ইউজার লগইন

জীবনের যে সৌন্দর্য দেখার জন্য সৎ-সাহস অপরিহার্য

আমাদের একজনের চলে যাওয়ার খবর পেলাম আজ। কিভাবে তিনি চিরতরে হারিয়ে গেলেন সেটা এ লেখায় বসার পূর্ব পর্যন্ত নিশ্চিত হওয়া যায় নি। শুধু এটুকুই জানা গেছে তিনি আর নেই। আর কোনোদিন তার হাত দিয়ে নতুন কোনো লেখা বের হবে না। নিভে গেছে একজন মায়ের স্বপ্নের বাতি, যার নাম ছিল অর্পিতা রায়চৌধুরী।

আমার আজকের লেখাটা প্রবাস জীবনের ছোটখাটো টুকিটাকি নিয়ে। চার বছরের বেশি সময় প্রবাসে থেকেও এ পর্যন্ত কোনো ভবিষ্যত নিশ্চিত করতে পারি নি। যে কারণে আমি খানিকটা ডিপ্রেসড্। এখনও ভবিষ্যত নিশ্চিত করতে না পারার কারণ উদ্ঘাটনের প্রচেষ্টা থাকবে এই লেখায়। যদিও একটা লেখার ভেতর এমন বড় পরিসরের বিষয়বস্তু পরিস্কারভাবে তুলে ধরা সম্ভব না। তাই চেষ্টাটা থাকবে মূলত কোন কোন ক্ষেত্রে আমি উন্নতি করার চেষ্টা করছি এবং কিভাবে সেটা আমাকে লক্ষ্যের কাছাকাছি নিয়ে যেতে পারে সেদিকে এই লেখার গতিপথটা ধরে রাখার।

জার্মানিতে লেখাপড়া শেষ হলে সরকার একটা দেড় বছরের ভিসা দেয় চাকুরী খোঁজার জন্য। আমি সেই ভিসারও প্রায় শেষ ভাগে চলে এসেছি। এ পর্যন্ত যা হয়েছে তাকে এক কথায় বলা যায়, শুধুই প্রতিনিয়ত নিজের সাথে লড়াই করে যাওয়া। এ লড়াইয়ের সাহস আর অনুপ্রেরণাটুকু আমি পেয়েছি পরিবার আর বন্ধুদের কাছ থেকে। তবে লড়াইয়ের ভেতরকার কিছু কিছু দিনে চাইলেও কেউ পারে নি, কথা কিংবা কাজে আমার মনকে খারাপ থেকে ভাল করে দিতে। আসলে যারা জানে না প্রবাসে একটা মানুষের জীবনের কষ্টটা ঠিক কোথায়, তাদেরকে সেটা কখনো বোঝানো যায় না। প্রবাসে সবকিছুর ভেতর ঠিক মধ্যমনি হয়ে বসে থাকে একটা সীমাহীন শূন্যতা। যা অতিক্রম করা দুঃসাধ্য।

তবে আমি যে প্রশ্নের উত্তরটা খুঁজে পাই না, সেটা হচ্ছে তাহলে কি আমার মতো যারা, তারা কেউই জীবনে প্রকৃত সুখী হতে পারে না? প্রকৃত সুখ কথাটার প্রকৃত সংজ্ঞাটাই বা কি? আমি তো দেখি কেউ নতুন গাড়ির ঘ্রাণে সুখ খুঁজে পায়, আবার কেউ পায় নতুন বইয়ের ঘ্রাণে। কারও সুখ লুকিয়ে থাকে সঙ্গীর শরীরের ঘামের স্বাদে, তো কারও সুখ লুকিয়ে থাকে প্রিয়জনের মুখের হাসির কোণে। তার মানে কি সামগ্রিকভাবে এই ছোট ছোট সুখের বিষয়গুলোর সম্মিলনকে বলা যেতে পারে প্রকৃত সুখ? তাহলে তো যার যতোবেশি ছোট ছোট চাহিদা, তার জন্য প্রকৃত সুখী হওয়া ততো কঠিন, কিন্তু মানুষের কাছে তো এমন কোনো জাদুর কাঠি নেই, যা দিয়ে নিজের চাহিদাকে লাগাম পড়ানো যায়।

