ইউজার লগইন

চোরাবালি

মা- বাবার ঝগড়া একদম ভাল লাগেনা অথৈ এর। কিছুদিন যাবত প্রতিনিয়ত তাদের ঝগড়া করতে দেখে হাপিয়ে উঠেছে সে। এইতো কিছুদিন আগেও তারা খুব সুখী একটা পরিবার ছিল। মা, বাবা, অথৈ তিনজন মিলে বেড়িয়ে এল মালয়েশিয়া থেকে। সেখানে কত্ত মজা করলো তিনজন মিলে। কিন্তু হঠাত করেই কেন সবকিছু এত দ্রুত বদলে গেল সে বুঝতে পারেনা। বাইরে থেকে দেখলে অবশ্য কখনোই কিছু বোঝা যায়না। এক সপ্তাহ আগেই তার বাবা- মা খুব জমজমাট করে তার জন্মদিন পালন করল। সেখানে দুজনই এমন ব্যবহার করল যেন কিচ্ছু হয়নি, তাদের মধ্যে কোন সমস্যাই নেই। তবে যতোই আড়াল করুক অথৈ জানে যে তারা কেউই এখন ভাল নেই।

সে বুঝতে পারে তার মা এখন আর তাদের সাথে থাকতে চায়না। তার মা জাফর আঙ্কেলকে বিয়ে করে আলাদা থাকতে চায়। এটা নিয়ে মা- বাবার মধ্যে বেশ কিছুদিন ধরেই খুব মনো-মালিন্য চলছে। যদিও তারা অথৈকে কিছুই বুঝতে দেননা। সেদিন রাতে তার বাবা- মা যখন নিজেদের ঘরে দরজা লাগিয়ে ঝগড়া করছিল তখন অথৈ কান পেতে শুনেছে। সে শুনেছিল মা তার বাবাকে বলছে, তোমার সাথে এভাবে এক ছাদের নীচে থাকা আমার পক্ষে আর সম্ভব হচ্ছেনা। এই আঠারো বছরের সংসারে কি দিয়েছ তুমি আমাকে? সংসারের ঘানি টানতে টানতে আমি আর কুলাতে পারছিনা। আমি এখন মুক্তি চাই। নিজের কথা ভাবতে চাই। তুমি আমাকে ডিভোর্স দাও। আমি জাফরকে বিয়ে করব। বাবা তার উত্তরে শুধু একটা কথাই বললেন, আমি তোমাকে ভালবাসি, অথৈ তোমাকে খুব ভালবাসে। আমাদের ছেড়ে যেওনা প্লীজ। বাবার কথা শুনে অথৈএর চোখ পানিতে ঝাপসা হয়ে এলো। সে আর সেখানে দাঁড়িয়ে থাকতে পারলোনা। চলে এলো নিজের রুমে।।

সেই রাতে আর এক ফোঁটা ঘুমাতে পারলোনা সে। সারারাত ভাবল, বাবার বন্ধু জাফর আঙ্কেল। মা এখন জাফর আঙ্কেলকে বিয়ে করতে চান। এজন্যই উনি এখন এত ঘন ঘন তাদের বাসায় আসেন। আসার সময় তার আর মা'র জন্য অনেক গিফটও নিয়ে আসেন। খুব সুন্দর করে কথা বলতে পারেন উনি। আর সেজন্যেই কি মা এত পাগল হয়ে গেল? যে কারনে আজ সে বাবাকে আর তাকে ছেড়ে চলে যেতে চাচ্ছে? অথৈকে ছেড়ে চলে যাবে মা? যে অথৈ এর একটু ঠান্ডা লাগতে পারেনা তাতেই মা কান্না- কাটি করে অস্থির হয়ে যান। কিছুই মেলাতে পারেনা সে। আর বাবা? বাবা মাকে ছেড়ে কিভাবে থাকবেন? বাবাতো মাকে আর অথৈকে খুব ভালোবাসেন। হয়তো বাবা জাফর আঙ্কেলের মত এত সুন্দর করে কথা বলতে পারেননা আর এত সারপ্রাইজ পার্টি রাখেন না। এত সারপ্রাইজও দেন না কথায় কথায়। তবু কি তিনি তাদের দুজনকে কম ভালবাসেন?

