ইউজার লগইন

ঠাসবুনটের ভীড়ে- ঠাসাঠাসি মানুষের এই শহরে!

মানুষ আমার খারাপ লাগে না। বরং অপরিচিত এক দংগল মানুষ দেখলে আনন্দিত হই যে ঢাকা শহরে আছি আর ভয় নাই। তবে এখন মানুষ দেখলেও ভয় লাগে। এত মানুষ এই দেশে সব পিলপিল করে ঢাকায় এসে পড়তেছে তা ভাবলেই দমবন্ধ লাগে। ঢাকা অবশ্য আমার বাপ দাদার সম্পত্তি না যে ঢাকায় মানুষ আসবে না। উল্টা বলা যায় আমি হইলাম মফিজ শ্রেনীর লোক যারা ঈদে বাড়ীতে চলে যায়। মফিজরা যখন বাড়ীতে, ঢাকায় থাকা মানুষের সুখের দিন। ফাকা ফাকা শহরে আয়েশ করে ঘুরে ফেরায়। টিভি চ্যানেল গুলাতে বারবার করে বলে এমন ঢাকাইতো আমরা চাই। কিন্তু সেই চাওয়াতো সোনার হরিন। আমাদের মতো মফিজরা ফিরে আসে ঢাকা আবার ফিরে পায় আগের হট্টগোল আর জনারণ্য। যারা সারা বছর ঢাকার বাইরে থাকেন তারা নিজেদেরকে দুনিয়ার অন্যতম লাকী লোক ভাবতে পারেন। কারন এই শহরে সবাই আসে বা থাকেই স্বার্থসিদ্ধির আশায়। যাদের সেই স্বার্থ নাই তারাই ভবিষ্যতে জলিলের মত নিঃস্বার্থ ভালোবাসাময় জীবন পাবেন। আমরা যারা এই শহরে থাকি তারা আছি বাটে পড়েই। এই বাটে থাকতেই থাকতেই বাটখারা হয়ে গেলাম, যেখান থেকে মুক্তি নাই!

তবে ঢাকায় থাকার ফায়দা হলো একটা কেন্দ্রস্থলের থাকার সুযোগ লাভ আর নানা কারনে নানা মানুষের খেদমত করতে পারার সুবিধা। ঢাকায় যাদের আত্মীয় আছে থাকা যায় দুয়েক দিন তারা খুব গরম থাকে নিজের জেলায়। কথায় কথায় বলে আমার মামা খালা চাচা ফুফু আছে ঢাকায়। তাদের মুখে শুনতে হয় ঢাকার গল্প। আমি যখন চিটাগাংয়ে থাকতাম একটু বড় বেলায় তখন শুনতাম ঢাকার গল্প। আমাদের অনেক বন্ধু ফার্মগেইট ও কলাবাগানে কোচিং করতো তাদের মুখে শুনতাম ঢাকায় লাইফ কত সুন্দর আর ফাস্ট। তখন আমার এক বন্ধু ঘোষনা দিয়েছিল ঢাকা চিটাগাংয়ের চেয়ে ৩০বছর এগিয়ে আছে। এই বয়ানে আমরা তো টাশকি। ভার্সিটির পরীক্ষা দিতে বেশির ভাগ সময় দলবেধে আসতাম তখন মেয়ের সংখ্যা বেশী দেখা ছাড়া আর কোনো পার্থক্য আমার চোখে পড়তো না। একা যখন আসলাম তখন বুঝলাম কি জিনিস ঢাকা শহর, কি তীব্র অবহেলা নিয়ে তাকায় আমার মতো অনাহুতের দিকে। কোনো জায়গা সমন্ধে জানতে চাইলেই প্রশ্ন ছুড়ে দেয় কোথা থেকে আসছেন? জেরায় তালগোল পাকিয়ে জবাব দিতে হয় চিটাগাং থেকে। তারপর ফ্যামিলী শিফট করলো, ঢাকায় আসলাম আর আমিও অভ্যস্ততা পেয়ে গেলাম এই ঢাকার অসভ্য জীবনে। এত কথা কেন লিখছি কারন ভার্সিটি শেষে দাঁড়িয়ে ছিলাম দেখি এক ছেলে রিকশাওয়ালার কাছ থেকে শুক্রাবাদ যাবার ওয়ে জানছে? রিকশাওলাও মুরুব্বী নির্ভাবনায় জানিয়ে দিল যাওয়ার উপায়। অথচ আজ থেকে সাত বছর আগে আমি যখন আসি একা একা এই শহরে খালি এক্সাম দিতে তখন আমাকে বাসা থেকে শিখিয়ে দেয়া হলো যারে তারে জিগেষ করবি না, বড় দোকানী বা ট্রাফিক পুলিশকেই জিগেষ করতে হবে পথের উপায়। অথচ এই চাঁদপুরের মতলব থেকে আসা ছেলেটা কত অবলীলায় রিক্সাওলার কথা শুনে নিল। খুশি হয়ে রিকশাওলাকে একটা শেক সিগারেট খাওয়ালো নিজে বেনসন ধরিয়ে। আমি চেয়ে চেয়ে দেখলাম এই জেনারেশন কত স্মার্ট।