আমার একটা সুখের উৎস হচ্ছে- আমি মদ্যপানকে প্রায় শূন্যের কোঠায় নামিয়ে এনেছি বহু আগে। একসময় আমার প্রায় সব সংকটের সমাধান ছিল ছয়-সাতটি ৫০০ মিলিলিটার বোতলের বুদভাইজার বা অগাস্টিনা। এই অভ্যাসটা ধরিয়েছিল তুরস্কের ছেলে একিন। তারও প্রায় সব সমস্যার সমাধান ছিল একই। যেদিন থেকে বুঝতে পেরেছি বুদভাইজার, অগাস্টিনা কিংবা অন্য কোন বিয়ারই সমস্যার সমাধানে সমর্থ নয়, বরং সমস্যার ওপর বাড়তি একটা মাথাব্যাথা আর অনাকাঙ্ক্ষিত শারীরিক উপসর্গ যোগের ক্ষমতা রাখে শুধু, সেদিন থেকে আর আমার বিয়ার কিংবা কোনোরূপ অ্যালকোহল সম্বলিত পানীয় ভাল লাগে না। সামাজিক অনুষ্ঠানগুলোতে, বিশেষ করে নেটওয়ার্কিং সম্পর্কিত যেগুলো, সেগুলোতে আমি যেটা করি সেটা হচ্ছে একটা লম্বা আকৃতির ককটেইল নিয়ে পুরো সময়টা কাটিয়ে দিই। মানুষের পাকস্থলী সুস্থ শরীরে একটা যেকোন আকৃতির ককটেইল খুব সহজেই পরিপাক করতে পারে- যদি না সেটা দুই-তিন পরপর চুমুকে কিংবা তারচেয়ে কম চুমুকে শেষ করে ফেলা হয়। শরীরই আমার কাছে মুখ্য, অ্যালকোহল গ্রহণের মাত্রা শূন্যের কাছাকাছি নামিয়ে আনার কারণ হিসেবে।

মারিয়ুয়ানা সেবনও ছেড়ে দিয়েছি। যদিও দ্রব্যটির ভাল বই খারাপ কোনো দিক নেই, তারপরও। খারাপ যা কিছু দিক সর্বজনবিদিত হিসেবে প্রতিষ্ঠিত তার সিংহভাগ মূলত গত পাঁচ কিংবা ছয় দশক ধরে চলে আসা ওষুধপ্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানের প্রবঞ্চনামূলক প্রচার কার্যক্রমের ফলাফল। আধুনিক বিশ্ব এখন সেটা বুঝতে শিখেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, কানাডাসহ পৃথিবীর বেশ কিছু দেশের উল্লেখযোগ্য সংখ্যক রাষ্ট্রে মারিয়ুয়ানার চাষ ও সেবন বৈধ ঘোষণা করা সেটারই নির্দেশক। তবে আমি মারিয়ুয়ানা সেবন করলে প্রায়ই অন্তর্মুখী হয়ে যাই, এবং অনেক সময় অনেককেই অনুচিত রকমের ছাড় দিয়ে দিই। এটা বুঝতে পারার পর দ্রব্যটি সেবন করা ছেড়ে দিয়েছি। হয়তো স্বভাবটা পরিবর্তন করা গেলে সেবন ছাড়তে হতো না, কিন্তু আমার আসলে আরও অনেক স্বভাব রয়েছে, যেগুলোতে পরিবর্তন আনা ওটার চেয়ে বেশি জরুরি। প্রাধান্যের তালিকাটাকে সোজাসুজি ধরে রাখার উদ্দেশ্যেই মারিয়ুয়ানা সেবন ছেড়ে দেয়া।

পরিবর্তন আনতে হবে আমার দৈনন্দিন জীবনের কর্মতালিকায়ও। সকালে বিছানা ছাড়াটা যদিওবা এখন আগের মতো কষ্টকর কিছু মনে হয় না, কিন্তু কিছু কিছু দিন এখনও সেই আগের মতো বিছানায় শুয়ে শুয়ে সবকিছুকে হাত গলে বের হয়ে যেতে দিই। আর যেটাকে একেবারেই বাগে আনতে পারছি না সেটা হচ্ছে- রাতের ঘুম। তাড়াতাড়ি ঘুমাতে গেলে মধ্যরাতে ঘুম ভেঙ্গে যায়, এবং আমি অন্ধকারের ভেতর চোখ খুলে শুয়ে থাকি। পানি কিংবা খাদ্যদ্রব্য গ্রহণ করে, টয়লেট করে কিংবা কিছুক্ষণ অন্য কিছু করে- কোনোভাবেই ঘুমের ভেতর ফিরে যেতে পারি না। আর দেরি করে ঘুমাতে গেলে ঘুমই আসে না। আমার আসলেই ঘুমের সমস্যা আছে।

