ইউজার লগইন

অসমাপ্ত ঝিকিমিকি গল্প

১.

সেবার আমাদের ডিপার্টমেন্ট থেকে শিক্ষার্থীদের জন্য দারুণ একটা ইন্টার্নশিপের ব্যাবস্থা করা হয়েছিলো! ডানিডা নামের একটা প্রতিষ্ঠান আছে। ইন্টার্নশিপটি ছিল সে প্রতিষ্ঠানের একটি প্রকল্পের অধীনে। ইন্টার্নশিপের জন্য যেতে হবে ডেনমার্কের একটি দ্বীপে। থাকতে হবে আয়োজনকারীদের ব্যাবস্থা মোতাবেক। ঠিক নয়টা-পাচঁটা কাজ নয়, তারপরও বেশ গুরুতর ব্যাপার।

ডিপার্টমেন্ট থেকে বলা হলো, আমাকে ক্লাসের ফার্স্টবয় সজলের সঙ্গে ডেনমার্কে যেতে হবে। কথাটা শুনে ভালো লাগলো। এই সুযোগে বিমানভ্রমণ হবে। কিছুদিন পোড়ামন নিয়ে পোড়া শহরে ঘুর ঘুর করতে হবে না এবং আমার ছকে বাঁধা জীবনটাকে রিপিট করতে হবে না। একই সঙ্গে ভাললাগা আর উত্তেজনা নিয়ে আমরা দু'জন ভাইকিংদের রাজ্যে পদার্পণের অপেক্ষায় দিন কাটাতে শুরু করলাম। ভিসা পেতে কোনো জটিলতাই পোহাতে হলো না। ডানিডা'র সব বন্দোবস্ত যারপরনাই ভালো ছিলো।

বাল্টিক সাগরের ছোট্ট যে দ্বীপটিতে আমাদের ঠাঁই হয়েছিলো, সেটা মূলত খ্রিস্টান অধ্যূষিত একটি গ্রাম। সুন্দর, ছিমছাম। আমার অল্প ক'দিনের অবস্থানে দেখেছিলাম, সেখানকার জলবায়ু বেশ মৃদু। এমনিতেও ডেনমার্ক একটি নিচু দেশ। প্রায় জলমগ্নই বলা যায়। সাগর তাকে চারপাশ থেকে ঘিরে রেখেছে।

আমরা যে দ্বীপে ছিলাম, সেটি ছিলো আরও ঠান্ডা একটি জায়গা। শীতের সময় তো কথাই নেই, সর্বোচ্চ গরমের কালেও সেখানে তাপমাত্রা ওঠে খুব বেশি হলে হিমাংক থেকে ২৫ কি ২৬ ডিগ্রী সেলসিয়াস ওপরে। তার ওপরে সাধারণত যায় না। আমাদের অবস্থানকালের একেবারে শেষের দিকে অমন কয়েকটি সূর্যালোকিত গরম দিন পাওয়া গিয়েছিল।

দ্বীপটি ছিলো অনেক বড়। চারপাশ সাগর এবং ঢেউখেলানো পাহাড়ের সারিতে ঘেরা। দূর থেকে যেগুলোর দিকে তাকালে বান্দরবান, খাগড়াছড়ির পাহাড়গুলোর কথা মনে পড়ে যেতে বাধ্য। পাহাড়ি পথ পাড়ি দিয়ে দ্বীপের ভেতর ঢুকলে পাওয়া যায় লোকালয়। সেখানে প্রতিটি বাড়ির সামনে ছোট ছোট বাগান, তাতে লাল-নীল-বেগুনি-হলুদ নানান রংয়ের চেনা-অচেনা ফুলের সারি। ছবির মতো সাজানো সবকিছু।

২.
ডেনমার্ক দেশটি প্রায় সবদিক দিয়েই সমুদ্র পরিবেষ্টিত। যে কারণে দেশটির সবখানেই উপকূলীয় আবহাওয়া বিরাজ করে সারা বছর। তবে গরমের দু'টি মাস ছাড়া সাধারণত সেখানকার আবহাওয়া থাকে বৃষ্টিবিঘ্নিত। এ অবস্থাকে স্বাভাবিক মেনে নিয়েই বাল্টিক উপকূলের ওই দ্বীপটিতে ক'টা দারুণ দিন কাটিয়েছিলাম। আর অল্প সময়ে ডেনিশ মেয়ে আনা মাতোভিচ হয়ে উঠেছিলো আমাদের প্রাণের বন্ধু।

