ইউজার লগইন

বসফরাসের গাঙচিল আর দুই দরিয়ার গহীন নীল: হারিয়ে যাওয়া যায় না বৃথা যেখানে

১.
দিনের বেলা ঘুমিয়ে কাদা হয়েছিলাম। এখন উঠে মন খারাপ লাগছে। জানি রাতে ঘুমানোটা কঠিন হয়ে গেল ভীষণ। কিন্তু কি আর করা। ঘুমানোর সময় ভেবেছিলাম খুব বেশি হলে আধা ঘন্টা ঘুমানো যাবে। ওমা পাক্কা আড়াই ঘন্টা পর চোখ খুলেছি। মাঝখানে তো ঘুমের মধ্যেই মনে হচ্ছিল ঘড়ির কাঁটা রাত আর দিন পেরিয়ে চলছে অজানা গন্তব্যের পানে।

সাগরের তীরে যতোবার বেড়াতে গিয়েছি, ততোবারই আমার কি যেন হয়েছে। মনে হয়েছে মাত্রই তো কয়েকদিনের জন্য এখানে আসা। এই আসার কি কোনো অর্থ আছে? এসব ভেবে ভেবে মন খারাপই থাকতো বেশি। বহু চেয়েও কখনও উপভোগ করতে পারি নি। অথচ সাগরপাড়ের বাতাস যদি মুঠোবন্দি করে এনে আমার সামনে কেউ ছেড়ে দেয়, আমি বলে দিতে পারবো সেটা সাগরপাড়ের বাতাস। জানি আর না জানি, সাগরের কাছাকাছি গেলেই আমি টের পেতে শুরু করি।

সাগর যতো না ভাল লাগে, তারচেয়ে বেশি ভাল লাগে জাহাজ। জাহাজের ভেতর একটা বিশেষ গন্ধ থাকে। লোহার সাথে নোনা পানি মিশে সেই গন্ধের জন্ম হয়। জাহাজে উঠলেই আমার ভেতর একটা টানা শিরশিরানি সৃষ্টি হয়। জাহাজ চলুক আর না চলুক। কোনো একদিন কোনো এক নির্জন জাহাজের ডেকে একা বসে বসে আমার প্রিয় লেখক হুমায়ূন আজাদ বা আহমদ ছফার কোনো একটা বই পড়বো। কিংবা আর্নস্ট ক্লাইনের। জাহাজ ভেসে চলবে দূরের কোনো বন্দরের উদ্দেশ্যে। আমি ঠাঁয় বসে থাকবো বই হাতে, সেই নীলে ঢাকা পরিবেশে। এমন একটা স্বপ্ন আমি দেখি বহুদিন ধরে।

সেবার ইস্তান্বুলে আশা মিটেছিল সাগরের বুকে চিড়ে ঘুরে বেড়ানোর। মার্মারা সাগর প্রতিদিন দু'বার করে পাড়ি দিয়েছি। এশিয়া মহাদেশ থেকে ইউরোপে যাওয়ার লক্ষ্যে। পথিমধ্যে পড়তো বসফরাস প্রণালী। দু'চোখ যেদিকে যায় শুধুই নীলের সমাহার। দেখলে বুকে একরকম চিনচিন করে ওঠে। হয়তো সেখানকার নিয়মিত বাসিন্দাদের অমন হয় না। তবে আমি নিয়মিত বাসিন্দা হলেও একইরকম যে বোধ করতাম না,সেই গ্যারান্টি দিতে পারছি না।

দেশের বাইরে কোথায় আমি সবচেয়ে বেশি উপভোগ করেছি সময়, জানতে চাইলে এখনও উত্তরটা ইস্তান্বুলই দিই। শুধু যে সাগরের বুকে ভেসে বেড়ানোর অবারিত সুযোগ ছিল সেজন্য নয়। আরও অসংখ্য ছোট-বড় অনুষঙ্গ মিলে সময়টাকে অন্যরকম করে তুলেছিল। রাতের শেষ প্রহরে ঘরে ফেরার পথে সুস্বাদু কাবাবের গন্ধে পথ ভুল হতো প্রতিদিন। তারপর দোকানী মামাকে গিয়ে ঠিক নিজে যেমনটা চাই তেমন একটা কাবাবের অর্ডার করা- এমন সুযোগ নিজ দেশের বাইরে খুব বেশি পাওয়া যায় বলে মনে হয় না। দোকানী মামাও যেন আমাদের দলটির জন্যই অপেক্ষা করে থাকতেন। ভান্ডারের সেরা মাংসটি তুলে রাখতেন আমাদের জন্যই। টাটকা লেবু, কাঁচা মরিচ, নানা রংয়ের পেঁয়াজ আর লেটুস পাতার মতো সালাদের উপাদানগুলো বিশাল কড়াইয়ে ভাজা কাবাবটির স্বাদ ছয়-পাঁচ গুণ বাড়িয়ে দিতো লহমায়। আর রুটির জন্য ইস্তান্বুলের খ্যাতি কে না জানে। আমাদের দোকানী মামা বলতেন, "একদম তুলতুলে নরম রুটি দিয়ে কাবাব ভাল হয় না। মুখের ভেতর রুটি লেগে থাকে।"

তাই সে যাত্রায় যে ক'বার মাঝরাত্তিরে কাবাব খাওয়া হয়েছে প্রতিবারই আমার অর্ডার ছিল একটু শক্ত কিন্তু তরতাজা রুটি, আর এক পেটি কড়াইয়ে ভাজা চর্বিওয়ালা মাংস। তার ওপর এক প্রস্থ গোলমরিচের গুড়া, এক প্রস্থ গোল করে কেটে রাখা পেঁয়াজ, সরিষায় ডোবানো রসুন, সিরকায় ডোবানো মরিচ, লেটুস পাতা, লেবুর রস; ব্যাস্। মধ্যরাতের ক্লান্তি মুহূর্তের হাওয়া। ইস্তান্বুলের রাস্তায় ঘুরে বেড়ানো স্বাস্থবতী বেড়াল আর কুকুরদের নিয়ে সামনে বিস্তারিত লিখবো। তবে আমাদের কাবাবের পার্টিতে সবসময়ই আশপাশের কয়েকটা আমুদে কুকুর এসে জুটে যেতো। একই দোকানে যাওয়া হতো বলে ওই কুকুরগুলোর সাথেও আমাদের খাতির হয়ে গিয়েছিল। মাঝরাতে অমন প্লেটভরা কাবাব নিয়ে বসফরাসের বাঁধের কোনো একটি বোল্ডারে বসে হালকা ঝিরঝিরে বাতাসের ভেতর বন্ধু-বান্ধব আর কয়েকটি বেওয়ারিশ কিন্তু অসম্ভব সুন্দর কুকুরে মিলে যে কত মাত্রার স্যুরিয়ালজমের জন্ম দিতে পারে, তা সরাসরি প্রত্যক্ষ করার সুযোগ হয়েছিল সে সফরে আমার। অমন মানবসুখ খুব বেশি পেয়েছি বলে মনে পড়ে না।

খেতে খেতেই ঘুমটা পেয়ে বসতো। আমাদের হোস্টেলটা ছিল ওখান থেকে কয়েক ব্লকের মধ্যে। ঘুমে ঢুলু ঢুলু পায়ে ঘরে ফেরি, কোনমতে জুতা আর জিন্সটা খুলে, কোনো একদিকে ছুড়ে ফেলে বিছানায় ঝাপ দিয়ে মুহূর্তে অতল ঘুমের রাজ্যে ডুবে যাওয়ার অনুভূতিটা দারুণ! যেন একটু দূরের বসফরাসের পানিতেই গিয়ে ঝাপ দিয়ে দিলাম। কিন্তু পানিতে ডুবে যাওয়ার অনুভূতি নেই। এক স্বপ্নের রাজ্যে হারিয়ে যাওয়ার মতো অনুভূতিরা এসে ঘিরে ধরে তখন। সে অনুভূতি ভাষায় বর্ণনার ক্ষমতা আমার নেই। হয়তো সারাদিনের ক্লান্তির তাতে ভূমিকা থেকে থাকতে পারে। সত্যি কথা বলতে কি, অমন সফরগুলিতে ক্লান্তিরা থাকে সবসময়ই লুকিয়ে। সারাদিন যতো দৌড়ঝাপই হোক না কেন, তাদের দেখা মেলে না। সব একসাথে এসে ধরা দেয় রাতের বিছানাতে। সেটিও একটি কারণ হয়ে আছে, হোস্টেলে ফিরেই বিছানাটাকে অতো প্রিয় লাগতে থাকার নেপথ্যে।

তারপর সকালে, তুরস্কের স্থানীয় বন্ধু একিন সোনমেজের চিৎকারে ঝালাপালা হওয়া কান জেগে উঠতো সবার প্রথমে। তারপর মাথা। তারপর শরীর। হাতড়ে হাতড়ে এক কাপ ধূমায়িত কফি আর একটা সিগারেট খুঁজে বের করতে পারলেই হলো। গাড়ির এন্জিনে চাবি পড়ে গেছে। এবার শুধু ছোটার পালা।

প্রথমেই গোসল, দাঁত ব্রাশ আর হোস্টেলের ব্রেকফাস্ট- এ তিনটি কাজ সারতে হবে। হোস্টেল হচ্ছে ইউরোপে হোটেলের ছোট ভাই। যেখানে ছাত্রছাত্রীরা ব্যাকপ্যাকিং করার সময় রাত কাটায় মূলত। খরচ কম। পরিবেশটাও বন্ধুবৎসল। তাই হোস্টেল নামক ব্যবস্থাটি গড়ে উঠেছে।

হোস্টেলের আরও একটি দারুণ বৈশিষ্ট্য হচ্ছে নিত্যনতুন বন্ধু খুঁজে পাওয়ার সুযোগ। অল্পবয়সী মানুষজনের পৃথিবী দেখার উদ্দেশ্যে একা একা বের হওয়াটাই একটা দারুণ বিষয়। সেখানে গিয়ে যদি মনের মতো একজনের সাথে বন্ধুত্ব হয়ে যায়, যে নিজেও পৃথিবী দেখতে বেরিয়েছে- তো আর কি চাই। এর জন্যও হোস্টেল একটি মোক্ষম জায়গা। আমি জানি অনেকে শুধু এ কারণেই হোটেলের চেয়ে হোস্টেল পছন্দ করেন বেশি।

২.

আগেই বলেছি ইস্তান্বুল শহরের মাঝখান দিয়ে চলে গেছে বসফরাস প্রণালী। এ প্রণালীটি শুধু ইস্তান্বুল শহরকেই, এশিয়া আর ইউরোপ মহাদেশকেও ভাগ করেছে তার চলার পথে, আর যোগ করেছে দু'টি অনিন্দ্যসুন্দর সাগরকে- মার্মারা ও কৃষ্ণসাগর। আর সবকিছু ঘটে গেছে ইস্তান্বুলেই!

সুলেতান সুলেমানের ছেলে সুলতান মেহমেতের নামের বসফরাসের ওপর একটি ব্রীজ রয়েছে- ফতেহ্ সুলতান মেহমেত সেতু। সেটির ওপর দাঁড়িয়ে একপাশে ইউরোপ আর আরেকপাশে এশিয়া দেখা যায়। তা অবশ্য বসফরাসে নৌকাভ্রমণের কালেও দেখা যায়। তবে ওই ব্রীজটির আরও একটি অনন্য বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, সেখান থেকে প্রণালীর একপ্রান্তের মার্মারা সাগর এবং অন্যপ্রান্তের কৃষ্ণসাগরের দিগন্তরেখারাও পোড়াচোখে ধরা পড়ে।

বসফরাস প্রণালীর কারণেই শহরের অর্ধেক পড়েছে এশিয়া মহাদেশের সীমানায় আর অর্ধেক পড়েছে ইউরোপে। রসিক তার্কিশরাও সে সুযোগে যাবতীয় পশ্চিমা স্থাপত্যকলার চর্চা করেছে ইউরোপে, এবং প্রাচ্যের স্থাপত্যকলার চর্চা এশিয়া মহাদেশে। তবে এর সবই তো সেদিনের গল্প। মহাদেশভিত্তিক বিভাজনের পূর্বে যখন পুরো অঞ্চলটিই অটোমান সাম্রাজ্যের অধীনে ছিল, তখনকার স্থাপত্যকলার ছড়াছড়ি রয়েছে শহরের ইউরোপ-এশিয়া উভয় অংশেই। সে এক অসাধারণ মিশেল! অতীত, বর্তমান, সংস্কৃতি, সংরক্ষণ, অগ্রগতি- সবকিছুকে আগলে নিয়ে শত বছর পূর্বে কামাল আতাতুর্কের আধুনিক তুরস্কের যে যাত্রা শুরু হয়, অনেকে বলেন এখন নাকি সে যাত্রায় ছেদ পড়েছে দেশটির প্রশাসক এরদোয়ানের কারণে। হলেও হবে হয়তো বা, কিন্তু এখনও ওই শহরের রাস্তায় রাস্তায় যা কিছু ঐতিহাসিক মণি-মুক্তা ছড়িয়ে আছে তেমন আর ক'টি শহরে রয়েছে এ বিশ্বে? সেদিক থেকে দেখলে হয়তো দেশটির কট্টরপন্থী সমসাময়িক শাসকদলকে খুব বেশি অভিযুক্ত করা যায় না। যদিও সেটি অন্য বিতর্ক।

আমার জন্য তারচেয়েও অনেক মজার বিতর্ক নিয়ে দ্বিতীয় দিনের ভোর থেকে অপেক্ষায় ছিল হোস্টেলের ছাদটি, যেখানে আমাদের ঝটিকা সফরে ঠাই জুটেছিল। তুরস্কের বন্ধু একিনের জন্মস্থানের নাম ইজমির। তবে স্কুল, কলেজ সবই ছিল ইস্তান্বুলে। ওর বাবা-মা থেকেছেন ইজমিরে। আমরা যে হোস্টেলে উঠেছিলাম তার থেকে পাঁচ মিনিটের হাঁটা পথের দুরত্বের তার কয়েক বছরের বড় ভাইয়ের অ্যাপার্টমেন্ট। আমাদের কয়েকদিনের ভ্রমণ উপলক্ষে একিনের বাবা ও মা এসে উঠেছিলেন সেখানে। যাতে কাছাকাছি থাকা হয় সবার। আমরা প্রথমে এসেছি চার বন্ধু একসাথে। পরে যোগ দেবে একজন বান্ধবী এমন পরিকল্পনা।

যাহোক ছাদের গল্পে ফিরে যাই। সকালে ঘুম ভাঙার সাথে সাথে সবার একসাথে গোসল ও দাঁত ব্রাশের ঠেলাঠেলি আর একিনের চিৎকার থেকে বাঁচতে এদিক-ওদিক ঘোরাঘুরি করতে করতেই ছাদটি আমি আবিস্কার করে ফেলি দ্বিতীয় দিন। ছাদ তো ছিলই, কিন্তু হোস্টেলের অতিথিদের সেদিকে নজর দেয়ার সময় ছিল না- এই আর কি। আমি আগের রাতে বাড়ি ফেরার সময়ই ভাবছিলাম- ছাদ থেকে জায়গাটা কেমন দেখায় জানতে হবে। আর একিনের হাত থেকে বাঁচতে হবে।

আমাদের হোস্টেলটি ছিল শহরের যে অংশ এশিয়া মহাদেশে পড়েছে সেই ভাগে। ওই এলাকাটি পাহাড়ি। শহরের প্রায় প্রতিটি রাস্তাই উর্ধ্বমুখী। কিংবা বলা যায় উপর থেকে রাস্তাগুলো নেমে এসেছে যেন বসফরাসের সাথে মিশে যেতে। আগের রাতে তেমনই হোস্টেলের রাস্তা ধরে উঠতে উঠতে ভাবছিলাম ছাদের ওপর থেকে আশপাশ আর বসফরাসটা মিলিয়ে একটি দারুণ দৃশ্য হওয়ার কথা। পরদিন সকালে সেটির খোঁজেই ইতি-উতি করতে করতে ছাদে পৌঁছে গিয়েছিলাম।

ছাদে আমায় সর্বপ্রথম অভ্যর্থনা জানিয়েছিল গাঙচিলদের দলনেতা। ওখানে আক্ষরিক অর্থেই গাঙচিলদের সভা হচ্ছিল। বসফরাস প্রণালী, মার্মারা সাগর আর কৃষ্ণ সাগর যে শহরকে আষ্টেপৃষ্টে ঘিরে রেখেছে, সে শহরে গাঙচিলদের রমরমা হওয়ারই কথা। আগের দিন ইস্তান্বুলে পৌঁছানোতক তাদের উপস্থিতি জোরে-শোরেই টের পাচ্ছিলাম। এবার একদম একটি ছোট দলের সাথে মুখোমুখি হয়ে যাওয়া।

দলের নেতা আমি যে মাত্র ছাদে পা দিয়েছি, গম্ভীর স্বরে একবার ডাক দিলেন এবং তারপর চুপচাপ আমার দিকে তাকিয়ে রইলেন। তার পেছনে আরও ছ'সাতটি গাঙচিল সারি বেঁধে দাঁড়িয়ে ছিল। তারাও আমার দিকে তাকিয়ে রইলো। যেন আমি বাংলা ভাষায় এখন কিছু একটা বললেই তারা বুঝে যাবে!

তবে বেশ কিছু "অকওয়ার্ড" মুহূর্ত কেটে যাবার পর আমিই নীরবতা ভাঙলাম। নেতাগোছের গাঙচিলটির উদ্দেশ্যে নড করে বললাম, শুভ সকাল। প্রথমে কিছুক্ষণ কিছুই হলো না। তারপর সবক'টি গাঙচিল একসাথে তারস্বরে চেচিঁয়ে উঠলো। শুধুই একটি চিৎকার। তারপর আবার সবাই চুপচাপ। আমি খানিকটা ভয় পেয়ে সিঁড়ির দিকে উঁকি দিলাম। কাউকে দেখা যায় কি না দেখতে। দেখলাম কেউ নেই। তার ঘুরে গাঙচিলদের দিকে তাকিয়ে মনে হলো, সবাই যেনে খানিক মিটিমিটি হেসে নিল।

আমি অবশ্য অমন সুন্দর একটা সকালে আর বেশি ঘাবড়াবো না বলে ঠিক করে ফেললাম। তারপর গাঙচিলদের এটা-সেটা প্রশ্ন করা শুরু করলাম। নেতাগোছের গাঙচিলটিকে জিজ্ঞেস করলাম, তুমিই কি দলের নেতা কি না? সে কি বুঝলো কে জানে, বিশাল ডানাটি খানিক ঝাপটিয়ে যেখানে বসেছিল সেখান থেকে আরেকটু উপরে একটি চিমনিতে গিয়ে বসলো। অন্যদের কাছে জানতে চাইলাম, কি নিয়ে কথা বলছিলে তোমরা? আবার সবাই একসাথে চেচিঁয়ে উঠলো। আমি তাদের কথা কিছুই বুঝলাম না। আমার হাতের রুটির টুকরাটির দিকে যে তাদের নজর ছিল সেটি অবশ্য এমনিই বোঝা যাচ্ছিল। ছিড়ে টুকরো টুকরো করে ওদের সামনে রুটিগুলো রেখে একটু দূরে এসে দাঁড়ালাম। গাঙচিলগুলো সবাই একটা করে টুকরা মুখে নিয়ে গিয়ে দলনেতার চারপাশে ওই ছোট চিমনিটার ওপরেই ঠাসাঠাসি করে গিয়ে বসলো। দলনেতাও এসে একটি টুকরা মুখে নিয়ে নিজের জায়গায় গিয়ে বসলো। তখনও আরও রুটির টুকরা পড়ে ছিল। অন্যান্য পাখ-পাখালি হলে আশেপাশেই ঘুরঘুর করে সব রুটি শেষ হলে পরে অন্য কোথাও যেতো। গাঙচিলগুলিকে দেখলাম একটা করে রুটি নিয়ে নিজের জায়গায় গিয়ে আরাম করে সেটি খাচ্ছে। খাওয়া শেষ হলে এসে আবার আরেকটি নিয়ে যাচ্ছে। আমি নিজের মনেই তাদের সাথে বেশ কিছুক্ষণ কথা বললাম।

এরই মধ্যে তুরস্কের একিন আর যুক্তরাষ্ট্রের রবার্ট খুঁজতে খুঁজতে ছাদে চলে এসেছিল। একিন যথারীতি চেচিঁয়ে আবার কানের বারোটা বাজিয়ে দিল। রবার্টটা চিরকেলে বোকা। গাঙচিলগুলোকে দেখাতক সে উত্তেজিত হয়ে উঠেছে! এত কাছে থেকে নাকি ওদের কখনো দেখে নি সে। আমি বললাম ওদেরকে খাবার দিলে ওরা কাছেও আসে। শুনে সে নিচে থেকে রুটি আনতে ছুট লাগাতে যাচ্ছিল। একিনের চক্ষুরাঙানি উপেক্ষা করে যেতে পারলো না। আসলে আমাদের হাতে সময়ও ছিল না। অল্প কয়দিনের সফরে আমরা প্রতিটি মুহূর্ত যেন উপভোগ করতে পারি, তাই একিন খুব টাইট করে প্ল্যান করেছিল। আর স্থানীয় হিসেবে ও কাজটির দায়িত্ব তো ওরই কাঁধে পড়ার কথা। তাই আমাদেরও প্রচ্ছন্ন সায় ছিল ওর চেচাঁমেচিতে। নাহলে যতোগুলো জায়গা আমরা ওই কয়দিনে দেখতে পেরেছিলাম, তার অর্ধেকও দেখা সম্ভব হতো না নিশ্চিত।

৩.

