ইউজার লগইন

বৃষ্টিদিনের প্রেমিক

ট্রেন স্টেশনে বসে আছি, পাশে ইতালী থেকে আগত নাজমুল ভাই। বয়স ৩৮ এর ওপরে, স্টকহোমে এসেছেন তিনদিন। গত পরশু দেখা হয়েছিলো তার সাথে আমার ঠিক এখানেই। থাকার জায়গা পাচ্ছিলেন না, আমাকে দেখে কেতা ঠিক রাখতে ইংলিশ ইতালিয়ান মিশিয়ে কথা বলার চেষ্টা করছিলেন।

একটু আগে আমাকে বললো,"আপনাকে দেখে মনে করেছিলাম আপনার জন্ম সুইডেনে। আপনার বাংলা কথা বলার টোন, চুলের স্টাইল দেখে মনেই হয় না আপনি কেস (এসাইলাম) মারছেন। দেশে কি মডেলিং করতেন?"

আমি এর কোনো উত্তর দেইনি। আমি অপেক্ষা করছিলাম ট্রেনের জন্য। গতকাল রাতে একটা আইফোন উপহার পেয়েছি সোনিয়ার কাছ থেকে। তারপরই ওর সাথে আমার একটা কঠিন ঝগড়া হয়। আমি ওর রুম থেকে বেরিয়ে যাই, বলা যায় এক কথায় আমাকে গলা ধাক্কা দিয়ে বের করে দেয়া হয়। যাই হোক, সেটা অন্য একদিন লিখব ক্ষন।

ট্রেন স্টেশনে বসে বসে আইফোনে সিম গুজেই দেখি সব কিছু সেট করা, নিজের নামে আপেল আইডি, বিভিন্ন ভাষার গান আর ওয়াল পেপারে সোনিয়ার ছবি। যদিও ছবিতে জামা কাপড় একটু কম.....আই ফোন ৪এস।

টাবিথাকে ফোন দিলাম:
: হ্যালো টাবিথা?
: কে?
: আমি ..... আমি.....শফিক.....ঐ যে বাংলাদেশী....ন্যুড বীচ.....তোমার কাপড় হারিয়ে যায়.....পিজা প্যান....ললিপপস.....
: ও আচ্ছা....আমি একটু ব্যাস্ত.....যদি কিছু মনে না করো আমি একটু পরে ব্যাক করি? এটা তো তোমার নম্বর তাই না?
: ঠিক আছে। সমস্যা নেই।

ফোনটা রাখতেই মনে হলো রাতটা বুঝি স্টেশনেই কাটাতে হবে। ক্যাম্পের নিয়ম অনুযায়ী ৮ টার মধ্যে ফিরতে হবে এর পর গেট লক। ৯ টা বাজে খাওয়া দাওয়া শেষ, এর পরে খাওয়া নেই। অবশ্য ক্ষুধা বেশ ভালোই পেয়েছিলো। মিনিট পাচেক পর আমাকে অবাক করে দিয়ে টাবিথা ফোন ব্যাক করে। রাতের বেলা মাথা গোজার ঠাঁই হয়, পেট ভরতে আবারও সেই ঘনদুধের প্যান পিজ্জা...ইয়াক!!

ট্রেন ধরবো বলে বসেছিলাম এমন সময় দেখি নাজমুল ভাই মুখটা ভার করে বসে আছে। তার পুরোনো দিনের সোনালী গল্প শুনতে ভালোই লাগে। সমস্যা হলো গল্প গুলো শুনতে শুনতে যখন ভালো লাগা শুরু করে তখন তার গল্পটা থেমে যায়। তখন আমরা দুজনই চুপচাপ বসে থাকি, আমি ডুবে যাই অদ্ভুত ভাবালুতায়। নিজেকে বসাই নাজমুল ভাইয়ের আসনে। আমি তার স্বপ্নে নিজেকে ভাসিয়ে দেই, উপভোগ করতে থাকি অন্যের সুখ স্মৃতি।

ইতালিতে আমরা ছিলাম রাজার হালে। ৮ ঘন্টা ফ্যাক্টরীতে কাজ। আমার কাজ দেখে আফ্রিকানরা পর্যন্ত অবাক হয়ে যেতো। আমার মালিক তো কারখানায় ঢুকলেই আমার খবর নিতো। তখন ইতালীর এমন অবস্হা ছিলো না। ওভার টাইম কাজ করে অনেক টাকা কামিয়েছি, দেশের বাড়ি পাকা দালান, মানিক গন্জ্ঞে দুইটা প্লট। আপনার ভাবীকে নিয়ে আসছিলাম কয়েকবছর পরই।

হঠাৎ করেই আমেরিকার ধ্বসের সাথে সাথে ইতালিতেও ধ্বস লাগা শুরু হলো। আমি কাজ করতাম ফার্নিচারের কারখানায়। ইতালির ফার্নিচার তো নামকরা! ভাবিনি যে আমাদের কিছু হবে। একদিন ছাটাই শুরু হলো, তখনও আমার চাকুরী যায়নি। আমি ভেবেছিলাম আমার যেই কাজের অবস্হা....আমার চাকুরী যাবে না। মাস খানেক পর মালিক ডেকে বলে কারখানা নাকি কাল থেকে বন্ধ।