সমস্যা আছে প্রত্যুৎপন্নমতিত্ব দেখিয়ে যেকোন কিছু করার ক্ষেত্রেও। আমার জন্য সবচেয়ে কঠিন কাজগুলোর একটা হচ্ছে- যদি আমাকে মুহূর্তের মধ্যে জরুরি একটা সিদ্ধান্ত নিতে বলা হয়। অথচ আমার আশেপাশে এমন অনেকেই আছে যারা ঘটনা ঘটার আগেই কি কি করতে হবে সব হিসেব-নিকেশ করে নিয়ে ঘটনার জন্য বসে অপেক্ষা করতে পারে। ঠিক যেন শার্লক হোমস্। তেমনি একজন ছিল আমার সর্বশেষ কমস্থলের বস্। আমাকে তার দিকে যেতে দেখলেই, কি কারণে আমি আসছি, সেটা অনুমান করে বলে দেয়াটা ছিল তার প্রিয় খেলাগুলোর একটা। শতকরা ৯৯ ভাগ সময় তিনি সঠিক হয়েছিলেন। আমাদের ১০ মাসের একত্র কর্মজীবনের পুরোটা অনেক অনেক সুন্দর মুহূর্ত দিয়ে ঘেরা। যার অনেকগুলোই সম্ভব হয়েছিল তার অসামান্য প্রত্যুৎপন্নমতিত্বের কারণে।

বলতে কোনো দ্বিধাবোধ করছি না যে, আমি তার প্রেমে পড়েছিলাম। তবে কোনোদিন সাহস করে কফি কিংবা অন্য কিছু পানের আহ্বান জানাতে পারি নি। প্রবাসে কাউকে ভাল লাগলে, সাধারণ নিয়ম হচ্ছে তাকে কফি কিংবা অন্য কিছু পানের আহ্বান জানানো। তবে তার মতো একজন বুদ্ধিমতীর জন্য আমার মনোভাব অনুধাবন করা কঠিন কিছু হওয়ার কথা ছিল না। যে কারণে কফি কিংবা অন্য কিছু পানের আহ্বান না জানানোর ব্যাপারটা আমাকে খুব বেশি পীড়া দেয় না। শতকরা ৯৯ ভাগ সম্ভাবনা ছিল যে, আমি ওই আহ্বানটি জানালেই- আমাদের সুন্দর সম্পর্কটা নষ্ট হয়ে যেত। যেটা কোনোকিছুর বিনিময়েই আমি চাই নি। শতকরা এক ভাগ সবকিছু আমার দেখা স্বপ্নগুলোর মতো হওয়ার সম্ভাবনার বিনিময়ে তো মোটেই না। তবে এই ঘটনার ফলাফল হিসেবে আমি যে আরও খানিকটা অন্তর্মুখী হয়ে গেছি, সেটা আজকাল বেশ টের পাই।

এখানেও পরিবর্তন আনার প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য। প্রবাসে অন্তর্মুখী ভাবধারার কোনো উপকার নেই। বরং পদে পদে বঞ্চিত হতে হয় ছোট-বড় নানারকম সুযোগ থেকে। পৃথিবীর যে দেশে জীবনযাত্রা যতো উন্নত, সে দেশের জনগণ ততো বেশি সুযোগের ব্যবহারে পারদর্শী। আসলে সুযোগগুলো তো মহাকাল আমাদের জন্য তৈরিই করে ব্যবহারের উদ্দেশ্যে। যারা সুযোগ গ্রহণ করতে জানে না, তারা খুব বেশি সমবেদনা পাওয়ার অধিকারও রাখে না। ইংরেজিতে একটা কথা আছে-

Seize the opportunity

.

