উড়ে যাওয়া হাওয়াগুলো
ঠান্ডা জাকিয়ে বসছে ইদানিং। রাত যত গভীর হয় কন কনে ঠান্ডা হাওয়া গাছের পাতাগুলো ঝরতে থাকে। দিগন্তজোড়া সবুজের উৎসব ফিকে হয়ে হলদেটে রং এ রূপ নিচ্ছে। চোখ ধাধিয়ে থাকা রূপ নির্জীবতায় বিলীন হয়ে যায়।
বিকেল গড়ালে পার্কগুলো জনমানবহীন হয়ে পড়ে। নিয়নের আলোতে নিজেকেই অদ্ভূত গীরগিটি মনে হয়। ক্যাম্পে পড়ে আছে কতদিন হলো এখন আর হিসেব নেই। উকিলের কোনো খোঁজ নেই, ইমিগ্রেশন ব্যাস্ত এখন সিরিয়ানদের নিয়ে। আমার অলস সময়গুলো কেটে যায় মানুষ দেখতে দেখতে। ল্যাপটপটা বিগড়ে গেছে কিছু দিন আগে। আইফোন দিয়ে গান শুনতে ভালো লাগলেও ল্যাপটপের কাজ করা যায় না। হাতে তেমন কিছু নেই যে একটা ল্যাপটপ কেনার বিলাসিতাটা করতে পারি।
শুধু একটা সোয়েটার আর মা এর কিনে দেয়া লেদার জ্যাকেটটা গায়ে দিয়ে গান শুনছিলাম। ঠান্ডা বাড়ছিলো আধার গ্রাস করছিলো পুরোটা আকাশ। হাটতে থাকলে গামলাস্তনের দিকে। ঠান্ডায় পিপাষা বাড়ে, পানশালাতে আড্ডায় ভরপুর হতে থাকে পিপাসার্ত মানুষের। প্রেসবিরন থেকে একটা ক্যান কিনে গলা ভিজাচ্ছিলাম এমন সময় একজন বাংলায় বলে বসলো পেছন থেকে,"ভাই, লাইটার আছে?"
আমি পেছনে তাকিয়ে দেখি সাদা কুকের জামা পড়া একজন সিগারেট হাতে দাড়িয়ে। আমি পকেট থেকে লাইটার দিতেই সিগারেট টা ধরিয়ে বললো,"সিগারেট নেবেন?"
আমি হেসে বললাম,"না ভাই, আপনি কি কুক?"
সে সুখটান দিতে দিতে বললো," কুক না, কুকের এসিস্ট্যান্ট। আজকে ডিনারে ফাটায়া ফেলতেছে। রাজার ছোট মেয়ের অনুষ্ঠান। অথচ কীচেনে লোক নাই। কাজের খ্যাতা পুরী, সিগারেটের পিপাষা পাইছে।"
"সুখেই আছেন", কিছু একটা বলতে হয় তাই বললাম। সে শুরু করলো,"আমার নাম মনসুর। আপনার নাম?"
"শফিক, কেস মারছি ভাই" আমার উত্তরটা শুনে সে বললো,"কাজ লাগবো ভাই?" ওয়ার্ক পারমিট আছে?"