হরতালের দিন বাসে প্রচন্ড ভীড় উঠার অবস্থা নাই। তাও আমাকে উঠতে হলো এই দুইদিন কারন ক্লাসে যেতে হবে। ৯০+৯০ টাকার রিকশা বিলাসীতা করার টাকা নাই। আর হরতালে এত শত রিকশা তাও কেউ ন্যায্য ভাড়ায় যেতে চায় না। আমি বাসের জন্য দাঁড়িয়ে থাকি। ভার্সিটি যাওয়ার সময় আরামেই যাই কিন্তু ফিরতে খুব কষ্ট। বাস কম হরতালে, একেকটা আসতেছে আর লোকজন ঝাপিয়ে পড়তেছে। যে বাসে যত বেশী ভীড় সে বাসে ততবেশী মানুষ ঢুকে। উঠার জায়গা নেই, তিল ধারনের ঠাই নেই তাও মানুষ উঠে যাচ্ছে। আমার গ্রাজুয়েশনের সময় বিজনেস কমিউনেকেশনে যে মেম ছিল তিনি একটা কথা বলতো কঠিন নাস্তিকও বাংলাদেশে আসলে আস্তিক হয়ে যাবে! আমি জিগেষ করলাম কেন ম্যাডাম, বললো এই যে বাস ট্রেনে লঞ্চে এইভাবে চলে বেঁচে ফিরছে, এত ভেজাল খেয়েও বেঁচে আছে এইটা আল্লাহ ছাড়া আর কারো পক্ষে সম্ভব না। আমার আবার ভীড় বাসে উঠতে গা গুলায়। তাই অনেক সাধনা পরে সিনেমায় রিয়াজ যেমন পায় শাবনুরের মন আমিও পেলাম তুলনামুলক ফাকা বাস। কিসের ফাকা? আমি উঠতে না উঠতেই দেখি বাস পুরোদমে ঠাসাঠাসি ভীড়। বাসের নাম রাজা কামে পুরাই প্রজার চেয়েও অধম। দাঁড়িয়ে ছিলাম কন্ডাক্টর খালি বলে আমি একলা মানুষ মামা ভাড়াটা হাতে হাতে রাখেন। ভাগ্য খুব ভাল তাই সিট পেয়ে গেলাম। আমার পাশে এক মাঝারী সাইজের মটকা লোক বসা। তিনি কিছুক্ষণ পরপর গা ঝারা দেন আর আমি প্রায় পড়িমরি দশা। যাই হোক যাত্রী তুলছে লোকালের চেয়েও থেমে থেমে। রাস্তায় জ্যাম আমার পাশের লোক সরকারের বিরুদ্ধে বলতে শুরু করলেন গালি গালাজ করে। সবাই শুনলো কেউ কোনও প্রত্যুত্তর নেই। তিনি হুট করে বলে ফেললেন আবেগে যে পচাত্তরে সবকয়টারে মারছিলো একটারে বাচায় রাখছিল কোন কামে যে? আমার হলো মেজাজ খারাপ ফুস করে বলে ফেললাম তাদের আগে আপনার মতো বেইমান মাইনষেরে মারা উচিত ছিল। ভেবেছিলাম রিপিট আসবে কিন্তু উনি শুধু ফোস ফোস করলো।

রিকশা দিয়ে নান্নুর দোকানে এসে দেখি লোকে লোকারণ্য। এত লোক কই থেকে আসলো? পরে বুঝলাম চার মেয়ে ও ছয়ছেলে বিশিষ্ট আমার বয়সী বাবা জেনারেশন নান্নুর দোকানের মজা পেয়ে গেছে। তারাই আসে এখন নিয়মিত ৫০০ টাকা বিল করে দিয়ে চলে যায়। ভালোই। লোকজন ট্যারা চোখে তাকায় আমার খারাপ লাগে না। মোহাম্মদপুরের মতো ঢাকা শহরের ল্যাঞ্জায় সোসাইটির খালের পাশে মেয়েরা গোল্ডলিফ খাচ্ছে দেখলেই শান্তি। তবে মেয়েদের কথা বাদ দিলাম ঢাকা শহরে এখন হিউজ পরিমান ছেলে স্মোকারের বাস। বাচ্চা বাচ্চা ছেলে কানের নিচে একটা থাবড় খাওয়ার জায়গা নাই পড়ে ক্লাস সিক্সে সেভেনে ধুমছে জ্বালিয়ে দিছে বেনসন আল্লাহর নামে। নিম্নবিত্ত থেকে উচ্চবিত্ত কিশোর সবার হাতে হাতে এখন সিগারেট। আগে নাকি যখন বেনসনের দাম ৩ টাকা ছিল তখন ধানমন্ডির এক দোকান তা বেচতো দেড় কার্টুন, এখন তিন গুন নামে নয় দশটাকা বেঁচে ১২ কার্টুন করে। এত আইন গাইন ফা ক্বফ করলো তাতে স্মোকারের সংখ্যা বরং দ্বিগুন হলো। সমবয়সী খুব কম লোকরেই পাই যারা ধুমপান করে না। চায়ের দোকানে বসে থাকার কারনে আমিও পরোক্ষ ধুমপানের শিকার, লোকজনকেও কম খাওয়াই না। আর কি অদ্ভুত মেন্টালিটি সামান্য একটা বেনসন খাওয়ালেই পাবলিক খুব অনার ফিল করে!