গাঙচিলদের দল উড়ে গেল কয়েক মুহূর্ত পরেই। পাখি উড়ে যায়, পড়ে থাকে মায়া। কোত্থেকে যেন হঠাৎ আমার চোখ দু'টোয় ছোট একটা জলের ঢেউ এসে আছড়ে পড়লো। কয়েকবার গোপনে চোখ ঝাপটে সামলে নিলাম। একিনের চোখে পড়লে কোনো রক্ষে ছিল না।

আমাদের দলের চতুর্থ সদস্য ফরিদ ভালিয়েভ। আজারবাইজানের দারুণ ছেলে। হলিউডের রম-কম বা বয়-মিট-গার্ল টাইপ মুভিগুলোতে যেমন চটপটে ছেলে থাকে তেমন। জার্মান, রাশিয়ান, তার্কিশ, ইংলিশসহ চার-পাঁচটা ভাষায় অনর্গল কথা বলে যেতে পারে। যেকোন সমস্যায় সবার আগে বুক চিতিয়ে এগিয়ে যায়। কিন্তু সমস্যা একটাই। ছোকড়াকে কেন যেন আমার দুই চক্ষু সহ্য করতে পারতো না। বিশ্বাস করুন, মানবমনের এহেন বিচিত্র খেয়াল আশ্চর্যের কিছু নয়। রবার্ট আর একিন রীতিমতো ভক্ত ফরিদের। আর আমার খালি গা জ্বলে। এমনকি প্রথম যখন শুনেছিলাম ও আমাদের সাথে যাচ্ছে, তখন থেকেই চেষ্টা করেছি ঘটনাটা ঘটতে না দেয়ার। লাভ হয় নি। ব্যাটা ঠিকই জার্নির দিন সকালবেলা ব্যাকপ্যাক কাঁধে ফেলে ইলমিনাউয়ের ছোট্ট ট্রেন স্টেশনে হাজির হয়েছে।

জামার্নি থেকে তুরস্কে যাবার পথে আমাদের প্রথমে বেশ খানিকটা ট্রেন ভ্রমণ হয়েছিল। আমরা চারজনই ইলমিনাউ প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। তার মধ্যে তিনজন- একিন, রবার্ট আর আমি একই ক্লাসের সহপাঠী। আর ফরিদ অন্য একটা বিভাগে পড়ে। একই ক্যাম্পাসে থাকি, সারাদিনই দেখা-সাক্ষাৎ হয়। একিনের সাথে আবার বিশেষ ভাল বন্ধুত্ব। ইস্তান্বুলেও অনেকবার জীবনে যাতায়াত করেছে। সবকিছু মিলিয়েই আসলে দলে জায়গা পেয়েছে ফরিদ। তাই আমার কোন প্রচেষ্টাতেই কাজ হয় নি।

ইলমিনাউ থেকে আমরা প্রথমে একঘন্টার ট্রেন যাত্রা করে পৌঁছাই এরফুর্টে। আশেপাশে ওটাই একটা বড় শহর, যেখান থেকে আরও বড় বড় শহরের উদ্দেশ্যে বাস, ট্রেন ইত্যাদি ছাড়ে। আমরা এরফুর্ট থেকে ট্রেনে উঠলাম স্টুটগার্টে যাওয়ার উদ্দেশ্যে। পাক্কা পাঁচ ঘন্টার যাত্রা। মাঝে নো বিরতি। সে কারণেই দলের সব সদস্য মিলে ঠিক করলাম, যদিও এখন মাত্র সকাল সাতটা বাজে কিন্তু আমরা ভ্রমণে বের হয়েছি প্রথম কথা, আর দ্বিতীয় কথা হচ্ছে ভ্রমণে পরবর্তী পাঁচ ঘন্টা ট্রেনে বসে কাটবে। সুতরাং তার আগে এক বোতল বিয়ার পান করে নেয়া বিশেষ জরুরি নি:সন্দেহে। আমাদের হাতে স্টুটগার্টের ট্রেন ছাড়ার আগে আধা ঘন্টার মতো সময় ছিল।

আমার মতে রসমান কিংবা রেভির মতো মধ্যসারির সুপারশপগুলো জার্মানির ট্রেন স্টেশনগুলোতে বিয়ার খোঁজার জন্য সবচেয়ে ভাল জায়গা। বড় সুপারশপগুলোর তুলনায় দাম একটু বেশি পড়ে, কিন্তু স্টেশনের রেস্টুরেন্ট, সুভ্যেনির শপ, চেইন ফাস্টফুডের দোকান কিংবা ডোনার কেবাপের দোকানগুলোর চেয়ে তারপরও অনেক কম পড়ে। ফ্রিজের ঠান্ডা বিয়ারও পাওয়া সম্ভব। সবগুলো না অবশ্য। দু'একটা ধরন শুধু ফ্রীজে রাখা থাকে সবসময়।

আমরাও এরফুর্টের রসমান থেকেই তিন ক্যান ঠান্ডা হাইনিক্যান আর রবার্ট এক বোতল মোজো নিলো। মোজোটা ফ্রীজে ছিল না বলে প্রচুর অভিযোগ করছিল সে, কিন্তু তারপরও ওটাই নিল। স্টেশনের স্মোকিং জোনে দাঁড়িয়ে ব্যাকপ্যাক কাঁধে চার বন্ধু চিয়ার্স করলাম। অফিসিয়ালি আমাদের যাত্রা শুরু হলো। এবং তারপরই ঘটলো যাত্রাপথের প্রথম দুর্ঘটনাটা।

আমরা তিনজন নিজেদের ক্যান শেষ করেই ট্রেনে উঠেছিলাম, কিন্তু রবার্ট তার মোজো শেষ না করে ব্যাগের সাইডপকেটে মুখ খোলা অবস্থাতেই রেখে দিয়েছিল। বেড়ালের মতো সারা রাস্তা ধরে চুক চুক করে খেতো কিনা কে জানে, কিন্তু ট্রেনে উঠতে গিয়ে তার মোজো কোলা অনেক খানি চলকে পড়ে গেল মেঝেতে। অকারণে শাখামৃগদের মতো ভাবভঙ্গি করতে গিয়ে ঘটনাটি ঘটিয়েছিল সে। আমরা সবাই দেখেছিলাম। একিন হতাশ হয়ে মাথা নাড়িয়েছিল। ফরিদ "ও কিছু না" বলে দুবার পিঠ চাপড়ে দিয়েছে। ঘটনাটি সেখানেই মিটে যেতে পারতো। মেটে নি কারণ সেটি আমাদের সবার সাথে সাথে ট্রেনের টিকিট চেকারও দেখে ফেলেছিল।

সেটার জন্য টিকিট চেকারকে তাও কষ্টে-সৃষ্টে বুঝিয়ে রাজি করিয়েছিলাম। কিন্তু তারপরপরই টিকিট দেখাতে গিয়ে বের হলো আরও বড় ঝামেলা। আমরা ভুল করে ফার্স্ট ক্লাস বগিতে উঠে পড়েছি!

আর যায় কোথা? চার শর্মাকে ৬০ ইউরো করে মোট ২৪০ ইউরো ফাইন ধরিয়ে দিতে টিকিট চেকার বিলম্বও করলেন না, কারও কথায় কর্ণপাতও করলেন না। শেষমেষ একিন রেগে গিয়ে তার্কিশ ভাষায় চেচিঁয়ে উঠলে আমরা বুঝলাম এই বেলা সামলে না নিলে থানা-পুলিশের ঝামেলাও পোহাতে হতে পারে। তাই একিনকে টেনে অন্যত্র সরিয়ে নিয়ে গিয়ে কোনোমতে পরিস্থিতি সামাল দিলাম।

এরপর স্টুটগার্ট পর্যন্ত যাত্রার পুরোটা পথে একিন থেকে থেকে টিকিট চেকারটাকে অচেনা ভাষায় গালিগালাজ করে উঠছিল। আমারও খুব মেজাজ খারাপ লাগছিল। টিকিট চেকারটা চাইলে একটা সন্ধিও করতে পারতো আমাদের সাথে। আমরা সবাই ছাত্র। সকলের আইডি কার্ড আছে। অন্তত জনপ্রতি ৬০ ইউরো ফাইন না করে ৩০ ইউরোও যদি করতো, মন্দ হতো না। কিন্তু সেই টিকিট চেকারটাকে কোনোভাবেই রাজি করানো গেল না।

গোঁদের ওপর বিষফোঁড়ার মতো ফরিদ ভালিয়েভটা সুযোগ পেলেই কবে কোন টিকিট চেকারকে কিভাবে হেনস্থা করেছে সেসব গল্প ফেঁদে বসছিল। শুধু কোনো বিকার ছিল না রবার্টের। ছেলেটা অমনই। খুব কম বিষয়েই তাকে আমি বিচলিত হতে দেখেছিলাম। শুধু গার্লফ্রেন্ড ক্ষেপে যাওয়ার কোনো সম্ভাবনা দেখা দিলেই তার দুশ্চিন্তা শুরু হয়ে যেতো। ৬০ ইউরো ফাইন খাওয়ার পর সে প্রথম যে কাজটি করে তা ছিল গার্লফ্রেন্ডকে ফোন করা। সেখান থেকে সে তথ্য পেল, এ ধরনের ফাইন খেলে নাকি ডয়েচে বানের (জার্মান রেলবিভাগ) কেন্দ্রীয় অফিসে এক ধরনের রিভিউয়ের আবেদন করা যায়। ওটি জেনেই রবার্টের সব দুশ্চিন্তা চলে গেছে, এবং সে স্টুটগার্ট বিমানবন্দর নিয়ে জল্পনা-কল্পনা শুরু করে দিয়েছে।

৪.

স্টুটগার্ট বিমানবন্দরটা ফ্রাঙ্কফুর্টের বিমানবন্দরের তুলনায় আকার-আকৃতিতে শিশু যেন। আমার সেবারই প্রথম যাওয়া। বিমানে ওঠার পথে তেমন কোনো সমস্যা হয় নি। এবার আমরা খানা-পিনা যথাযথভাবে শেষ করেই টার্মিনালের পথে পা বাড়িয়েছিলাম বলেই অবশ্য। নাহলে রবার্ট আবারও বলার চেষ্টা করছিল পথে যেতে যেতে যদি খেতে ইচ্ছে হয় সে জন্য সে একটি র‍্যাঞ্চ ড্রেসিং দেয়া স্যান্ডউইচ হাতে করে নিয়ে উঠতে চায়। আমাদের রক্তচক্ষু দেখে আবার নিজেই বললো, থাক, ইস্তান্বুলে নেমে খাবো। আর বিমানেও তো কিছু না কিছু দেবে তাই না? আমাদের তিন ঘন্টার ফ্লাইট। কিছু খেতে দিলেও ভাল, না দিলেও খারাপ না। কিন্তু রবার্টকে ঠান্ডা করার জন্য সবাই বললাম, আর দেবে না মানে। চার কোর্সের ডিনার দেবে। তাড়াতাড়ি চলো বাবা।

বিমানের জানালায় যখন ভূমধ্যসাগরের দুই পাড়ে তুরস্ক আর গ্রীস দৃশ্যমান হয়ে উঠলো তখন সারাদিনের নানাবিধ ধকল, আক্কেল সেলামি কিংবা আর কোনকিছুই মনে ছিল না। শুধু মনে ছিল, এই রকম একটি দৃশ্য দেখবো বলেই সারাটা দিন একবারের জন্যও হাল ছেড়ে দেয়ার কথা ভাবি নি আমি অনেক দিন পর। এমনকি ফরিদকে পর্যন্ত দিনের শুরু থেকে প্রায় শেষ পর্যন্ত সহ্য করে ফেলেছি। সহ্য করার ফলে এখন মনে হচ্ছে ছেলেটাকে আমি যতোটা অসহ্য আসলে ভেবেছিলাম ততোটা সে হয়তো নয়।

হাজিয়া সোফিয়া এয়ারপোর্টে যখন আমাদের বিমান নামে তখন সেখানকার ঘড়িতে বাজছিল রাত সাড়ে আটটা। আমরা যাবতীয় আনুষ্ঠানিকতা সেরে বিমানবন্দরের বাইরে এসে পা দেয়ার পর আমার মনে হল, হযরত শাহজালাল এয়ারপোর্টের বাইরে পা দিয়েছি। ট্যাক্সিচালকদের হাঁক-ডাক, পাশের বাসস্ট্যান্ড থেকে ভেসে আসা বাসের প্যাঁ-পুঁ, দূরের কোনো চালা থেকে ভেসে আসা ভাজা মাছের গন্ধ সব মিলিয়ে হুট করেই এক অন্যরকম অনুভূতি ঘিরে ধরলো। ইউরোপে আসাতক আমি অমন অগোছালো এলোমেলো হই হুল্লোড় দেখি নি। যদিও ইউরোপে আসার আগে ২৯ বছর আমি ওসবের ভেতরেই জীবনধারণ করেছি। তারপর বেশ কিছুদিন ভোজবাজির মতো সবকিছু হাওয়া হয়ে ছিল চোখের সামনে থেকে। চারিদিকে নিয়ম-শৃঙ্খলা, ঠান্ডা মাথার চিন্তা-ভাবনা, সেসবের প্রয়োগ ইত্যাদি দেখতে দেখতে বছর দুয়েকে চোখ-মন ইত্যাদি সব সয়ে গিয়েছিল। এমনকি সেদিন সকাল পর্যন্তও এরফুর্টের ট্রেন স্টেশনের স্মোকিং জোনে দাড়িঁয়ে বিয়ারের ক্যান ঠোকাঠুকি করে চিয়ার্স করাকেও কোন একটা পর্যায়ের অনিয়ন্ত্রিত জীবনাচরণ হিসেবে মনে হচ্ছিল। সেই আমার চোখের সামনে যেন আবার হুট করেই দুই বছর আগে যখন দেশে ছিলাম সে সময়ের মতো একটা পরিবেশ ফিরে এসেছে। দেখে যারপরনাই অবাক হচ্ছিলাম। এমনকি রাস্তার অপরপাশে ভ্যানে করে ডাব বিক্রি হচ্ছে বলেও মনে হচ্ছিল একটা কিছু দেখে আমার। ঠাহর করে দেখতে বুঝতে পারলাম ডাব নয়, তরমুজ। যাক বাবা, গরমের সময় তরমুজ রাস্তা-ঘাটে বিক্রি হতে দেখা ইউরোপেও খুব বেশি অস্বাভাবিক নয়। এ যাত্রা বাচোঁয়া।

এয়ারপোর্ট থেকে হোস্টেল পর্যন্ত ট্যাক্সি ভাড়া পড়বে প্রায় একশ' লিরা। যা প্রায় ৩৫ ইউরোর সমান। ইদানীং এক ইউরোতে দশ লিরার বেশি পাওয়া যায়। কিন্তু আমি যেসময়ের কথা বলছি তখন এক ইউরো সমান ছিল তিন লিরা। আমরা তাই বাসে তাকসিম চত্বর পর্যন্ত গেলাম। প্রত্যেকের দুই লিরা করে ভাড়া পড়ল। তারপর তাকসিম চত্বর দিয়ে প্রায় ঘন্টাখানেক হেঁটে নদীবন্দরে। সে রাতেই জীবনে প্রথমবারের মতো ফেরিতে চড়ে বসফরাস পাড়ি দেয়া অভিজ্ঞতা হয়েছিল আমার। অস্বাভাবিক আনন্দ হয়েছিল। ফেরিতে চড়ার আগে বুলগুর দিয়ে বানানো একটি করে ডোনার খেয়ে নিয়েছিলাম সবাই। এবার আর কোনো বাধানিষেধ ছিল না। একিন নিজেই জোর করে আমাদের চারজনের হাতে চারটি ক্যান ধরিয়ে দিল। তার্কিশ বিয়ার। নাম এফেস্। বসফরাসের ঠান্ডা বাতাস চামড়ায় হুল ফোটানোর চেষ্টা করছিল। সেদিকে যেন কোনো নজরই ছিল না আমার। একিন, ফরিদ আর রবার্ট মিলে পরদিন সকালে কিভাবে ইস্তান্বুলের মেয়ে-মহলে নিজেদের আগমনী জানান দেয়ার ব্যবস্থা করবে তা নিয়ে জরুরি মিটিং করছিল। মিটিং মূল বিষয়বস্তু কোথায় তাদের পাওয়া যাবে সেটির গবেষণা। একিন আর ফরিদ বিশেষজ্ঞ মতামত দিচ্ছিল আর রবার্ট নিপুণ কারিগরের মতো সিনেমার শট সাজাচ্ছিল। কে, কোন দিক দিয়ে, কিভাবে এন্ট্রি নেবে, কার কি ডায়লগ হবে সব ওর নখদর্পনে। যেন হলিউডের ভিনসেন্ট ভন একটা।

আমি যতোটা নিতে পারলাম নিয়ে তারপর একসময় ওদেরকে ফ্রেশ বাতাসের অজুহাত দেখিয়ে ছাদে চলে গেলাম। সেখানে বাতাস আরও বেশি। চারপাশটা অন্ধকারে খুব ভাল দেখাও যাচ্ছিল না। যদিও দুই পাড়ের বাড়িগুলো, সেসবের আলো সব বোঝা যাচ্ছিল। জাহাজের আর বাতাসের শব্দে আর কিছু শোনা যাচ্ছিল না বলে আমি হেডফোনে এমি ওয়াইনহাউসের গান ফুল ভলিউমে চালিয়ে দিলাম। ঘড়িতে দেখলাম তখনও প্রায় বিশ মিনিটের পথ পাড়ি দেয়ার বাকি জাহাজের। ছাদেও বসার জায়গা করে রেখেছে অনেক। কাউকে দেখলাম না আশেপাশে। আমি হেলান দিয়ে বসলাম রেলিং ঘেঁষা একটা চেয়ারে। প্যাকেট থেকে একটা সিগারেট বের করে এমন সময়ের জন্য স্টুটগার্ট বিমানবন্দর থেকে কেনা জিপো লাইটারটি কাজে লাগালাম। কেন যেন ছোট্ট সে কাজটি করতে পেরে অনেক আনন্দ হলো। সারা পৃথিবীতে প্রতিদিন কত জিপো বিক্রি হয়। তার মধ্যে কয়টির বসফরাসের বুকে অন্ধকার চিড়ে চলত থাকা জাহাজের ছাদে আনকোরা প্যাকেটের প্রথম সিগারেটটিতে আগুন জ্বালিয়ে দেয়ার সৌভাগ্য হয়? আমার লাইটারটির হয়েছে- এই সামান্য ভাবনাটি আমাকে অনেকক্ষণ ভাললাগায় ডুবিয়ে রাখলো।

প্রায় পৌঁছে যাবার সময় ওরা তিনজন এসে হাজির হয়ে গেল। আমি একা একা কেন পুরোটা সময় ছাদের মজাটা নিলাম এ নিয়ে রবার্ট একটু কপট রাগ দেখানোর চেষ্টা করে সুবিধা করতে পারলো না। দূরের বন্দরের আলোগুলো ধীরে ধীরে আকার পাচ্ছিল। ওরা ছোট থেকে বড় হতে হতে যখন পরিস্কার দেখা যেতে লাগলো, তখন বুঝে ফেললাম আমরা এসে গেছি গন্তব্যের কাছাকাছি।

পূর্ব ইস্তান্বুলের কাদোকেই এলাকা। হাজার বছরের পুরোনো একটা জায়গা, অনেকটা ঘিঞ্জি কিন্তু তাই বলে গা ঘেঁষাঘেষি ঘিঞ্জি নয়। জাহাজ যখন ঘাটে ভিড়লো, তখন চোখে পড়লো চারপাশে অসংখ্য দোকানপাট, বেশিরভাগই খাবারের, তবে পোশাক-আশাক, নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি ইত্যাদিরও আছে- সবই বসফরাসের পাড় ঘেঁষে গড়ে উঠেছে এবং সেই রাত ১১টায়ও মানুষে ভর্তি চারিদিক। আমরা ক'জন ভাবছিলাম তখন এমন একটা জায়গায় আমাদের পরবর্তী কটা দিন কেমন কাটবে?

৫.

পরদিন সকালে গাঙচিলদের সাথে পরিচয়পর্ব শেষে যখন আমরা চারজন হোস্টেল থেকে সেজেগুজে বেরিয়েছি, তখনও আমাদের ধারণায় ছিল না দিনটি কি ধরনের চমক নিয়ে অপেক্ষা করছে আমাদের জন্য। একিন দেশের প্রশাসক এরদোয়ানের বিরুদ্ধে প্রায় পুরোটা রাস্তা বিষোদগার করলো। আমরা হোস্টেলের আশপাশের এলাকা খানিক ঘুরে জাহাজঘাটের পথ ধরলাম।

ওই অল্প সময়ের ঘোরাঘুরিতে যা সবচেয়ে বেশি আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করলো তা হচ্ছে বেওয়ারিশ কুকুর ও বেড়াল। যারা কুকুর, বেড়াল পছন্দ করেন না, তাদের কথা আলাদা কিন্তু আমি ও দুটি প্রাণীর বিশাল ভক্ত। ইস্তান্বুলের রাস্তার কুকুর, বেড়ালে সৌন্দর্যে যেকোন ইউরোপীয় পোষাপ্রাণীকে হার মানাবে চোখ বন্ধ করে। কেমন লাগতে পারে যদি দেখতে পান গা ভর্তি সোনালী পশমে ভরা স্বাস্থ্যবান ও স্বাস্থ্যবতী কুকুরের দলকে ডাস্টবিনের আশপাশে ঘুরঘুর করতে দেখেন? চামড়া উঠে যাওয়া, হাড় জিরজিরে কুকুরদের অমন কাজ করতে দেখতে আমাদের চক্ষু সয়ে গেছে। ইস্তান্বুলের পথে যেসব কুকুর ঘুরে বেড়াতে আমি দেখেছি, তেমন আর শুধু দেখেছি নাটক, সিনেমা, ইন্সটাগ্রাম, ফেসবুক আর টিকটকে। অমন সুন্দর কুকুর পথে-ঘাটে ঘুরে বেড়াচ্ছে দেখে আর থাকতে পারলাম না। একিনকে জিজ্ঞেস করলাম, এমন কুকুরের পাল দিয়ে তো আর কিছু না হোক বিদেশে রপ্তানি করে তোমরা প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রায় রাষ্ট্রীয় কোষাগার ভরতে পারো, ব্যাপারটা কি?

