শুধু শারীরিক নির্যাতন না বন্ধ করো মানসিক নির্যাতন
কয়েকদিন ধরে মিডিয়ার কল্যানে আমরা সবাই খুব রোমানা মঞ্জুরের কথা বলছি। যেখানেই যাই সেখানেই আলোচনার টপিক দাঁড়ায় রোমানা মঞ্জুর। কিন্তু আমাদের এই সো কলড শিক্ষিত সমাজে এরকম কত হাজার হাজার রোমানা মঞ্জুর আছে আমরা কেউ তার খবরও রাখিনা। আরেকদিন অফিসের কাজে একশন এইডে গেলাম। ওখানে গিয়ে দেখি খুব সুন্দর দেখতে একটা মেয়ের ছবি বড় করে টানানো। মেয়েটি কে জিজ্ঞেস করতেই ওদের একজন জানালো, মেয়েটি আমাদের সহকর্মী ছিল, ওকে ওর স্বামী মেরে ফেলেছে। শুনে আমার একটা ধাক্কার মত লাগলো। আরও কষ্ট পেলাম যখন জানতে পারলাম মেয়েটা ইউনিভার্সিটিতে আমার ডিপার্টমেন্টেরই সিনিয়র ছিল। সব শুনে আমি আমার কলিগকে বললাম আমরা ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশনের মেয়েরা নারীর ক্ষমতায়ন নিয়ে এত কাজ করি অথচ আমাদেরইতো কোন ক্ষমতা নাই। আমাদের মেয়েরাইতো বাসায় স্বামীর হাতে নির্যাতিত হয়, তাহলে আমরা আর মানুষকে কি শেখাই? ব্যাপারটা আসলে এখানেই। নিম্নবিত্ত পরিবারগুলোতে দেখা যায় স্বামী স্ত্রীকে জনসমক্ষেই মারে, গালিগালাজ করে। আমরা তাই এসকল মেয়ের নির্যাতনের কথা অবলীলায় জানতে পারি। নিম্নবিত্ত কোন মেয়ে যৌতুকের বলি হলেও আমরা সেটা গায়ে মাখিনা। মনে করি অশিক্ষিত গরীবের ঘরে এটাতো নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা। কিন্তু আমাদের টনক নড়ে যখন এই ধরনের ঘটনাগুলোই শিক্ষিত কোন মধ্যবিত্ত কিংবা উচ্চবিত্ত পরিবারে ঘটে। তাও আমরা সেটা জানতে পারি যখন একটা মেয়েকে মেরে ফেলা হয় বা সে মৃত্যুর সাথে যুদ্ধ করে ঠিক তখন। কিন্তু আমার প্রশ্ন হল শুধু শারীরিক নির্যাতনই কি নির্যাতন? শারীরিক নির্যাতনের চেয়েও বড় হল মানসিক নির্যাতন, যার ভুক্তভুগী হয় প্রায় ১০০% মেয়েই। যেখানে শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয় ৭০%। প্রতিটা ঘরে প্রতিটা মেয়ের সাথে এই মানসিক নির্যাতনের ঘটনা ঘটে থাকে। আর শারীরিক বা মানসিক যে নির্যাতনের কথাই বলিনা কেন তার পেছনে মূল যে বিষয়টি ভূমিকা রাখে তা হল পুরুষতন্ত্র। আমাদের এই পুরুষতান্ত্রিক সমাজে মেয়েরা মানুষ হিসেবেই গন্য হয়না। সবসময় তাকে দেখা হয় একজন নারী, দুর্বল, অবহেলিত, অসহায়রূপে। সবসময় তাকে থাকতে হবে বিনীত ভঙ্গিতে, তার স্বামীর অধীন। ভুলক্রমেও যদি কোন মেয়ে মেধার জোড়ে তার স্বামীর চেয়ে বেশী প্রতিষ্ঠা অর্জন করে ফেলে তাহলেই আর আমরা সেটা মেনে নিতে পারিনা। পুরুষেরা তখন মনে করতে থাকে সমাজে বোধ হয় তার আর মর্যাদা রইলোনা। যার ফলে প্রথমে ঘটে মানসিক নির্যাতন, পরে সেটা শারীরিক নির্যাতনে রূপ নেয় এবং পরবর্তীতে ঘটে হত্যার মত ঘটনাগুলো। আমার খুব কাছের একজন বন্ধু একদিন কথা প্রসঙ্গে আমাকে বললো যে, আমি আমার স্ত্রীকে তো কোনদিনই চাকরি করতে দিবোনা। কথাটা শুনে আমি খুব অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম, কেন? তার