কথাটা কিন্তু খুবই ইতিবাচক। যদিও বাংলায় সুযোগ শব্দটার সাথে ব্যবহার করা যায় এমন খুব বেশি ইতিবাচক শব্দ পাওয়া যায় না। জাতিগতভাবেই কি আমরা খানিকটা নেতিবাচক? হতেও পারে। 'বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবনী'তে আছে, পরশ্রীকাতরতা শব্দটি নাকি পৃথিবীর অন্য কোনো অভিধানে নেই। আমিও অন্তর্জালে খোঁজাখুজি করে তেমন কিছু পাই নি। থেকে থাকলেও আমার জানাশোনার মধ্যে নেই। ব্যাপারটা মর্মপীড়াদায়ক। আমরা নিজেদের দোষ, অতীতের ভুল ইত্যাদি গোপন করে রাখতে ভালবাসি, কিন্তু ভুলে যাই যে ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে সামনে এগিয়ে যাওয়ার প্রথম ধাপ হচ্ছে সেই ভুলকে স্বীকার করে নেয়া। দ্বিতীয় ধাপ হচ্ছে ভুলের কারণে ক্ষতিগ্রস্থদের কাছে দায়িত্বশীলভাবে ক্ষমাপ্রার্থনা করা। ইলমিনাউ প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র হিসেবে আমাকে "ক্রস-কালচারাল ক্রাইসিস কমিউনিকেশন" বিষয়ের উপর একটি গবেষণা করতে হয়েছিল। সে গবেষণার মূল প্রশ্নটি ছিল- জার্মান গাড়ি প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান ফোক্সভাগেন তাদের গাড়িতে যে কার্বন মনোঅক্সাইড নিঃসরণের মাত্রা কম করে দেখানোর যন্ত্র সংযোজন করেছিল, সেটার জন্য বিশ্বের কোন কোন দেশের ভোক্তাদের কাছে তারা ক্ষমা চেয়েছে, এবং সেই ক্ষমা কি শুধুই ক্ষমাপ্রার্থনা ছিল নাকি দায়িত্বগ্রহণপূর্বক ক্ষমাপ্রার্থনা ছিল?

এইসব বিষয়ে লিখছি এ কারনে যে, আমি সত্যিই বিশ্বাস করি অতীতের ভুলকে গোপন করে রাখার ভেতর কোনো মহিমা লুকিয়ে নেই। নিজের দোষকে স্বীকার করতে না পারা, না চাওয়া, এবং সজ্ঞানে স্বীকার না করে নেয়া আসলে সেই দোষের পুনরাবৃত্তির পথকেই পরিস্কার করে। অপরদিকে নিজের ভুল জনসমক্ষে স্বীকার করে নেয়া নির্দেশ করে উক্ত ব্যক্তি সত্যিকার অর্থেই সেই ভুলের পুনরাবৃত্তি নিজের সাথে কিংবা অন্য কারও ঘটুক- তা দেখতে চায় না। পৃথিবীর বড় বড় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে এ বিষয়ের ওপর গবেষণা হয়েছে। সেগুলো পড়ে পড়ে আমাকে উল্লিখিত "ক্রস-কালাচারাল ক্রাইসিস কমিউনিকেশন" বিষয়ের গবেষণাপত্রটির 'স্টেট-অফ-দি-আর্ট' অধ্যায়কে সাজাতে হয়েছিল।

আমি আরও চেষ্টা করছি নিজের সৎ-সাহসের পরিধি যতোটা সম্ভব বাড়িয়ে তোলার। এই একটা বিষয়ের সাথে সম্ভবত আমাদের বেড়ে ওঠার যোগসাজশ খুব বেশি। তবে শরীরচর্চা, ধ্যান, সঠিক পন্থায় চিন্তা-ভাবনা করা- ইত্যাদি এই ক্ষেত্রটিতে উন্নতির উদ্দেশ্যকে যেকোন বয়সেই সাহায্য করে। যদিও আমি চেষ্টা করে যাচ্ছি, তবে সত্যি কথা বলতে কি, পৃথিবীর বিভিন্ন রকমের বিষয় এখনও বেশ ভালভাবেই আমার বুকে দুরুদুরু কাঁপন ধরাতে পারে। যেমন, আগামী ছয় মাসের মধ্যে একটি চাকুরী খুঁজে না পেলে আমাকে দেশে ফিরে যেতে হবে। দেশে গত চার বছর থাকলে হয়তো আজ আমার 'ক্যারিয়ার' নিয়ে ভাবতে হতো না। শেষ চার বছর আমি বিনিয়োগ করেছি একটি স্বপ্ন বির্নিমাণে। দেশে ফিরে গেলে সেই স্বপ্নের নির্মাণ হবে না।