"ভাই, সেটা গত সপ্তাহে দিছে। আইডি পাইছি। কিন্তু কোনো কাজ পারি না। তাই কাজ খোজার সাহস পাই না", তার দিকে নিজেকে অনেকটা স্যারেন্ডার করে দিলাম।
"আসেন আমার সাথে" এই বলে আমার হাতটা খপ করে ধরে নিয়ে গেলো ভেতরে। পুরো কীচেন নয়, যেন একটা ইন্ডাস্ট্রি। চারিদিকে ধোঁয়া আর সাদা চামড়ার বিশাল বিশাল লোক। কেউ রাধছে, কেউ দৌড়াচ্ছে খাবার নিয়ে। এর মধ্যে সার্ভিসের লোকজন খাবার নিয়ে যাচ্ছে। খুব সুন্দর ফুট ফুটে মেয়ে দু'জন দাড়িয়ে ছিলো। বয়স খুব সম্ভবত ২০ কি ২১। মনসুর ভাই তাদের কাছে আমাকে নিয়ে গেলো। তারা আমার কার্ড দেখলো, জিজ্ঞেস করলো সুইডীশ পারি কিনা। আমি সুইডীশে উত্তর দিলাম।
মেয়ে দুটো মনসুর ভাইকে সুইডীশে বললো,"এই পিসকে কিচেনে দেয়া যাবে না। মনসুর একে আমরা সামনে নিয়ে যাবো।" মনসুর ভাই কাচুমাচু করতে লাগলো, আমার দিকে তাকিয়ে বাংলায় বলো,"ভাই, আপনার কপালটা কি চান কপাল? মাস শেষে বেতন পাইলে আমারে অবশ্যই খাওয়াইবেন। ভয় পাইয়েন না, খালি বাংলাদেশের নামটা রাইখেন।"
গ্রান্ড হোটেলে কাজ পেয়ে গেলাম। নতুন জামা কাপড়ের মাপ নিয়ে গেলো সেরাতেই। সপ্তাহে ৫ দিন কাজ দৈনিক ৮ ঘন্টা। ২ মাস পর ওরা কন্টাক্টে যাবে। কাজ কিছুইনা, সলোমন ডীশের মেন্যু আর ওয়াইন সার্ভ। মাঝে মাঝে স্পেশাল গেস্টদের বলরুমে ঘুরতে যাওয়া। কিছু বলতে হবে না, শুধু তাদেরকে পথ চিনিয়ে দেয়া। মনসুর ভাই বললো ঘন্টায় নাকি ন্যুনতম ২৫০ ক্রোনার ট্যাক্স বাদে। আমি হিসাব করে দেখলাম মাসে যে টাকার পরিমান সেটা মনে হয় দেশে দু'বছরে কামানো সম্ভব না।
সমস্যা একটাই, গোস্ত এরা কাঁচা খায়। মনসুর ভাই দৈনিক কাজ করে না তাই মাঝে মাঝে বুঝতেও পারি না কোনটা শুয়োর কোনটা গরু। তাই দৈনিক দুধে রাধা সলোমন ফিশের ডীশ আর অখাদ্য স্বাদের ক্যাভিয়ার।
আজকে নতুন বাসায় উঠলাম। দু রুমের বিশাল একটা রুম, বাঙ্গালী একজন নতুন বাসা পেয়েছে,সেটাই আমাকে ভাড়া দিলো। এখন কিছু নতুন জামা কেনার পালা। ২টা জিন্স দু বছর ধরে পড়ছি। এখন সপ্তাহে দুটো জিন্স কেনাই যায়, জীবনে একটু রং আনা যায়, তাহলে কেমন হয়?





ভাল থাকুন সব সময়।আপনার লেখাগুলি খুব হৃদয় গ্রাহী।
ধন্য হলাম এমন প্রশংসা পেয়ে
শুভকামনা অভিননদন
খাওয়া শুরু করেন বিসমিললাহ করে, দেখবেন কাচা মাংস খেতে খারাপ না
আদিম যুগে আপনার আমার পরদাদা কাচাই খাইছে
কথা খারাপ বলেননি। কিন্তু যখন স্টেক কেটে রক্ত দেখি তখন পেট উগড়ে সব বের হয়ে যায়। অনেক কষ্টে বমি সামলাই।
কিভাবে খায় এগুলো মানুষ?
লেখা পছন্দ হইসে।
শিরোনামটাও সুন্দর।
শুভকামনা রইলো!
আপনার জন্যও শুভকামনা
অভিনন্দন।
চমত্কার বর্ণনা।
অনেক অনেক ভালো সময় বয়ে নিয়ে আসুক সামনের দিনগুলো। ভালো থাকুন।
আপনিও ভালো থাকুন। আগামীর দিন বয়ে আনুক অসীম আনন্দ আর উচ্ছলতা
খুব সুন্দর লিখনী
মন্তব্য করুন