অথৈ এর মনে আছে, একবার মাকে অফিসের কাজে রাশিয়া যেতে হয়েছিল দিন সাতেকের জন্য। দেশে ফেরার দিন ভোর ছয়টায় মা'র ল্যান্ড করার কথা ছিল। প্রচন্ড শীত তখন। এই শীতের মধ্যে বাবা অথৈকে নিয়ে এয়ারপোর্টে যেয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন মা'র জন্য। হাতে ইয়া বড় এক টেডি বিয়ার কারন মা টেডি বিয়ার খুব ভালোবাসেন। আর তাই বাবা আর অথৈ মিলে পুরো ঢাকা শহর খুজে সবচেয়ে বড় টেডি বিয়ার কিনেছিল মাকে সারপ্রাইজ দেবার জন্য। সেদিন যে মা কত্ত খুশী হয়েছিলেন, সেটা এখনও অথৈ’র চোখে ভাসে। সেই মা হঠাত করে কিভাবে এত বদলে গেলেন যে আজ তাদের ছেড়ে চলে যেতে চাইছেন।

ষোল বছরের অথৈ মনে মনে চিন্তা করে, কেন তার মা দেখতে এত সুন্দর? চল্লিশ বছরের মা দেখতে এত ভীষন সুন্দর যে তাকে দেখলে যে কেউ এখনো পঁচিশ বছরের মেয়ে বলে ভুল বুঝতে পারে। বাবার পাশে মা কম্পারেটিভলি অনেক বেশী সুন্দর এবং অনেক বেশী ইয়াং। বন্ধুরাও সবসময় অথৈকে বলে, তোর মাকে দেখতে একদমই মা মা লাগেনা, তোর বড় বোনের মত লাগে। রায়ানতো মায়ের অনেক বড় ভক্ত। শুধুমাত্র মা দেখতে ভীষন সুন্দরী এইজন্যে। রায়ান সবসময় বলে, সে যদি আরেকটু বড় হতো তাহলে নাকি মায়ের পেছন পেছন ঘুরতো। অথৈ হেসে উত্তর করে, মায়ের কাছে চান্স না পেয়ে এখন আমার পেছনে ঘুরিস? রায়ান স্কুলে তার খুব ভাল বন্ধু। বাবা- মাও তাকে খুব পছন্দ করেন। আর তাই অথৈ’র বাসায় রায়ানের অবাধ চলাফেরা। একদিনতো বাবা খাওয়ার টেবিলে দুষ্টামি করে বলেই ফেললেন, ইয়াংম্যান, ছোট থেকে একসাথে ঘুরছো আর এখন পর্যন্ত এই মেয়েটাকে পটাতে পারলানা? তুমি ভীতুর ডিম না আমাদের অথৈ অনেক বেশী আয়রন ওম্যান? অথৈকে বললেন, কিরে তুই কি মার্গারেট থ্যাচার নাকি? অথৈ উত্তরে বলেছিল, রায়ান আর পটে যাওয়া? উফ বাবা নেভার। কথা শুনে রায়ানের চেহারা দেখে বাবাতো হেসেই বাঁচেননা। একবার অথৈ কোন একটা কারনে রায়ানের উপর খুব রাগ করে বেশ কয়েকদিন কথা বলেনি। রায়ান রাগ ভাঙ্গানোর অনেক চেষ্টা করেও যখন ফেল করলো, তখন মাকে যেয়ে বলে, আন্টি অথৈ রাগ করেছে। কি করলে রাগ ভাঙ্গবে? কিছু টিপস দেন। শুনে মা কিছু আইডিয়া দিয়েছিলেন। পরে সত্যি সত্যি অথৈ এর রাগ ভেঙ্গেছিল। আর রায়ানের সে কি থ্যাঙ্কস জানানো মাকে!

