অবিশ্বাসের দোলাচল
কোর্টের চিঠিতে আজকের তারিখ ছিলো, বেলা ১১টায়। সোলনা ইমিগ্রেশন অফিসে পৌছাই ১০:৪৫ মিনিটে। রোদের প্রখর তাপে টপ টপ করে কপাল বেয়ে ঘাম ঝরছিলো। রিসেপশনিস্ট আমার চিঠিটা দেখা মাত্রই তলায় পাঠিয়ে দিলো ১০৮ নম্বর কক্ষে: ইন্টারভিউ রুম।
এখানকার বিল্ডিংগুলো বেশীরভাগ পুরোনো আমলের বাগান বাড়ির মতো। বাইরে থেকে দেখলে মনে কাঠের বাড়ি ঘর কিন্তু এই বাড়িঘর গুলো বানানো হয়েছিলো আজ হতে প্রায় ৫০-৬০ বছর আগে। যাই হোক, ইন্টারভিউ রূমে ঢুকে দেখি একটি স্বর্নকেশী মেয়ে আর একজন বাংলাদেশী মহিলা। এই বাংলাদেশী মহিলাকে আমি চিনি। উনি আমার ইন্টারপ্রেটার। যদিও আমি বলেছিলাম আমি ইংলিশ ভালো পারি তবুও বলা হলো এই ইন্টারপ্রেটার যিনি ইন্টারভিউ নেবেন তার জন্য।
সম্ভাষন শেষে শুরু হলো প্রশ্ন পর্ব:
: মিঃ শফিক, আপনার কেসটা সম্পর্কে বলুন।
: আমি শফিক সুইডেনে আসি ২০১১ সালে ছাত্র ভিসায়। যদিও আমার পড়ালেখা করবার কোনো উদ্দেশ্য ছিলো না। জীবন বাচাবার তাগিদেই আমি চলে এসেছি। ২০১০ সালে আগস্টের ১০ তারিকহ মঙ্গলবার, আমি টিউশনি করিয়ে বিকেল ৮ টা নাগাদ আমার এলাকায় ঢুকি। তখন লোডশেডিং চলছিলো। আমাদের গলির মাথায় ঢুকতেই দেখি দু'জন একজন অল্পবয়সী ছেলের দু'হাত ধরে ছিলো আর সামনে থেকে আরেক জন ছুরি হাতে দাড়িয়েছিলো। আমি স্বচক্ষে দেখলাম ঐ অল্প বয়সী ছেলেটির দু চোখে ছুরি দিয়ে দুটো স্টেপ করা হলো। আমি সইতে না পেরে চিৎকার করি। এমন সময় যে ছেলেটির হাতে ছুরি ছিলো সে আমার দিকে তাকায়। আমি তাকে চিনতে পারি, সে আমাকে চিৎকার করে বলে,"শফিক, ভাগ!" আমি আরও সামনে এগোতে থাকলে আশে পাশে লোক জমতে শুরু করার আগঐ তারা ঐ ছেলেটিকে ওখানে ফেলে মটরসাইকেলে চলে যায়। আমি রাস্তায় পড়ে থাকা দেহটার দিকে তাকিয়ে চিনতে পারি এই ছেলেটাকেও। পরে শুনি ছেলেটা তখনই মারা গিয়েছিলো।
: আপনি কি পুলিশে অভিযোগ করেছিলেন?
: আমি তখন খুব শকড ছিলাম। রাতে এক দন্ড ঘুমাতে পারিনি। সকালে উঠে যখন পুলিশ ষ্টেশনে যাবার জন্য আমি রাস্তায় নামলাম তখন পেছন থেকে আমাকে আঘাত করা হয়। তারপর আমি অজ্ঞান হয়ে যাই। যখন জ্ঞান ফিরে পাই তখন ঐ তিনজন আমার সামনে দাড়িয়ে ছিলো আর আমি চেয়ারে বাধা ছিলাম। টানা ৩ দিন আমার প্রচন্ড নির্যাতন করা হয়। এর পর ওরা ভেবে ছিলো আমি মারা গিয়েছি। ওরা বুড়িগঙ্গার পাড়ে আমাকে ফেলে দিয়ে আসে। ওখান থেকে লোকজন আমাকে নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়। যখন বাসায় ফিরি তখন জানতে পারি আমার বিরুদ্ধে উল্টো ঐ ছেলেটিকে হত্যা করার অভিযোগ দায়ের করা হয়েছিলো এবং সাক্ষ্মী হিসেবে ঐ তিনজনের নাম। যে ছেলেটিকে হত্যা করা হয়েছিলো তার নাম আমিরুল, ছেলেটি তাবলীগ করতো। কিন্তু ওকে শিবিরের ছেলে বলে চালিয়ে দেয়া হয়। হত্যা কারী তিনজনের নাম সাব্বির তৎকালীন যুবলীগের সংস্কৃতিক সম্পাদক আর বাকি দুজন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের ক্যাডার।
: তাহলে তোমার কেসটা দেখা যাচ্ছে রাজনৈতিক কেস নয়, মার্ডার কেস। সেক্ষেত্রে আমাদের এটাও জানতে হবে তুমি সত্য বলছো কিনা।
: আমি কি ছোট একটা প্রমান দেবো?
