তার চকচকে খয়েরি রং আর কোণায় কোণায় লালের আভা দেখে কে বলবে বাড়ির বছর প্রায় হাজার হতে চললো।

সেদিন গভীর রাতে ওই বাড়ির দোতলার বারান্দায় পাশাপাশি দু'টি হাতে বোনা বেতের চেয়ারে বসে, আকাশের তারা দেখতে দেখতে আমরা ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। তাই গভীররাতে প্রাগ শহরের পথে একদম হারিয়ে যাওয়ার অভিজ্ঞতাটা নেয়া হয় নাই। ওটা প্রথমরাতেই করার খুব দরকার ছিল। কেননা পরের দিন রাত হওয়ার আগেই শহরের অনেক কিছুই চেনা, জানা, দেখা হয়ে যাবে জানতাম আমরা। যেই মুহূর্তে প্ল্যানটা হচ্ছিল, সেই মুহূর্তেই কাজটা করার কথা ঠিক করে রেখেছিলাম কিন্তু ঘুমের কারণে সেই পরিকল্পনাটা অসম্পূর্ণই রয়ে গিয়েছিল।

পরের দিন হয়েছিলও তাই। আমরা এতো হেঁটেছি, এতো হেঁটেছি যে আমাদের পা ব্যথা করছিল। গভীর রাতে ভালিটোভা নদীর তীরে ঘাসের বনে বসে আমরা বব ডিলানের গান গাইছিলাম।

পোস্টটি ১ জন ব্লগার পছন্দ করেছেন

মন্তব্য করুন

(আপনার প্রদান কৃত তথ্য কখনোই প্রকাশ করা হবেনা অথবা অন্য কোন মাধ্যমে শেয়ার করা হবেনা।)
ইমোটিকন
:):D:bigsmile:;):p:O:|:(:~:((8):steve:J):glasses::party::love:
  • Web page addresses and e-mail addresses turn into links automatically.
  • Allowed HTML tags: <a> <em> <strong> <cite> <code> <ul> <ol> <li> <dl> <dt> <dd> <img> <b> <u> <i> <br /> <p> <blockquote>
  • Lines and paragraphs break automatically.
  • Textual smileys will be replaced with graphical ones.

পোস্ট সাজাতে বাড়তি সুবিধাদি - ফর্মেটিং অপশন।

CAPTCHA
This question is for testing whether you are a human visitor and to prevent automated spam submissions.

বন্ধুর কথা

মীর's picture

নিজের সম্পর্কে

স্বাগতম। আমার নাম মীর রাকীব-উন-নবী। জীবিকার তাগিদে পরবাসী। মাঝে মাঝে টুকটাক গল্প-কবিতা-আত্মজীবনী ইত্যাদি লিখি। সেসব প্রধানত এই ব্লগেই প্রকাশ করে থাকি। এই ব্লগে আমার সব লেখার কপিরাইট আমার নিজেরই। অনুগ্রহ করে সূ্ত্র উল্লেখ না করে লেখাগুলো কেউ ব্যবহার করবেন না। যেকোন যোগাযোগের জন্য ই-মেইল করুন: bd.mir13@gmail.com.
ধন্যবাদ। হ্যাপি রিডিং!