আজ এতদিন পর এসব কথা মনে করে সে চোখের পানিতে বালিশ ভিজিয়ে ফেললো। সারারাত তার নির্ঘুম কাটলো। সে এটাই ভেবে পায়না তার সেই মা হঠাত করে কিভাবে এত আমূল পাল্টে গেল। আজ তার মা তাকে আর তার বাবাকে ছেড়ে চলে যেতে চাইছেন। জাফর আঙ্কেলকে বিয়ে করতে চাইছেন। মা কি পারবেন তাদেরকে ছেড়ে শুধু জাফর আঙ্কেলকে নিয়ে খুশী থাকতে? তাদের কথা একবারো কি মনে পড়বেনা তার?

অথৈ ভাবে, কোনো জাদুর কাঠি কি আছে যার এক ছোঁয়াতে তাদের পরিবারটা আবার আগের মত হয়ে যাবে? ভাবতে ভাবতে পূর্বাকাশ রাঙ্গা হয়ে থালার মত এক লাল সূর্য উঠল। একটা নতুন দিনের শুরু, একটা সুন্দর ভোর। বারান্দায় দাঁড়িয়ে ভোর হওয়া দেখলো অথৈ। তারপর হাত- মুখ ধুয়ে, ইউনিফর্ম পরে সে স্কুলের জন্য তৈরী হল। স্কুলে যাবার আগে দেখে গেল বাবা ঘুমুচ্ছেন আর মা সাজগোজ করছেন। হয়তো কোথাও যাবার জন্য তৈরী হচ্ছেন।

ক্লাসে অপ্রত্যাশিতভাবেই অথৈএর ডাক পড়লো প্রিন্সিপালের রুমে। তাকে ইমার্জেন্সী দেখা করতে বলা হয়েছে। কারন কিছুই বুঝতে না পেরে দুরুদুরু বুকে সে গেল সেখানে। প্রিন্সিপাল খুব গম্ভীর মুখে বললেন, তোমার বাবার শরীর হঠাত করে খুব খারাপ করেছে। তুমি এক্ষুনি বাসায় চলে যাও। অথৈ চিন্তা করলো, সকালেইতো বাবাকে দেখে এসেছে সে, হঠাত করে কি হল যে স্কুল থেকে তাকে ছুটি দিয়ে দেয়া হচ্ছে? খুব ঘাবড়ে গেল সে। তাড়াতাড়ি করে বাসায় পৌছে দেখে বাসার সামনে অনেক লোকজন দাঁড়ানো। গেটের বাইরে প্রচুর লোকের ভীড় ঠেলে সে বাসায় ঢুকে দেখে বাসা ভর্তি আত্নীয়-স্বজন এবং পুলিশে বোঝাই। কিছুই বুঝতে পারছেনা সে। বেডরুম থেকে তার মার কান্নার আওয়াজ শোনা যাচ্ছে। খুব ধীর পায়ে বেডরুমের দিকে এগুতেই দেখতে পেল ডাইনিং টেবিলের পাশে একটা লাশ সাদা কাপড়ে ঢাকা। তার মনে ছ্যাত করে উঠলো। এটা কে? দৌঁড়ে সে লাশের কাছে গিয়ে মুখ থেকে কাপড় সরিয়ে অবাক হয়ে বললো, বাবা! এক সেকেন্ডর বেশী সময় লাগলোনা তার সবকিছু বুঝে ফেলতে। চিতকার দিয়ে সে কেঁদে উঠল। তার কান্নার আওয়াজ প্রতিদ্ধনির মত বেজে উঠল সারা ঘরময়। তাকে কেউ সান্ত্বনা দিতে এলোনা। কারন সবাই জানে মিথ্যে সান্ত্বনার কোন মানে হয়না। কিভাবে কি হল জানতে গিয়ে অথৈ এর এবার অবাক হবার পালা। সে জানলো তার বাবা সুইসাইড করেছে। রাতে অনেকগুলো ঘুমের ওষুধ খেয়ে ঘুমিয়েছেন তিনি যাতে সকালে আর কোনভাবেই ঘুম না ভাঙ্গে তার। এজন্যই কি স্কুলে যাবার সময় তাকে ওরকমভাবে ঘুমাতে দেখেছিল অথৈ? বাবার জন্য প্রচন্ড কষ্ট হতে লাগলো তার আর সাথে মার প্রতি প্রচন্ডরকম ঘৃনা। মা'ই একমাত্র মানুষ যার জন্য আজকে তাদের এই অবস্থা। আজকে বাবা লাশ হয়ে পড়ে আছেন এই ঘরে।