ছিপছিপে লম্বা মেয়েটির ছিল মাথাভর্তি সোনালী রংয়ের চুল আর ভীষণ মায়াকাড়া চেহারা। হাসলে মুক্তো ঝরতো ওর মুখ থেকে। এই কারণে আমি ওকে হুমায়ুন আজাদ স্যারের 'ঝিনুকের জ্যোতির্ময় ব্যাধি' লেখাটি অনুবাদ করে শুনিয়েছিলাম। ও শুনে মুগ্ধ হয়েছিলো। এবং সেজন্য সে আমাকে স্যারের 'শ্রেষ্ঠ কবিতা' বইটি থেকে প্রায়ই বিভিন্ন কবিতা অনুবাদ করে শোনানোর জন্য অনুরোধ করতো। ওকে কবিতা অনুবাদ করে শোনাতে এবং সেগুলো নিয়ে আলোচনা করতে আমারও ভালো লাগতো। সজলও খুব আগ্রহসহ সেসব আলোচনায় অংশ নিতো।

গবাদিপশুর একটা খামার ছিলো আনাদের। তবে সে কোনোদিন দুধ খেতো না। জিনিসটা নাকি অসহ্য। ওর প্রিয় খাবার ছিলো আলু ভাজা। কারণ ওটাই ডেনিশরা সবচে' দারুণ করে বানাতে পারতো। সসেজ আর আলু ভাজা। সঙ্গে মেয়োনেজ দিয়ে বানানো একটা সস্। এই ছিলো জনপ্রিয়তম খাদ্য ওখানকার।

আরেকটা খাবার সবাইকে খেতে দেখতাম। বেশ কয়েক ধরনের সবজি দিয়ে বানানো সালাদ। তাতে ডিমও দেয়া থাকতো। অর্ধসেদ্ধ সবজিগুলো খেতে কচকচে হলেও সুস্বাদু ছিলো।

আনা কখনো বিফ বা আর কোনোকিছুর স্টেক খেতো না মুটিয়ে যাবার ভয়ে। অথচ ওখানকার বিফস্টেক, ল্যাম্বস্টেক ইত্যাদি ছিলো দূর্দান্ত সুস্বাদু। তবে স্বাস্থ্যসচেতন স্থানীয় জনগোষ্ঠী সেদিকে নজর একটু কমই দিত।

৩.
দ্বীপটিতে মানুষের জীবন ছিল নিস্তরঙ্গ আনন্দের। ধীর-স্থির ও শান্তিপূর্ণ। দ্বীপে কোনো পুলিশ ছিল না। কোনো প্রয়োজনও ছিল না পুলিশের। অপরাধীই যেখানে নেই, সেখানে পুলিশ কি করবে? পর্যটকদের নিরাপত্তার জন্য দ্বীপপ্রধানের অধীনে কিছু মানুষ স্বেচ্ছাশ্রম দিতো। তারও আসলে খুব বেশি প্রয়োজন ছিল না। মানুষের জীবন ছিল আক্ষরিক অর্থেই পরিপূর্ণ। অন্তত বাইরে থেকে অমনই মনে হয়েছে আমার।

আর আনা ছিলো সবসময়ের জন্য হাসিখুশি, প্রাণোচ্ছল, মারকুটে ধরনের একটি মেয়ে। আমি যে প্রিন্টিং মেশিনটার কারিকুরি বইয়ে পড়ে-টড়ে ওখানে গিয়েছিলাম, সেটার কাজ হাতে-নাতে শেখার জন্য; সেই মেশিনটার চীফ-অপারেটরের মেয়ে ছিলো সে।

আমরা ওই মেশিন চালানো শেখার জন্য এতদূর পথ পাড়ি দিয়ে এসেছি শুনে সে হেসেই বাঁচে না! সে নাকি পাঁচ বছর বয়স থেকে মেশিনটা চালাতে জানে এবং ছোটবেলায় নাকি নিজের ছবির খাতার আঁকি-বুকিগুলো মেশিনের উদ্বৃত্ত কাগজে প্রিন্ট করে রাখাটা ওর একটা মজার খেলা ছিলো।

এমনিতে আমার তেমন কোনো কাজ ছিলো না সেখানে। বেলা পর্যন্ত পড়ে পড়ে ঘুমাতাম। ঘুম থেকে ওঠার পর ওখানে গিয়ে কেনা মোবাইল ফোনটা দিয়ে বাড়িতে ফোন করতাম।

