ইউজার লগইন

দিনলিপিতে দু'হাজার বাইশ - ২

কাটছে সময় কি তার আপন গতিতে? কে জানে তা। আমার তো কখনো মনে হয় সময় যেন কাটছেই না, আবার কখনো মনে হয় এত দ্রুত সবকিছু ঘটছে যেন দেখা ছাড়া আমার দ্বারা আর কিছুই করা হচ্ছে না। তবে এটাও কিন্তু হতে পারে যে, সময় তার নিজের মতো করে সকলের জীবনে ভারসাম্যতা ঠিক করে দেয়। যে কারণে কখনো সেটিকে দ্রুতগতির মনে হয় আবার কখনো মনে হয় মন্থর। আসলে নিজের গতিতে সে আবহসঙ্গীতের মতো চলতেই থাকে পুরোটা সময়।

আজকাল একসঙ্গে নতুন বাসা খোঁজা এবং পুরোনো বাসা হাতবদলের কর্ম সম্পাদনে ব্যস্ত সময় কাটছে। তবে সে ব্যস্ততাটা যে আসলে কি, তা বলা বড় কঠিন। এই যেমন; পুরোনো বাসা কোন মেরামত ছাড়া তাৎক্ষণিকভাবেই নতুন ভাড়াটিয়াকে বুঝিয়ে দেয়া যাবে কিনা, তা দেখতে আসবেন যিনি, তিনি যেন মুগ্ধ হন- সে চেষ্টা চললো তিনটি দিন। সেটা ছিল একটা ব্যস্ততা। কিন্তু আসলেই কি?

অপরদিকে নতুন শহরে যেসব বাসা খুঁজছি বা পাচ্ছি এই মুহূর্তে, সেগুলোতে যোগাযোগ খুব সহজে যে করা যাচ্ছে- ব্যপারটা ঠিক তা না। অনলাইনে আবেদন ঠুকে দিয়ে বসে থাকা ছাড়া, খুব বেশি ফলপ্রসূ কিছু করারও নেই এ মুহূর্তে। ওয়েবসাইট থেকে বিভিন্ন নাম্বার খুঁজে ফোন করেও, এখন অপেক্ষা করার পরামর্শ ছাড়া বেশি কিছু পাই নি। তো, এই দুইটা বিষয় সামলাতে হচ্ছে একহাতে, এইসব দিনগুলোতে, এই আরকি।

যাহোক সেদিন পোষা কাকটার কথা মনে পড়েছিল অনেক দিন পর। কাকটার নাম দেয়া হয়েছিল কুকি। ওকে অবশ্য নাম ধরে ডাকলে বুঝতে পারতো না। কা কা করলে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাতো। ক'টা দিন অসুস্থ হয়ে বাসায় ছিল সে আমার। নিজে থেকেই ছিল। দরজা, জানালা খোলা থাকলেও উড়াল দেয় নি। আর আমার ঘরের সবকিছুর ওপর ঘুরে ঘুরে মলত্যাগ করেছিল।

কোন কিছু তেমন খেতো না। ভাত দিতাম। ঠুকরে ঠুকরে ফেলে রাখতো। মাছ, মাংস, ভর্তা, ভাজি, কাঁটাকুটি, উচ্ছিষ্ট- দু'টো দিন ওসবের কোনকিছুই যে কুকি খাওয়ার মতো করে খেয়েছিল, তা বলা যাবে না। তারপর তৃতীয় দিন দুপুরের দিকে, খাটের ওপর থেকে বারান্দা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে থাকতে থাকতে এক সময় দুই লাফে বারান্দাটার রেলিংয়ের ওপর গিয়ে বসেছিল কুকি।

কাকটাকে পেয়েছিলাম আমাদের বিল্ডিংয়ের নিচে। ঝড়ের ভেতর পড়ে বিধ্বস্ত হয়ে গিয়েছিল। এক কোণায় গিয়ে ঠুকঠুক করে কাঁপছিল আর গলা দিয়ে স্বর বের করার ব্যর্থ চেষ্টা কর‍ছিল। আমি সন্ধ্যায় বাসার ময়লা নিচে ফেলতে গিয়ে সেখানেই ওকে খুঁজে পাই।