একিন গাঁক গাঁক করে উঠলো, সেই করি আরকি? শেষে আর কিছু না পেয়ে জাতের নামের এই বদনাম লাগুক। কেন বাপু, আমাদের রাস্তাঘাটে তাদেরকে কি ভাল লাগছে না দেখতে?

বললাম, না তা তো লাগছেই। কিন্তু এরা তো সব ছেড়ে দেয়া কুকুর। এদের প্রয়োজনীয় যত্ন, চিকিতসা, টিকা, খাবার জোগায় কে?

- কে আবার? মিউনিসিপ্যালিটি। ওদের কাজই তো ওই। আর কোন কাজ ওরা কবে কখন ঠিকঠাকমতো করতে পেরেছে।

আমি মেনে নিলাম একিনের কথা। আসলে পথে-ঘাটে এত সুন্দর কুকুর খোলাখুলি ঘুরে বেড়াচ্ছে এমন দৃশ্য জার্মানিতে আমার চোখে কখনই পড়ে নি। কুকুরদের দিক থেকে নজর সরালে দেখতে পাচ্ছিলাম বেড়াল। বেড়ালগুলো কুকুরদের চেয়ে যেন আরও এক কাঠি বেশি সরেস। যেমন নাদুস-নুদুস তেমন বন্ধুবতসল। রাস্তায়, ফুটপাথে মানুষের সাথে তাল মিলিয়ে হাঁটছে যেন ওরা অফিস-আদালতে যায়, বাজার করে, বাচ্চাদের নিয়ে স্কুলে যায়। এবারও জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকালাম একিনের দিকে। সে আমার চোখ দেখেই বুঝতে পারলো বেড়ালের কথা জানতে চাইছি।

বললো, বেড়ালও আমাদের এখানে মানুষের মতোই মর্যাদায় থাকে। কেউ ঘাটাতে যায় না। ওরা নিজেদের মতো থাকে। খাবার চুরি করে। তবে তার চেয়ে বেশি বিভিন্ন বাসা-বাড়ি থেকে নিয়ম করেই পায়। খুব বেশি চুরির প্রয়োজন পড়ে না।

পথের বাঁকে একটি রকে বসে থাকা বেড়ালের পরিবার দেখিয়ে বললো, এই যে এ পরিবারটিকে প্রতিদিন খাবার দেয় আমার ভাই। আমি পরিবারটির দিকে তাকিয়ে দেখলাম তিনটে বড় বেড়াল এবং গোটা চারেক দুগ্ধপোষ্য শিশু বেড়াল। পথের রকের ওপর এমনভাবে গা এলিয়ে শুয়ে-বসে আর কয়েকটা ঘুমিয়ে আছে যে দেখলে মনে হবে ওই রক ওদের জন্যই তৈরি করা হয়েছে। কুকুর, বেড়াল, গাঙচিলদের এমন সহাবস্থান দেখে আবারও একবার মনে মনে ভাবলাম, আমাদের দেশে কাক, কুকুর আর বেড়াল দেখলে আমরা কি "দুরছাই"-টাই না করি। সামান্য অবলা প্রাণী। তাই নাকি ঘরে থাকলে কে কে সব আসেন না ঘরে। হুম, ঘরে ঘুষখোর, চোরাকারবারি, ডাকাত, বদমাশ, নারীলোভী হুজুর ইত্যাদি থাকলে তাদের ঘরে আসতে কোনো অসুবিধা হয় না শুধু একটি অবলা প্রাণী থাকলে তেনাদের আর ঘরে পা পড়ে না। বেশ ভালই নিয়মনীতি! শ্রদ্ধা শ্রদ্ধা!!

যাক আমার ভাল লাগছিল আগামী কয়েকটা দিন এই কুকুর, বেড়ালগুলোকে যখনই বের হবো, দেখতে পাবো। চাই কি খানিক খেলতে পারবো। মানুষের ওদের যত্ন নেয় বলে ওরাও মানুষের খোঁজখবর রাখে। একটু মুখ চেনা হয়ে গেলেই, হোক সে কুকুর বা বেড়াল, রাস্তাঘাটে দেখলে ঠিকই দৌড়ে কাছে চলে আসে। কি মজা!

আমরা জাহাজঘাটে গিয়ে ইউরোপে যাবার টিকেট কাটলাম। আগেই বলেছি আমাদের হোস্টেলটা হচ্ছে ইস্তান্বুলের এশিয়ান অংশে। তাই যেসব দিন আমরা ইউরোপীয় অংশ ঘুরবো বলে ভেবেছি সেসব দিন আমাদের প্রতিবারই জাহাজে করে বসফরাস পাড়ি দিয়ে সেখানে যেতে হয়েছে। অন্যান্য জনপরিবহন যেমন বাস, ট্যাক্সি ইত্যাদিও আছে, কিন্তু জাহাজের বন্দোবস্ত থাকলে, হাতে সময় থাকলে এবং একটু সাশ্রয়ের ইচ্ছে থাকলে জাহাজই মোক্ষম। আর আমার তো পোয়া বারো। প্রত্যেকবার জাহাজে উঠেই আমি দৌড়ে চলে যাচ্ছিলাম ছাদে। শব্দের অত্যাচার থেকে বাঁচতে কানে হেডফোন। তারপর হেডফোনে পরিচিত কোনো গান। একটি সিগারেট আর তুমুল বাতাস। মুহূর্তের মধ্যে জীবনের সবগুলো পাজলকে সহনীয় এবং কোনো একদিন অবশ্যই মিলে যাবে সেই নিশ্চয়তায় মোড়ানো বলে মনে হতে থাকে। শুধু না যদি রবার্ট কানে কানে এসে বলে বসে, এত যে কবি কবি ভাব, নায়িকার অভাব- তা ওইদিকে এক তুর্কী সুন্দরি যে একা একা বসে আছে! এহেন সমুদ্রযাত্রা কি একেলাই কাটিয়া যাইবে উহার?

৬.

রবার্ট যে কেন নিজেকে আমাদের সকলের উইংম্যান বা সোজা বাংলায় ঘটকের জায়গায় প্রতিস্থাপন করেছিল, তা আমি ঠিক জানি না। একিন প্রায়ই বান্ধবী নেই বলে বলে আক্ষেপ প্রকাশ করে, কিন্তু ফরিদ বা আমি কখনোই ওকে তেমন কোনো কথা বলি নি, নিদেরপক্ষে ইশারা-ইঙ্গিতেও কিছু বলি নি। ছেলেটা এমনই অবশ্য। পরিচয় ইস্তক এভাবেই দেখে আসছি। প্রথম দিকে তো আমি বেশ অপ্রস্তুত হতাম ও কার্যকলাপে। প্রথমবার যখন সকলে মিলে এরফুর্টের উঠতি বয়সীদের ক্লাব "কসমোপলিটান"-এ গিয়েছিলাম, সেদিনের একটা কথা মনে আছে।

ও ধরনের ক্লাবভ্রমণগুলোকে আমি খুব একটা পছন্দ করতে পারতাম না। আমি আজীবন খেটে খাওয়া মানুষ। আমার বরং ভাল লাগে ক্লাবে-ট্লাবে গিয়ে বারটেন্ডারের চাকুরি খুঁজতে। তারপর বারের পেছনে ককটেইল বানাতে বানাতে সারারাত প্রচুর উপভোগ করতে পারি আমি। বারে আসার অতিথিদের সাথে নানা গল্প গুজবে সময় পার করতেও দারুণ লাগে। কিন্তু এছাড়া ক্লাবে কাজে না গিয়ে, বরং পানালাপ, নর্তন-কুর্দন ইত্যাদির জন্য গেলে আমি সবসময়ই জবরজং হয়ে বসে থাকি শুধু। কেন যেন এমনিতে আমি যেসব হাসি-ঠাট্টা করি সেসবই ঠিকঠাকমতো করতে পারি না। খরচের চিন্তা হয়তো একটা ব্যাপার হয়ে থাকবে। আর আমার সামান্য ইন্ট্রোভার্ট মানসিকতারও তাতে ভূমিকা থেকে থাকতে পারে। এ কারণে আমার ক্লাবে কাজ নিতে ভাল লাগে। কাজ ছাড়া ঘুরতে যেতে না।

যাই হোক রবার্টকে তো আর সেসব বোঝানো সম্ভব না। ওর এক কথা, তুমি আর একিন না থাকলে আমাকে প্রিসকার (ওর বান্ধবী) এক্স-বয়ফ্রেন্ডদের হাত থেকে কারা বাঁচাবে? এই ওর এক নিত্যদিনের অজুহাত। এর বান্ধবীর এক্স-বয়ফ্রেন্ডরা চারিদিকে ঘুরে ফিরে বেড়ায় এবং সুযোগ পেলেই নাকি ওকে হেনস্থা করে। যদিও একিন বা আমি অমন কিছু কখনো ঘটতে দেখি নি। কিন্তু আমাদের দু'জনকে তার চাই যাতে এমন কোনো ঘটনা কোনোদিন ঘটে গেলে ওকে যেন উদ্ধার করতে পারি।

যাহোক সেবার কসমোপলিটানে গিয়ে রবার্টের ঘটানো ঘটনাটা বলি। তখন আমরা দুজন কাউন্টার থেকে দুটো পানীয় কিনছিলাম। পাশে ছিল পেটখোলা এক অষ্টাদশী। সে আমাদের পরে পানীয় চেয়েছিল বারটেন্ডারের কাছে। তাই বারটেন্ডার আমাদেরটা বানিয়ে দিয়েছিল আগে। পানীয়টা হাতে দিয়ে রবার্ট পাশের মেয়েটির দিকে তাকিয়ে কোনোরূপ ভনিতা ছাড়া বললো যে, তুমি কি আমার বন্ধু মীরের সাথে পরিচিত হয়েছো? তারপর গম্ভীর ভঙ্গিতে মাথা নাড়তে নাড়তে চলে গেল আমাকে রেখেই ওখানে। এইবার আমি আমার পানীয় নিয়ে দাঁড়িয়ে আছি। মেয়েটি তার পানীয় জন্য অপেক্ষা করছে। আর রবার্ট হাওয়া। কিছুক্ষণ অকওয়ার্ড সময় কাটানোর পর আমি মেয়েটিকে বললাম, আমার বন্ধুর মাথার স্ক্রু ঢিলা। স্যরি তোমাকে বদার করার জন্য।

মেয়েটি বললো, না না কোনো সমস্যা নেই। তোমার নাম মীর? আমার নাম মিলা।

তারপর মিলা তাদের টেবিল দেখালো আঙ্গুলের ইশারায়। বলে গেল, সময় পেলে আমরা যেন ঢু দিই। তা আর সময় পাওয়া! ওই একই দিন একই কাণ্ড রবার্ট আরও দুবার ঘটালো। একবার একিনকে নিয়ে এবং আরও একবার আমাকে নিয়ে। একিনের সাথে যেটা ঘটেছিল, সেটা মনে হলো খানিকটা কাজও করেছিল। সেদিন ফেরার পথে একিন বলছিল, ফোন নাম্বার পেয়েছি মেয়েটার। এ কারণেই তখন বলছিলাম, রবার্ট যেন ভিনসেন্ট ভন একটা।

যাহোক ফিরে যাই বসফরাস প্রণালীতে আবার। জাহাজে যখন রবার্ট আক্ষরিক অর্থেই আমায় খবর দিল একটি তুর্কী সুন্দরী নিচে একা, আমিও ভাবলাম "কি আসা গেবনে" (কি আছে জীবনে)। কানের হেডফোনে এমিও তো গাইছে,

"Our day will come
And we'll have everything.
We'll share the joy
Falling in love can bring."

যদিও এমি গানটি কভার করেছে। মূল শিল্পী অন্য। তারপরও সব মিলিয়ে আমি ভাবলাম, দেখাই যাক কি হয়। শুনি তো রবার্টের পরিকল্পনাটা কি এ নিয়ে। তাই আমি ওর দিকে পূর্ণ দৃষ্টি মেলে জানতে চাইলাম, তো কি করতে হবে শুনি?

আমার কাছে থেকে এ ধরনের বিষয়গুলোতে রবার্ট সাধারণত ইতিবাচক সাড়া পায় না। অনেকদিন পর একটা পেয়ে যেন পাগল হয়ে উঠলো সে। বললো, কোনো চিন্তা নেই দোস্তো। পুরো ব্যাপারটা আমি দেখবো। তুই শুধু থাকবি সাথে সাথে। জানিস আজ রাতে যদি তুই ওই মেয়েটির সাথে থাকতে পারিস তাহলে মনে হবে আমিই থাকছি ওর সাথে!

রবার্টের অমনতরো নোংরা কথা শুরুতে বন্ধ করে না দিলে চলতেই থাকে। তাই ওকে তাড়াতাড়ি থামানোর জন্যই বললাম, চল দেখি কোথায় কাকে দেখে তোর মাথা এমন বিগড়েছে।

৭.

গাঙচিলেরা আমাদের জাহাজের পাশে পাশে উড়ছিল। চলমান জাহাজের ছাদ থেকে ওদের দেখা এক অমূল্য অভিজ্ঞতা। হাতে রুটির টুকরা থাকলে ওদের দিকে ছুড়ে দেয়া যায়। বাংলাদেশের ফিল্ডারদের মতো তারা নয়। খুব কমই ক্যাচ ফেলে গাঙচিলগুলো। যেগুলো ধরতে পারে না সেগুলো পরে যায় নিচে বসফরাসের নীল পানিতে। ওখানে আবার জাহাজের সাথে পাল্লা দিয়ে ছুটছে জেলিফিশ। বেশির ভাগ জেলিফিশ ঘাটের আশপাশে থাকলেও কিছু কিছু সাহসী জেলিফিশ পুরোটা পথই জাহাজের সাথে সাথে পাড়ি দেয়। বসফরাসে চলমান জাহাজের ছাদ তাই ধীরে ধীরে আমার অন্যতম পছন্দের জায়গায় পরিণত হয়ে উঠছিল।

তবে রবার্টকে থামানোর জন্য সব রেখে নিচে নেমে আসতে হলো। এসে দেখি রবার্ট যাকে তুর্কী সুন্দরী ঠাউরেছিল তিনি বস্তুত জাহাজের টিকেট চেকার। কই আমরা উনার দিকে এগোবো, তার আগে তিনিই এগিয়ে এলেন। টিকেট দেখানো শেষে রবার্ট উনাকে জিজ্ঞেস করলো, তোমার ডিউটি শেষ কখন? আমরা জাহাজঘাটে তোমার জন্য অপেক্ষা করবো। শুনে তিনি চোখ বড় বড় করে বললেন, আমার কাজ তো কেবল শুরু হলো। অন্তত আট ঘন্টা আরও। রবার্ট সাথে সাথে আমার দিকে ঘুরে বললো, দোস্ত চিন্তা করিস না। সামনে ঠিকই আমরা একজনকে তোর জন্য খুঁজে পাবো। আমি কোনো কথাই বললাম না।

আমাদের পরিকল্পনা ছিল ইস্তান্বুলের ইউরোপীয় অংশের যতোটা সম্ভব সেদিন ঘুরে ফিরে দেখে নেবো। কেননা এরপরের দুদিনে আমাদের পরিকল্পনা ইস্তান্বুলের চারপাশের দ্বীপগুলোতে ঘুরতে যাওয়া। তারপর শেষ দিন এশিয়ান অংশের যতোটা সম্ভব ঘুরে-ফিরে পরদিন সকালে আমরা ফিরে যাবো আমাদের ছোট্ট, সবুজ, পাহাড়ঘেরা ইলমিনাউ শহরে।

জাহাজঘাটে পৌঁছুনোর পর টের পেলাম সবাই পেটে প্রচণ্ড ক্ষুধা! ফরিদ জানালো পাশেই একটি দূর্দান্ড কাম্পিরের দোকান রয়েছে। কাম্পির হলো তুরস্কের অন্যতম জনপ্রিয় একটি স্ট্রীট-ফুড, যা মূলত আলু দিয়ে তৈরি। বিশালায়তনের আলু মাঝামাঝি কেটে প্রথমে ভেতরটা কুড়িয়ে নেয়া হয়। তারপর সেখানে তেল, মশলা, সালাদ, মাংসের টুকরা, টোফু, সালামি, সেদ্ধ ভুট্টা, জলপাই এবং আরও নানাবিধ উপাদান পুরে উচ্চ তাপমাত্রায় "বেক" করা হয়। তারপর আলুটি কাগজে মুড়িয়ে হাতে দিয়ে দেয়া হয় খরিদ্দারের। ব্যাস্ এবার ভেতর থেকে সেদ্ধ উপাদানগুলো চামচ দিয়ে খেতে খেতে হাঁটুন, কিংবা কোথাও গিয়ে বসুন, কিংবা ওখানেই দাঁড়িয়ে খেয়ে নিন- যেমনটি আপনি চান। খাবারটি দেখতে কেমন দেখায় জানতে চাইলে গুগলে তার্কিশ কাম্পির (Turkish kampir) লিখে ইমেজ-সার্চ দিয়ে দেখতে পারেন। একটি কাম্পির যেকোন বয়সী মানুষের পেট ভরিয়ে দেয়ার জন্য যথেষ্ট। তবে রবার্টের সবসময়ই একটু বেশি বেশি লাগে বলে, ও সবার আগে নিজেরটা শেষ করে প্রথমে আমার সসেজের টুকরাগুলোতে ভাগ বসালো। আমি ওগুলো আলাদা করে রাখছিলাম শেষে খাবো বলে। সাধারণত আমি এভাবেই খাই। খাবার যে উপাদানটি বা আইটেমটি বেশি ভাল লাগে সেটিকে শেষে খাওয়ার জন্য রেখে দিই। প্রায়ই রবার্টের জন্য সে সুযোগ জোটে না অবশ্য। তবে শুধু রবার্টই নয়, এ কাজ করতো আমার নাইজেরিয়ার বন্ধু কোলাওলে-ও। ওর কথা অন্য কোনো একদিন বলবো- কখনও যদি ওর সাথে আমাদের আমস্টারডামে ঘুরতে যাওয়ার কথা লিখা হয়।

রবার্ট আমার বিফ সসেজের টুকরাগুলো সাবাড় করে, একিনের কাছে গিয়ে একটা কিছু খুঁটিয়ে খেতে নিয়েছিল কিন্তু পারলো না। বরং একটা রামধমক খেলো। তারপর ফরিদের কাছে গিয়ে আবার কি কি যেন সাবাড় করলো। আমি আর নজর দিলাম না সেদিকে। কেননা আমাদের চোখের সামনে তখন দৃশ্যমান হয়ে উঠতে শুরু করেছে হাজিয়া সোফিয়া মসজিদের সুউচ্চ গম্বুজগুলি। দূর থেকেই ওদের শক্তিশালী হাতছানি টের পাচ্ছিলাম।

৫৩৭ খ্রিস্টাব্দে গ্রীকদের দ্বারা নির্মিত হয়েছিল তখনকার এই গির্জাটি। যেটি বাইজেনটাইন স্থাপত্যকলার অন্যতম নিদর্শন হিসেবে এখনও গৌরবজ্জ্বল অস্তিত্ব হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে। ১৪৫৩ খ্রিস্টাব্দে আটোমানদের হাতে বাইজেনটাইন সাম্রাজ্যের রাজধানী কন্সটানটিনোপলের পতন ঘটলে, অটোমানরা গীর্জাটিকে মসজিদে রুপান্তরিত করে ফেলে। তারপর থেকে ওটি মসজিদ হিসেবেই মূলত ব্যবহৃত হয়ে আসছে। শুধু ১৯৩৫ থেকে ২০২০ পর্যন্ত সেখানে নামাজ ইত্যাদি পড়ানো হয় নি। সে সময়কালে মসজিদটি ব্যবহৃত হয়েছে জাদুঘর হিসেবে। ২০২০ থেকে আবারও ওখানে নিয়মিত নামাজ পড়ানো শুরু হয়েছে।

আমি যে সময়ের কথা বলছি, তখনও হাজিয়া সোফিয়ার মূল ভবনটি ব্যবহৃত হচ্ছিল মূলত জাদুঘর হিসেবে। সে কারণেই প্রচুর অতিথির ভীড় এবং লম্বা লাইন পাড়ি দিয়ে আমাদের সেখানে ঢুকতে হয়। ভেতরে গিয়ে অবশ্য ভীড় কিংবা লাইনে দাঁড়ানোর কষ্ট মুহূর্তেই দূর হয়ে যায়।