উত্তরে সে আমাকে বললো, চাকরি করা বউ অনেক বেশী বোঝে, তাকে যা খুশী তাই বলে ম্যানেজ করা যাবেনা। আমার অতো দরকার নাই বাবা। তাকে ঘরেই থাকতে হবে, আমার সেবাযত্ন করতে হবে, আমাকে খুশী রাখতে হবে, তাইলেই চলবে। কি দরকার মেয়ে মানুষের চাকরির নাম করে অতো বাইরে ঘুরাঘুরি করা? আমি বললাম, সে যদি চায় কখনও বাইরে কাজ করতে? উত্তরে সে আমাকে যা বললো তা হল, এরকম কোন অবস্থা হলে তাকে বেছে নিতে হবে সে কোনটা চায়? সে কি আমাকে চায় না তার ক্যারিয়ার চায়? এই কথা শুনেতো আমি আকাশ থেকে পড়লাম। আমি বললাম, কিন্তু তুই যে সেদিন আমাকে বললি খুব দ্রুত কোথাও চাকরি নিতে আর যেন বেকার ঘুরাফিরা না করি সেটা? শুনে সে বলে, হ্যাঁ সেটাতো তোকে বলেছি। অন্য যে কোন মেয়ে চাকরি করুক, জীবনে প্রতিষ্ঠিত হোক আমার কোন সমস্যা নেই। আমিও চাই মেয়েরা জীবনে উন্নতি করুক, নিজের পায়ে দাঁড়াক, কিন্তু আমি শুধু আমার স্ত্রীকে চাকরি করতে দিবোনা। সে আবার এও বললো যে, এ বিষয়ে আমি আবার একটু পুরোনো ধাঁচের। আমি খুব রেগে গিয়ে তাকে বললাম, তাহলে প্লীজ তুই আধুনিকমনা হওয়ার এই ভন্ডামীগুলাও আর করিসনা। যেটা ধারন করিসনা, বিশ্বাস করিসনা সেটা সবার কাছে বলে প্রশংসা পেলেই কি আর তুই ভাল হয়ে গেলি? তোদের মত ছেলেদের কারনেই মেয়েরা তাদের প্রতিভাগুলো কখনো বিকাশ করার সুযোগ পায়না। আমার এই ঘটনাটা তুলে ধরার কারন হল আমরা প্রত্যেকটা মানুষই ভনিতা করতে খুব বেশী পছন্দ করি। মানুষের কাছে নিজেকে মহান হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য মন থেকে যেটা বিশ্বাস করিনা আমরা সেটাই বলি, সেটাই করি। প্রত্যেকটা ছেলেই যদি চিন্তা করে অন্যের বউ করুক আমার বউ কোনদিনও করতে পারবেনা তাহলে মেয়েদের উন্নতি কোনদিন সম্ভব হবেনা। বিশ্ববিদ্যালয়ের মত দেশের সর্বোচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সর্বোচ্চ ডিগ্রীধারী ছেলেরা, মেয়েদের সম্পর্কে যখন এধরনের মন্তব্য করে তখন আমি খুব অবাক হওয়ার সাথে সাথে খুব ভয়ও পেতে থাকি। আমার মনে হয় শিক্ষিত ছেলেরাই যদি মেয়েদেরকে ঘরে আটকে রাখার জন্য এত অস্থির হয়ে যায় তাহলে এর বাইরের দুনিয়াটা কি? মেয়েদের জন্য কষ্ট হয় এই ভেবে যে তাদেরকে আরো অনেক কঠিন পথ পাড়ি দিতে হবে। যে পথ হবে বন্ধুর, যেখানে কোন বন্ধু থাকবেনা। আর শুধুকি অর্থ উপার্জন করলেই একজন মেয়ের ক্ষমতায়ন হয়ে যায়? অর্থ উপার্জন অনেক মেয়েই করে কিন্তু কয়টা মেয়ে ওই অর্থ নিজের ইচ্ছামতো খরচ করার স্বাধীনতা পায়? কয়টা মেয়ে চলাফেরায় স্বাধীনতা পায়? সবচেয়ে ভয়ংকর ব্যাপার হচ্ছে, ছেলেদের নিজেদের ইচ্ছা, পছন্দ, অপছন্দ, ভাললাগা, মন্দলাগা জোড়পূর্বক অন্যের উপর চাপিয়ে দেয়ার একটা প্রবনতা দেখা যায়, সেটা অন্যের ভাল লাগছে কি না তা বিবেচ্য হয়না। একটা ছেলে রাত একটায় বাসায় ফিরলেও সেটা কারো জন্য কোন সমস্যা না কিন্তু একটা মেয়ে যদি অফিসের কাজে একটু