সজল আরও আগেই ঘুম থেকে উঠে দু'জনের জন্য ব্রেকফাস্ট বানিয়ে ফেলতো। আমি ঘুম থেকে উঠে বাড়িতে কথা বলা শেষ করে সজলকে ধন্যবাদ এবং প্রেম প্রেম একটা লুক দিয়ে ওর সাথে নাশতা করতে বসতাম।

ছেলেটা আসলেই খুব কো-অপারেটিভ ছিলো। আর ছিলো সাদাসিধেও ভীষণ। ব্রেকফাস্টের পর আমরা দু'জন একসাথে টুকটাক ঘরের কাজ, ইন্টার্নশিপের কাজ ইত্যাদি শেষ করে রাখতাম।

বিকেল হওয়ার আগেই দেখতে পেতাম- অদূরে আমাদের থাকার জায়গাটা যে সড়কে, সে সড়কের মাথায় আনার সাইকেলটা দেখা দিয়েছে। মাথায় পেশাদার সাইকেল চালকদের মতো হেলমেটও আছে মেয়েটার। খানিক পর সিঁড়ি দিয়ে ওর দুদ্দাড় উঠে আসা শুনলেই বুঝতে পারতাম, শুরু হতে যাচ্ছে দিনের নৈমিত্তিক কুরুক্ষেত্রটি। ভেতরে ঢোকার পর একটা পূর্ণ তুলকালাম বাঁধিয়ে দিতে ওর সর্বসাকুল্যে সময় লাগতো তিন থেকে চার মিনিট।

প্রথমে বেচারা সজলকে একদফা হেনস্থা করে সে মনোযোগ দিতো আমাদের ঘরটার দিকে। ওটা কোনো এক বিচিত্র কারণে কখনোই সুশ্রী অবস্থায় থাকতো না। এজন্য যাবতীয় দোষ আমাদের ঘাড়ে চাপিয়ে দিয়ে সে ঠা ঠা করে খানিকক্ষণ হাসতো এবং তারপর ফ্রীজ খুলতো।

এরমধ্যে সে একবার আমার কাজের টেবিলটার ওপর উঠে পা দুলাতে দুলাতে, 'হাই সুইটহার্ট! হাউ আর ইয়া?' বলে কৃত্রিম আহ্লাদ দেখিয়ে গেছে। ফ্রীজটা খোলার পরপরই হুট-হাট ভাল্লুকের বোতলগুলো ছোঁড়া শুরু করতো আমাদের দিকে। সেগুলো ছোঁড়ার আগে একটু সঙ্কেতও দিতো না। যে কারণে আমরা খুব টেনশনে থাকতাম। কখন মাথায়-কপালে লেগে যায় বা ল্যাপটপের মনিটরে। অবশ্য উড়ন্ত বোতলগুলো ধরতে ভুল হলে ওর জ্বালা ধরানো হাসিটা সহ্য করতে হবে-এই ভয়টা কাজ করতো আরো বেশি।

এরই মধ্যে দেখতাম সে ফস্ করে একটা সিগারেট জালিয়ে ফেলেছে। ম্যাচের কাঠিটা কোথায় ছুড়ে মেরেছে তার কোনো ইয়ত্তা নেই। ওসব নিয়ে আমার তেমন কোনো দুশ্চিন্তা না থাকলেও সজল ঠিকই সন্ত্রস্তভাবে কাঠিটাকে অনুসরণ করতো। ফোমের গদিটার ওপর গিয়ে পড়লে সারা ঘরে আগুন লেগে যেতে পারে- এই আশঙ্কাটা যে সে মৃদুমাত্রায় করে সেটা আমি জানতাম।

৪.
এদিকে ঘরের ভেতর ছোটখাটো কাণ্ড ঘটে চলছেই! সোফার একপাশে হয়তো আমি বসে আছি। আনা আরেকপাশে এমন বেমক্কা একটা লাফ দিয়ে এসে বসতো যে, উল্টাদিকে বসে থাকা আমাকে পুরাই টলোমলো হয়ে যেতে হতো। সে সময় যদি ভাল্লুকের ক্যানটা মুখে ধরা থাকে তো কর্ম সারা! একেবারে এক দলা ভাল্লুক চলে যেতো পেটের ভেতর। খানিকটা ঢুকে যেতো নাক দিয়েও। আর তাই দেখে উল্টোদিকে হাসতে হাসতে বিষম খেতো দস্যিমেয়ে।