বাসায় নিয়ে আসার পরও প্রায় ঘন্টা দুই-তিনেক খুব নিস্তেজ হয়ে পড়েছিল সে। বুকের ওপর ভর দিয়ে ডিমে তা দেয়ার মতো করে বসে ছিল রান্নাঘরের মেঝেতে মাথাটা নিচু করে। পানি খেতে দিয়েছিলাম একটা মালটোভার বয়ামের ঢাকনায় করে। কয়েকবার চেষ্টা করে হাল ছেড়ে দিয়ে দীর্ঘক্ষণ মেঝেতেই পড়ে ছিল পাখিটা। তারপর এক সময় দেখলাম ধীরে ধীরে সে মাথা তুলে তাকালো। নিজের পায়ে উঠে দাঁড়ালো। কালো কুচকুচে ঠোঁটে করে পানি তুলে খেলও খানিকটা।

পরের দু'টো দিন কুকি আমার পুরো বাসাটা যা করেছিল, তা কহতব্য নয়। বেশিরভাগ জিনিস আমি পরে একদম ফেলে দিয়েছিলাম। কুকির সম্ভবত একটাই যোগাযোগের উপায় জানা ছিল। যেকোন একটা কিছুর ওপর ছোট্ট একটা লাফ দিয়ে উঠে, সেখান থেকে আমার দিকে তাকিয়ে বিষ্ঠা ত্যাগ করা। আমি হয়তো কম্পিউটারে কিছু লিখছি। হঠাৎ কুকির গম্ভীর স্বরের কা ডাক শুনে মাথা ঘুরিয়ে যেই না ওর দিকে তাকিয়েছি, দেখলাম নিচে দিয়ে ছোট্ট একটা পার্সেল "আনলোড" হলো। তারপর কুকি মুখ ঘুরিয়ে রাজকীয় চালে হাঁটতে হাঁটতে অন্য কোন দিকে চলে গেল। প্রতি আধাঘন্টায় বিষয়টা একবার করে ঘটছে।

কাকেদের হাঁটার ভেতর যে একটা রাজকীয় চাল রয়েছে সেটা দু'দিন কুকিকে খুব কাছ থেকে পর্যবেক্ষণ করে জানতে পেরেছিলাম। তৃতীয় দিন কুকি দু'টো লাফ দিয়ে যখন ওই রেলিংটার ওপর গিয়ে বসেছিল, তখনই বুঝতে পেরেছিলাম ও চলে যাচ্ছে। ভেবেছিলাম যাওয়ার আগে মাথা ঘুরিয়ে একবার হয়তো তাকাবে পেছনের দিকে। কিন্তু সেটা ঘটে নি। মনে হয় না, কুকির স্মৃতিতে তথ্য সংরক্ষণের কোন জায়গা আছে। যে ছোট একটা মাথা!

কুকি ছাড়া আমার পোষা একটা বেড়াল ছিল অনেক আগে। তারও অনেক আগে ছিল একটা খরগোশ। ভবিষ্যতে একটা কুকুর পোষার ইচ্ছা আছে। একটা ফক্স টেরিয়ার, বাদামী আর শাদার মিশেলে গায়ের রং। অল্পবয়সী পেলে দত্তক নেয়ার ইচ্ছা আছে আমার।

জার্মানিতে কুকুর দত্তক নেয়া কিন্তু অনেক বড় একটা বিষয়। কুকুরেরা ঠিক এমন না যে তারা ঘন ঘন নিজের মনুষ্য সহচর পাল্টাতে পারে। এর কারন হচ্ছে; যেকোন একজন মানুষ বা একটা পরিবারের সঙ্গে বা একদল মানুষের সঙ্গে একটি কুকুর যেসব পরীক্ষা-নিরীক্ষা, চর্চা ও চেষ্টার মাধ্যমে একটা বন্ধুত্ব তৈরি করে, কথা না বলেও যে যোগাযোগের ব্যবস্থাটা ওই কুকুর এবং তার মনুষ্য সহচরের মধ্যে গড়ে ওঠে- সেটা আবার নতুন করে কারও সঙ্গে তৈরি করাটা খুব সহজ না। সময়সাপেক্ষ তো বটেই।