বাবার মৃত্যুর পর থেকে অথৈ এর জীবনটা পুরোপুরি পালটে গেল। সে স্কুলে যাওয়া বন্ধ করল। কিছু বাজে ছেলেদের সাথে মিশে নেশা করা শুরু করলো। সকালে ইউনিফর্ম পড়ে বের হত ঠিকই। কিন্তু স্কুলে না গিয়ে চলে যেত বনানীতে সাজ্জাদের বাসায়। ঐখানে সাজ্জাদ তার কিছু বন্ধু বান্ধব নিয়ে হেরোইনের আসর বসায়। সেও গিয়ে ঐখানে জয়েন করে। মার সাথে কথা বলা তার পুরোপুরি বন্ধ। মা ব্যস্ত থাকেন জাফর আঙ্কেলের সাথে তার ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে। সুতরাং অথৈ কি করছে তা নিয়ে মাথা ব্যথা নেই উনার। অথৈ বাবার লাইসেন্সড রিভালভারটা খুব যত্ন করে রেখে দিয়েছে তার কাছে। ঐ রিভালভারটা তার একদিন লাগবে। যার জন্য আজকে সে তার মা আর বাবা দুজনকেই হারালো, সেই লোকটাকে মেরে তার বাবার মৃত্যুর প্রতিশোধ নেবে সে। এখন শুধু সময়ের অপেক্ষা। এদিকে রায়ানের সাথে দূরত্ব বেড়ে গেছে তার। বাবার মৃত্যুর পর রায়ান তাকে কিছুদিন খুব টেক কেয়ার করার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু সে ইচ্ছে করেই ওর সাথে খারাপ ব্যবহার করেছে। কারন তার ধারনা, রায়ান থাকলে সে তার পরিকল্পনা মত কিছুই করতে পারবেনা। অনেকদিন স্কুলে যায়না বলে হঠাত একদিন অথৈ দেখে সাজ্জাদের বাসায় এসে রায়ান দাঁড়িয়ে আছে।

সাজ্জাদ অথৈদের ক্লাসেই পড়ে। কিন্তু বখে যাওয়া ছেলে বলে এর আগে ওর সাথে অথৈ বা রায়ান কেউ মেশেনি। আজকে অথৈকে ওর সাথে বসে প্যাথেড্রিন নিতে দেখে রায়ানের খুব খারাপ লাগলো। সে তাকে কড়া ভাষায় কিছু কথা বলতেই দুজনের মধ্যে তর্ক বেধে গেলে রায়ান সেখান থেকে চলে যায়। এরপর থেকে আর রায়ানের সাথেও অথৈ এর সবরকম যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়।

নিঃসঙ্গ, বিপর্যস্ত অথৈ প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে চলে যায় সাজ্জাদের বাসায়। সেখানে বিকেল পর্যন্ত সময় কাটিয়ে নিস্তেজ অবস্থায় বাড়ি ফিরে আসে। বাসায় ঢুকেই সে চলে যায় তার বাবার লাইব্রেরিতে, যেখানে বসে বাবা সন্ধ্যেবেলাটা বই পড়ে সময় কাটাতেন। সারারাত অথৈ সেখানেই পড়ে থাকে। ঐ রুমের টেবিলের ড্রয়ারেই সে রেখেছে তার অস্ত্রটা। যেটা দিয়ে সে একদিন একটা খুন করবে। সেখানে বসে বিভিন্ন রকম পরিকল্পনা করতে থাকে সে। মা খুব একটা এই রুমে আসেননা। একদিন অথৈ তার বাবার একটা ছবির উপর শুয়ে আছে ঠিক সেই সময় মা ঢুকলেন এই রুমে। এসেই খুব রাগতস্বরে বললেন, এসব কি শুনছি তোমার নামে? সে কোন উত্তর করলোনা দেখে মা কয়েক মিনিট পর জিজ্ঞেস করলেন, তুমি নাকি ড্রাগ নেয়া শুরু করেছো? কে বললো তোমায়? অথৈ জবাব দিল। কে বললো সেটা গুরুত্বপূর্ন না। গুরুত্বপূর্ন হচ্ছে তুমি ড্রাগস নিচ্ছো কিনা? যদি নিয়ে থাকো তাহলে আমার বাসায় তোমার আর কোন জায়গা নেই। যেখানে যেয়ে ঐসব নাও সেখানেই থেকে যাবে। মার কথা শুনে অথৈ ও খুব এ্যারোগেন্টলি উত্তর করলো, আমি তোমার বাসা থেকে চলে যাবো ঠিকই কিন্তু ঐ সোয়াইনটাকে খুন করার পর। এই কথা শুনে মা কিছুক্ষন বিষ্ময় ভরা একটা দৃষ্টি নিয়ে অথৈ এর দিকে তাকিয়ে ঘর থেকে বের হয়ে গেলেন।