হবে নাই বা কেন? আজ থেকে ১৪৮০'রও বেশি বছর আগে সমাপ্ত হওয়া সে সুবিশাল সুরম্য স্থাপত্যযজ্ঞের সামনে হাজির হলে যে কারোই এমনটা হওয়ার কথা। দীর্ঘ দিন তুরস্কা দেশটি কিংবা অঞ্চলটি মুসলমানদের শাসনাধীনে থাকার দরুণ এখন দেয়ালে দেয়ালে আরবী ম্যূরাল কিংবা এপিটাফের ছড়াছড়ি। তবে আগে যখন গীর্জা ছিল সে সময় যেসব শিল্পকর্ম নির্মিত হয়েছিল, সেগুলোকেও সংরক্ষণ করা হয়েছে বড় সযত্নে। পুরো এলাকা নিশ্চিত কয়েক শত একরের বেশি হবে। নিশ্চিত কোনো তথ্য হাতের কাছে না পাওয়ায় উল্লেখ করা গেল না। কিন্তু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কথা যদি ভাবি, শাহবাগ থেকে চানখাঁর পুল আর দোয়েল চত্বর থেকে শাহনেয়াজ হল পর্যন্ত বৃত্তাকার এলাকার আয়তন যদি প্রায় ছয়শত একর কিংবা কাছাকাছি হয়, তাহলে হাজিয়া সোফিয়া আরও খানিকটা বড় এলাকা নিয়েই দাঁড়িয়ে আছে বলা যায়।

হাজিয়া সোফিয়া ঘুরে দেখা শেষে আমরা ভাবলাম সামান্য বিশ্রাম নিই। প্রচুর ঘোরাঘুরি হয়ে গেছে। তবে আমাদের তখনও তাকসিম স্কোয়ার, গেজি পার্ক কোথাও যাওয়া হয় নি। তাই বেশিক্ষণ বিশ্রাম নেয়া গেল না। পাশেই একটি পার্কে ঢুকে আমরা পাহাড়ের গা কেটে তৈরি সিঁড়িতে বানানো চায়ের দোকানে বসে চা পান করলাম। ইস্তান্বুলে মানুষ উঠতে বসতে রং চা খাচ্ছিল। ছোট ছোট কাপে। খুব সুন্দর দেখতে। আমার মতো যাদের ঘন ঘন রং চা-এ সমস্যা নেই তাদের জন্য আসলেই দারুণ একটা ব্যপার। যারা রং-চা পছন্দ করেন না তাদের জন্য অবশ্য সমস্যা। কেননা ইস্তান্বুলের কোথাও দুধ চা বা তেমন কিছু চোখে পড়ে নি আমার। কফিশপ কিংবা কাফে রয়েছে প্রচুর। দুধ চায়ের দোকান একটিও না। আমি কয়েক জায়গায় পানীয়টা খুঁজলাম। দোকানীদের কথা শুনে মনে হলো, কেউই দুধ দিয়ে চা পানের ধারণাটা খুব পছন্দ করে বলে মনে হলো না। এ যেন আনারসের পিজ্জার মতো। কেউ কেউ পছন্দ করে, কিন্তু বেশিরভাগ তেলে-বেগুনে জ্বলে উঠে নাম শুনলেই।

চায়ের দোকানটা এমন সুন্দর একটা জায়গায় ছিল যে আমরা প্রায় ঘন্টা খানেক বসে বসে গল্প করেই কাটিয়ে দিলাম ওখানে। আমরা পাহাড়ের শরীর কেটে বানানো সিঁড়িতে বসে যখন চায়ে চুমুক দিচ্ছিলাম, তখন একপাশে বসফরাসের নীল জলরাশি কেটে বড় বড় প্রমোদতরীগুলো ছুটে যাচ্ছিল আমাদের চোখের সামনে দিয়ে। যদিও অনেকটা দূরে বলে সবকিছুকে অনেক ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র দেখাচ্ছিল কিন্তু তাতে কোনোকিছুর কমতি হচ্ছিল না বিন্দুমাত্র। আরেকপাশে প্রায় আমাদের চোখের উচ্চতায়ই দেখা যাচ্ছিল কিংবা আরেকটু উঁচুতে বড় বড় গাছভর্তি গাঙচিলের বাসা। গাঙচিলেরা আমাদের মাথার ওপর দিয়েই উড়ে একবার পানির দিকে চলে যাচ্ছিল আবার একবার তাদের নীড়ে ফিরছিল। এমন একটা পরিবেশে কার না বসে থাকতে ভাল লাগে। আমরা চারজনা গল্প করতে করতে তাই এক প্রকার ভুলেই গিয়েছিলাম সেদিনের অন্যান্য পরিকল্পনার কথা।

৮.

ফরিদই মনে করালো সকলকে যে, গেজি পার্ক দেখে যদি আমরা তাকসিম চত্বর এবং লাগোয়া "ফ্যাশন স্ট্রীট" ঘুরে দেখতে চাই তাহলে আমাদের অন্তত চার-পাঁচ ঘন্টার পরিকল্পনা করতে হবে। যার অর্থ আমাদেরকে তখনই উঠতে হবে। চিন্তা করে দেখলাম কথা খারাপ বলে নি ছেলেটা। আসলে যাত্রার প্রথম ওকে নিয়ে আমার মনে যা কিছু হচ্ছিল, দুদিনের মাথায় সে সব দূর হয়ে গিয়েছে। ছেলেটা আসলেই চটপটে। যা কিছু বলে একদম ঠিকঠাক বলে। ভুলভাল কোনো তথ্য দেয় না। অপরদিকে রবার্টের সবকিছু যেন কল্পনায় ঠাসা। ওর কোনটা যে সঠিক তথ্য আর কোনটা বানানো, তাই ঠাহর করা যায় না। তবে আমি পারি। বহুদিনের বন্ধুত্ব বলে ওর কথা শুনলেই আমি বুঝতে পারতাম- ছেলেটা সত্যি কথা বলছে নাকি চাপা।

আমরা গেজি পার্কে হেঁটেই চলে গেলাম সেখান থেকে। কিছুটা সময় বেশি লেগেছিল। কিন্তু পথের দোকানপাট, মানুষজন, যানবাহন দেখতে দেখতে ঠিকই পৌঁছে গিয়েছিলাম। মাঝখানে একটি আইসক্রীমের দোকানে বিস্তর নাজেহাল হলাম আমিই। আমরা চারজন চারটি কোন আইসক্রীম অর্ডার করেছিলাম। আমারটি ছিল একদম ক্লাসিক স্ট্রবেরী আর ভ্যানিলা। সে কারণেই দোকানি বুঝি আমায়ে বেছে নিয়েছিল। ওখানকার আইসক্রীমের দোকানীরা খরিদ্দারদের হাতে আইসক্রীম তুলে দেয়ার সময় নানাবিধ কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে তাকে সাময়িক নাজেহাল করেন। ব্যপারটা খুবই স্বাভাবিক এবং পর্যটনবান্ধব। বিশেষ করে কোলের বাচ্চারা এ ধরনের হেনস্থার স্বীকার হলে কেঁদে ফেলে যা দেখতে ভীষণ মিষ্টি আর চিত্তাকর্ষক। তবে আমার মতো ত্রিশোর্ধ্ব নিরেট লোকের অমনধারা নাজেহাল হতে দেখাও কম চিত্তাকর্ষক নয়। আইসক্রীমের দোকানি কোনোভাবেই আমার হাতে আইসক্রীমটি দিচ্ছিলেন না। একবার তো আমি নিয়েই ফেলেছি ভেবে মুখের কাছেও নিয়ে আসি আইসক্রীমটা। তারপর দেখি শুধু কোনের খোলসটা হাতে। আর সবকিছু দোকানির কাছে। সবশেষে যখন দোকানী আমায় সত্যি সত্যি আইসক্রীমটি দিচ্ছিল তখন আমি বিশ্বাস করতে পারছিলাম না বলে নিচ্ছিলাম না। পেছন থেকে একটি মেয়ে এসে সেটি খপ করে দোকানীর কাছ থেকে কেড়ে নিয়ে আমার দিকে বাড়িয়ে ধরলো। বললো, ব্যপার না। অভ্যাস না থাকলে ওই দোকানী না চাইলে কেউই তার হাত থেকে আইসক্রীম নিতে পারে না। এ জাদুর চর্চা ওরা ছেলেবেলা থেকে করে আসছে।

আমি অবশেষে আইসক্রীম হাতে পেয়ে খুশি হয়ে মেয়েটিকে একটা ধন্যবাদ জানালাম। মেয়েটি হেসে প্রত্যূত্তর দিলো, তুমি তো এখানকার মানুষ নও। কোথা থেকে আসছো?

আমি খানিক অবাক হলাম। আশেপাশে রবার্টকে দেখছি না। সেই কাউকে ঠিক করে পাঠালো কিনা কে জানে। বললাম, আমি বন্ধুদের সাথে বেড়াতে এসেছি জার্মানি থেকে।
- ও আচ্ছা, তা দেশ কোথায় তোমার?
-বাংলাদেশ। তুমি তো বোধহয় এই শহরেরই মেয়ে তাই না?
-না আমার জন্ম, বেড়ে ওঠা সব আঙ্কারায়। এখানে কাজের খোঁজে এসেছি।
-কি কাজ খুঁজছো তুমি?
-আমি অভিনয় করতে জানি। সিনেমায় অভিনয় করতে চাই।
-এই যাহ, এখনও তোমার নামই জিজ্ঞেস করি নি।
-আমি মাহরিবান লাইলা একালাই। তুমি আমায় মাহরি বলে ডেকো। তোমার নাম কি?
-আমি মীর রাকীব-উন-নবী। তুমি আমায় রকি বলে ডেকো।
-রকি? শুনেই সিলভেস্টার স্ট্যালোনের সেই সিনেমাগুলোর কথা মনে পড়ে গেল। সুন্দর নাম তো।
-থ্যাংক ইউ। তোমার নামটাও তো সুন্দর। একালাই কি তোমার বংশের পদবী?
-না একালাই আমার সাবেক স্বামীর পদবী। ছাড়াছাড়ি হয়ে গেলেও নামটা এখনও রয়ে গেছে। থাকুক না হয় একটা স্মৃতি, তাই না?

মাহরীর কথা শুনে রুদ্র মুহাম্মদ শহীদুল্লাহর একটি পঙক্তি মনে পড়ে গেলো-

"থাকুক তোমার একটি স্মৃতি থাকুক
একলা থাকার খুব দুপুরে
একটা ঘুঘু ডাকুক।"

পঙক্তিটি মাহরীকে শোনালাম, খানিকটা ব্যাখ্যাও করলাম। মেয়েটি কবিতাটা খুব পছন্দ করলো। ততক্ষণে রবার্ট, একিন আর ফরিদও দেখলাম আশপাশ থেকে কাছে চলে এসেছে। সবার সাথে মেয়েটির পরিচয় করিয়ে দিলাম। দেখা গেল সেদিন ওর আর কোনো কাজও নেই। সে আমাদের সাথে যুক্ত হয়ে গেল গেজি পার্ক এবং তাকসিম চত্বর ভ্রমণের উদ্দেশ্যে। পরে জানা গেল সেও ইস্তান্বুলের পূবপাশে অর্থাৎ এশিয়ান অংশ থাকে। যাত্রা শেষে সবাই একসাথে জাহাজে করে ফিরবো, তাও যেতে যেতে ঠিক করে ফেলা হলো। তবে সেদিন কিছুক্ষণের মধ্যেই পুরো পরিবেশ পাল্টে গিয়েছিল তাকসিম চত্বরে এক আত্মঘাতী বোমা হামলায়।

৯.
বোমা হামলাটি ঘটেছিল সেদিন সকাল ১১টায়। তাকসিম চত্বরেই। হামলাকারীসহ ৫ জন নিহত এবং ৩৬ জন আহত হয়েছিল। সে সময়টায় আমরা মূলত হাজিয়া সোফিয়াতে ঢোকার লাইনে দাঁড়িয়েছিলাম। কোনো খবর পাই নি, কেননা আমরা ঘোরাঘুরিতেই বেশি ব্যাস্ত ছিলাম। খবরটি পাই নি গেজি পার্কে পৌঁছেও। তবে পার্কটি বোমা হামলার স্থান থেকে কাছাকাছি হওয়ায় প্রচুর সেনাসদস্য আর পুলিশের উপস্থিতি আমাদের মনে প্রথম থেকেই শঙ্কা জাগাচ্ছিল। একিনকে যে একটা খোঁজ নিতে বলবো তাও করা হয়ে উঠছিল না। একদিকে হাঁটাহাঁটি ভাল লাগছিল, আরেকদিকে আমাদের নতুন পরিচিত বন্ধু মাহরি অল্প সময়ে একিনের সাথে স্থানীয় ভাষায় জমাট আড্ডা শুরু করে দিয়েছিল বলে ছেলেটাকে জিজ্ঞেস করা হচ্ছিল না, এত পুলিশ আর সেনাসদস্য কেন আশেপাশে।

তবে পার্কে ঢোকার প্রবেশপথে যখন আমাদের মেটাল ডিক্টেটর দিয়ে তল্লাশি চালানো হচ্ছিল তখন আশপাশের মানুষের কথা শুনে ফরিদ প্রথম বুঝতে পেরেছিল আশপাশে ঘন্টা দুই বা তিনেক আগেই একটি বোমা হামলা হয়েছে। তার কিছুদিন আগেই লন্ডনের মেট্রো স্টেশনে বোমা হামলার খবর সারা পৃথিবীতে আলোড়ন তুলেছিল। সবাই মনে মনে ঘাবড়ে ছিল খানিকটা। আমরা পার্কের ভেতর ঢোকার পর একিন তার মা ও ভাইকে ফোন করে ঘটনার সত্যতা জানতে পারলো। ততক্ষণে আমরা নিজেরাও ফোনে ইন্টারনেট চালু করে খুঁজে বের করে ফেলি ঘটনার বর্ণনা। বিদেশ-বিভুইয়ের রোমিং চার্জের ভয়ে কখনও ফোনের এয়ারপ্লেন মোড পরিবর্তন করা হতো না। শুধু ওয়াই-ফাই জোন পেলে সেখানে গিয়ে অনলাইন জগতে ঢু মারা হতো। সেদিন সেসবও কিছু মাথায় ছিল না। সরাসরি রোমিং চালু করে ফোনে যে সামান্য ডাটা ছিল তাই দিয়ে আমরা বিপুল উত্তেজনায় কাঁপতে কাঁপতে বের করেছিলাম খবরগুলো।

জানা গেল, বোমা হামলা ঘটেছে তাকসিম চত্বরেই। একদম মেয়রের কার্যালয়ের সামনে। তখনকার সবচেয়ে বড় জঙ্গী সংগঠন "আইসিস" সেই হামলার দায়ও স্বীকার করেছে। খিলাফতের পথে এমন বাঁধা আর যারা সৃষ্টি করবে তাদের একই পরিণতি বরণ করে নিতে হবে বলে হুঁশিয়ারিও জারি করেছে। এ সবই ঘটেছে যখন আমরা মনের আনন্দের হাজিয়া সোফিয়া ঘুরে ঘুরে দেখছিলাম সে সময়টাতে।

আমাদের তাকসিম চত্বরে ঘুরতে যাওয়ার পরিকল্পনা বাতিল করতে হলো দ্রুতই। ওটিই মূলত ইস্তান্বুলের সবচেয়ে জনপ্রিয় ট্যুরিস্ট স্পট। বোমা হামলার সাথে সাথে ওই এলাকায় রেড এলার্ট জারি করা হয়ে গেছে। কাউকে ঢুকতে দেয়া হচ্ছে না। যারা আগে থেকে ছিল তাদেরকে নিরাপদে বের করে নেয়া হয়েছে। ওদিকে আমাদের সাথে যে বান্ধবীর পরে যোগ দেয়ার কথা ছিল সেও জানালো আর আসবে না। তার বাবা-মা নাকি বোমার কথা টিভিতে জানতে পেরে ওকে ফোন করে বলেছে, ইস্তান্বুলে এখন না যাওয়াই ভাল হবে।

আমরা পরে ঠিক করলাম জাহাজঘাটের দিকে যাই। পশ্চিমে যেহেতু আজ আর কাজ নেই, পূর্বের এশিয়ান অংশে গিয়ে যদি কিছু করা যায়। জাহাজঘাট পর্যন্তও যাওয়া গেল না। পথিমধ্যে সেনাবাহিনীর বাঁধার মুখোমুখি হতে হলো। পুরো জাহাজঘাট নাকি ঘিরে রাখা হয়েছে এবং সেদিন সব ধরনের ছোট বড় নৌ-যান চলাচল বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে।

কি করা যায় ভাবছি যখন মাহরি বললো, আমরা গালাটাসারে ফুটবল ক্লাবটি ঘুরে দেখে আসতে পারি। গালাটাসারে তুরস্কের সবচেয়ে সফল ফুটবল ক্লাব। মাঝে মাঝে চ্যাম্পিওনস্ লীগেও খেলে। ফ্রান্ক রিবেরি, দিদিয়ের দ্রগবা, হাকান সুকুরদের মতো ফুটবলারেরা প্রথম জীবনে ওই ক্লাবে খেলে সুনাম কুড়িয়েছে। ক্লাবের নিজস্ব জাদুঘর, স্টেডিয়াম, ক্লাব, রেস্টুরেন্ট সবই আছে। হাঁটা দিলাম সবাই মিলে। একিন আর মাহরি দুজনেই গালাটাসারে ক্লাবের ডাই-হার্ড ফ্যান। জানা গেল, গালাটাসারে যদি ওদের মোহামেডান হয় তাহলে আবাহনী হচ্ছে ফেনারবাচে ফুটবল ক্লাব। শুনেই ফরিদ, রবার্ট আর আমি ফেনারবাচের সমর্থক হয়ে গেলাম। ব্যাস্ তারপর পথ চলতে চলতে দুই পক্ষ মিলে কতো যে কথা কাটাকাটি। বিশেষ করে একিনকে রাগিয়ে মজাটা বেশি পাওয়া যাচ্ছিল। সে থেকে থেকেই বলে উঠছিলো, "একেকটা ফেনারবাচের নামও শুনে নি আজকের আগে জীবনে। আর দেখো না এখন কেমন ক্লাবের নামটি শুনে ভূমধ্যসাগরের উড়ুক্কু মাছের মতো লাফাচ্ছে। মরণ!"

মাহরি অল্প সময়ের মধ্যে ভালই মিশে গিয়েছিল আমাদের সাথে। সেও একিনের সাথে তাল মিলিয়ে আমাদের কটাক্ষ করে যাচ্ছিল। আর আমাদের একমাত্র হাতিয়ার ছিল সর্বশেষ মুখোমুখি লড়াইয়ে ফেনারবাচের কাছে গালাটাসারের ৪-০ গোলে হারের ঘটনাটি। আমি শুধু ফরিদ আর রবার্টকে শিখিয়ে দিয়েছিলাম- ৪ মানে, এক হালি। আর যায় কোথায়, ওরা বাংলাতেই ও দুজনকে "এক হালি", "এক হালি" বলে ক্ষেপাচ্ছিল।

তবে সবই ছিল বন্ধুত্বপূর্ণ ঠাট্টা-তামাশা। তাই করতে করতে সেদিন আমাদের গালাটাসারে ক্লাবটা ঘুরে দেখা হয়ে গেল। তারপর বাসে করে ফিরে এলাম কাদোকেই এলাকায়। সুলতান মেহমেত সেতুর ওপর দিয়ে পার হলাম বসফরাস। ঠিক করা হলো পরদিন সবাই আমাদের হোস্টেলের সামনে দেখা করবো আগে। তারপর বের হবো ঘুরতে-ফিরতে।

১০.
ইস্তান্বুলের চারপাশে মার্মারা সাগরের বুকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে ছোট বড় চারটি দ্বীপ। যাদের একসাথে বলা হয় প্রিন্সদের দ্বীপপুঞ্জ বা প্রিন্সস' আইল্যান্ডস্ (Princes' Islands)। বিভিন্ন সময় অটোমান সম্রাটরা তাদের উঠতি বয়সী পুত্রদের সেসব দ্বীপে রাজকার্য পরিচালনা শিখতে পাঠাতেন। সেখান থেকেই এমন নামকরণ। কথিত আছে যারা একবার ওইসব দ্বীপে রাজ্য পরিচালনা শিখতে তারা বেশিরভাগই আততায়ীর হাতে মারা পড়তেন। ফিরে আসতেন খুব কম সংখ্যক রাজপুত্রই।

আমাদের পরের দুইদিনের পরিকল্পনা ছিল দ্বীপপুঞ্জগুলো ঘুরে দেখার। সেই পরিকল্পনায় সামান্য পরিবর্তন আনা হলো বোমা হামলার জন্য। ভাবলাম দ্বীপপুঞ্জে ঘুরে বেড়ানোর পরিকল্পনা একদিনে সমাপ্ত করে, পরে আরেকদিন তাকসিম চত্বর দেখতে যাবো। ফরিদ আর মাহরি বললো সেটাই ভাল। চারটি দ্বীপে একদিনে ঘুরে বেড়ানোর জন্য ভাল প্যাকেজ রয়েছে বিভিন্ন জাহাজের। আমরা একটা দলীয় প্যাকেজ নিয়ে নিলেই কোনো চিন্তাই থাকবে না।

ইস্তান্বুল ভ্রমণের সেরা দিন ছিল সম্ভবত ওটিই। যদিও অন্যান্য দিনগুলো অসামান্য ছিল না বলছি না। একটু বেশি অসামান্য ছিল দ্বীপভ্রমণের দিনটি। তারপরের দিনের তাকসিম চত্বর আর ইস্তান্বুলের বিখ্যাত মশলার বাজার ঘুরে দেখাটাও একটা দারুণ আনন্দের দিন হিসেবে খচিত হয়ে রয়েছে আমার স্মৃতির খাতায়। তারপরও সেরা দিনটা ছিল ওইটিই, যেদিন আমরা সারাদিন জাহাজে করে দ্বীপ থেকে দ্বীপে ঘুরে বেড়িয়েছিলাম গাঙচিলদের মতো করেই। সেদিন সবচেয়ে বেশি নৈকট্য অনুভব করেছিলাম ওদের সাথে। ওদের জীবনটাকেও দেখেছিলাম আরও একটু কাছ থেকে।

আমাদের পরিকল্পনা ছিল সেদিন সকালে হোস্টেল থেকে খুব বেশি কিছু না খেয়ে বের হওয়া, যাতে প্রথম এবং সবচেয়ে বড় দ্বীপটিতে গিয়ে সেখানকার স্বনামধন্য "ব্রেকফাস্ট" ভালভাবে উপভোগ করতে পারি। রবার্ট অবশ্য সেসবের ধার ধারলো না। সে নাকি কোথা থেকে শুনেছে সকালে দুবার নাশতা করলে আয়ুবৃদ্ধি ঘটে। এই কথাটি সে আগের দিন রাতে পরিকল্পনা করার সময়ই আমাদের সাথে শেয়ার করেছে। যখন আমরা বলছিলাম হোস্টেলে সকালে বেশি কিছু খাবো না। ওর কথা হচ্ছে, হোস্টেলেও নাশতা করবে। তারপর দ্বীপে গিয়ে এই সুযোগে আয়ু অন্তত পাঁচ বছর বাড়িয়ে নেবে দ্বিতীয়বার নাশতা করে। আমাকে আর ফরিদকেও সে লোভ দেখানোর চেষ্টা করলো। ফরিদটা সবসময় যেহেতু নিজের "কুল" ধরে রাখার দিকে পক্ষপাতী তাই সে রাজি হলো না। আমি আবারও ভাবলাম, কি আছে জীবনে। যায় যদি দিন যাক না। নাহয় হলো একদিন দুইবার নাশতা!