তখন আমাদের ঘরে ৪ বছরের মেয়ে। আপনের ভাবী আর মেয়েটারে দেশে পাঠিয়ে দেই। একসময় ২-৩০০০ ইউরো কামানো কোনো ব্যাপারই ছিলো না, তখন পেনশনের ১৪০০ ইউরো দিয়েই কোনো মতে টিকে ছিলাম। একসময় মিলান ছেড়ে ভেনিসে চলে আসলাম। দেখতাম সবাই টুপরী মাথায় নিয়ে ফেরী করে। আমার মান সম্মানে বাধে ওগুলায়। ট্যুরিস্টরা হাটবার সময় হটাত পকেটে ফুল গুজে দেয়া বা পানির বোতল ধরিয়ে দিয়ে ৭ ইউরো। ট্যুরিস্টরা বাধ্য হয়ে যখন খুচরো ১০ ইউরো দিতো তখন বাংলায় বলে ভাংতি নাই। যখন অনেকক্ষন ধরে জড়াজড়ি করে ৩ ইউরো ফেরত পাবার কোনো আশা পেত না তখন ট্যারিস্টরা চলে যেতো। আপনিই বলেন এটা কি কোনো কাজ হলো?

বছর ঘুরতেই সেই পেনশন বন্ধ হয়ে গেলো। ২০১০ এর ঘটনা। টানা ৬ মাস কাজ ছাড়া, জমানো টাকা ভেঙ্গে খাওয়া। বাসা থেকে বলছিলো দেশে এসে পড়তে। দেশে গিয়ে কি করবো বলেন? তখন থেকেই শুনছিলাম সুইডেন নরওয়ে জার্মানীতে নাকি ভালো অবস্হা। কিন্তু মন টানে নাই।

উপায়ান্তর না দেখে মাথায় টুপি পড়ে নেমে পড়ি টুপরী নিয়ে। তখন দেখি আমার মতো এরকম শয়ে শয়ে। তখন ট্যুরিস্টরাও চালাক হয়ে গেছে। আমাদের থেকে দুরে দুরে থাকে। যখন কেউ পকেটে ভরে দেয় ওরা ফেরত দিয়ে দেয়, বলে টাকা নাই। আগে শুনতাম মাসে ১৫০০-২০০০ ইউরো কামাতো যারা এখন কোনো মাসে ২০০ কোনো মাসে ১৫০ ইউরোও আসে না। টানা বছর খানেক চেষ্টা করে জার্মানীতে চলে গেলাম। ওরা খুব রেসিস্ট, নিয়ম কানুন খুব কড়া। নিজের পরিচিত এক আত্মীয় ছিলো, গবেষক। খুব ভালো অবস্হায় আছে সে। সে কোনো সাহায্যই করলো না। সাহায্য করার মধ্যে দু দিন থাকতে দিয়েছিলো। তারপর নিজের পরিবারের সমস্যার কথা বলে আরেকটা বাসায় উঠায় দেয়।

এখন শেষ ভরসা সুইডেন। কিন্তু এখানেও দেখি সমস্যা। কালকে স্ক্যাটেভার্কেট অফিসে গিয়ে জানলাম আগে কোনো এমপ্লয়ারের কাছ থেকে কন্টাক্ট পেপার জোগাড় করতে হবে। কিন্তু এখানে রেস্টুরেন্টের কাজ ছাড়া তো আর কোনো কাজ নেই। আর বাঙ্গালীদের রেস্টুরেন্টে মরে গেলেও কাজ করবো না। হাতের সব টাকাও শেষ.....এই শেষ জীবনে এখন কি করবো বুঝতেছি না!

এখানেই থেমে যায়। আমার ট্রেন এসে গেছে। আমি তার কাছ থেকে বিদায় নেই। নাজমুল ভাইয়ের থাকার জায়গা হয়েছে। আমি যেই রুমে ছিলাম ওখানে উঠিয়ে দিয়েছি, সোনিয়ার পাশের রূম। এখন তার দরকার একটা কাজ।

আমি ট্রেনে উঠে জানালার পাশে একটা সীট নেই। গ্রীষ্ম চলে গেছে, এখন শরতেরও শেষের দিক। আর মাস খানিক পর দেখা যাবে না এরকম সোনা ঝরা রোদ, সবুজ বনানীর দিগন্ত ছুয়ে যাওয়া। তখন ৪ ঘন্টার আধআলো দিনে দিগন্ত জুড়ে ফ্যাকাশে স্নো ফলে ভরে যাবে। পুরো দেশটা ঠান্ডার মনে হবে নির্জীব। যদি নাজমুল ভাইয়ের মতো একজন এমন থাকতো যে আমার সুখে দুখে পাশে থাকবে, ভরসা দেবে, তাহলে এই নির্জীব অদ্ভুত দেশটা ছেড়ে যেতাম।