রাত তখন বারোটা। বাসায় কেউ নেই। অথৈ একা বসে টিভি দেখছিল। বুয়াটাও হঠাত করে ছুটি নিয়ে আজকে গ্রামে গেছে। এমন সময় কলিংবেল বেজে উঠলো। এতো রাতে কে এলো চিন্তা করে অথৈ পীপহোলে দেখলো বাইরে জাফর আঙ্কেল দাঁড়িয়ে আছেন। তার মানে মা ফিরে এসেছেন। এটা ভেবে সে আর কোন কিছু চিন্তা না করেই দরজা খুলে দিল। জাফর আঙ্কেল ঘরে ঢুকে দরজা লাগানোর চেষ্টা করছেন দেখে অথৈ জিজ্ঞেস করলো, কি ব্যাপার দরজা লাগাচ্ছেন কেন? মা কই? মা আসবেনা? তার কথা শুনে লোকটা ক্রুর একটা হাসি দিয়ে বললেন, কেন আমাকে দেখে ভাল লাগছেনা? অথৈ রেগে গিয়ে উত্তর দিল, বাজে কথা বলছেন কেন আপনি? মা কোথায়? "তোমার মা একটা পার্টিতে গিয়েছেন। আমিও এতক্ষন সেখানে ছিলাম। কাজের লোক ছুটিতে, তুমি একা থাকবে বলে বেচারী অবশ্য যেতে চাচ্ছিলনা। আমি জোড় করে বুঝিয়ে শুনিয়ে তাকে নিয়ে গেছি। এটা অবশ্য আমারই একটা প্ল্যান ছিল। আমার মনে হল বাসায় যেহেতু আর কেউ নেই তাই তোমাকে একা পাবো। এটাইতো সুযোগ তোমাকে কাছে পাওয়ার। তাই পার্টিতে যাওয়ার পর আমি একটা অজুহাত তৈরী করে বের হয়ে এসেছি। তোমার মাকে বলেছি কিছুক্ষনের মধ্যে ফিরে আসছি। সে তাই বিশ্বাস করে ওখানে বসে আছে। আর আমি সময় নষ্ট না করে এখন এখানে।" কথাটা শেষ করা মাত্রই খুব বিশ্রীভাবে হেসে উঠল লোকটা। অথৈএর মধ্যে তখন ঘৃনা, বিশ্বাসঘাতকতা, রাগ, কষ্ট অনেকগুলো অনুভূতির সংমিশ্রণ। সে ভাবছিল, এই জানোয়ারটার জন্য তার মা আজকে আর তাকে ভালবাসেনা, তার বাবা সুইসাইড করেছে, তাদের পরিবারটা নষ্ট হয়ে গেছে। অথচ এই জানোয়ারটা আজকে তার মাকেই ঠকাচ্ছে। পশুটা এগিয়ে এসে যখন অথৈএর গায়ে হাত দেয়ার চেষ্টা করল, সে চিতকার করে বলল, এই খবরদার আমার কাছে আসবিনা। সে শুনে বলে, বাব্বাহ তোমারতো দেখি অনেক তেজ। তেজী মেয়ের টেস্টই আলাদা। তোমার মার তো কোন তেজ নেই। সেতো হাসিমুখে আমাকে সব দিয়ে দেয়। আর তার মেয়ে হিসেবে তুমি খুব তেজী। আজকে তোমাকে পাওয়ার সাথে সাথে একদম ডিফারেন্ট দুটি টেস্ট পাবো আমি। অথৈ শুওরের বাচ্চা বলে গালি দিতে দুজনের মধ্যে ধস্তাধস্তি শুরু হয়ে গেল। একপর্যায়ে অথৈ লোকটাকে ধাক্কা দিলে বেকায়দায় দাঁড়িয়ে থাকার কারনে সে পড়ে গেল। এই সুযোগে অথৈ দৌঁড়ে তার বাবার লাইব্রেরীতে ধুকে রিভালভারটা তাক করল। অথৈ এর পেছন পেছন পশুটা এ ঘরে চলে এসেছে। তার হাতে অস্ত্রটা দেখে হতবিহবল চোখে পশুটা কিছুক্ষন তাকিয়ে থাকলো। প্রত্যাশার বাইরে যখন কিছু ঘটে তখন কারো দৃষ্টি যেরকম থাকে পশুটার দৃষ্টি ছিল ঠিক সেইরকম। সে পরিস্থিতি ঠান্ডা করার জন্য বললো, অথৈ কি