দেরি করে বাসায় ফিরে তাহলে? তাহলেই আমরা তার চরিত্র নিয়ে শুরু করি বিশ্লেষন। এত বেশী পক্ষপাতিত্বপূর্ন আমরা। আমাদের একটা বিশ্বাস রয়ে গেছে যে স্ত্রীকে সবসময় স্বামীর নীচেই থাকতে হবে। পদমর্যাদায় হোক আর অর্থ উপার্জনের ক্ষেত্রেই হোক। অন্য মহিলাকে কোন পুরুষের বস মেনে নিতে সমস্যা হয়না, তার অসম্ভব মেধা নিয়েও কোন সংশয় কাজ করেনা কিন্তু যখনই ব্যাপারটা দাঁড়ায় নিজের স্ত্রীর ক্ষেত্রে তখনই সেটা আর সহ্য হতে চায়না। আজকে রোমানার জায়গায় তার স্বামী থাকলে কি কোনদিনও এরকম কোন ঘটনা ঘটতো? মেয়েরা যদি পারে তার স্বামীর উন্নতিতে খুশী হতে তাহলে ছেলেরা পারেনা কেন? মেয়েরাতো দুর্বল!!!!???? তাহলে তাদের এত ভয় কিসের? কোন কাজ না করে ঘরে বসে থাকা স্বামী আর কি ই বা করতে পারে বউকে সন্দেহ করা ছাড়া। নিজের হীনমন্যতাই তাকে বাধ্য করে এ ধরনের আচরন করতে। যখন আমি নিজে পারবোনা তখন আরেকজনকে বাধা দিব। আমার ধারনা সাঈদকে মন থেকে ঘৃনা করেছে এমন ছেলের সংখ্যা খুব হাতে গোনা। এরকম একটা ঘটনার পর সাঈদকে কোনভাবেই সমর্থন করা যায়না বলে হয়তো অনেকেই মুখে নিন্দা জানাচ্ছে ঠিকই কিন্তু আমি নিশ্চিত তাদের মনে রোমানাকে নিয়ে অনেক বাজে ধারনা রয়েছে। যতদিন আমাদের সমাজে এরকম মুখোশধারীরা ঘুরে বেড়াবে এধরনের ঘটনা কোনদিন কমবেনা বরং বাড়বে। এরচে আরো ভয়ংকর ঘটনা ঘটবে। তাই প্রথমে দরকার আত্নোপলব্ধি। মেয়েদেরকে নারী হিসেবে নিজের অধস্তন না মনে করে তাকে একজন মানুষ মনে করা। তাকে শুধুই ভোগ্যপন্য না মনে করে মানুষ হিসেবে তাকে সম্মান করা। আজকে নিজের স্ত্রীকে যে নিপীড়ন করছে সে সুযোগ করে দিচ্ছে আরেকজনকে তার বোন বা মেয়ের উপর নির্যাতন করার জন্য। মেয়েরা কোনদিনও উন্নতি করতে পারবেনা যদি তার স্বামী, ভাই, বা পিতা তাকে সাহায্য না করে। নারী উন্নয়ন কোন পুরুষবিরোধী ধারনা না। বরং একজন পুরুষের উন্নতির জন্য যেমন একজন নারীর অবদান থাকে তেমনি একটা মেয়েকে এগিয়ে দেয়ার জন্য একজন পুরুষের আকুন্ঠ সমর্থন থাকা উচিত।এছাড়া নারীমুক্তি কখনোই সম্ভব হবেনা।





পুরুষরা তাই ভাবে।
আর এটা ভাবে বলেই মেয়েদের উপর করা নির্যাতনগুলা দিনে দিনে ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে। আজকে ঢাকা ইউনিভার্সিটির একজন টিচার পর্যন্ত তার স্বামীর হাতে মার খেয়ে হাসপাতালে পড়ে থাকে।
কেউ কাউকে কিছু দেয় না। দেয়া জিনিস ধরেও রাখা যায় না। অর্জন করতে হয়। রুমানার মতো মেয়েরা যখন পড়ে মার খাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় তখন সমাজে নারী উন্নতি হয়েছে বলি কোন লজ্জায়? চাকরী করা মানে কি উন্নতি নাকি বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রীর মধ্যে উন্নতি থাকে?
There is no comments from male......Why?
Ur thought process is nice.......
Keep writting.....Society needs some1 like u for empowerment of women.
Shishir
মন্তব্য করুন