যাহোক লেখাটা শেষ করবো আমার খুব প্রিয় একজন অভিনেতার বলা একটা কথা দিয়ে। উইল স্মিথ। তিনি আমার জীবদ্দশায় দেখা সেরা অভিনেতাদের মধ্যে একজন। তিনি একটা টক-শো'তে বলেছিলেন, তুমি যখন উড়ন্ত বিমানের খোলা দরজা থেকে ঝাপটা দিয়েই দেবে- ঠিক তারপরের মুহূর্তে তুমি বুঝতে পারবে আসলে জীবনটা কতোটা সুন্দর।

কথাটা উইল স্মিথ বলেছিলেন নিজের প্যারা-জাম্পিংয়ের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করতে গিয়ে। কথাটা আমি যখনই কোনো রোলার কোস্টার রাইডে চড়তে যাই তার আগে আগে মনে করি। তবে আমার মনে হয় কথাটাকে আরও অনেক কিছুর সাথেই সংযুক্ত করা যায়। আমার একটা ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা কথাটাকে দারুণভাবে প্রমাণ করেছে। সেই অভিজ্ঞতাটাই আজকের লেখার শেষ উপজীব্য।

গত নভেম্বরের শুরুর দিকেও আমি জানতাম না, মধ্য-জার্মানী ছেড়ে আমাকে পশ্চিম-জার্মানীতে পাড়ি জমাতে হবে। আমি ছিলাম নিজের মতো। অক্টোবরের শেষ সপ্তাহে ক্যাম্পাসে একটা চাকুরী-মেলা হয়েছিল। সেটার জন্য একটা ওয়েবসাইট বানিয়ে নিয়ে গিয়েছিলাম। নিজের কোনো অ্যান্ড্রয়েড ট্যাব কিংবা আইপ্যাড নেই, তাই এক বন্ধুর আইপ্যাড ধার করে নিয়ে যেতে হয়েছিল। লক্ষ্য ছিল চাকুরীদাতাদের আমার বানানো ওয়েবসাইটটা সরাসরি দেখিয়ে দেয়ার। ওয়েবসাইটটা ছিল মূলত আমার 'অনলাইন রেজুমি'। ওয়ার্ডপ্রেসে বানানো। সময় লেগেছিল ঘন্টা তিনেক। ওয়ার্ডপ্রেসে দারুণ দারুণ কিছু বিনামূল্যের থিম রয়েছে। ওগুলো দিয়ে চমৎকার সব অনলাইন রেজুমি বানানো যায়। সাধারণত আমি যেটা করতাম সেটা হচ্ছে, প্রত্যেকটা চাকুরী মেলার আগে আগে কয়েক কপি রেজুমি প্রিন্ট করতাম। তারপর সেই হার্ডকপিগুলো নিয়ে যেতাম মেলায়। চেষ্টা থাকতো চাকুরীদাতাদের সাথে আলাপ-আলোচনা সেরে একটা করে রেজুমি দিয়ে আসার। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই যেটা হতো যে, আলাপ শেষ পর্যন্ত রেজুমি হাতবদলের পর্যায়ে পৌঁছাতো না। তাই সেবারের মেলার উদ্দেশ্যে ভিন্নভাবে পরিকল্পনা করেছিলাম। সেই অনুযায়ী বেশ কয়েকজনকে আমার অনলাইন রেজুমি দেখানোও হয়েছিল। যেই দেখেছে মুগ্ধ হয়েছে। ই-মেইল করে রেজুমির পিডিএফ-ফর্ম্যাট পাঠাতে বলেছে।

সেসব করে-টরে যথারীতি আমি নভেম্বরে আমার পুরোনো জীবনে ফিরে যাই। প্রিয় বস-এর সাথে প্রতিদিন কাজ করি, নানারকম বিষয়ে কথা বলি, কিন্তু আসল কথা বলি না। এরই মধ্যে এক বন্ধু ফোন করে জানালো, সে বন শহরের কাছাকাছি একটা হোটেল চালু করতে চায়, এবং তার একজন সহকারী প্রয়োজন ঠিক আমার মতো। কারণ আমি তাকে বন্ধুদের মধ্যে সবচেয়ে ভাল বুঝতে পারি, এবং সে-ও আমার সাথে যেকোন বিষয়ে অবাধে আলোচনা করতে পারে। সে চায় আমি যেন তার সাথে যোগদান করি, বিনিময়ে আমার ভিসা-সংক্রান্ত যে চাকুরীগত জটিলতা সেটি সমাধানের লক্ষ্যে সে আমাকে প্রয়োজনীয় চুক্তিপত্রসহ বেতনভুক্ত সহকর্মী হিসেবে নিয়োগ দেবে।