করছো তুমি? আই ওয়াজ জাস্ট জোকিং। ফেলে দাও ওইটা, এক্ষুনি ফেলো। অথৈ আহত নেকড়ের মত গর্জন করে বলল, "ওয়্যার ইউ জাস্ট জোকিং? ইউ সান অব দ্যা বিচ। তোর জন্যই আজকে আমাদের পরিবারটা নষ্ট হয়ে গেছে। তুই আমার বাবার মৃত্যুর কারন। আমার মা তোকে ভালবেসেছে, তোকে বিশ্বাস করেছে। আর তুই তাকে পর্যন্ত ঠকাচ্ছিস? তাকে ঠকিয়ে আসছিস আমার টেস্ট নিতে? বলছিলি না আমার খুব তেজ, তাই আমার টেস্ট অন্যরকম? এখন দ্যাখ আমার টেস্ট কিরকম? তুইতো তোর প্ল্যান বললি। এখন আমারটা শোন। আমার নিজেরও অনেকদিনের ইচ্ছা ছিল তোকে খুন করার। বাবা মারা যাওয়ার পর আমি প্রমিজ করেছিলাম, আমি যদি আমার বাবার মেয়ে হই তো আমি তোকে খুন করবো। আমার ইচ্ছাটা খুব তীব্র হলেও আমি বুঝতে পারছিলামনা তোকে আমি কোথায়, কিভাবে মারবো? কারন তোর সাথে সবসময় আমার মা থাকতো। আর আমি আমার মায়ের ক্ষতি করতে কখনোই চাইনি। কারন সে আমার মা। আজকে হয়তো তুই তাকে ঠকিয়ে বা ভুল বুঝিয়ে এরকম করেছিস। কিন্তু সে একদিন ঠিকই তার ভুল বুঝতে পারবে। ভুল বুঝে ফিরে আসবে আমার কাছে। তবে তুই যে এভাবে নিজেই নিজের বিপদ ডেকে আনবি তা আমি কখনো ভাবিনি। আত্নরক্ষার জন্য আমাকে কোনদিন তোকে খুন করতে হবে তা আমি কখনো কল্পনাই করিনি।" অথৈ এর কথা শেষ হওয়া মাত্র একটা গুলি এসে বিধঁলো পশুটার একদম ঠিক পাঁজরের মাঝখানে। এবং সাথে সাথেই মেঝেতে লুটিয়ে পড়লো নিথর দেহটি। আর পরমুহূর্তেই একটা তীব্র চিতকার ভেসে এলো দরজার ওইপাশ থেকে। অথৈ তাকিয়ে দেখে তার মা দাঁড়িয়ে আছেন। গুলির শব্দ সে দরজা থেকে শুনতে পেয়ে দৌড়ে এঘরে এসেছে। এসে দেখেন অথৈ রিভালভার উচুঁ করে দাঁড়িয়ে আর জাফরের লাশ মাটিতে পড়ে আছে। তার মা চিতকার করে বললেন, অথৈ তুমি ওকে মেরে ফেললে। সে তার উত্তরে বললো, আমি ওকে মারিনি মা। ও নিজেই নিজের মৃত্যু ডেকে এনেছে। আমি ওকে না শেষ করলে ও আমাকে শেষ করতো, তোমাকে শেষ করতো। মা তার কোন কথা না শুনে বলতে লাগলেন, তুমি সবসময় বলতে ওকে খুন করবে। আমি ভাবতাম রাগের মাথায় বলছো। রাগ ঠান্ডা হলে তুমিও এসব চিন্তা করা বাদ দিয়ে দিবে। বাট আই ওয়াজ রঙ। তুমি সত্যি সত্যিই ওকে মেরে ফেলে এখন কাহিনী বানাচ্ছো। সে অবাক হয়ে দেখলো তার মা তার কোন কথাই বিশ্বাস করছেননা। তার মনে একবারো এলোনা, এই লোকটার মনে খারাপ কিছু না থাকলে তাকে পার্টিতে একা বসিয়ে রেখে সে এই বাসায় এলো কেন? কোন যুক্তিই যখন তার মা আর মেনে নিচ্ছেননা উলটা তাকেই দোষারোপ করছেন প্রচন্ড কষ্টে তখন অথৈ হাসতে শুরু করলো। একটু পরে তার মার দেয়া ফোনে পুলিশ এসে তাকে এ্যারেস্ট করলো।