: অবশ্যই।
আমি আমার শার্ট খুলে দেখালাম পিঠের বিশাল একটা পোড়া দাগ। পেটের নীচে খুড় দিয়ে পোচানোর দাগ। আর দু হাতের নীচে সিগারেটের অজস্র ক্ষত চিহ্ন।
সুইডিশ মেয়েটা চিৎকার করে উঠলো,"শার্ট পড়ো প্লিজ।প্লিজ!" আমি শার্ট পড়ে নিলাম। মেয়েটি সুইডিশে ইন্টারপ্রেটারকে কিছু একটা বলে চলে গেলো। ইন্টারপ্রেটার মহিলা আমাকে একটা কাগজে সাইন করতে বলে।
আমি সাইন করে বাইরে বেরিয়ে যেতেই ঐ ইন্টারপ্রেটার মহিলা ডাক দিলেন," তোমার কেসটা খুব শক্ত। যদিও ইদানিং বাংলাদেশের পলিটিক্যাল এসাইলাম এক্সেপ্ট করে না। তোমার কেসটা পলিটিক্যাল হলে আজকেই ডিসিশান হয়ে যেতো। যাই হোক, ও অসুস্হ হয়ে পড়েছে। ও ইনভেস্টিগেশন করবে। যদি পারো কোনো সংবাদ পত্রের কাটিং জোগাড় করে রেখো।"
আমি একটু হাসলাম। এই মহিলার নাম শাহানা। সুইডেনে আছেন ৮ বৎসর, বয়স খুব বেশী হলে ৩৫, কিন্তু দেখলে মনে হয় ২৬।
: তুমি কি সকালে নাস্তা করেছো?
: না, বাড়ি গিয়ে করবো।
: রেলস্টেশনের দিকে একটা ইন্ডিয়ান রেস্টুরেন্ট আছে, সাজনা। যাবে?
: যাওয়া যায়।
দু'জন লান্ঞ্চ করলাম, আমি চলে আসলাম নিজের রুমে। আমার শৈশবের অনেক সুখ স্মৃতি ছিলো, ছিলো অনেক স্বজনের দল। হঠাৎ করে আমার জীবনে এমন কিছু ঘটলো যার ফলে পুরো জীবনটাই পরিবর্তন হয়ে গেলো। আমারও একটা সুন্দর জীবন হতে পারতো, একজন স হধর্মিনী, এক সন্তান। তাকে নিয়ে স্কুলে যেতাম, সন্ধ্যেবেলা তার হোমওয়ার্ক। রাতের বেলা বাসার সবাই মিলে টিভি দেখা, ঘুমুতে যাবার আগে স হধর্মিনীর মাদকমাখা ভালোবাসা।
অথচ আমি এক অজানা অচেনা দেশে পড়ে আছি অনিশ্চিত এক ভবিষ্যত নিয়ে!





স্বাগতম। ভাল লাগলো লেখা।
নিজের সম্পর্কে এতো ডিটেইলে লেখা ঠিক হলো কিনা বুঝতে পারছি না। মনের কথা গুলো শেয়ার করতে পারছিলাম না কোথাও
ধন্যবাদ মন্তব্যের জন্য!
ভাল লাগ্লো।
অনুপ্রাণিত
রিসিশান শুরু হওয়ার পর থেকে একদমই করে না।
সহানুভূতি রইলো, আপডেট জানাবেন
করে না এটা মনে হয় ঠিক না। কয়েকমাস আগে নাখালপাড়ার নিক্সন কেস করেছিলো, পরে তার কেসের ব্যাপারে বাংলাদেশে তেজগাঁও থানায় কহোজ নিতে গিয়ে দেখে সে ২১ শে আগস্টের গ্রেনেড মামলার আসামী। থানার ইনচার্জ ইনভেস্টিগেটরকে দেখেই বলে ওনার ঠিকানার জন্য সবাই মরিয়া। ঠিকানা জানলে তখনি পুলিশ বের হয়ে যায় খুজতে এরকম অবস্হা।
যাই হোক, গত ৬ মাসে খুব বেশী না হলেও কিছু কিছু পাচ্ছে। তবে আমারটা হবে না। আমার দুটো অপশন একটা মেয়ে ধরা আরেকটা ফুলটাইম কাজ পাওয়া। এ দুটোর কোনোটাই আমি করছি না আপাতত। দিন যায় ঘুরে বেরিয়ে আর খেয়ে দেয়ে গায়ে বাতাস লাগিয়ে!
ধন্যবাদ
ভালো চাপাবাগি করলেন,চালাইযা যান,আপনারে দিযা হপে।
দেওয়ানবাগী বা ফুরফুরা বাগীর থেকে কি চাপাবাগী খারাপ?
মন্তব্য করুন