আমার জায়গা থেকে দেখলে প্রস্তাবটি আসলেই ফেলে দেয়ার সুযোগ নেই। আমি তা করিও নি। নভেম্বরের দ্বিতীয় সপ্তাহে আমরা দুই বন্ধু বনের কাছাকাছি একটা শহর, যার নাম রেমাগেন, সেখানে গিয়ে ওই হোটেলটিতে উঠে পড়লাম। হোটেলটি দুই বছর ধরে বন্ধ পড়ে আছে। তার আগে পাঁচ তারকা হোটেল হিসেবে দীর্ঘদিন এলাকায় একচেটিয়া ব্যবসা করেছিল। আমাদের কাজ ছিল হোটেলটিকে পুনরায় চালু করা। যা এককথায় প্রায় অসাধ্য ছিল। তারপরও আমি আমার ছোট্ট চাকুরীটি ছেড়ে এবং বাড়িওয়ালাকে নভেম্বরের পর বাসা ছেড়ে দেয়ার নোটিশ দিয়ে কাজে লেগে গিয়েছিলাম।

নভেম্বরের তৃতীয় সপ্তাহের শেষ নাগাদ গিয়ে বোঝা গেল আমাদের দ্বারা ওই হোটেল পুনরায় চালু করা সম্ভব নয়। সে সময় আমার বন্ধুর মুখের দিকে আক্ষরিক অর্থেই তাকানো যাচ্ছিল না। সে আমার অবস্থা সম্পর্কে সবকিছুই অবগত ছিল। তার নিজেরও প্রাথমিকভাবে প্রায় ১৫ হাজার ইউরো খরচ হয়ে গেছে। সবকিছুর পর আমরা দু'জনে প্রায় নিঃস্ব অবস্থায় হাড় জমে যাওয়া ঠান্ডা ওই হোটেলের একটি কক্ষে শেষ রাতটি পার করছিলাম। সিদ্ধান্ত হয়ে গিয়েছিল যে, তার পরের দিন সকালে সেই হোটেল ছেড়ে চলে যাবো দু'জনই। আগের দু'সপ্তাহ হোটেলের একটা কক্ষে আমরা দু'জন থেকেছি, এবং হোটেলের যতোদূর সম্ভব মেরামতের চেষ্টা করেছি। তবে পানি আর গ্যাসের লাইন কোনোভাবেই মেরামত সম্ভব ছিল না বলে শেষ পর্যন্ত আমাদেরকে সিদ্ধান্ত বদলাতে হয়েছে। সে রাতে আমিই চেষ্টা করছিলাম বন্ধুকে স্বান্তনা দেয়ার। যদিও পরের মাসে অর্থাৎ ডিসেম্বরে কোথায় থাকবো কিংবা কি করবো তার কোনো নিশ্চয়তা আমারও ছিল না। আমার বন্ধু ছিল আমার চেয়েও বেশি উদ্বিগ্ন। সে রাতটাও পার করতে পারে নি হোটেলে। আমরা মধ্যরাতে হোটেল ছেড়ে বের হয়ে পড়েছিলাম হাইওয়েতে।

সেই সময়টা আমার কাছে ছিল খাদের কিনারা থেকে ঝাপ দেয়ার মতোই একটা সময়। প্রতিদিনই একবার করে উইল স্মিথের সেই ভিডিও ক্লিপটার কথা মনে হচ্ছিল। তার চোখের দ্যূতি কেন যেন ভুলতে পারছিলাম না। সেই সময়টায় হঠাৎ একদিন ফোন খুলে দেখি একটা মিস্-কল এসে আছে। আমি বাড়তি সব ধরনের খরচ বন্ধ করে দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম বলে দরকার ছাড়া আমার ফোনের লক খুলতাম না। ওয়াই-ফাই জোনের ভেতরে থাকলেই কেবল ফোন খুলতাম। অন্য সময় মনে হতো ফোন খুললেই অন্তর্জালের হাতছানি এড়াতে পারবো না। যাহোক মিস্-কল আসা নাম্বারটায় ফোন করতেই যিনি ধরলেন, তার নাম শুনেই মনে পড়ে গেল- আরে! এই ভদ্রলোক তো আমার অনলাইন-রেজুমিটা খুবই পছন্দ করেছিলেন।