বিভিন্ন জাহাজ বিভিন্ন পথে পর্যটকদের প্রিন্সদের দ্বীপপুঞ্জ ঘুরিয়ে দেখায়। বেশিরভাগই অবশ্য শুরু করে সবচেয়ে বড় দ্বীপটি দিয়ে। যার স্থানীয় নাম বুয়ুকাদে। আমরা যখন বুয়ুকাদে দ্বীপে নামলাম তখন সবে সকাল ১০টা। আরও আগে আসা হতো। মাহরির আসতে দেরি হয়ে গিয়েছিল। তা নাহলে আমাদের পরিকল্পনা ছিল ৯টায় বুয়ুকাদে দ্বীপে পৌঁছে যাওয়া।

যাহোক তাতে কোনো ক্ষতিবৃদ্ধি হয় নি। একিনকে প্রথম চিন্তিত দেখালেও, মাহরি আসার পর থেকে ওর দন্তপাটি বিকশিত হাসিও দুই কান পর্যন্ত চওড়া হয়ে গিয়েছিল। ছেলেটা সেদিন এমনকি সুগন্ধি এবং চুলে জেলও মেখেছিল আমাদেরকে লুকিয়ে লুকিয়ে। কথাটা এক ফাঁকে সুন্দর করে মাহরিকে জানাবো ভেবে রেখেছিলাম আমি। রবার্টটা সে সুযোগ দিলে তো। প্রথমেই গুমোর ফাঁস করে দিলো, একিন কিন্তু আজ পার্ফিয়ুম মেখেছে, চুলে জেলও দিয়েছে। আর কি কি প্রস্তুতি নিয়েছে জানা যায় নি, কিন্তু গোসলে প্রায় আধাঘন্টা বেশি সময় নিয়েছে তা আমরা সবাই জানি।

মাহরি একদিনেই রবার্টের চালচলন বুঝে ফেলেছিল। তাই প্রচ্ছন্ন প্রশ্রয়ের হাসি দিয়ে বললো, তাই, আর কি কি প্রস্তুতি নিলো সেটা কোনোমতেই জানতে পারলে না বুঝি?

আমি জানি রবার্ট নিজের কৌতুকগুলো উত্তরে কৌতুক পেলে আনন্দে আত্মহারা হয়ে যায়। এবারও মাহরির প্রগলভ প্রশ্নে সে লাফাতে লাফাতে একিনের দিকে এগিয়ে গেল এবং গিয়ে ওকে কানে কানে বললো, এ্যাই, তুই আর কি কি প্রস্তুতি নিয়েছিস?

একিন আগের থেকেই লজ্জা পাচ্ছিল, এবার লাল টমেটো হয়ে ফেটে পড়লো। বেশ কিছুক্ষণ "স্টুপিড আমেরিকান" বলে হম্বিতম্বি করে শেষে আমাদেরকেই এসে অনুরোধ করলো রবার্টকে থামাতে। আমরা সবাই মিলে রবার্টকে বললাম, কৌতুক চালিয়ে যেতে। তাই দেখে একিনটা ক্ষেপে গেল আরও।

খুনসুটি করতে করতেই সেদিন জাহাজে উঠে গিয়েছিলাম আমরা। তারপরতো ১০টায় গিয়ে নামলাম বুয়ুকাদে দ্বীপে। নাশতা না করে আসার দরুন পেটে ছুঁচোর ডন-বৈঠক টের পাওয়া যাচ্ছিল আগে থেকেই। জাহাজ থেকে নেমে আগে তাই একটি হোটেল দেখে ঢুকে পড়লাম। হোটেলের খোঁজখবর আগের রাতেই হোস্টেলে বসে নেট ঘেঁটে নেয়া হয়ে গিয়েছিল। গিয়েই অর্ডার পড়লো, জলপাইয়ের তরকারি, গম আর আটার তৈরি বনরুটি, মাছের কোপ্তা, ভেড়া মাংসের স্টু, ফ্রেঞ্চ ব্রি চীজ, সিরকায় ডোবানো শসা ও মরিচ, এবং প্রত্যেকের জন্য এক গ্লাস করে ইয়ানি রাকি। বরার্টটা ভরপেটে খেয়ে এসেও এসবের সাথে বাড়তি দুটি ডিম সেদ্ধ অর্ডার করে দিলো নিজের জন্য। আমার ডিমভাজা খাবার ইচ্ছা ছিল কিন্তু হোস্টেলে খানিকটা নাশতা করে এসেছিলাম বলে আর সে পথে পা বাড়ালাম না।

ইয়ানি রাকি মূলত তুরস্কের জাতীয় পানীয় যেটি আবাল-বৃদ্ধ-বণিতা নির্বিশেষে সকলে অত্যন্ত আনন্দিত চিত্তে পান করে। মূলত জিরার তৈরি মদ। যা পানের জন্য ওদের বিশেষ গ্লাস রয়েছে। ছোট ছোট কাঁচের গ্লাস। সাকুল্যে হয়তো ১৫-২০ সেন্টিলিটার পানি ধরে। সেই গ্লাসে ২ কিংবা ৪ সেন্টিলিটার ইয়ানি রাকি ঢেলে, তাতে বিশুদ্ধ ঠান্ডা পানি ঢেলে দিতে হয় বাকি অংশ ভরতে। স্ফটিকের ন্যায় স্বচ্ছ ইয়ানি রাকি পানি পেলেই দুধের মতো সাদা ঘন এক প্রকারে তরলে রূপান্তরিত হয়। চোখের সামনে অমন ভোজবাজির ন্যায় কারবার দেখতে ভিন্নরকম আনন্দ হয়। তারপর ধীরে ধীরে পান করা সেই পানীয়টি। গ্রীকরা তার্কিশদের দেখে দেখে একই রকম একটি পানীয় আবিস্কার করেছে। ফর্মুলা একই কিন্তু ব্র্যান্ডিং ভিন্ন। সেটির নাম ওউজো। ছাত্রাবস্থায় জার্মানির বিভিন্ন বার ও ক্লাবে কাজের সুবাদে ওইসব পানীয় এবং তাদের ব্যূৎপত্তিগত ইতিহাস ও ব্যবহার জানতাম আমি। জানতো অন্যরাও। একিন, ফরিদ, মাহরিরা ভাল জানতো অটোমানদের ইতিহাস, গ্রীকদের সাথে দীর্ঘ রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের গল্প সবই। এসব নিয়ে গল্প করতে করতেই কেটে গেল আমাদের সেদিনের নাশতা করার পালা।

১১.
নাশতা শেষে যখন বের হলাম দ্বীপ ঘুরে দেখতে, তখন গাঙচিলেরা সাথে জুটে গেল আবার। দ্বীপের চারপাশে বৃত্তাকার কংক্রীটের রাস্তা। সেই বৃত্ত থেকে আবার ব্যাসার্ধের মতো ভেতরে ঢুকে গেছে একেকটা রাস্তা। খানিক পর পর।

চাইলে ঘোড়ার গাড়িতে ঘুরে দেখা যায় পুরো দ্বীপটা। আবার হেঁটে হেঁটেও উপভোগ করা যায় মার্মারা সাগরের সফেদ ঢেউ, নির্মল বাতাস এবং আশপাশের অটোমান স্থাপত্যকলার নয়নাভিরাম সৌন্দর্য। পুরো দ্বীপজুড়েই ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে অসংখ্য দালান-কোঠা, প্রাসাদ আর বাগান যেগুলোর বয়স চারশ, পাঁচশ, হাজার, দেড় হাজার কিংবা ততোধিকও ক্ষেত্রবিশেষে। সেসবের সামনে দাঁড়িয়ে ঘন্টার পর ঘন্টা কাটিয়ে দেয়া যায়। প্রিয়জনের হাত ধরে নিজেরা কতোটা সৌভাগ্যবান তা অনুভব করা যায়। হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে নিজের মানবজন্মের জন্য গর্ব অনুভব করা যায়। কিছু করতে না চাইলে সেগুলোর সামনে দাঁড়িয়ে সেলফি তুলে ফেসবুক, ইন্সটাগ্রাম ইত্যাদিতে শেয়ার দেয়া যায়। কিন্তু আমার নিজের কেন যেন কিছুই করতে ইচ্ছে করছিল না। সেদিনটির শুরু থেকেই কেন যেন নিজেকে সবকিছু থেকে খানিকটা বিচ্ছিন্ন লাগছিল। মনে হচ্ছিল, আজ আমি একা একা কতোটা পথ পাড়ি দিয়ে চলে এসেছি! অথচ আমার কি সত্যিই এখানে একা একা আসার কথা ছিল?

ফরিদকে বললাম, আজ আমার খুব ভাব আসছে জানো। দ্যাখো তো আশেপাশে শুকনো রেড ওয়াইন পাও কিনা। একটি বোতল নিয়ে খানিকটা সময় সাগরের পাড়ে বসে থাকতে পারলে মন্দ হতো না।

ফরিদ বললো, কি হয়েছে কাঙকা (ভাই)? কারো কথা মনে পড়ে গেল নাকি?
-খানিকটা। কিন্তু সে জন্য নয়। এমনিও মনে হচ্ছে সাগর পাড়ে খানিক বসি। তোমরা যাও ঘুরে এসো। আমি এখানেই আছি।

-অন্যরা মানবে সে কথা? ওই দ্যাখো রব ইতোমধ্যে আমাদের দিকে সরু সরু চোখ করে এগিয়ে আসতে শুরু করেছে।

রবার্টকে সংক্ষেপে রব বলে ডাকে প্রায় সকলেই। যদিও আমি বলি না। আসলেই সে এগিয়ে আসছিল আমাদের দিকে। এসে ষড়যন্ত্রীদের মতো গলা নামিয়ে জানতে চাইলো, তোমরা কি ক্যানাবিসের খোঁজ করছো নাকি? খবরদার! একিন জানলে কুরুক্ষেত্র বাঁধাবে কিন্তু।

বললাম, না ক্যানাবিস্ নয়। রেড ওয়াইন। শুধু আমার জন্য। আমার খুব ইচ্ছে এক বোতল রেড ওয়াইন নিয়ে সাগর পাড়ে বসে একটু নিরিবিলি সময় কাটাবো। গত কয়েকদিন তোমাদেরকে টানা দেখতে দেখতে চোখ জ্বালাপোড়া করছে। কি করা যায় বলো তো?

রবার্ট আমার কথা হেসেই উড়িয়ে দিলো। ততক্ষণে একিন আর মাহরিও চলে এসেছে। মাহরি কিন্তু আমার কথা শুনে হেসে উড়িয়ে দিল না। বললো, ওর যদি একটু একা সময় কাটাতে ইচ্ছে করে- কাটাক না। তোমরা এমন করছো কেন?

রবার্ট সাথে সাথে প্রতিবাদ করে উঠলো, তাহলেই হয়েছে আরকি। পরে বিদেশ-বিঁভুইয়ের কিছু হলে ওর মাকে কি জবাব দেবো আমি?

শুনে হাসি আটকাতে পারলাম না কোনোমতেই। এমনভাবে বলছে যেন আমার মাকে খুব চেনে সে। একদিন মাত্র আমার বাবার সাথে দুই-এক লাইন কথা হয়েছিল তার। তাও ম্যাসেঞ্জারে বাবার সাথে ভিডিও কলে কথা হচ্ছিল, এমন সময় রুমে ঢুকে পড়েছিল বলে। পরিচয় করিয়ে দেয়ার সময় সে আগে আমায় জিজ্ঞেস করলো, কি নাম উনার? আমি "মোশারফ হোসেন"-এর মোশারফ পর্যন্ত বলতেই সে আমার বাবার উদ্দেশ্যে চেচিঁয়ে উঠেছিল, হাই মোশারফ, হোয়াটস্ আপ?

হয়তো ওদের সংস্কৃতিতে নিজের বাবাকে কিংবা বন্ধুর বাবাকে নাম ধরে ডেকে বসাটা কোনো ব্যাপার না। সিনেমায় তো হরহামেশাই দেখা যায়। আর রবার্টের কাছে তো এসব যে আরও কোনো ব্যাপার না তা আমি খানিকটা আগে থেকেই জানতাম। সে তার বান্ধবীর বাবাকেও কখনও ফার্স্ট নেম ছাড়া ডাকতো না। তবে আমার কানে তো অমনতরো ব্যাপার একদমই সয় না। তাই ওই ঘটনার পর থেকে ওকে আমি বাড়ির কারও সাথে পরিচয় করাই নি আর।

সেদিন অবশ্য মাহরির জন্যই সবাই শেষমেষ রাজি হলো। আমি ভাবছিলাম একিন চিক্কুর পেড়ে বলবে, এইভাবে তো চলবে না। সবাইকে একসাথে মার্চপাস্ট করতে হবে। রেডি, গেট সেট, গো।

কিন্তু তেমন কিছু হলো না। দেখলাম মাহরির মাথার সাথে সাথে ওর মাথাও একবার ওপরে উঠলো, একবার নিচে নামলো। ছেলেটা দুদিনের ভেতরে মজেছে ভাল। এই প্রেমটা শেষতক টিকলে হয়!

ওরা চলে যাবার পর আমি খুঁজে পেতে দু'বোতল বিয়ার নিয়ে সাগরের পাড়ে গিয়ে বসলাম। রেড ওয়াইন কোনমতেই পাওয়া গেল না। বন্ধুরা হাঁটতে চলে গেল। কথা হলো এক ঘন্টা পর সবাই সেখানেই আবার মিলিত হবো, যেখান আমি রয়ে গেলাম। জায়গাটা মূলত জেটি ও হোটেলের কাছাকাছি বলে চিনতে অসুবিধা হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। ওরা ফিরে এলে পরে আমাদের দ্বিতীয় দ্বীপের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু হবে।
আমি সাগরপাড়ে বসে ফ্রিজের ঠান্ডা তার্কিশ বিয়ারের প্রথম বোতলটি খুলে প্রথমেই অনেকটা একবারে গলায় চালান করে দিলাম। হালকা গরম একটা হলকা পাকস্থলী থেকে কণ্ঠনালী বেয়ে শ্বাসতন্ত্র হয়ে সন্তপর্ণে বের হয়ে গেল। চোখের কোণেও অকারণেই খানিকটা চিকচিকে জলের অনুভূতি টের পেলাম। আশপাশে তখন গাঙচিলেরা ধ্যানমগ্ন ভঙ্গিতে বসে সাগরের দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে খেয়াল রাখছিল- কোথাও কোনো উড়ুক্ক মাছ লাফ দিতে দেখা যায় কিনা।

১২.

দৃশ্যত এমন একটা জীবন কখনো চেয়েছি বলে মনে করতে না পারলেও, আমি জানি হয়তো ভেতরে ভেতরে চেয়েছিলাম। তাই একটা সাজানো সংসার তছনছ করে দেয়া বিদ্রোহ এক সময় আমার ভেতর থেকে আপনাতেই বের হয়ে এসেছিল। আমাদের জীবনে যা কিছু হয় সবই ভালোর জন্য হয়। ব্রায়ান কক্সের ভাষায়, পুরো বিশ্বব্রহ্মাণ্ডটাই প্রতিনিয়ত এনট্রপির পথে এগিয়ে চলছে।

আসলেই কি তাই নয়? পৃথিবীকে আসলে একটি বালুকাবেলা ছাড়া আর কিছুই মনে হয় না আমার। এখানে আপনি যা কিছুই বানান না কেন, একটু পর একটি ঢেউ এসে ঠিকই সবকিছু মুছে দিয়ে যাবে। আপনার পর আরেকজন এসে আবার একটা কিছু বানাবে। সাধারণ মানুষের জীবন মূলত এটিই। এর মধ্যেই আমাদের ক্ষুদ্র চাওয়া-পাওয়া, তাদের হিসেব-নিকেশ আর প্রদর্শনের হিড়িক। আর কি আসলে? একটি মানুষ জীবনে এত অর্থ, সুনাম ও খ্যাতি অর্জন করতে পারে যে চাইলে পুরো পৃথিবীর কাছে পূজনীয় হয়ে উঠতে পারে। স্টিফেন হকিংস্, বিল গেটস্, জেফ বেজোস, ইলন মাস্ক, স্টিভ জবস্, জ্যাক মা- কত কত সমসাময়িক উদাহরণ ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে চারপাশে! কিন্তু আমি ভাবি, অতীতের যেকোন একটি মুহূর্তে করে আসা সামান্য একটি ভুল যদি একদিন তাদের মনের সব শান্তিকে মুহূর্তে উড়িয়ে নিয়ে যায়, সেদিন কি এই মানুষগুলো তাদের খ্যাতি, অর্জন, অর্থ কোনোকিছুর বিনিময়ে জীবনে ক্ষত সৃষ্টি করে চলে যাওয়া সেই মুহূর্তটিকে ফিরিয়ে আনতে পারবে? তাহলে কেন এত রেষারেষি? কিসের আশায়? কি চাই আমরা? কেন শুধু মানুষ হিসেবে আরেকজন মানুষকে নিঃস্বার্থভাবে ভালবাসতে পারি না আমরা?