পাশাপাশি কুকুরদের জীবনের দৈর্ঘ্যও মানুষের তুলনায় অনেক ছোট। একটা নিরাপদ, কুকুরবান্ধব পরিবেশে গড়পরতা ১৫ থেকে ২০ বছর। বেশিরভাগ কুকুরই সে কারণে একবার তার মনুষ্য সঙ্গী থেকে পাকাপাকিভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়লে, খুবই হতাশ হয়ে পড়ে। এরপর আর নতুন করে কিছু শিখতে চায় না। সহজে কোনকিছুতেই আগ্রহ খুঁজে পায় না। যা কুকুরটার জন্য মারাত্মক। তাই কুকুর দত্তক নেয়ার আগে জার্মানিতে এক ধরনের আবেদন প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। শহরের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে সেই কুকুরটির নিবন্ধনও করাতে হয় নিজের নামের অধীনে। অর্থাৎ কুকুরটির যাবতীয় দেখভালের দায়িত্ব তখন সেই মানুষটির।

তবে জার্মানরা তা খুব আনন্দের সঙ্গেই করে। এ দেশের প্রায় প্রতিটি বাসস্থানকেই নানাভাবে পোষাপ্রাণীদের উপযোগী করে বানানো হয়েছে। এদেশের ৮০ মিলিয়ন জনসংখ্যার পাশাপাশি রয়েছে ৩০ মিলিয়ন পোষা প্রাণী। প্রতি তিনটি বাড়ির একটি বাড়িতে কোন না কোন পোষা প্রাণী দেখা যায়। আর এসব থেকেই অনুমান করা সহজ যে, পোষা প্রাণীদের বাড়ির সদস্যের চেয়ে কম কিছু ভাবা হয় না এখানে। আর এই দেশে পোষা প্রাণীদের দেখেও বলিহারি যেতে হয়। তারা যেন আসলেই বাড়ির সবচেয়ে রসিক সদস্য একেকটা, সারাটা সময় নির্মল আনন্দ ছড়ানোর জন্যই যেন ওদের থাকা!

আমার বারান্দার টমেটো গাছটায় দুটো টমেটো ধরেছে দেখলাম। একদম ছোট্ট। সবুজ রংয়ের দুটো টমেটো। গত বছরও দুটো ধরেছিল। ওরা বড় হয় নি। ছোট থাকতেই পেকে লাল হয়ে গিয়েছিল। এ বছর ধরলো আরো দুটো। ভাবছি এই গতিতে টমেটো চাষ করলে লাভের মুখ দেখার আদৌ কোন সুযোগ কি আছে? থাকলে তা কতদিনে?

---

পোস্টটি ৪ জন ব্লগার পছন্দ করেছেন

মন্তব্য করুন

(আপনার প্রদান কৃত তথ্য কখনোই প্রকাশ করা হবেনা অথবা অন্য কোন মাধ্যমে শেয়ার করা হবেনা।)
ইমোটিকন
:):D:bigsmile:;):p:O:|:(:~:((8):steve:J):glasses::party::love:
  • Web page addresses and e-mail addresses turn into links automatically.
  • Allowed HTML tags: <a> <em> <strong> <cite> <code> <ul> <ol> <li> <dl> <dt> <dd> <img> <b> <u> <i> <br /> <p> <blockquote>
  • Lines and paragraphs break automatically.
  • Textual smileys will be replaced with graphical ones.

পোস্ট সাজাতে বাড়তি সুবিধাদি - ফর্মেটিং অপশন।

CAPTCHA
This question is for testing whether you are a human visitor and to prevent automated spam submissions.

বন্ধুর কথা

মীর's picture

নিজের সম্পর্কে

স্বাগতম। আমার নাম মীর রাকীব-উন-নবী। জীবিকার তাগিদে পরবাসী। মাঝে মাঝে টুকটাক গল্প-কবিতা-আত্মজীবনী ইত্যাদি লিখি। সেসব প্রধানত এই ব্লগেই প্রকাশ করে থাকি। এই ব্লগে আমার সব লেখার কপিরাইট আমার নিজেরই। অনুগ্রহ করে সূ্ত্র উল্লেখ না করে লেখাগুলো কেউ ব্যবহার করবেন না। যেকোন যোগাযোগের জন্য ই-মেইল করুন: bd.mir13@gmail.com.
ধন্যবাদ। হ্যাপি রিডিং!