সে সময় সজল জানালার ধারের আলমিরাটার আড়াল থেকে মেয়েটির দিকে বিস্ফোরিত চোখে তাকিয়ে থাকতো। আসলে মেয়েটি যখন আমাদের ঘরে ঢুকে লাফালাফি-ঝাপাঝাপি, হাহাহিহি শুরু করে দিতো, তখন উদ্বিগ্ন চোখে তাকিয়ে থাকা ছাড়া সজলের বিশেষ কিছু করার থাকতো না।

ঠিক সন্ধ্যে নামার মুখে আমরা বাসা থেকে বের হতাম। পাহাড়ি পথ ধরে ধরে একদম সমুদ্রতীরে চলে যেতাম। সজলটা অবশ্য সুযোগ পেলেই কোথাও বসে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্য অবলোকনের জন্য আমাদের তাগাদা দিতো। আমরা তারপরও সমুদ্রতীরেই যেতাম। সেখানে গিয়ে দৌঁড়ঝাপ, হই-হুল্লোড় আর পানিতে ঝাপাঝাপি করে অল্প সময়েই এলাকার নিরব শান্তিপূর্ণ ভাবমূর্তি ভেঙ্গে চুরমার করে দিতাম। আমাদের হাসির শব্দে আর কোলাহলে ভরে উঠতো চারিদিক। আশেপাশে কেউ থাকলেও তারাও আমাদের সাথে যোগ দিতে কসুর করতো না।

আমরা মাঝে মাঝে সজলকে চ্যাং-দোলা করে সমুদ্রের পানিতে ছুঁড়ে মারতাম। আনা ভালো সাঁতার পারতো। আমিও মোটামুটি পারি। আর সজলটা একদম আনাড়ি। বেচারা আমাদেরকে ভয় পেতো। তবে তিনজনেই যখন ভিজে যেতাম, তখন সঙ্গে করে আনা ভদকা'র বোতল খুলে বড় বড় দুই ঢোক গলায় ঢেলে দেয়া লাগতো। নাহলে যে মাথাটা ঠান্ডায় জমে যাবে- সেটা জানতাম সবাই।

রাতে ফেরার পথে আমরা আনাকে বাংলা গান শোনাতাম। সে আধুনিক, ক্লাসিক্যাল, লোকগীতি, পল্লীগীতি প্রায় সব ধরনের বাংলা গানই পছন্দ করতো। সজলটা ভাল গান গাইতে পারতো। গান গাইতে গাইতে আমরা গ্রামে ফিরে কোনো একটা হোটেলে ঢুকে সসেজ-স্টেক-আলু-সালাদ, যার যেটা ভাল লাগে সেটা দিয়ে রাতের খাবার সারতাম। তারপর বাসা।

সে সময় এলাকার পাথর বিছানো পথে ভাল্লুকের বোতল হাতে আমাদের সরব-প্রণোচ্ছল-হাস্যজ্জ্বল পদচারণা স্থানীয় বাসিন্দাদেরও আলোড়িত করতো। বিভিন্ন পাবের বারান্দায় বসে থাকা আবাল-বৃদ্ধ-বণিতা আমাদের উদ্দেশ্যে গ্লাস উচিয়ে ধরে শুভেচ্ছাবাণী ছুড়ে দিতো। চিৎকার-হইচই-অট্টহাসিগুলো সচরাচর আমি আর আনাই করতাম। সজলটা একবার লোকালয়ে চলে আসলেই হয়েছে, আর জোর গলায় গান গাইতে চাইতো না। বলতো, তাহলে এলাকার অন্যদের সমস্যা হতে পারে।

স্থানীয়রা আমাদেরকে পছন্দ করেছিলো মূলত স্বতঃস্ফূর্তভাবে ওদের সঙ্গে মিশে যেতে পারার জন্য। আমি অবশ্য আনাকে বলেছিলাম, এর পুরো কৃতিত্ব আসলে তোমার। তুমি একটা অদ্ভুত ভালো মেয়ে বলে তোমাকে সবাই পছন্দ করে। আর আমরা তোমার বন্ধু বলে আমাদেরকেও এখন পছন্দ করে ফেলেছে।