আমার কাছে মনে হয় এর একমাত্র কারণ আমাদের উন্নতি। যার বিনিময়ে নিজেদের ভেতরে একে অপরের প্রতি জিনগত প্রতিরক্ষামূলক যোগাযোগ ব্যাবস্থাকে বিকিয়ে দিয়েছি আমরা।

পৃথিবীর আর কোনো প্রাণী সেটি করে নি বলে তারা উন্নতও হতে পারে নি, অন্তত দৃশ্যত ও মানুষের মতো; কিন্তু তাদের ভেতরে একে অপরকে রক্ষা করার সেই প্রবণতাটি রয়ে গেছে এখনো। বিদ্যুৎস্পৃষ্ট একটি কাককে নিয়ে অন্য কাকদের আহাজারি খুব সহজ একটি প্রমাণ। হয়তো তাদের কাছে কোনো প্রযুক্তি নেই, কিন্তু নিজের স্বজাতির প্রতি এক স্বাভাবিক প্রতিরক্ষামূলক যোগাযোগ ব্যাবস্থা রয়েছে। যেকোন জায়গায় আপন জাতের কেউ কোনোভাবে আক্রান্ত হলে, ওরা সব ভুলে ওখানে গিয়ে বসে থাকে। কিছু একটা করার চেষ্টা করে। আর আমরা মানুষেরা যুদ্ধ, বোমা হামলা কিংবা খুন, ধর্ষণ, লুটতরাজ, দুই নম্বুরি সবই করি নিজেদের বিরুদ্ধে! এর একমাত্র কারণ আমরা একটু উন্নতির দেখা পেয়েছি, এই যা। আর কিছু না।

সেই উন্নতিও বড় যৎসামান্য জানেন? মাল্টিপল ইউনিভার্স আর কসমিক বাবলের ধারণা যদি সত্যি হয়, আমাদের সময়ের সবচেয়ে বড় বিজ্ঞানী স্টিফেন হকিংস্ যে ধারণায় বিশ্বাস করতেন মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত, তাহলে আমাদের গতিবিধি আক্ষরিক অর্থেই আজও পর্যন্ত সৌরজগতের সীমান্তের কাছাকাছি কোনো একটা জায়গা পর্যন্ত সীমাবদ্ধ। ভয়েজার নম্বর ১ এ পর্যন্ত যতটুকু পথ পাড়ি দিতে পেরেছে ততটুকুই। তার বেশি নয়। এরপর তো গ্যালাক্সি, সুপারক্লাস্টার, ইউনিভার্স, বাবল এবং বাবলে ভর্তি ইউনিভার্স রয়েছেই। সেসবের তুলনা আমাদের পৃথিবী শুধুই একটি সামান্য নীল রঙয়ের বিন্দু। আর আমরা মানুষেরা? অদৃশ্য কৃমির ন্যায় ক্ষুদ্র। খোলা চোখেতো বটেই, আমরা যেখানে অবস্থিত সেই লানকিয়া সুপারক্লাস্টারের বাইরে থেকেই আমাদের দেখার মতো দূরবীক্ষণ যন্ত্র আজতক আবিস্কৃত হয় নি। সেই আমরা সামান্য কয়টা টাকার লোভে অনেক সময় নিজের স্বজাতিকে খুন করতে পিছপা হই না! এক টুকরা জমির লোভে ছুরি চালিয়ে দিয়ে জন্মদাতা পিতার গলায়! একটা জীবন একবার চলে গেলে লক্ষ-কোটি-বিলিয়ন বছরেও কখনো ফিরে আসে না। অথচ আমাদের কারও একটা বারও মনে হয় না, অন্যকে কোনোভাবে বঞ্চিত করা বা ক্ষতিগ্রস্থ করার অর্থ নিজেকে আসলে বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের ক্ষুদ্রস্য ক্ষুদ্র কীটের স্থানেও অভিষ্ঠিত করা নয়, তার চেয়েও নিচে নিয়ে গিয়ে ফেলা! কখনোই হয় না।

খেয়াল করে দেখলাম দ্বিতীয় বোতলটি ততক্ষণে ফুরিয়ে এসেছে এবং মনে খানিক আলগা মতো ভাব এসেছে। পাশাপাশি একটি সিগারেটের তৃষ্ণাো খুব ভালমতো পেয়েছে। ভাবলাম একটি সিগারেট রোল করি, কিন্তু পেপার, ফিল্টার, তামাক কিছুই পেলাম না। সব দলের অন্য সদস্যদের কাছে। কি আর করা, বালুকাবেলার পেছনের সেই দোকানটি যেখান থেকে বিয়ার কিনেছিলাম, সেখান থেকেই বেশি দামে মার্লবরো সিগারেটের প্যাকেট কিনলাম একটা। প্যাকেটটা নিয়ে আবার সাগরতীরে ফিরলাম। খানিকটা সময় নিয়ে একটি সিগারেটে অগ্নিসংযোগ করলাম।

সেদিন আমি ফুসফুসকে পোড়া আলকাতরা আর নিকোটিনসহ ৭০-এরও অধিক রকমের বিষাক্ত রাসায়নিক মৌল ও যৌগের পোড়া ধোঁয়ায় একাধিকবার ভরিয়ে এবং খালি করেও কোনোমতে শান্তি পাচ্ছিলাম না। দুচোখ বেয়ে জল ঝরছিল শুধু আমার। আর মনে মনে হচ্ছিল, একিনরা খানিক পরে ফিরে এলেই ভাল হয়। আমি আরো ক'টা মুহূর্ত একা একা নিজের সাথেই কাটাতে চাই।

১৩.

খানিকপরে অবশ্য ফিরেই এসেছিল বন্ধুরা। তারপর একে একে তিনটি দ্বীপ ঘুরে দেখি আমরা। ছোট ছোট দ্বীপগুলো মূলত পর্যটন ব্যবসাকে কেন্দ্র করেই টিকে রয়েছে। প্রচুর সুভ্যেনিরের দোকান, রেস্টুরেন্ট, পর্যটকদের আকর্ষণ করার জন্য নানাবিধ রাইড এবং সাগর ঘেঁষা ছোট-বড় হোটেলগুলোর মূল চালিকাশক্তি পর্যটন।

আমার কাছে যেটা সবচেয়ে ভাল লাগলো সেটা হচ্ছে মানুষের প্রতি মানুষের সম্মানবোধ। কোন ধরনের বর্ণবাদী আচরণ চোখে পড়লো না কারও ভেতরে। কেউ আগ বাড়িয়ে জানতে চাইলো না, আমি ভারত থেকে এসেছি কিনা। বাংলাদেশিদের এই সমস্যায় বিদেশ বিভুঁইয়ে সবচেয়ে বেশি পড়তে হয় আমার জানামতে। কোথাও গেলেই মানুষ জানতে চায় ভারত থেকে এসেছি কিনা। সেটা ঠিক করে দেয়ার পরের প্রশ্নটি হয় প্রায়ই হিন্দি ভাষা জানি কিনা। এসব তো ছিলই না, এমনকি মেয়েদের উদ্দেশ্যে কোনোরূপ খারাপ দৃষ্টি নিক্ষেপেরও কোনো ঘটনা দেখলাম না। আমাদের সাথে ছিল মাহরি, যার পরনে পেটখোলা ব্লাউজ আর শর্টস্। চোখে রোদচশমা। কেউ তাতে কোনো মন্তব্য করলো না কিংবা পিছু নিল না। আমরা দ্বীপগুলোতে প্রায়ই নিজেদের মতো ঘুর‍ছিলাম। ঘোড়ার গাড়ি কিংবা কোনো রাইড ভাড়া করি নি একবারও। হাঁটার শক্তি থাকলে কোনো রাইডে ওঠাটা বোকামিই প্রায়। ইচ্ছেমতো জায়গায় যাওয়া যায় না, কোথাও একটু বেশি ভাল লেগে গেলে সেখানে বেশিক্ষণ কাটানো যায় না এবং সর্বোপরি উচ্চহারের ভাড়া তো আছেই। একিন, ফরিদ, মাহরি তিনজনই বললো, সরকারি নিয়ম অনুযায়ী একজন ঘোড়াগাড়িচালক জাহাজে করে আসা পর্যটকদের কাছ থেকে নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে পঞ্চাশ শতাংশ বেশি দাবি করতে পারে। স্থানীয়দের জন্য অবশ্য তা খাটে না। আমরা হয়তো ওই তিনজনের সুবাদে স্থানীয়রা যা ভাড়া দেয় তাই দিয়েই ঘোড়ার গাড়িতে চড়তে পারতাম, কিংবা পর্যটনের ট্যাক্সিগুলো ব্যবহার করতে পারতাম। কিন্তু তাতে অন্যান্য সমস্যা যেমন নিজেদের ইচ্ছেমতো ঘুরতে পারতাম না। তাই রাইডে চড়া হয় নি। তবে তাতে লাভই হয়েছে বরং। মনের আনন্দে ঘুরে বেড়িয়েছি।

দ্বীপগুলোর সৌন্দর্য্যে মন্ত্রমুগ্ধ ছিলাম সারাদিন। কখন যে বেলা গড়িয়ে গিয়েছিল টের পাই নি। বিকেল চাটায় আমরা শেষ দ্বীপটায় নেমে দুপুরের খাবার খেয়েছিলাম। আঙুর পাতায় ভাত মোড়ানো দোলমা, আস্ত ভেড়ার পেটের ভেতর রান্না হওয়া সবজি খিচুড়ি, ভেড়ার মাংস, কলিজার শিককাবাব আর ভূমধ্যসাগরীয় ভুবনভোলানো স্বাদের সালাদ দিয়ে সকলে পেটপুজো করেছিলাম। খাবারগুলো বাংলা নাম আমি নিজে চিন্তাভাবনা বের করেছি। মূলত খিচুড়ি বলে যেটা ছিল সেটার স্বাদ কোনমতেই বাংলার খিচুড়ির মতো ছিল না। তবে খেতে অসামান্য ছিল। স্বাদের কোনো কমতি ছিল না।

খেয়ে দেয়ে শেষ দ্বীপটি ইচ্ছেমতো ঘুরে সাতটায় আমরা ইস্তান্বুলে ফেরার জাহাজে উঠি। জহাজে উঠতেই আমার ভেতরের ভাবুক সত্বাটি আবারও বেরিয়ে আসতে চাইলে সেই দফা আমি সেটিকে ইচ্ছে করেই আটকে দিই। ওইভাবে ভুত-ভবিষ্যতের হাজারটা খুটিনাটি নিয়ে ভেবে ভেবে বর্তমানে আনন্দঘর সময়টা নষ্ট করতে চাই নি।

জাহাজের পেছনে একদম প্রপেলার রুমের ওপরে রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে পাঁচজন তুমুল হাসি-ঠাট্টায় অন্ধকার মার্মারা সাগরের ওপর দিয়ে ফিরে আসি ইস্তান্বুলে। সেদিনের সেই স্মৃতি আজও অমলিন হয়ে আছে মস্তিষ্কের সংরক্ষণ-কুঠিতে। জীবনে যা কিছু সুন্দর অভিজ্ঞতা, তার বেশিরভাগই আমি পেয়েছি প্রায় কোনো পরিকল্পনা না করে কিংবা সামান্য পরিকল্পনা আর বেশিরভাগ স্বত:স্ফূর্ততা দ্বারা পরিচালিত কর্মকাণ্ডগুলোর মধ্য দিয়ে। যে কারণে ওই ধরনের পরিকল্পনাগুলোকে আজও খুব মোহনীয় মনে হয়। শুধু বয়স আর সময় এখন সে ধরনের সুযোগ প্রায় দেয় না বললেই চলে।

১৪.

ইস্তান্বুল ফিরে আসতে আসতেই আবার ক্ষিধে পেয়ে গেল সবার। সাগরের বাতাসের প্রভাব। কি আর করা। সবাই ইস্তান্বুলের জাহাজঘাটেই একটা করে বুলগুরের ডোনার খেয়ে নিলাম, দই দিয়ে বানানো পানীয় "আইরান" সহযোগে। মাহরি অবশ্য খেল না। ওর নাকি ততোটা ক্ষিধে লাগে নি। হবেও হয়তো বা। তবে এরপর হাঁটতে হাঁটতে কিছুদুর যেতেই মিষ্টান্নের দোকান দেখে মেয়েটির মুখে লাজুক হাসি ফুটে উঠলো। সবাই হই হই করে ইস্তান্বুলে বসে "বাকলাভা" খাওয়ার অবিস্মরণীয় অভিজ্ঞতা অর্জনের উদ্দেশ্যে। গরম ধোঁয়া সুষম মাত্রার মিষ্টি বাকলাভা, মানে খুব বেশি মিষ্টিও না আবার কম মিষ্টিও না এমন- মুখে ফেললেই চোখ দু'টো বুজে আসে। বুঝি না এ কিসের জাদু! এই বাকলাভাই যখন রপ্তানি হয়ে জার্মানি যায় তখন মুখে দিলে ডালডায় ভাজা বাসি মিষ্টি প্যাটিস্ মুখে দিচ্ছি। অথচ টাটকা বাকলাভার অসামান্য স্বাদের কাছে হার মানতে বাধ্য নয় এমন মিষ্টান্ন সম্ভবত কমই আছে। অবশ্য ব্যক্তিবিশেষ এ মতামত ভিন্ন হওয়ার সুযোগ রয়েছে। অনেকে বাদাম খেতেই পারেন না। বাকলাভার মূল উপাদান কিন্তু পেস্তা বাদাম। এবং এই পেস্তা বাদাম তার্কিশদের বেশিরভাগ মিষ্টান্নের মূল উপাদান একই সাথে।

ডোনার, বাকলাভা ইত্যাদি খেয়ে যখন টইটম্বুর তখন একিন নিজের স্বভাববিরুদ্ধ ভঙ্গিতে খানিকটা কাচুমাচু মুখে জানতে চাইলো আমরা ওর স্থানীয় বন্ধুদের সাথে দেখা করতে চাই কিনা। বুঝলাম প্রশ্নের পেছনে অতোখানি বিনয়ের কি দরকার ছিল। খুব সম্ভবত মাহরি ছিল বলে, আমরা সেসবে বেশি মাথা ঘামালাম না। হই হই করে উঠলাম একেকজনে। দেখা করবো না মানে? আরও আগেই দেখা করা উচিত ছিল। চলো যাই সবাই মিলে।

একিন তার কিছু বন্ধুদেরকে এলাকার একটি রেস্টুরেন্ট কাম ক্লাবে আসতে বললো। আমরা হাঁটা দিলাম সেদিকে। ইস্তান্বুলের এশিয়ার অংশের রেস্টুরেন্টগুলোর সবই প্রায় আধা রেস্টুরেন্ট আধা ক্লাব। মানে সামনের দিকে রেস্টুরেন্ট আর পেছন দিকে একটা জায়গা ঘেরা দিয়ে বানানো ক্লাব। অভ্যন্তরীণ সাজসজ্জা বা ইন্টেরিওর ডিজাইন খুব সুন্দর। আমরা যেটিতে ঢুকলাম, সেটিতে মাথার ওপর ঝুলছিল ছোট ছোট পাখির বাসার মতো কাঠের তৈরি ঘর। প্রতিটির ভেতর বৈদ্যুতিক মোমবাতি। আলো-আধাঁরি মেশানো বসার জায়গা। একপাশে ক্লাবের ডিজের জন্য নির্ধারিত মঞ্চ। যদিও ডিজে পার্টি না থাকলে সাউন্ড সিস্টেমে আগে থেকে তৈরি প্লে-লিস্ট কিংবা রিমিক্স মিউজিক বাজানো হয়। যেমন আমরা যেদিন গিয়েছিলাম, সেদিনও হচ্ছিল।

কিছুক্ষণের ভেতরেই একিনের বন্ধুরা হাজির হয়ে গেল। ওরা বেশ কয়েকজন ছিল। সবার নাম আমার মনে নেই। এফসুন আচার নামের একটি মেয়ে আর বুরাক এফেন্দি নামের একটি ছেলেকে মনে আছে শুধু। ও দুজনের সাথে ঘন্টা ধরে আড্ডা দিয়েছিলাম আমি সে রাতে ক্লাবে বসে। অটোমান ইতিহাস থেকে শুরু করে হালের ইউরোপীয় ফ্যাশন তরিকা সবই ছিল সেসবের মধ্যে। পাশাপাশি জার্মানিতে উচ্চশিক্ষার ব্যবস্থা, আবেদনের সম্ভাব্য উপায়, কাজের সম্ভাবনা ইত্যাদি নিয়েও বিস্তারিত আলাপ করেছিলাম আমরা। সবাই মিলে শোরগোলে অসামান্য একটি রাত কাটিয়ে পরদিন সকালে সকলে একসাথে তাকসিম চত্বর, গেজি পার্ক, জর্জ ক্লুনির সামারহাউস ইত্যাদি দেখতে যাবো বলে ঠিক করে ফেললাম। একিনের বন্ধুদের মধ্য থেকে এফসুন, বুরাকসহ আরও দু'জন সাথে যাবে বলে কথা দিলো কেননা ওদের হাতে পরের দিন সময় ছিল।

ক্লাব থেকে যখন সকলে মিলে বের হলাম তখন রাত প্রায় দেড়টা। ক্লাবে ঢোকার এই এক ঝকমারি। সময় যে কোথা দিয়ে পার হয়ে যায় বোঝাই যায় না। প্রায় চার ঘন্টা সময় যেন নিমিষে উবে গেল। তবে সকলেই বের হয়ে টের পেলাম পেট জুড়ে হাহাকার। মাহরি আর এফসুন একই দিকে যাবে বলে একটি ট্যাক্সি নিয়ে চলে গেল। ওদের ক্ষিধে মনে হয় একটু কমই পাচ্ছিল। কিন্তু আমাদের কোনো তর সইছিল না সাগরপাড়ের কাবাবের দোকানের পানে ছুট লাগাতে। কাছাকাছি যেতে যখন ভাজা মাংসের সুগন্ধ নাকে এসে ধরা দিল তখন গেয়ে উঠেছিলাম, "আহা কি আনন্দ আকাশে বাতাসে"। অন্যরা সাথে সাথে চেপে ধরলো গানটা গেয়ে শোনানোর জন্য। দিলাম সাথে সাথে হেড়ে গলায় দুই লাইন গেয়ে। ওরা কে কি বুঝলো কে জানে, কিন্তু তারপর থেকে থেকে অনেক পর্যন্ত "আকাশে বাতাসে" চেচিঁয়ে উঠছিল বুরাক আর রবার্ট একসাথে। বুরাক অল্প সময়ে ভাল মিশে গিয়েছিল আমাদের সাথে। একিনের বাল্যকালের বন্ধু হিসেবে খুব হম্বিতম্বি করছিল ওর ওপরে। সম্ভবত ওটাই কারণ ছিল। আমরা একিনের হম্বিতম্বি দেখেই এতদিন অভ্যস্ত ছিলাম। সেদিন দেখলাম ওর ওপরেও একজন হম্বিতম্বি চালাতে পারে। দেখে বেশ আনন্দ হচ্ছিল। সেদিন অমন অনেক অকারণেই আনন্দে ভেসে যাচ্ছিলাম সকলে। সারাদিন দ্বীপে দ্বীপে ঘুরে এমন সুখ হয়েছে যে যা কিছু দেখছিলাম ভাল লাগছিল সবারই।

সে রাতে কাবাবের দোকানে মচমচ শক্ত তাজা রুটি দিয়ে ভাজা চর্বিওয়ালা মাংস খেতে খেতে আরও একবার ইস্তান্বুল সফরে অংশ নিতে পারার জন্য মনে মনে নিজের ওপর আনন্দিত হয়েছিলাম। পাশে তখনও একটি সোনালি পশমের ডাকাবুকো কুকুর বসে বাড়তি নিশ্চয়তা দিচ্ছিল। যেন ওরা জানে ওদের শহরে আগন্তুক আমি। এসেছি কয়েকটা দিনের জন্যে। তাই খুব যত্ন সহকারে আগলে রাখছিল আমাকে এবং অন্য সবাইকে।

১৫.

বড় শহরের "ফ্যাশন স্ট্রীট" ঘুরে দেখতে আমার সবসময়ই ভাল লাগে। কত রকমের নামি দামি ব্র্যান্ডের দোকান! ভেতরে ঢুকলেই ঘিরে ধরে কেমন এক অচেনা অনুভূতি। যেন অন্য কোন রাজ্যে চলে এসেছি। আবার বাইরেও সবসময় কিছু না কিছু ঘটছেই দেখার মতো। হয় সিনেমার শুটিং চলছে, নাহয় বিখ্যাত কেউ শপিং করতে এসেছে। একবার প্যারিসের ফ্যাশন স্ট্রীটে বন্ধু জিমির সাথে ঘুরতে ঘুরতে আমি জেনিফার এনিস্টনকে সামনাসামনি দেখেছিলাম। ফ্রেন্ডস্ সিরিয়ালের চরিত্রগুলোর মধ্যে আমি কোন সিরিয়াল ঠিক করতে পারি না কখনোই। তবে নিতান্ত যদি ফ্যাশন, এয়ারটাইম, অভিনয়, ক্যারেক্টারের গঠন, বেড়ে ওঠা, আনন্দ-বেদনা, সাফল্য-ব্যর্থতা সবকিছু মিলিয়ে একজনকে পছন্দ করে নিতে বলা হয়, আমার পছন্দ জেনিফার এনিস্টোন। দেখেই ভাবছিলাম একটা অটোগ্রাফ নেবো, কিন্তু আমার কাছে কোনো নোটপ্যাড ছিল না। এককালে যখন সাংবাদিকতা করতাম, তখন প্যান্টের পেছনের পকেটে ধরে যায় এমন নোটপ্যাড ব্যবহার করতাম। সেসব ছিল বহুদিন আগের কথা।

আগের রাতেই ঠিক করা হয়েছিল, পরদিন আমরা কোথায় যাবো এবং কে কে সাথে যাবে। যথারীতি কাদোকেই জাহাজঘাটে সকাল নয়টার ভেতরে পৌঁছে গিয়েছিলাম সবাই। মাহরি ও এফসুন এসেছিল একসাথে। বুরাকসহ আরও দুজন এসেছিল একসাথে। আর আমরা চারজন ফরিদ, রবার্ট, একিন আর আমি তো ছিলামই।

মাহরিরা এসে পৌঁছানো পর্যন্তও জাহাজঘাটটা মোটামুটি নিরিবিলিই ছিল বলা যায়। তখন জাহাজঘাটে দাঁড়িয়ে রবার্ট আর আমি যখন চীজ দেয়া একমেক (রুটি) চিবুচ্ছিলাম আর মাউন্টেন ডিউ-এ চুমুক দিচ্ছিলাম। ফরিদ আর একিন দুটো ধুম্রশলাকার শ্রাদ্ধ ঘটাচ্ছিল। তখন প্রথমে এসে ঘাটে ভেড়ে একটি জাহাজ, আর তারপর পরই এসে হাজির হয় বুরাকেরা।

বুরাকের সাথের দুজনের নাম আজ আর মনে নেই। তখন কিন্তু মনে ছিল। দুর থেকে দেখেই ওরা তিনজন "কাঙকা, কাঙকা" বলে চিৎকার শুরু করে দিয়েছিল। রবার্ট আর আমি দ্রুত রুটি চিবুনো শেষ করে নিলাম। ততক্ষণে আমাদের কয়জনের চিৎকার, জাহাজের ভেঁপু, আশপাশের নানাবিধ হকারদের হাকডাকে পুরো এলাকা ভীষণ প্রাণবন্ত হয়ে উঠেছিল। এত দ্রুত পরিবেশ পরিবর্তিত হয়ে যেতে দেখে আমি অবশ্য অবাক হলাম না। আমার কাছে সারাবিশ্বেই ট্রেন স্টেশন বা জাহাজঘাটগুলোকে খানিকটা একইরকম মনে হয়। ট্রেন আসার সাথে সাথে হুড়োহুড়ি, হই-চই, শব্দের ঝনঝনানি এবং চলে যাওয়ার পরপর এক ধরনের শব্দহীন শূন্যতা- জীবনের গাঢ় বাস্তবকেই যেন এক ঝলকে মনে করিয়ে দিয়ে যাওয়া। এই নশ্বর পৃথিবীতে স্থায়ী বলে কিছু নেই। আমাদের এ দেহও তাই। সেই প্রায় চৌদ্দ বিলিওন বছর পূর্বে ঘটে যাওয়া বিস্ফোরণে সৃষ্ট নক্ষত্রকণাগুলোই ছুটে চলেছে আজও। তারই ভেতর দিয়ে ঘটে যাচ্ছে কত বিবর্তন, আর কত যে রূপের পরিবর্তন! সবকিছুর ছোট্ট একটা ট্রেলার যেন দেখা যায়, যখন ট্রেন স্টেশনে ট্রেন আসে কিংবা জাহাজঘাটে জাহাজ ভেড়ে। যখন ওগুলো একদল যাত্রীকে নামিয়ে, আরেক দল যাত্রীকে নিয়ে ছুট লাগায় পরের গন্তব্যে।