পুলিশী হেফাজতে অথৈ মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলে। জেলের একটা সেলে তাকে হাত- পায়ে শেকল বেঁধে রাখা হয়। কেউ তাকে কোনদিন দেখতে আসেনা। কেউ তার খোঁজ নেয়না। হঠাত অনেকদিন পর রায়ান সেখানে গেল তাকে দেখতে। তাকে ঐ অবস্থায় দেখতে পেয়ে রায়ান নিজেকে আর সামলে রাখতে পারলোনা। তার গাল বেয়ে নেমে এলো অশ্রুধারা। তার চোখে শুধুই ভাসছিলো স্কুলের সেই ব্রাইট অথৈএর ছবি। যে একইসাথে পড়ালেখায় ছিল ব্রিলিয়ান্ট, ছিল স্কুলের ডান্স চ্যাম্পিয়ন। সেই অথৈএর আজ কি অবস্থা? শুন্য দৃষ্টি মেলে লোহার গরাদ ধরে বসে থাকা এই অথৈতো কাউকে দেখছেনা। মনে হয় কিছু শুনতেও পাচ্ছেনা। তবু সে তার নাম ধরে ডেকে বললো, অথৈ কেমন আছিস তুই? দ্যাখ, আমি তোর জন্য তোর ফেভারিট লেইস আর কোক নিয়ে এসেছি। তুই খাবিনা? অথৈ এর নিরুত্তাপ চোখে ঠিক আগের দৃষ্টি দেখতে পেয়ে রায়ান যেন আরো ভেঙ্গে গেলো। সে জিজ্ঞেস করলো, অথৈ আমাকে বিয়ে করবি? তুই যত তাড়াতাড়ি সুস্থ হবি আমরা তত তাড়াতাড়ি বিয়ে করবো। তুই দ্রুত সুস্থ হয়ে যা প্লীজ। দেখিস, আমি ঠিক তোকে এখান থেকে নিয়ে যাবো। আমি তোর আরো ভাল চিকিৎসার ব্যবস্থা করবো। কথাগুলো বলা শেষ হবার পরও অথৈ ছিল স্থির, ভাবলেশহীন। সে দৃষ্টির সামনে রায়ান বেশিক্ষন টিকতে পারলোনা। আবার আসবে আশ্বাস দিয়ে সে দ্রুত চলে গেলো সেখান থেকে। রেখে গেলো তার প্রিয় অথৈকে লোহার গরাদে শেকলে বাঁধা।