তবে আনা কথাটা খুব গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছিল বলে আমার মনে হয় নি। ও বলতো আমি সবসময় আমার নিজের মতো করে বাঁচতে চেষ্টা করি। অন্যের কোনো সমস্যা সৃষ্টি না করে। আমি বুঝতে পারতাম, ওর সেই থাকার মধ্যেই আশপাশের প্রত্যেকটা মানুষ জেনে যায় যে, সে আছে কোথাও। মেয়েটা আশেপাশে থাকলে অন্যরা সেটা টের পাবেই কোনো না কোনভাবে। মেয়েটি কথা বলতো খুব সুন্দর করে।

৫.
মাঝে মাঝে আনা আমার মনিটরের দিকে তাকিয়ে থাকতো। বিশেষ করে যখন আমি নিজের ভাষায় লিখতাম। সে বলতো, তোমার ভাষাটা যখন বের হয় তখন সেটা দেখতে খুবই 'কুল' লাগে, জানো? মনে হয় ফ্যাক্টরী থেকে মাত্র ম্যানুফ্যাকচার হয়ে এক-একটা শব্দ বের হচ্ছে। মাঝে মাঝে শব্দের ওপর গিয়ে বসে যাচ্ছে নানারকমের আকৃতি।

আমি শুনে ভেতরে ভেতরে হাসতাম কিন্তু বাইরে কিছু বলতাম না। বড়জোর লেখায় সাময়িক বিরতি দিয়ে, একটা সিগারেট বানাতে বসতাম। লেখা বের হওয়ার সময়টায় মনিটরের দিকে তাকিয়ে থাকলে একটা "ম্যাজিক"-মতো ঘটে, সেটা আমিও জানি। অন্য কেউ কখনও সেটা ধরতে পারবে বলে কখনও ভাবি নি। আনা প্রথমবার কথাটা উল্লেখ করে আমাকে বেশ ভালই চমকে দিয়েছিল।

এই জাদুর মতো অনুভূতিটি কেমন তা একটু বিস্তারিত বলি। আমি নিজে মাঝে মাঝে গভীর রাতে টেকনো মিউজিক চালিয়ে, কানে ফুল ভলিউমের হেডফোন গুঁজে, চোখ বন্ধ করে, টেট্রাহাইড্রো ক্যানাবিনল মেশানো সিগারেট টেনে দেখেছি। দূর্দান্ত অনুভূতি! লেখা বের হতে দেখাটা অনেকটা সেরকমই এক জাদুকরী অনুভূতির মতো। কিংবা শান্ত নীল স্বচ্ছ গভীর জলের ওপর ভাসমান কোনো নৌকার গলুইয়ে শুয়ে আকাশ দেখার মতো। বিষয়টার স্থায়িত্ব হয়তো কয়েক মুহূর্তের, কিন্তু স্পর্শ-ক্ষমতা অপরিসীম। মনে হয় একটা ছোট্ট আঙ্গুল কোথা থেকে যেন এসে হৃদযন্ত্রের দেয়ালে খুব আস্তে আস্তে আঁচড় কাটতে লেগেছে। হালকা ব্যাথা-জর্জরিত ভাললাগা মস্তিষ্কের আনাচে-কানাচে ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ছে। খুব সন্তপর্ণে বন্ধ হয়ে আসতে লেগেছে চোখের পাতা। লিখতে বসে যখন সময়ের কোনো খেয়াল থাকে না, অনবরত একটার পর একটা লাইন বের হতে থাকে- সে সময়কার অনুভূতি অনেকটা ওরকম।

আমাদের কথাগুলো কখনও আনাকে খুব বেশি বুঝিয়ে বলতে হতো না। ও সবসময়ই আমাদের কথাগুলো যা নির্দেশ করে বলতাম অর্থাৎ যেভাবে বুঝাতে চাইতাম- সেভাবেই বুঝে ফেলতো। একবার এমি ওয়াইনহাউসের গানের একটা লাইন এনে আমায় বলেছিল, এই লাইনটা না মাঝে মাঝে আমার হৃদযন্ত্রের দেয়ালে আস্তে আস্তে আঁচড় কাটে। এমি ওয়াইনহাউসের 'ব্যাক টু ব্ল্যাক' গানের একটি লাইন ছিল সেটা-

"You go back to her,
And I go back to black"