স্থানীয়রা দলে ভারী হওয়ায় এক ধরনের বাড়তি মজা পাওয়া যাচ্ছিল। যেখানেই যাচ্ছিলাম, সবকিছুকে নিজেদেরই মনে হচ্ছিল। জাহাজে করে ইউরোপীয় অংশে পৌঁছে, অন্য কোনদিকে না তাকিয়ে হাঁটা দিলাম তাকসিম চত্বরের উদ্দেশ্যে। আগের দিন থেকেই জায়গাটিতে জনসমাগম স্বাভাবিক হয়ে গিয়েছিল। প্রচুর পুলিশ এবং সেনাসদস্য হাতে বড় বড় আকারের বন্দুক নিয়ে টহল দিচ্ছিল, কিন্তু ওই সশস্ত্র লোকগুলো ছাড়া এক দিন আগে ঘটে যাওয়া নারকীয় মৃত্যুলীলার কোনো বিশেষ চিহ্ন কোথাও ছিল না।

প্রচুর মানুষ আর অসংখ্য ভাষার সংমিশ্রণে পুরো এলাকায় মানুষের দ্বারা সৃষ্ট কোলাহলকে আমার পাখির কুজন বলে মনে হচ্ছিল। আমরা তাকসিম চত্বরটা পুরোটা ঘুরে দেখলাম। রিপাবলিক মনুমেন্টের সামনে দাঁড়িয়ে একিন মোটামুটি লম্বা একটি ভাষণ দিল। যার মূল বিষয়বস্তু ছিল, কেন এরদোয়ান শাসনামলে পতন এবং কামাল আতাতুর্কের অনুসারীদের আবারও ক্ষমতায় ফিরিয়ে আনা জরুরি। রিপাবলিক মনুমেন্টটি মূলত ১৯২৩ সালে গণপ্রজাতন্ত্রী তুরষ্কের গোড়াপত্তনের নেপথ্য নায়কদের সম্মানে নির্মিত। কামাল আতাতুর্কসহ অন্যান্য তার্কিশ নেতাদের ভাস্কর্য রয়েছে সেখানে।

বলছিলাম ফ্যাশন স্ট্রীটের কথা। ইস্তান্বুলের ফ্যাশন স্ট্রীটটি তাকসিম চত্বর লাগোয়া। আমার ফ্যাশন স্ট্রীটের প্রতি আগ্রহের কথা রবার্ট জানতো। তাই নিয়ে খুব খানিকক্ষণ হাসাহাসি চললো। ওর বেশিরভাগ কৌতুক "লেইম" ধরনের হয়, সেদিন আমায় নিয়ে যতগুলো কৌতুক করেছিল সবই লেইম ছিল। তারপরও কেন যে সবাই অতো হেসে কুটিকুটি হচ্ছিল বুঝতে পারছিলাম না। অবশ্য কাটা কাটা আমেরিকান অ্যাকসেন্টে কাউকে কৌতুক বলতে শুনলে এমনিতেও স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি হাসি পাওয়ার কথা। স্ট্যান্ড-আপ কমেডিকে ওরা এমন একটা জায়গায় নিয়ে গেছে যে, বিষয়টা অনেকটা ওদের সাথে প্রতিকী হয়ে গেছে। আর আমার নিজস্ব পর্যবেক্ষণ বলে, সাধারণ আমেরিকানরা প্রচুর কৌতুক করতে পছন্দ করে। সকল কুটি কুটি হয়ে যাওয়া হাসির কারণ সব কিছুর সম্মিলন হয়ে থাকতে পারে। আমার কিন্তু খারাপ লাগছিল না। সেদিন কেন যেন কোনকিছুতেই বেজার হতে পারছিলাম না।

চারপাশে এত দারুণ সব ব্র্যান্ড আর তাদের শো-রুম যে কি আর বলবো! কোন কোনটা যেন একেকটা ছোট শপিং মল। এয়ার জর্ডানের শো-রুমের সামনে গিয়ে অনেকক্ষণ উইন্ডো শপিং-এর অর্ধেকটা করলাম, অর্থাৎ শুধু বাইরে থেকে চেয়ে চেয়ে ওদের জুতা, টি-শার্ট, জ্যাকেট আর জিন্সগুলো দেখলাম। অতিরিক্তের ওপরে মূল্য হলেও, জিনিসগুলো পড়তে যে কি আরাম আর কি যে স্টাইলিশ- তা কি আর বলবো। ঘুরে ঘুরে দেখা হলো অস্কার ডে লা রেনাটা, লুয়ি ভুটন, গুচি, ব্যালেনচিয়াগাসহ সবগুলো ব্র্যান্ডের শো-রুম। শ্যানেল ফাইভে ঢুকে টেস্টের জন্য সাজিয়ে রাখা ছোট্ট বোতলের সুগন্ধি নিজের হাতে একটু মেখেও নিলাম। কেনার মতো কোনো সামর্থ্য ছিল না কি আর করা? ৫০ মিলি বোতলের মূল্য ১০০ ইউরোর ওপরে!

মাঝে মাঝে বড় শহরের ফ্যাশন স্ট্রীটে ঘুরতে যাওয়া আসলে আজও আমার কাছে মূলত এভাবেই দুধের স্বাদ ঘোলে মেটানোর উপলক্ষ হয়ে টিকে আছে। দেখলাম, বুঝলাম, কোনো একদিন হয়তো ওখানে কেনাকাটা করার সামর্থ্য হবে- ভেবে নিলাম, তারপর ফিরে এলাম। হয়তো আসলেই কোনো একদিন এ অবস্থার পরিবর্তন হবে। সে আশায় থাকতে খারাপ লাগে না। তবে সে আশার ঠাঁই আমার প্রায়োরিটির লিস্টে কখনও সামনের দিকে হয় না। তারচেয়ে আমার এক নং আশা পরিবারের সবাইকে নিয়ে একবার ইউরোপ ভ্রমণ করাটা পূর্ণ হলে আমি অনেকগুণ বেশি খুশি হবো। আর বন্ধুবান্ধবদের নিয়ে প্যান-আমেরিকান হাইওয়ে ধরে মেক্সিকো থেকে বুয়োনেস এইরেস্ পর্যন্ত লং-ড্রাইভে যাওয়ার দুই নং আশাটি পূর্ণ হয়ে গেলে এই লাইনে আমার আর আসলে কিছু চাওয়ারই থাকবে না।

১৬.

তাকসিম চত্বর আর ফ্যাশন স্ট্রীট ঘুরে দেখতে দেখতে বেলা আড়াইটা বেজে গেল। সবার পেটে চলছে ছুঁচোর বুকডন। আশপাশে যত রেস্টুরেন্ট রয়েছে সবগুলোতেই খাবার-দাবারের মূল্য অতি চড়া। সে কারণে দলের সবাই মিলে ঠিক করলাম জাহাজঘাটে গিয়ে দুপুরের লাঞ্চ সারবো। ওখানে গিয়ে অবশ্য মনের মতো কিছু পেলাম না।

বুরাক আমাদেরকে ওখান থেকে নিয়ে গেল বেসিকতাস এলাকার ডলমাবাচে প্রাসাদের সামনে। সেখানে গিয়ে বেশ কিছু মনের মতো স্ট্রীট ফুডের দোকান মিললো। বিভিন্ন দোকানে সাজিয়ে রাখা নানান রকম কাম্পির এবং সেগুলোর উপাদানের তালিকা দেখে লোভ হচ্ছিল খুব। কচি ভেড়ার মাংস, ভাজা হাঁস, কবুতর আর কোয়েলের রোস্ট, তার্কিশ মুরগির শ্নিটসেল (মচমচে করে ভাজা মুরগীর সাদা মাংসের কিমা) কি নেই চারপাশে?

আমকে সবচেয়ে বেশি হাতছানি দিচ্ছিল হাঁসের মাংসে মোড়ানো রুটির তৈরি "ইয়ুফকা"। আবার কচি ভেড়ার মাংসের কাম্পির থেকেও চোখ সরছিল না। কিন্তু দুইটা আইটেম একজনের দ্বারা সাবাড় করা প্রায় অসম্ভব। আমি আর রবার্ট ভাগাভাগি করে দুইটা আইটেমই নিলাম। অন্যরাও বিভিন্ন মজার মজার খাবার অর্ডার করলো। খাবারের মূল্য তুলনামূলক কম ছিল ওখানে। আমাদের দুপুরের পেটপুজোটা দুর্দান্ত হলো।

ডোলমাবাচে প্রাসাদে ঢোকার ব্যাপারে অবশ্য কাউকেই খুব বেশি আগ্রহী মনে হলো না। অটোমান সম্রাট আবদুল মেচিদ-এর (১ নং) প্রাসাদটি কেন যেন আমাদের টানছিল না। বরং জর্জ ক্লুনির সামার হাউস দেখতে যাওয়ার দিকে দলের সকলের আগ্রহটা বেশি ছিল। একটা ভোটাভুটি হলো। মেয়েরা আর আমি ভোট দিলাম সুলতান সুলেমানের বোন হাতিচে সুলতানের প্রেমিক ও জামাই ইব্রাহিম পাশার প্রাসাদ দেখতে যাওয়ার পক্ষে, আর বাকি সব ছেলেরা ভোট দিল জর্জ ক্লুনির সামার হাউস দেখতে যাওয়ার পক্ষে। গণপ্রজাতন্ত্রী তুরষ্কের রাজধানীতে বসে এহেন ভোটাভুটির পর ফলাফলকে অগ্রাহ্য করে সে সাধ্য কার? সকলে দলবেঁধে হই হই করে এগিয়ে চললাম ওশেন্স-১১, ১২, ১৩-র বিখ্যাত সেই চোর জর্জ ক্লুনির সামার হাউস দেখার উদ্দেশ্যে।

অর্থ হয়তো সবসময় সব অনর্থের মূল নয়। অন্তত জর্জ ক্লুনির সামার হাউসে গিয়ে খানিকটা তেমনি মনে হয়েছিল আমার। কালেভদ্রে গ্রীষ্মকাল কাটাতে যাওয়ার জন্য অমন আলিশান প্রাসাদসম বাড়ি কেনার সামর্থ্য কোটি-কোটি-ডলারপতিদেরই হয় কি না কে জানে, কিন্তু হওয়াটা খারাপ না ক্ষেত্রবিশেষে। ভদ্রলোক বসফরাসের তীরে আড়াইশ একর জমির ওপর বানানো তিনশত বছরেরও পুরোনো বাড়িটি কিনেছিলেন বলেই তো আশপাশের প্রায় তিনশ মানুষের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হয়েছিল। প্রায় শ'খানেক নানা বিষয়ে পারদর্শী ব্যক্তিবর্গ বাড়ির বাগান, লাগোয়া রেস্টুরেন্ট, পর্যটকদের বেড়ানোর এলাকা ইত্যাদির দেখভাল করেন। আরও শ'দুয়েক কর্মচারী পরিচালনা করেন মৎস্য আহরণ এবং প্রমোদতরী ভাড়া দেয়ার ব্যবসা। ছয়টা আড়াইশ' ফুটি এবং চারটি দেড়শ' ফুটি প্রমোদতরী রয়েছে সেখানে। সবগুলোর মালিক জর্জ ক্লুনি নিজে। মাছ ধরার ট্রলার রয়েছে প্রায় ২০ টি এবং ওয়াটার ট্যাক্সি পাঁচটি। ঘুরে ঘুরে দেখার মতো রয়েছে আরও অনেক কিছু। গোলাপের একটি বাগান দেখলাম যেটিতে লাল, গোলাপি, হলুদ, সাদা, বেগুনি, কালো- হেন রংয়ের গোলাপ নেই যা চোখে পড়লো না। সামার হাউসে ঢোকার পথে একটি সুবিশাল কক্ষকে বানিয়ে ফেলা হয়েছে মাছের অ্যাকোরিয়াম। সেখানে দেয়ালজোড়া কাঁচঘেরা মাছের আবাস। বর্ণিল বিচিত্র মাছেদের দেখতে দেখতে যখন প্রায় মাথা খারাপ হবার জোগাড়, তখন বুরাকের হুংকারে সম্বিত ফিরলো আমার।

"চকচক করলেই সোনা হয় না" কথাটা ইংরেজিতে বলে হুংকার দিয়েছিল ছেলেটা। কাছে যেতে বললো, মাছগুলো দেখতে যাই হোক, খেতে একটুও ভাল না।

ওরে মর্কট এবং একই সাথে পাষণ্ড, এ মাছ তো খাবার মাছ নয়।- উত্তর করলাম আমি।

শুনে হেসে কুটি কুটি ছেলেটা। বললো তাহলে অতো চকচকে চোখে ওদের দিকে তাকিয়ে ছিলে যে, বলি ব্যাপারটা কি হ্যাঁ?

কথায় কথা বাড়ে। আমরাও একের পিঠে আরেক কথা বলতে বলতে তাই পুরো সামার হাউসটা ঘুরে ঘুরে দেখলাম। বাড়ির একদিকে ছোট একটি কুঠিমতো জায়গা প্রাইভেট করে রাখা হয়েছে। বুরাক বললো, মহাত্মন সফরে এলে ও কুঠিটিতেই থাকেন। অল্পবয়সী ছোকড়ারা সাথে থাকে সঙ্গী হিসেবে।

মাহরি অবশ্য প্রতিবাদ করে উঠলো, বলেছে তোমাকে! উনার পার্টনার থাকেন সাথে। মোটেও এলোপাতাড়ি অগণিত ছেলে-ছোকড়ারা সাথে থাকে না, যেভাবে তুমি বললে। একিন সায় দিল মাহরির কথায়।

বুরাকটা খুব মজার ছেলে। এরপর সারাটাদিন গোপনে একিনকে ক্ষেপিয়েই গেল সে।

সেদিনর সন্ধ্যাটিও অসামান্য ছিল আমাদের জন্যে। ঠিক সন্ধ্যে নামার মুখে, আমরা বসফরাস ঘুরে দেখার উদ্দেশ্যে একটি ছোট নৌযানে উঠে পড়লাম। এতদিন শুধু এপার-ওপার করার জন্য জাহাজে চড়েছি। আজ চড়লাম অপেক্ষাকৃত ছোট দেখতে প্রমোদতরীর মতো ওই নৌ-যানটিতে। উঠেই যথারীতি ছাদে চলে গেলাম। লাল ভেলভেটে মোড়ানো বসার জায়গা ছিল সেখানে। সামনের টেবিলে সাজিয়ে রাখা ছিল বোতল আর গ্লাস। লাল-নীল বাতিতে মোড়ানো ছিল পুরো নৌ-যান। আমায় যদি তখন আপনার দেখতেন!

সে যাত্রায় ঘন্টাখানেক সময় যেন মুহূর্তের পার হয়ে গিয়েছিল আমাদের সকলের। বুরাক, রবার্ট, এফসুনদের মজার মজার গল্প শুনছিলাম। চুক চুক করে পানীয়র গ্লাসে চুমুক দিচ্ছিলাম আর মনে মনে ভাবছিলাম, "কত লক্ষ জনম ঘুরে ঘুরে, আমরা পেয়েছি হায় মানবজনম।"

আসলে জীবনের গল্পই আমাকে সবচেয়ে বেশি টানে। যখন শুনি জীবন কাউকে দুহাত ভরিয়ে দিয়েছে, স্বতশ্চলিতভাবে ভেতরটা খুশি হয়ে ওঠে। জীবনমুখী মানুষ হওয়ার এই এক মস্ত সুবিধা। আমার কাছে সবসময় মনে হয়েছে ঈশপের সেই ছেলেবেলায় পড়ে আসা গল্পটির চেয়ে সত্য আর কিছু নেই, যেবার এক লোক এক ঋষির কাছে জানতে চেয়েছিল তিনটি প্রশ্ন। আমাদের জীবনের সবচেয়ে জরুরি সময় কোনটি? সবচেয়ে জরুরি কাজ কোনটি? এবং সবচেয়ে জরুরি মানুষটি কে?

ঈশপ উত্তর করেছিলেন আমাদের জীবনের সবচেয়ে জরুরি সময়টি হচ্ছে ঘটমান মুহূর্তটি। সবচেয়ে জরুরি কাজ হচ্ছে চলমান কাজটি। আর সবচেয়ে জরুরি মানুষ হচ্ছেন তিনি, যিনি এই মুহূর্তে সামনে অধিষ্ঠান।

সেদিন বসফরাসে সেই নৌ-যানে করে ঘুরতে ঘুরতে আবারও একবার গল্পটির সত্যতা টের পেয়েছিলাম। তারপর যখন নৌ-ভ্রমণ শেষ হলো, তখন চারিদিকে সন্ধ্যেও নেমে এসেছিল পুরোপুরি। আমরা সকলে মিলে হই হই করে একটি গ্যাস স্টেশনে ঢুকে স্বাভাবিকের দ্বিগুন মূল্যে দুই বোতল ভদকা গর্বাচেভ এবং নানাবিধ কোমল পানীয় কিনে, হাঁটতে হাঁটতে চলে গিয়েছিলাম গেজি পার্কে।

২০১৩ সাল সেখানেই হয়ে গিয়েছিল রক্তক্ষয়ী এক বিপ্লব। ইস্তান্বুলের যুব সমাজ তেঁতে উঠৈছিল এরদোয়ানের অন্ধ ও কট্টর শাসননীতির বিরুদ্ধে। সে বিপ্লব শক্ত হাতে দমন করেন এরদোয়ান। একিন আর বুরাক সেই সরকারবিরোধী বিপ্লবে সরাসরি অংশ নিয়েছিল। সেই পার্কে রাত ১২ টা পর্যন্ত আমরা পানাহার করলাম। হৈ-হুল্লোড় করলাম। লম্ফঝম্প করলাম। আর যে কি কি করলাম মনেও নেই।

এফসুনের গানের গলা খুব সুন্দর। মেয়েটি এক এক করে পাঁচটি তার্কিশ গান শুনিয়ে দিলো আমাদের। সাথের তার্কিশ ছেলেগুলো গানের কথা বুঝলো বলে পুরো আনন্দটা উপভোগ করলো। আমি শুধু অচেনা শব্দে বোনা সুরের মায়াজালে অনেকটা সময় বুঁদ হয়ে ভাবলাম, সব দেশে সব ভাষায় সঙ্গীতের মর্ম একই। শুধুই বুকে গিয়ে বেঁধে।

১৭.

বসফরাসের গাঙচিলদের সাথে কাটানোর জন্য যে সময়টুকু বরাদ্দ করে দিয়েছিল মহাকাল, তা ধীরে ধীরে শেষ হয়ে আসছিল। জীবনের সব ভাল বিষয়েরই ইতি রয়েছে। যেভাবে রয়েছে জীবনের সব কষ্টেরও অনিবার্য পরিসমাপ্তি। ছেলেবেলায় আমি যখন পছন্দের কোনো জায়গায় কিংবা কারো বাড়িতে বেড়াতে যেতাম, তখন সেখান থেকে ফিরে আসার সময় আমার খুব খারাপ লাগতো। ইস্তান্বুল ভ্রমণের বেলা ফুরিয়ে আসছে বলে কিন্তু সেই ছেলেবেলার মতো খারাপ লাগছিল না, কারণ তখন আমি জানতাম চিরন্তন সুখ কিংবা দুঃখ বলে কিছু নেই। সব সুখেরই একটি সমাপ্তি আছে। এই সমাপ্তির মাধ্যমেই আবার একদিন আরেকটি সুখের জন্ম হয়।

আগের দিন রাতে গেজি পার্ক থেকে বাড়ি ফিরেছিলাম রাত তিনটায়। পশ্চিম ইস্তান্বুল থেকে নাইট বাসে করে প্রথমে পূর্ব ইস্তান্বুল, তারপর হেঁটে হেঁটে কাবাবের দোকান, সেখানে টসটসে সিরকায় ডোবানো মরিচের সাথে রুটি আর কাবাব চিবুনো শেষে ঘুম ঘুম চোখে হোস্টেল, এবং তারপর বিছানায় শুয়ে মুহূর্তে ঘুমের রাজ্যে হারিয়ে যাওয়া। তারপর যখন চোখ খুলি, তখন দেখি ঘড়ির কাঁটায় বাজছে সাড়ে নয়টা। সর্বনাশ!