ঘটনাটা ছিলও তাই। তিনি আমাকে ফোন করেছিলেন মূলত একটি ইন্টার্নশীপের প্রস্তাব দেয়ার জন্য। তাও আবার সম্ভব হলে সেদিন থেকেই শুরু করার আর্জি সহকারে। আমি বলেছিলাম, প্রথমে একদিন আমরা দেখা করি, আপনি আমার একটা ইন্টারভিউ জাতীয় কিছু নেন, আমিও কথা বলে দেখি- তারপরে নাহয় একটা সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যাবে। তিনি তাতেও রাজি। কথা হলো পরের শুক্রবারেই আমি তার কার্যালয়ে যাবো এবং আমরা কিভাবে আগামী দিনগুলোতে একত্রে কাজ করা যায় তার একটা উপায় খুঁজে বের করবো। উপায় যেটা হয়েছে, সেটা হচ্ছে এখন আমি তার অধীনে ইন্টার্নশীপ করছি। তার কোম্পানি থেকে আমার থাকার জন্য একটা বাসা দেয়া হয়েছে। জার্মানিতে নূন্যতম বেতনের একটা ধাপ রয়েছে। আমাকে তার চেয়ে সামান্য বেশি বেতন দেয়া হয়। ভদ্রলোক বলেছেন, ইন্টার্নশীপ শেষে তিনি আমাকে তার কোম্পানিতে পাকাপাকিভাবে নিয়ে নেয়ার সর্বোচ্চ চেষ্টা করবেন।

আমি কিন্তু এখনও উইল স্মিথের কথাটাই বলতে চাই। খাদের কিনারা থেকে ঝাপ না দেয়ার আগ পর্যন্ত জীবনের সৌন্দর্যটা অধরাই থেকে যায় আমাদের কাছে।

যাহোক লেখার শেষ প্রান্তে পৌঁছে গেছি। ভাল থাকবেন সবাই। প্লীজ্ কোনকিছুতে ডিপ্রেসড্ বোধ করলে তা নিয়ে অন্যদের সাথে আলাপ করবেন। যেমন আমি এখানে করলাম। এখন কিন্তু আমি অনেক ভাল বোধ করছি, পরিস্কারভাবে ভাবতে পারছি অনেক কিছু। আপনারাও কেউ প্লীজ্ নিজের ভেতর ডিপ্রেশন চেপে রাখার চেষ্টা করবেন না। ডিপ্রেশন আমাদের ভেতর থেকে অনেক সম্ভাবনাকে অকালে কেড়ে নিয়ে গেছে। আর যেন কেউ ডিপ্রেশনের স্বীকার না হতে পারে, সেজন্য দয়া করে নিজের দিকে এবং নিজের চারপাশের মানুষের দিকে আসুন একটু বাড়তি নজর দিই। ডিপ্রেশন লুকিয়ে থাকে অনেক রকম লক্ষণের ভেতরে। অপরিস্কার জামা-কাপড়ের দিকে দীর্ঘদিন নজর না দেয়া, দিনের পর দিন ঘর না গোছানো ইত্যাদি ডিপ্রেশনের খুবই চেনাজানা লক্ষণ। নিজেকে বা কাউকে এ অবস্থায় পেলে প্লীজ তাকে সাহায্য করুন।

সবার জন্য শুভকামনা।

---

পোস্টটি ৮ জন ব্লগার পছন্দ করেছেন

মোঃ শরিফুল ইসলাম's picture


দীর্ঘ লেখাটি পড়লাম খুব মনোযোগ সহকারে,খুবই তাৎপর্যপূর্ণ!

মীর's picture


ধন্যবাদ Smile

লাবণী's picture


লেখাটি আরো এক সপ্তাহ আগে পড়েছিলাম অফ লাইনে দুই দিন সময় নিয়ে। নিজের জীবনের কথাগুলো শেয়ার করে ভালো করেছেন। অনুপ্রাণিত হলাম, নিজেও লিখার।
" তুমি যখন উড়ন্ত বিমানের খোলা দরজা থেকে ঝাপটা দিয়েই দেবে- ঠিক তারপরের মুহূর্তে তুমি বুঝতে পারবে আসলে জীবনটা কতোটা সুন্দর।"
কথাটা আমার মনে হয় জীবনের প্রতিটি ডিসিশন মেকিং এর ক্ষেত্রে বেশি প্রযোজ্য!
ভালো থাকবেন!