শেষ করি। এত লোকের ভীড়ে যে হারিয়ে যাই না তাই কপাল। এখন আর তাই মানুষ ও বিল্ডিংয়ের জংগ ল ভালো লাগে না। আর ভালো লাগে না এই শহরকে। অঞ্জনদত্তের গানের ভাষাতেই বলি সারাটা দিন মানুষ দেখি এবার একটু আকাশ দেখতে চাই!

পোস্টটি ১৩ জন ব্লগার পছন্দ করেছেন

তানবীরা's picture


কথা বলতো কঠিন নাস্তিকও বাংলাদেশে আসলে আস্তিক হয়ে যাবে! আমি জিগেষ করলাম কেন ম্যাডাম, বললো এই যে বাস ট্রেনে লঞ্চে এইভাবে চলে বেঁচে ফিরছে, এত ভেজাল খেয়েও বেঁচে আছে এইটা আল্লাহ ছাড়া আর কারো পক্ষে সম্ভব না।

এটাতো আমার কথা !!!!!!

আরাফাত শান্ত's picture


আপনে তো আমার সেই ম্যাডামের চেয়েও জ্ঞানী লুক Cool

সামছা আকিদা জাহান's picture


এত লোকের ভীড়ে যে হারিয়ে যাই না তাই
কপাল। এখন আর তাই মানুষ ও বিল্ডিংয়ের জংগ ল
ভালো লাগে না। আর ভালো লাগে না এই শহরকে।
অঞ্জনদত্তের গানের ভাষাতেই বলি সারাটা দিন মানুষ
দেখি এবার একটু আকাশ দেখতে চাই!

তানবীরা বলেছে

কথা বলতো কঠিন নাস্তিকও বাংলাদেশে আসলে আস্তিক
হয়ে যাবে! আমি জিগেষ করলাম কেন ম্যাডাম, বললো এই
যে বাস ট্রেনে লঞ্চে এইভাবে চলে বেঁচে ফিরছে, এত ভেজাল
খেয়েও বেঁচে আছে এইটা আল্লাহ ছাড়া আর
কারো পক্ষে সম্ভব না।
এটাতো আমার কথা !!!!!!

আরাফাত শান্ত's picture


Smile

নিভৃত স্বপ্নচারী's picture


সেই ছেলেবেলায় সবকিছু গ্রামে ফেলে যখন আসি এই শহরে, গ্রামের জন্য কেবলই কান্না পেত। তখন যদিও শহরটা এত ঠাঁসাঠেসি ছিল না। এখন এই সময়ে মানুষে ঠাঁসাঠেসির এই শহরটাকে বড্ড বেশী ভালবেসে ফেলেছি। তাই একে ফেলে আর কোথাও যাওয়া হয়না, এমনকি ঈদের সময়ও না।

আরাফাত শান্ত's picture


ভালোই তো। Laughing out loud

মন্তব্য করুন

(আপনার প্রদান কৃত তথ্য কখনোই প্রকাশ করা হবেনা অথবা অন্য কোন মাধ্যমে শেয়ার করা হবেনা।)
ইমোটিকন
:):D:bigsmile:;):p:O:|:(:~:((8):steve:J):glasses::party::love:
  • Web page addresses and e-mail addresses turn into links automatically.
  • Allowed HTML tags: <a> <em> <strong> <cite> <code> <ul> <ol> <li> <dl> <dt> <dd> <img> <b> <u> <i> <br /> <p> <blockquote>
  • Lines and paragraphs break automatically.
  • Textual smileys will be replaced with graphical ones.

পোস্ট সাজাতে বাড়তি সুবিধাদি - ফর্মেটিং অপশন।

CAPTCHA
This question is for testing whether you are a human visitor and to prevent automated spam submissions.

বন্ধুর কথা

আরাফাত শান্ত's picture

নিজের সম্পর্কে

দুই কলমের বিদ্যা লইয়া শরীরে আমার গরম নাই!