সেদিন ছিল আমাদের ইস্তান্বুল ভ্রমণের শেষ দিন। পরদিন সকালে আতাতুর্ক ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্ট থেকে আমাদের ফ্লাইট। যাবে সরাসরি বার্লিন। ওখানে থেকে বাসে করে ইলমিনাউ যেতে সময় লাগবে তিন ঘন্টা। সবকিছু পরিকল্পনামাফিক চললে পরদিন দুপুরের মধ্যেই পৌঁছে যাবো বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে।

সেই শেষ দিনটিতেই কিনা সবচেয়ে বেশি বেলা পর্যন্ত পড়ে পড়ে ঘুমানো হলো! আমাদের সবার ছিল একই অবস্থা। প্রথম দিকে যে একিন সবার আগে ঘুম থেকে উঠে আমাদেরকে ওঠানোর জন্য চিৎকার লাগিয়ে দিতো, সেও বিকট শব্দে নাক ডেকে পশ্চাৎ উল্টে ঘুমাচ্ছিলো। ফরিদের শরীর থেকে কম্বল নিচে পড়ে ওর ধবধবে সাদা শরীরের প্রায় পুরোটাই উন্মুক্ত হয়ে গিয়েছিল। আর বরার্টটা মুখে একটা আঙ্গুল দিয়ে ঘুমুচ্ছিল।

আমি ভাবলাম, থাকুক এরা ঘুমিয়ে। আজ আমাদের এমনিতেও কোনো বিশেষ পরিকল্পনা নেই। অন্য বন্ধুদের বলা আছে যেকোন সময় ফোন দিয়ে চলে আসতে। সেদিন মূলত এশিয়ান অংশেই ঘোরাঘুরি হবে। একবার মনে হলো, আসলে সেদিন আর কোন প্ল্যান ছিল না বলেই ওভাবে পড়ে পড়ে ঘুমুচ্ছে সবাই। আমি সন্তপর্ণে পা টিপে টিপে বের হয়ে এলাম কক্ষ থেকে।

নিচে এসে অবশ্য বুরাককে দেখে অবাক হতে হলো। ছেলেটা নাকি আগের দিন রাতে আর বাড়ি ফেরে নি। হোস্টেলের সোফায় শুয়ে কাটিয়ে দিয়েছে। অন্য বন্ধুরা যদিও সবাই ফিরেছিল, কিন্তু বুরাককে হোস্টেলের লোকেরা চিনতো বলে, সে আর বাড়ি পর্যন্ত যাওয়ার কষ্ট করে নি। আমায় দেখেই কাঙকা বলে চিৎকার দিয়ে উঠলো। আমি বললাম, সান্না বে? (কেমন আছ হে)

বুরাক জানতে চাইলো অন্যরা ঘুম থেকে ওঠার আগেই একবার বসফরাসের তীর থেকে ঘুরে আসতে চাই কিনা? আমি সানন্দে রাজি হলাম। দুজন বাসি মুখে হাঁটতে বের হলাম। যদিও কফি, সিগারেট, একমেক ইত্যাদি যোগে হালকা একটা নাশতা হয়ে গিয়েছিল ততক্ষণে। ফিরে এসে দাঁত ব্রাশ আর গোসল করবো ভেবে বের হয়ে পড়লাম।

বসফরাসের নির্মল বাতাস গায়ে লাগতেই যেন মনটা চনমনে হয়ে উঠলো। বুরাকের সাথে বেশ কিছুক্ষণ গল্প গুজব করলাম একটি বোল্ডারের ওপর বসে। ছেলেটা ওরই ভেতর কোত্থেকে যেন ঠান্ডা এফেস বিয়ার জোগাড় করে এনেছিল। জার্মানিতে একটি কথা চালু আছে, "Kein Bier, vor Vier". বাংলায় যাকে বলে বিকেল চারটার আগে কোনো বিয়ার নয়। তুরস্কে সে রকম কোনো কথা চালু নেই। জানালো বুরাক। তারচেয়েও বড় কথা, যেখানে এই কথা প্রচলিত আছে, সেখানেই এই কথা খুব যে মানা হয় তাও না।

বসে বিয়ার খেতে খেতে বুরাক তার পুরোনো জীবনের গল্প বললো। ২০১৩ সালের এরদোয়ান বিরোধী বিদ্রোহের মাত্র এক মাস আগেই তার বিয়ে হয়েছিল দীর্ঘদিনের প্রেমিকার সাথে। বিয়ের পর স্ত্রী'কে নিয়ে নিজের বাবার বাড়িতেই থাকছিল বুরাক। বিদ্রোহ শুরুর পূর্ব পর্যন্ত একটা মাস স্বপ্নের মতো সময় কেটেছিল তার। বিদ্রোহ শুরু হয়ে গেলে বুরাক তাতে যোগ দেয়, আর ধীরে ধীরে শুরু হতে থাকে পারিবারিক অশান্তি। তার স্ত্রী'র দিক থেকে প্রথমদিকে বাঁধা না থাকলেও; আন্দোলনের সাথে বুরাকের সংশ্লিষ্টতা যত বাড়তে থাকে, তত বাড়তে থাকে দুজনের মধ্যে দুরত্বও।

একদিন গভীর রাতে এরদোয়ানের পালিত পুলিশবাহিনীর তাড়া খেয়ে কোনমতে প্রাণ বাঁচিয়ে বাড়িতে পালিয়ে আসে বুরাক। সেদিনের ঘটনাটি কোনমতেই মেনে নিতে পারে নি ওর স্ত্রী। পরদিনই বাপের বাড়ি চলে যায়। বুরাক পড়ে যায় মহাসংকটে। স্ত্রী'কে ফিরিয়ে আনতে যাবে নাকি আন্দোলনে অংশ নেয়া চালিয়ে যাবে বুঝতে পারে না ছেলেটা। এরই মধ্যে পুলিশের গুলিতে নিহত হয় তার ছেলেবেলার আরেক বন্ধু। ওই গেজি পার্কেই। শোকে মূহ্যমান হয়ে বুরাক সিদ্ধান্ত নেয়, আন্দোলনই চালিয়ে যাবে সে। বিজয়ের পর বিজয়ী বেশে ফিরিয়ে আনতে যাবে অভিমানী স্ত্রী'কে।

কিন্তু বিধির নির্মম পরিহাস। সপ্তাহখানেকের ভেতরে পুলিশের হাতে ধরা পড়ে যায় ছেলেটা। তারপর প্রচুর নির্যাতন সহ্য করে একদিন যখন মুক্তি পায়, তখন এরদোয়ানবাহিনী আন্দোলনে জিতে গেছে। বুরাকের অন্য সব বন্ধুরা কেউ জেলে, কেউ নির্বাসনে আবার কেউবা আত্মগোপনে। বাড়ির কেউ জানে না ওর স্ত্রী'র সঠিক খবর। বাপের বাড়ি চলে যাবার পর মেয়েটি যোগাযোগ করে নি আর কারও সাথে। বুরাকের বাবা-মা যোগাযোগের চেষ্টা করেও পান নি তাকে। এমনকি ওদের বাড়িতে ফোন করেও পান নি খুব একটা সমাদর। বরং অপরপক্ষ দায়সারাভাবে কাটা কাটা উত্তর দিয়ে ফোন কেটে দিয়েছে বারবার।

বুরাক ঠিক করে সে নিজেই যাবে স্ত্রী'কে ফিরিয়ে আনতে। সেটা না করলেই হয়তো ভাল হতো। যে প্রিয়তমা স্ত্রী'র কথা ভেবে জেলখানার বিষাক্ত দিনগুলোর কষ্ট দাঁতে দাঁত চেপে পাড়ি দিয়েছিল সে, আর যে মুক্তির স্বপ্ন দেখে বিপ্লবে যোগ দিয়েছিল; দুটোই ভেঙ্গে চুরমার হয়ে গিয়েছিল মেয়েটিকে এরদোয়ানের পুলিশবাহিনীরই এক সদস্যের বাহুলগ্না অবস্থায় ঘোরাঘুরি করতে দেখে।

তারপর খুব দ্রুতই কাগজ-কলম বিচ্ছেদের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হয়ে যায় তাদের। কথাগুলো যখন বলছিল, বুরাকের চোখে তখনও তার সাবেক স্ত্রী'র প্রতি এক ধরনের মায়া দেখতে পাচ্ছিলাম। বুঝতে পারছিলাম, ছেলেটা কেন সবসময় হাসিখুশি ও প্রাণবন্ত থাকার একটু বেশিই চেষ্টা করে। হয়তো তখনও মন থেকে পুরোপুরি ভুলতে পারে নি পুরোনো প্রেমিকা কিংবা সাবেক স্ত্রী'কে।

আমি কোনো সমবেদনা জানালাম না ওকে। বললাম, ব্যপার না বন্ধু। বড় বড় সম্পর্কগুলো থেকে বের হতে একটু সময় লাগেই আসলে। তোমার তো প্রায় তিন বছর হতে চললো। এখন নিশ্চই সেই আগের মতো কষ্ট হয় না, তাই না?

বুরাক বললো, কষ্ট আসলে কিছুই না। মাঝে মাঝে মনে পড়ে। এটুকুই। জীবনে যা আমাদের নয়, তা কি কোনদিন আপন হয়?

ওর কথাটা যে অক্ষরে অক্ষরে সত্য তা আমার চেয়ে বেশি আর কে জানতো।

প্রায় একই ধরনের একটি ঘটনা আমার জীবনেও ঘটেছিল। গণজাগরণ মঞ্চের শুরুর মাসখানেক আগে আমারও দীর্ঘদিনের সম্পর্কের বিয়ে নামক পরিণতি ঘটেছিল। আন্দোলন শুরুর আগ পর্যন্ত সে বিয়ের সবকিছু ঠিকঠাকও ছিল। তারপর বুরাকের মতো এক্সট্রিম ঘটনাপ্রবাহের মধ্য দিয়ে না হলেও, আমাকে বিচ্ছেদ যন্ত্রণা সইতে হয়। বুরাক আর আমার জীবনের ওই কাকতালীয় মিলের ঘটনাটির সময়সীমাও কাছাকাছি। ভাবছিলাম মানুষের জীবন কতোই আশ্চর্যের হয়! দুই ভিন্ন গোলার্ধে ঘটে যাওয়া দুইটি ভিন্ন আন্দোলন এবং অনুবর্তী কাকতালীয় ঘটনাবলী কিভাবে দুজন সম্পূর্ণ অচেনা মানুষকে এক সুতোয় গেঁথে ফেলে!

১৮.

সেদিন সাড়ে ১১ টা কিংবা পৌনে ১২ টার দিকে একিন প্রথমে ঘুম থেকে ওঠে এবং ফোন করে আমায়। তারপর বুরাক আর আমি হোস্টেলের উদ্দেশ্যে পা বাড়াই। গিয়ে অবশ্য দেখি চমক অপেক্ষা করে আছে। মাহরি, এফসুনরা চলে এসেছে। একিন, রবার্ট আর ফরিদও প্রস্তুত। আর আমাদের সেদিনের ভ্রমণকে পরিপূর্ণতা একিনের বাবা-মা ও ভাই মের্ত-ও দলে যোগ দেবে বলে চলে এসেছে।

এক বিশাল দল নিয়ে বের হলাম আমরা সেদিন। আনন্দের সীমা ছিল না প্রায় কারোই। যদিও সেদিন আমাদের শুধু এশিয়ান অংশ ঘুরে বেড়ানোর পরিকল্পনা ছিল, কিন্তু সকলের ইচ্ছায় সে পরিকল্পনায় পরিবর্তন আনা হলো। আমরা আবার জাহাজে করে ইউরোপীয়ন অংশ গেলাম। সেখানে ইস্তান্বুলের বিখ্যাত মশলার বাজারে ঢু দিলাম। নামে মশলার বাজার হলেও মূলত বাংলাদেশের হকার্স মার্কেটে মতো একটা বাজার। আকৃতিতে শুধু বিশাল। হেঁটে পুরোটা পাড়ি দিতে একদিন নাকি লেগে যায়। আর দোকানগুলো একটু বড় বড় এবং বাজারের ভেতরে পথ-ঘাটগুলো খুব বেশি চিপা নয়- এইটুকুই পার্থক্য। দরদাম করে পন্য কিনতে হয়। আমরা অবশ্য খানিকটা ঘুরেফিরে দেখালাম। পুরোটা দেখার মতো সময় ছিল না। বাজার থেকে আমরা গেলাম তাকসিম চত্বরে আবার। একিনের মা আমাদের সকলকে টি-শার্ট আর জুতা কিনে দিলেন। কেউ নিতে না চাইলে তাকে এমন আদুরে স্বরে ধমক দিচ্ছিলেন যে কিছুই বলার ছিল না। বাবা-মায়েদের কাছে সন্তানেরা আসলেই কখনও বড় হয় না। আমাদের সকলকে অন্তত একটা করে আইটেম নিতেই হলো।

শপিং শেষে ফিরলাম এশিয়ান অংশে। একিনের মা-বাবা ও ভাই আমাদের সকলকে রাতের খাবারের দাওয়াত দিয়ে চলে গেলেন। আমরা বন্ধুরা গেলাম রাতের খাবারের আগ পর্যন্ত সময়টা ঘুরে ফিরে দেখতে।

ইস্তান্বুলের মানুষকে আমার খুব আমুদে মনে হয়েছে। একটু খেয়াল করলেই দেখা যায়, সবকিছুতেই ছোটখাটো আনন্দ খুঁজে বের করার একটা চেষ্টা তাদের মধ্যে সবসময় থাকে। আমরা বসফরাসের পাড় ধরে হাঁটছিলাম। একটু পর পর ছোট বড় নানারকম মসজিদ। সেসব মসজিদের মার্বেল পাথরের দেয়ালভরা নয়নাভিরাম সব ক্যালিগ্রাফি। সৃষ্টিকর্তার বন্দনা ছাড়াও রয়েছে মসজিদ নির্মাতা শাসকের গুণগান। একবার তাকিয়ে অনেকটা সময় মুগ্ধ হয়ে পার করে দেয়া যায়। মসজিদগুলোর স্থাপত্যরীতিতে নানান যুগের মিশেল থাকলেও, মূল সুরটি প্রায় সবখানে একইরকম রয়ে গেছে। সুউচ্চ মিনার, সুবিশাল গম্বুজ, নীল মার্বেল পাথরের তৈরি দেয়াল ও ছাদ, এবং আশপাশের খেজুর গাছ- দেখলেই মনে হবে এক ন্যানো সেকেন্ডের ভেতর হুট করে কয়েকশ' বছর পেছনে ফিরে আসলাম। আমার কয়েকবারই অমন হলো। রাস্তার দিকে তাকালে বড় বড় মার্সিডিজ বেঞ্জ বাস, বিএমডব্লিউ ই সিরিজের আধুনিক প্রাইভেট কার কিংবা সস্তার জনপরিবহন টেম্পু সবই চোখে পড়ছে, সেই চোখকে ঘুরিয়ে মসজিদের দিকে ফেললে মনে হচ্ছে কোনো তুর্কি সিনেমার সেটের দিকে তাকিয়ে আছি। সে এক অদ্ভুত অনুভূতি!

এরই মধ্যে চোখে পড়লো, বসফরাসের পাড় ঘেঁষে অনেকটা জায়গা জুড়ে নান রংয়ের বাহারি ও আরামদায়ক সোফা পেতে রাখা হয়েছে। সাধারণ পথচারীদের জন্য যাতে চলার পথে একটু জিরিয়ে নিতে পারে। আর বসফরাসের নির্মল বায়ুতে ফুসফুসকে চাঙা করে নিতে পারে।

একিন জানালো এটা একটি স্থানীয় আকর্ষণ। সরকারীভাবে এ সোফাগুলো ওখানে ফেলা হয়েছে। মূল দেখভালটা সরকার করে। তবে আশপাশের চায়ের দোকান, খাবারের দোকান এবং সিসার দোকানগুলোর দায়িত্ব হচ্ছে অতিথিদের আপ্যায়ন করা। অর্থের বিনিময়ে যদিও। অর্থাৎ অতিথিদের চা, সিগারেট, কোন খাবার কিংবা সীসার প্রয়োজন পড়লে তা তাদের কাছে বিক্রি করা। তবে কাউকে জোর কিংবা হেনস্থা করলে ব্যবসার লাইসেন্স হারানোর সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে।

আমরা একটি সোফায় গিয়ে বসে বেশ কিছুক্ষণ গল্পগুজব করলাম। আমি একসময় সকলের উদ্দেশ্যে "এমন একটি জায়গায় সারাদিন কাটিয়ে দেয়া সম্ভব" বলতেই একিন, বুরাক, মাহরি, এফসুনরা হই হই করে উঠলো, মানুষ তো তাই করে। এখানে আসা বেশিরভাগ মানুষই স্থানীয় এবং নিয়মিত। অনেকেই সারাদিন আড্ডা দেয়ার জন্য আসে। সীসা সেবন করে কাটিয়ে দেয়।

আমি ভাবছিলাম, আহা এমন একটা বন্দোবস্ত যদি আমাদের কক্সবাজারে করা সম্ভব হতো! যেখানে মনের আনন্দে কোনো দুশ্চিন্তা ছাড়া একটি দিন শুধু সাগরতীরে বসে কাটিয়ে দেয়া যেতো। বিশেষ করে এমন বিনামূল্যে বসার জায়গা যদি তৈরি করে দেয়া যেতো। জানি না কখনো সম্ভব কিনা।

সেদিন এরপরও আমরা ঘুরে ঘুরে দেখেছিলাম আশপাশের অনেক এলাকা। রাতে খাওয়া-দাওয়া হয়েছিল একিনের ভাইয়ের বাসায়। একিনের মা আর বাবা আমাদের খুব যত্ন করে খাইয়েছিলেন। আর প্রাণভরে দোয়া করে দিয়েছিলেন। জীবনের চলার পথে আজও সে দোয়ার বরাত টের পাই।

পরদিন সকালে হোস্টেল ছেড়ে আসার সময় আমাদের বিদায় দিতে এসেছিল বুরাক, মাহরি আর এফসুন। আরও ছিল এক দল কুকুর, একটি বেড়ালের পরিবার যেটিকে একিনের ভাই খাবার দেয় প্রতিদিন, এবং এক পাল গাঙচিল। আমরা কিছুদূর হেঁটে যাই নিকটবর্তী বাসস্ট্যান্ডে। সেখানে বন্ধুদের সকলকে একবার করে জড়িয়ে ধরে শুভেচ্ছা বিনিময় করি সবাই। ওদেরকে ইলমিনাউ আসার নিমন্ত্রণ জানাই। তারপর আমরা চারজন এয়ারপোর্টগামী বাসে উঠে যাই। বসফরাস প্রণালী, মার্মারা সাগর, কৃষ্ণ সাগর, প্রাচীন অটোমান সাম্রাজ্যের রাজধানী সব পেছনে রেখে ধীরে ধীরে বিমানবন্দরের পানে এগিয়ে যাই। যেখানে বিশাল এক হাওয়াই জাহাজ ছিল আমাদের অপেক্ষায়। আমাদের চারজনকে আবারও বাস্তব জীবনে ফিরিয়ে আনার আশায়।

---

অসংখ্য ধন্যবাদ সবাইকে, দীর্ঘ এ ভ্রমণকাহিনীর প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত সাথে থাকার জন্য। কাহিনীর কতটুকু সত্য আর কতটুক কল্পনা তা বিচারের ভার আপনাদের হাতেই রইলো। কিছু ছবি যোগ করে দিচ্ছি এখানে। এগুলো আগে কোথাও প্রকাশ করা হয় নি। শুধুই আপনাদের জন্য। আবার দেখা হবে শ্রীঘ্রই নতুন কোনো ভ্রমণকাহিনী সহকারে। সে পর্যন্ত ভাল থাকুন সবাই। অনেক অনেক শুভকামনা।

ও হ্যাঁ, একটা জরুরি কথা, ফেসবুক প্রোফাইলে এভাবে লেখা প্রকাশের অনেকগুলো অসুবিধা রয়েছে। তাই আমি নিজের লেখাগুলো প্রকাশের জন্য একটি ফেসবুক পেজ খুলেছি। পরের লেখাগুলো এখান থেকেই প্রকশ হবে। চাইলে পেজটিকে অনুসরণ করে রাখতে পারেন। পেজের লিংক এখানে:
https://www.facebook.com/Mir-Rakib-Un-Naby-107739480738650

ধন্যবাদ আবারও। ভাল থাকা হয় যেন। শুভেচ্ছা সবাইকে।

---

পোস্টটি ১ জন ব্লগার পছন্দ করেছেন

মন্তব্য করুন

(আপনার প্রদান কৃত তথ্য কখনোই প্রকাশ করা হবেনা অথবা অন্য কোন মাধ্যমে শেয়ার করা হবেনা।)
ইমোটিকন
:):D:bigsmile:;):p:O:|:(:~:((8):steve:J):glasses::party::love:
  • Web page addresses and e-mail addresses turn into links automatically.
  • Allowed HTML tags: <a> <em> <strong> <cite> <code> <ul> <ol> <li> <dl> <dt> <dd> <img> <b> <u> <i> <br /> <p> <blockquote>
  • Lines and paragraphs break automatically.
  • Textual smileys will be replaced with graphical ones.

পোস্ট সাজাতে বাড়তি সুবিধাদি - ফর্মেটিং অপশন।

CAPTCHA
This question is for testing whether you are a human visitor and to prevent automated spam submissions.

বন্ধুর কথা

মীর's picture

নিজের সম্পর্কে

স্বাগতম। আমার নাম মীর রাকীব-উন-নবী। জীবিকার তাগিদে পরবাসী। মাঝে মাঝে টুকটাক গল্প-কবিতা-আত্মজীবনী ইত্যাদি লিখি। সেসব প্রধানত এই ব্লগেই প্রকাশ করে থাকি। এই ব্লগে আমার সব লেখার কপিরাইট আমার নিজেরই। অনুগ্রহ করে সূ্ত্র উল্লেখ না করে লেখাগুলো কেউ ব্যবহার করবেন না। যেকোন যোগাযোগের জন্য ই-মেইল করুন: bd.mir13@gmail.com.
ধন্যবাদ। হ্যাপি রিডিং!