তারপর গানটি আমরা দুজনে মিলে পুরোটা একসাথে শুনেছিলাম। সজল গিয়েছিল দোকান থেকে নাশতার সরঞ্জাম কিনতে। গানটা শুনতে শুনতে আনা আমায় বলেছিল, গানের কথাগুলো কি শক্তিশালী! শুনলেই শরীরটা শিরশির করে ওঠে- "যাও তুমি ফিরে প্রেমিকার কাছে, আমি ফিরে যাই অন্ধকারে।"

কথাটা শুনে আমি খানিকক্ষণ পূর্ণ দৃষ্টিতে ওর দিকে তাকিয়ে একটা ধূম্রশলাকায় অগ্নিসংযোগ করেছিলাম। সজলটা ঠিক সে সময়ই ঘরে ঢুকেছিল ব্যাগভর্তি বাজার হাতে নিয়ে। আর ঠিক তখনই আনা তার বিয়ারের বোতলের ব্যাকওয়াশটুকু এক চুমুকে শেষ করে স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে হাতের উল্টো পিঠ দিয়ে ঠোঁট মুছে, কোনো পূর্বনোটিশ ছাড়া বোতলটা ছুঁড়ে দিয়েছিল সজলের দিকে! ছুড়ে দেয়ার পর যখন বোতলটা শূন্যে ভাসছিল, সেই সময় সে সজলকে জানিয়েছিল যে, তোমার দিকে একটা বোতল এগিয়ে যাচ্ছে ম্যান, কিছু একটা করো।

৬.
সজল হয়তো সে সময় আমাদের সেই রুমের ছোট্ট পৃথিবীটার কোথাও ছিলই না। নিজের মনে ডুবে ছিল কোনো চিন্তায়। আমি জানতাম ছেলেটা যখনই একা কোথাও যেতো, অনেক কিছু নিয়ে চিন্তা করতো।

সেই চিন্তার জগত থেকে এক মুহূর্তে বাস্তব জীবনে ফিরে আসা, প্রয়োজনীয় পরিমাণ হাবুডুবু খাওয়া, ব্রেইনের কাছ থেকে আসা বোতল ঠেকানোর আদেশটাকে হাত দিয়ে প্রসেস করা এবং কোনমতে বোতলটা ঠেকানো; সব কিছু বেচারাকে এত দ্রুত করতে হয়েছিল যে, পুরো বিষয়টা দেখার মধ্যে এক ধরনের স্বার্থপর কিন্তু শিশুতোষ আনন্দ লুকিয়ে ছিল। আমি কোনমতেই নিজেকে সে আনন্দ গ্রহণ করা থেকে বিরত রাখতে পারি নি। আর সজল কোনমতে বোতলটা ঠেকানোর পর, আনার হাসতে হাসতে গড়িয়ে পড়া দেখে- নিজের হাসিও ঠেকাতে পারি নি। আনা গড়াগড়ি দিয়ে হাসছিল আর বলছিল, "বোকাটা বোতলটা ধরার চেষ্টাটাও করে নি। জাস্ট কোনমতে ঠেকিয়ে দিয়েছে।"

বলতে বলতে সে ঘরের মেঝেতে শুয়েই পড়েছিল। তারপর হাসির দমক ঠেকানোর জন্য কাঠের মেঝেতে বার বার চাপড় দিচ্ছিল। তাও ওর হাসি পুরোপুরি থামছিল না। আমিও হাসতে হাসতে বিষম খাচ্ছিলাম বারবার। আর ভাবছিলাম, যদি ঘটনাটাকে একটা ১৫ সেকেন্ডের ভিডিও হিসেবে দেখানো হয়, তাহলে সেটার ক্যাপশান হিসেবে আনার কথাটা একদম যুৎসই হয়।

আসলে ডেনমার্কের অল্প ক'দিনের জীবনটা আমাদের অতুলনীয় ছিল। আসার আগের দিন বিকেলে আমরা সৈকতে বসে বসে মার্গারিটা পান করছিলাম। আমি একটা হাওয়াই শার্ট কিনেছিলাম ওখানে গিয়ে আর একটা অফ হোয়াইট রঙয়ের কার্গো প্যান্ট। সেটা পরেই সেদিন ওদের জন্য মার্গারিটা বানাচ্ছিলাম।