মীর's picture


থ্যাংক্স লাবণী। আপনাকে অনেকদিন পর দেখলাম। ভাল আছেন তো?
আর লেখার অনুপ্রেরণা পেয়েছেন জেনে খুবই ভাল লাগলো। প্লীজ লিখুন। লিখার মধ্য দিয়ে আমরা অনেক পরিস্কারভাবে চিন্তা করতে পারি। আমি নিজের ক্ষেত্রে দেখেছি বিষয়টা দৈনন্দিন জীবনের জন্য খুবই হেল্পফুল।

লাবণী's picture


অ-নে-ক দিন বটে! প্রায় সাত বছর পর!!! ভালো আছি কিনা জানিনা, ভালো থাকার চেষ্টাটা সবসময়ই করি। এখানে মনে হয় থিওরি অব রিলেটিভিটির ব্যাপার স্যাপার আছে! Thinking
আপনিও ভালো থাকবেন.....সবসময়!

মন্তব্য করুন

(আপনার প্রদান কৃত তথ্য কখনোই প্রকাশ করা হবেনা অথবা অন্য কোন মাধ্যমে শেয়ার করা হবেনা।)
ইমোটিকন
:):D:bigsmile:;):p:O:|:(:~:((8):steve:J):glasses::party::love:
  • Web page addresses and e-mail addresses turn into links automatically.
  • Allowed HTML tags: <a> <em> <strong> <cite> <code> <ul> <ol> <li> <dl> <dt> <dd> <img> <b> <u> <i> <br /> <p> <blockquote>
  • Lines and paragraphs break automatically.
  • Textual smileys will be replaced with graphical ones.

পোস্ট সাজাতে বাড়তি সুবিধাদি - ফর্মেটিং অপশন।

CAPTCHA
This question is for testing whether you are a human visitor and to prevent automated spam submissions.

বন্ধুর কথা

মীর's picture

নিজের সম্পর্কে

স্বাগতম, আমার নাম মীর রাকীব-উন-নবী। এটি একটি মৌলিক ব্লগ। দিনলিপি, ছোটগল্প, বড়গল্প, কবিতা, আত্মোপলব্ধিমূলক লেখা এবং আরও কয়েক ধরনের লেখা এখানে পাওয়া সম্ভব। এই ব্লগের সব লেখা আমার নিজের মস্তিষ্কপ্রসূত, এবং সূত্র উল্লেখ ছাড়া এই ব্লগের কোথাও অন্য কারো লেখা ব্যবহার করা হয় নি। আপনাকে এখানে আগ্রহী হতে দেখে ভাল লাগলো। যেকোন প্রশ্নের ক্ষেত্রে ই-মেইল করতে পারেন: bd.mir13@gmail.com.

ও, আরেকটি কথা। আপনার যদি লেখাটি শেয়ার করতে ইচ্ছে করে কিংবা অংশবিশেষ, কোনো অসুবিধা নেই। শুধুমাত্র সূত্র হিসেবে আমার নাম, এবং সংশ্লিষ্ট পোস্টের লিংকটি ব্যবহার করুন। অন্য কোনো উপায়ে আমার লেখার অংশবিশেষ কিংবা পুরোটা কোথায় শেয়ার কিংবা ব্যবহার করা হলে, তা
চুরি হিসেবে দেখা হবে। যা কপিরাইট আইনে একটি দণ্ডনীয় অপরাধ। যদিও যারা অন্যের লেখার অংশবিশেষ বা পুরোটা নিজের বলে ফেসবুক এবং অন্যান্য মাধ্যমে চালিয়ে অভ্যস্ত, তাদের কাছে এই কথাগুলো হাস্যকর লাগতে পারে। তারপরও তাদেরকে বলছি, সময় ও সুযোগ হলে অবশ্যই আপনাদেরকে এই অপরাধের জন্য জবাবদিহিতার আওতায় আনার ব্যবস্থা নেয়া হবে। ততোদিন পর্যন্ত খান চুরি করে, যেহেতু পারবেন না নিজে মাথা খাটিয়ে কিছু বের করতে।

ধন্যবাদ। আপনার সময় আনন্দময় হোক।