পোস্টটি ১০ জন ব্লগার পছন্দ করেছেন

রায়েহাত শুভ's picture


শেষটা বড়বেশী তাড়াহুড়ো করে পরিণতির দিকে চলে গেলো বলে মনে হচ্ছে...

প্রিয়'s picture


আর লিখতে ইচ্ছে করতেসিলোনা। Smile

তানবীরা's picture


একটু সিনেমাটিক যদিও তবু ভালো লেগেছে। আমি অথৈ হলে মাকে খুন করতাম। জাফরকে না

প্রিয়'s picture


Laughing out loud

প্রিয়'s picture


Laughing out loud

শওকত মাসুম's picture


নাটকীয়

প্রিয়'s picture


হুম। Laughing out loud

প্রিয়'s picture


হুম। Laughing out loud

মীর's picture


ভালো গল্প। অথৈয়ের পরিণতিটা বড় নির্মম। বাস্তব বোধহয় এমনি হয়।
ভালো লিখেছেন প্রিয়। আরো বেশি বেশি লিখুন। আপনার গদ্য লেখার দারুণ ক্ষমতা আছে।

১০

প্রিয়'s picture


থ্যাঙ্কু। তবে আপনার মতো এতো ভালো আমি কখনোই লিখতে পারবোনা। Laughing out loud

১১

লাবণী's picture


আমিও তাতাপুর সাথে একমত। আমি অথৈ হলে রিভলভারটা দিয়ে মা-কেই খুন করতাম।
মন খারাপ করে দেয়া গল্পটা ভালো হয়েছে প্রিয় আপুটি Smile

১২

প্রিয়'s picture


থ্যাঙ্কু। Smile

১৩

প্রিয়'s picture


থ্যাঙ্কু। Smile

১৪

আরাফাত শান্ত's picture


পিউর সিনেমেটিক। এই রাত ১টা আটচল্লিশে মফস্বলে নিসুতি রাতে মোবাইলে গল্পটা পড়ে একটা থ্রীল অনুভব করলাম।

১৫

প্রিয়'s picture


ধন্যবাদ। Smile

১৬

বিষণ্ণ বাউন্ডুলে's picture


পিউর সিনেমেটিক। সেরাম জমজমাট।
একটু তাড়াহুড়া হইছে, এটা বাদে দারুন।

আরও লিখতে থাক। আরও ভাল হবে।
ভাল থাক, প্রিয় প্রিয় আপু।

১৭

প্রিয়'s picture


থ্যাঙ্কু। Smile

১৮

কামরুল হাসান রাজন's picture


প্লটটা খুবই পছন্দ হইছে, আরেকটু সময় নিয়ে লিখলে খুব ভাল হত। কিশোরদের পত্রিকায় ছাপা হলে খুব জনপ্রিয় হত।

১৯

প্রিয়'s picture


থ্যাঙ্কু ফর দ্যা ইন্সপিরেশন। Laughing out loud

২০

মেসবাহ য়াযাদ's picture


পিউর সিনেমেটিক। সেরাম জমজমাট।
একটু তাড়াহুড়া হইছে, এটা বাদে দারুন।

একমত আমিও

২১

প্রিয়'s picture


থ্যাঙ্কু । Laughing out loud

২২

শামান সাত্ত্বিক's picture


শুভ কামনা।

মন্তব্য করুন

(আপনার প্রদান কৃত তথ্য কখনোই প্রকাশ করা হবেনা অথবা অন্য কোন মাধ্যমে শেয়ার করা হবেনা।)
ইমোটিকন
:):D:bigsmile:;):p:O:|:(:~:((8):steve:J):glasses::party::love:
  • Web page addresses and e-mail addresses turn into links automatically.
  • Allowed HTML tags: <a> <em> <strong> <cite> <code> <ul> <ol> <li> <dl> <dt> <dd> <img> <b> <u> <i> <br /> <p> <blockquote>
  • Lines and paragraphs break automatically.
  • Textual smileys will be replaced with graphical ones.

পোস্ট সাজাতে বাড়তি সুবিধাদি - ফর্মেটিং অপশন।

CAPTCHA
This question is for testing whether you are a human visitor and to prevent automated spam submissions.

বন্ধুর কথা

প্রিয়'s picture

নিজের সম্পর্কে

নিজে লিখার চেয়ে অন্য সবার লিখা পড়তেই বেশী ভাল লাগে।