লোডশেডিং হলে পুকুর পাড়ে গাছের ছায়ায় একটা গামছা বিছিয়ে দিতাম। উদোম হয়ে শুয়ে পড়তাম।২-১ ঘন্টা ঘুমিয়ে তারপর পুকুরে ঝাপ। গা মুছে বাসায় গিয়ে গরম চালের সাথে মশুরীর ডাল আর একটা শুকনো মরিচ ভাজা। ওর গা থেকে ভেসে আসা গোসল ভেজা গন্ধ আর লাজুক হাসির সাথে খুনসুটি কথা। খাওয়া শেষে গা এলিয়ে আবেগের ভাগাভাগি.....খারাপ কি ছিলো এমন জীবন? টিনের চালে ঝুম বৃষ্টির শব্দ অথবা পূর্নিমার প্লাবনে স্নাত নদীর পাড়ের কাশবন...

সুখী হবার জন্য এত এত টাকার তো দরকার নেই, দরকার শুধু আপনজনদের সাথে নিরাপদে ভালো থাকাই তো!

সবার জীবনটা কেন এমন সুন্দর হয় না?

পোস্টটি ১১ জন ব্লগার পছন্দ করেছেন

বিষণ্ণ বাউন্ডুলে's picture


বিষাদছোঁয়া লেখনীতে
মন খারাপ হয়ে গেল..

দূরতম গর্জন's picture


পুরো ইউরোপটা যেন বিষাদাচ্ছন্ন

সামছা আকিদা জাহান's picture


গল্পের হাহাকার বুকের ভেতরে বেজে চলেছে। খুব ভাল লাগলো।

দূরতম গর্জন's picture


ইদানিং যেন হাসতে ভুলে গেছি

তানবীরা's picture


যাহা চাই তাহা পাই না আর যাহা পাই তা চাই না Smile

দূরতম গর্জন's picture


সমস্যা হলো এরকম কুকুরের জীবন কেও কখনো চায়নি

তানবীরা's picture


আসার আগে কি করবেন সেই ধারনা নিয়ে আসেন নাই???? Shock

দূরতম গর্জন's picture


আপনি মনে হয় আমার পুরোনো লেখা পড়েননি। আমি লিখেছিলাম আমি এখানে এসাইলাম করেছি, এবং নিতান্ত জীবন বাচাতে দেশ ছেড়েছি সেটাও লিখেছি।

ধন্যবাদ।

তানবীরা's picture


এসাইলমে যারা থাকে তারা কিভাবে কতোটুকু জামাই আদরে থাকে এ খোজটা নিয়ে বের হওয়া দরকার ছিল না???

১০

দূরতম গর্জন's picture


সুইডেনের জামাই আদর নিয়ে এগুলো অভিযোগ নয়, অভিমত। শুধু তুলনা করছি মাত্র।

অভিযোগ আর অভিমত জানানোর মধ্যে বিশাল ফারাক কিন্তু থেকে যায়

১১

টোকাই's picture


ভাই , আমাদের দেশ কি এখন আপনার জন্য এতই বিপদজনক যে আপনাকে সুইডেন এ রাজ্নৈতিক আশ্রয় নিতে হইসে ? একটু যদি খুলে বলতেন ভালো হইত .

১২

দূরতম গর্জন's picture


http://amrabondhu.com/samehere/6679

১৩

আরাফাত শান্ত's picture


বিষাদময় লেখা!

১৪

দূরতম গর্জন's picture


হুমম

১৫

নিভৃত স্বপ্নচারী's picture


মন খারাপ করা লেখা, ভাল লাগলো।

১৬

দূরতম গর্জন's picture


ধইন্যা পাতা

মন্তব্য করুন

(আপনার প্রদান কৃত তথ্য কখনোই প্রকাশ করা হবেনা অথবা অন্য কোন মাধ্যমে শেয়ার করা হবেনা।)
ইমোটিকন
:):D:bigsmile:;):p:O:|:(:~:((8):steve:J):glasses::party::love:
  • Web page addresses and e-mail addresses turn into links automatically.
  • Allowed HTML tags: <a> <em> <strong> <cite> <code> <ul> <ol> <li> <dl> <dt> <dd> <img> <b> <u> <i> <br /> <p> <blockquote>
  • Lines and paragraphs break automatically.
  • Textual smileys will be replaced with graphical ones.

পোস্ট সাজাতে বাড়তি সুবিধাদি - ফর্মেটিং অপশন।

CAPTCHA
This question is for testing whether you are a human visitor and to prevent automated spam submissions.

বন্ধুর কথা

দূরতম গর্জন's picture

নিজের সম্পর্কে

মহাশূন্যের গুন গুন শুনতে চাই, কান পেতে রই তারাদের আহ্বানে। দূরতম গর্জন যখন সৈকতে আছড়ে পড়ে, আমি পা ফেলে উপভোগ করি সাগরের কূর্ণিশ। মানুষ হয়ে জন্মাবার অহংকারই শুধু বিদ্যমান, অথচ নিত্য বেচে আছি তেলাপোকার শৌর্য্যে!