আনার পরনে ছিল সবুজ রঙয়ের বিকিনি। ওর চোখ আর কপালের অর্ধেকটা ঢেকে রাখা বেড়ালের কানের শেপের রোদচশমা, আর কোকড়ানো চুলের গোছাগুলোর কয়েকটার শেষপ্রান্তে ঝুলতে থাকা ছোট ছোট হেয়ার-ব্যান্ডগুলোর দিকে তাকালে একটা ভালোলাগা টাইপ অনুভূতি হচ্ছিল। বিশেষ করে যখন মাঝারি সাইজের এক-একটা মেঘ সূর্যটাকে ঢেকে দিচ্ছিল কয়েক সেকেন্ডের জন্য, তখন ওকে বিদেশি সিনেমার নায়িকাগুলোর মতোই লাগছিল একদম।

আমি কয়েকটা তরতাজা লেবু জোগাড় করেছিলাম স্থানীয় বাজারের চার-পাঁচটা দোকান ঘুরে। আর "আগাভে নেকটার", যেটা মূলত মার্গারিটার স্বাদটা নিয়ন্ত্রণের জন্য স্টিয়ারিং হুইল হিসেবে কাজ করে- সেটা কিনতে হয়েছিল গ্রামের সবচেয়ে বৃদ্ধ নারীটির কাছ থেকে। বুড়ি একলা থাকে ৪৫ বছর যাবত। মধ্য জীবনে স্বামী কলেরায় ভুগে মারা যাওয়ার পর তার জীবনটা একলা হয়ে যায়। একটা সন্তান ছিল- মেয়ে। মেয়েটি জন্মেছিল পোলিও নিয়ে। তারপর মরে গেছে মাত্র কয়েক বছর পরই। মৃত্যু দুটোর পর বুড়ি নাকি নিজেকে আর কারও সঙ্গে জড়ানোর সাহসই করতে পারে নি। তার ভাষায়, "মৃত্যুরা সবচেয়ে ভয়ংকর, যখন তারা হানা দেয় কাছের মানুষের ভেতর।"

কথাটা সর্বাঙ্গে সত্য। তবে বুড়ি সেই বয়সেও বেশ শক্ত সমর্থ ছিল। দিব্যি বিশাল এক আঙুর ক্ষেতের দেখভাল চালিয়ে যাচ্ছিল। গল্পে গল্পে জেনেছিলাম, তাকে শুধু মাঝে মাঝে ভারি জিনিসপত্র টানাটানির কাজে প্রতিবেশির বাড়ন্ত ছেলেটার সাহায্য নিতে হয়। এছাড়া আর সবকিছু বুড়ি নিজেই করতে পারে। বুড়ির সংগ্রহশালায় নিজের হাতে বানানো ৫০ বছরের পুরোনো ওয়াইনও আছে। কোনো একদিন খুব মুড আসলে নাকি বারান্দায় একটা আরামকেদারা টেনে বসে সূর্যাস্ত দেখতে দেখতে বুড়ি সেই ওয়াইনটা পান করবে।

আমি যখন মার্গারিটা বানাচ্ছিলাম তখন সজল আমাদের মধ্যেই বসে ছিল এবং সাধারণত যেটা হয়- ওর চোখের সামনে বিশাল এক ল্যাপটপ খোলা থাকে, সেদিন সেটাও ছিল না। এর ফলে আমাদের তিনজনের মধ্যেই বিবিধ বিষয় নিয়ে আলাপ-আলোচনা-তর্ক ইত্যাদি চলছিল।

সজলটা 'নার্ড' বলেই কিনা কে জানে, অনেক মজার মজার জিনিস জানতো। এই যেমন, ঘুমের সময় নাকি প্রতি নব্বুই মিনিট পর পর আমাদের মস্তিষ্কের নিউরণগুলোতে কেমিকেল রি-চার্জ হয়! সে সময় কয়েক মিনিটের জন্য শরীরের ওপর মস্তিষ্কের কোনো নিয়ন্ত্রণ থাকে না। ওই সময় যদি মস্তিষ্ক ভুলক্রমে শরীরের কোনো অংশে কোন আদেশ পাঠানোর চেষ্টা করে (হয়তো মশা কামড়াচ্ছে দেখে ঘুমের ভেতর মস্তিষ্ক হাতকে বললো মশা মারতে- এমন আরকি), তাহলে শরীর সে আদেশটা পালন করতে চায় না বা করলেও খুব ধীরগতিতে করে। আর আমাদের মস্তিষ্ক সেটা দেখে ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে পড়ে। ফলস্বরূপ আমরা ঘুমের ভেতরে ভয় পাই, দুঃস্বপ্ন দেখি কিংবা আমাদেরকে তথাকথিত 'বোবা'-য় ধরে। আসলে আমাদের মস্তিষ্ক যা দেখে অভ্যস্ত নয়, তা দেখলেই প্রাথমিক প্রতিক্রিয়া হিসেবে ভয় পেয়ে যায়।

জিনিসটা যখন সজল অনেকগুলো খুঁটিনাটি ফ্যাক্ট আর রেফারেন্স সহকারে ব্যাখ্যা করছিল, তখন সেটা আনা আর আমি হা করে শুনছিলাম। সে সময় সাগরে কয়েকটা ডানপিটে ছেলে-মেয়ে সার্ফিং করছিল। সজলের কথা শেষ হলে আনা শিশুদের মতো সরল মুখ করে আমার দিকে তাকিয়ে বলেছিল, "দেখেছো? এই ছেলে একটা স্বাভাবিক মানুষের মতো গল্প করতেও জানে!"

৬.
সেবারের যাত্রায় আমরা সবাই আসলে কয়েক দিনের জন্য একটা ভিন্ন জীবন উপভোগ করেছিলাম। আর তার মধ্য দিয়ে নিজেদের চরিত্রের বিভিন্ন অচেনা দিক, শক্তি ও দুর্বলতার জায়গা আবিস্কার করেছিলাম। বলা যায়, নিজেদের আরও খানিকটা ভালভাবে চিনতে পেরেছিলাম আমরা।

আনার সাথে তারপর আমাদের এখনও দেখা হয় নি। ও বলেছিল, আবার দেখা হবে। হয়তো কথাটা ওর মনে আছে। কিংবা নেই, জানি না। আমার ভাবতে ভাল লাগে যে কথাটা ওর মনে আছে। তাই সেটাই ভাবি। এই যেমন আজ সকালে এমি ওয়াইনহাউসের 'ব্যাক টু্ ব্ল্যাক' গানটা শুনতে শুনতে খানিকক্ষণ ভেবেছি। তারপর সজলকে ফোন দিয়েছিলাম। সে-ও নাকি মাঝে মাঝে আমাদের সেই ডানিডার ইন্টার্নশিপটার কথা ভাবে।

জীবনের সেই সময়টি এখন আর আমাদের কারোরই নেই, কিন্তু স্মৃতিগুলো রয়ে গেছে। জীবন আমাদের হাসি, কান্না, স্মৃতি সবই দেয়। হাসি একসময় মলিন হয়ে যায়, কান্না ফুরিয়ে আসে কিন্তু স্মৃতি রয়ে যায় আজীবন অমলিন। হয়তো সে কারণেই স্মৃতি এত মূল্যবান।

---

মন্তব্য করুন

(আপনার প্রদান কৃত তথ্য কখনোই প্রকাশ করা হবেনা অথবা অন্য কোন মাধ্যমে শেয়ার করা হবেনা।)
ইমোটিকন
:):D:bigsmile:;):p:O:|:(:~:((8):steve:J):glasses::party::love:
  • Web page addresses and e-mail addresses turn into links automatically.
  • Allowed HTML tags: <a> <em> <strong> <cite> <code> <ul> <ol> <li> <dl> <dt> <dd> <img> <b> <u> <i> <br /> <p> <blockquote>
  • Lines and paragraphs break automatically.
  • Textual smileys will be replaced with graphical ones.

পোস্ট সাজাতে বাড়তি সুবিধাদি - ফর্মেটিং অপশন।

CAPTCHA
This question is for testing whether you are a human visitor and to prevent automated spam submissions.

বন্ধুর কথা

মীর's picture

নিজের সম্পর্কে

স্বাগতম। আমার নাম মীর রাকীব-উন-নবী। জীবিকার তাগিদে পরবাসী। মাঝে মাঝে টুকটাক গল্প-কবিতা-আত্মজীবনী ইত্যাদি লিখি। সেসব প্রধানত এই ব্লগেই প্রকাশ করে থাকি। এই ব্লগে আমার সব লেখার কপিরাইট আমার নিজেরই। অনুগ্রহ করে সূ্ত্র উল্লেখ না করে লেখাগুলো কেউ ব্যবহার করবেন না। যেকোন যোগাযোগের জন্য ই-মেইল করুন: bd.mir13@gmail.com.
ধন্যবাদ। হ্যাপি রিডিং!