যেভাবে হেঁটে চলছি এই শহরে!
আবার লিখতে বসলাম। কি লিখবো কিছুই ভাবি নাই এখনো। তাও লিখতে বসা অযথাই। শুয়ে শুয়ে বই পড়ছিলাম। আজ তেমন গরম নেই, নেই শরীরে কোনো ক্লান্তি তাই বই পড়ছিলাম। কিন্তু আমার মতো গরীব মানুষের সুখ কারোই সহ্য হয় না। তাই কারেন্ট চলে গেল। শুয়ে শুয়ে মশার কামড় খাবার চেয়ে বসে বসে মশার কামড় খাওয়া ভালো। তাই আবার যথারীতি অন্ধকারে বসে লেখা শুরু করলাম। ব্লগে লেখতে হলে ইচ্ছাই যথেষ্ট। তাই ইচ্ছে হলেই লেখতে বসি। তবে লেখার আগে ভেবে লেখতে বসা উচিত, কিন্তু আমার চিন্তা ভাবনার কোনো বালাই নাই। মনে কিছু কথা আসে তাই না সাজিয়ে গুছিয়ে লিখে দেই। আমার মামা বলে 'তোমার লেখা ওতো পড়ি না আর, খালি কমেন্ট দেখি লোকজনের।' আমি জিগেষ করলাম কেন? মামা বলে একই ধরনের কথাই ইনিয়ে বিনিয়ে বারবার বলো, তা আর পড়ার কি?' আমি মনে মনে ভাবি আহারে কত বড় অপমান। নান্নু মামা থাকলে বলতো 'সবার সামনে অপমান/ মৃত্যুর সমান'।
আমি অবশ্য তাও লিখে যাই এই ব্লগে যে ব্লগে তেমন কেউ লিখে না আর। ঠিক যে কারনে আমি অযথাই হাঁটি। আমার হাঁটতে ভালো লাগে। মন খারাপে হাঁটতে ভালো লাগে, মন ভালোতে হাঁটতে ভালো লাগে, প্রয়োজনে অপ্রয়োজনে যে কোনো আয়োজনে হাঁটতে ভালো লাগে। কিন্তু সব সময় হাঁটা হয় না চাইলেও। মাঝে মধ্যে সময় থাকেনা, মাঝে মধ্যে ঝপঝপ করে শরীর জামা ঘামে ভিজাতে ইচ্ছে করে না উৎকট গন্ধে। যদি ঘাম না হতো তবে হয়তো আমি সারা শহরই হেঁটে বেড়াতাম। তবে রিকশায় চড়া আর হেঁটে বেড়ানো এই দুইটা কাজে আমি অতি পারদর্শী। আগে আরো এক্সপার্ট ছিলাম, এখন শরীরে কিছুটা মেদ ভুড়ি হয়ে কিছুটা স্থবির হয়ে গিয়েছি। তাও একবার হাঁটা শুরু করলে আর থামাথামি নেই হেঁটেই যাই।
তবে আমার বেশী হাঁটা হয় সাধারণত মেজাজ খারাপ থাকলে। এইটার কি কারন আমি আজও জানি না। মেজাজ খারাপ থাকলেই আমি হন হন করে খালি হাঁটি। এই অভ্যাস চিটাগাং থেকে প্রাপ্ত। পকেটে টাকা থাকতো না, মিনিবাসে প্রচন্ড ভীড় তাই আমি হাঁটতাম খালি। মাথার মনের সব আক্রোশ চালিয়ে দিতাম পায়ে। তখন থেকেই আমার হাঁটার সুখ্যাতি শুরু। স্যান্ডেল টিকে না, জুতা ছিড়ে যায় হাঁটতে হাটঁতে। আমার হাঁটা জীবনের অন্তহীন বন্ধু ছিল তখন কামরুল। কত গল্প যে করতাম রাস্তায় হাটঁতে হাটঁতে পাশ দিয়ে চলে যেত চিটাগাংয়ের বিশাল বিশাল সব লরী কনটেইনার। বেঁচে যে এখনও আছি তাও একটা কপাল! আমার বাসা থেকে কামরুলের বাসা ছিলো পাক্কা আড়াই কিলোমিটার দূরে। সেই পথ মুড়ি মুড়কীর মতো হেঁটে হেঁটে গেছি। সামান্য ৮ টাকা ভাড়া ছিল তাই বিশাল লাগতো। আট টাকা মানে আমার কাছে তখন দুই কাপ চা দুইটা সলটেস বিস্কিট খাওয়ার সুখ। কামরুলের ছিল এক সাইকেল, ডাকতাম তাকে ছাগল বলে। আমার হাঁটার উত্তেজনায় সেই সাইকেল বাসাতেই পড়ে থাকতো বেশী। একবার কি হলো দুই বন্ধু নিউমার্কেট যাবো, দিলাম হাটা। আমাদের বাসা থেকে নিউ মার্কেট তখন পায় আট কিলোমিটার দূরে। পুরো শরীর ক্লান্ত কাজ আর করা হলো না। জিরিয়ে আবার হাটা। সেই হাটায় এক সপ্তাহ আমার গায়ে জ্বর আর কামরুলের ডিহাইড্রেশন! আমাদের এই ওয়াকিং নিয়ে পোলাপান যে টিজ করতো। একটা জনপ্রিয় টিজ ছিলো 'শান্তরে যদি খালি টাস্ক দেয়া হয় তবে দুই দিনে হেটে হেটে মায়ানমার চলে যাবে।' কতো গাজাখুরী আলাপ! আমার আরেক বন্ধু ছিল সে তখন একটেলের যে একটা নাম্বারে ফ্রি ছিল সারাদিন তা দিয়ে প্রেমিকার সাথে কথা বলতো! নতুন প্রেম। কানে ফোনে নিয়ে হাটা একবার শুরু করলে সে দুই তিন কিলোমিটারের চক্কর মেরে আসে। পোলাপান তারে টিজ করতো এই বলে যে মোবাইলে টাকা থাকলে সেই বন্ধু দিনে একবার করে ঢাকা চিটাগাং ট্যুর দিতে পারবে হেঁটে! সেই সাত আট বছর আগে আমি একবার হাটঁতে হাঁটতে পাচশো টাকা পেয়েছিলাম, খুব নীতিবোধ কাজ করে নি। পেয়েই পাঁচ দিনে শেষ করলাম। তারপর কতো হাটলাম আর টাকার মুখ দেখি না। একবার শুধু একজনের মানিব্যাগ পেয়েছিলাম তাতে হাজার বারোশ টাকা ছিল। ফোন করে দিয়ে দিলাম সেই লোক খুব খুশী। তবে আমার মামা সাচ্চা লোক। একবার লাখ খানেক টাকা পাইছিলো রাস্তায় পড়া। ফেরত দিয়ে দিলো মালিককে সাথে সাথেই। আমি হলে দিতাম কিনা জানি না। তবে টিএসসিতে আড্ডা মারছি পাশেই একজনের একটা ক্যামেরা পড়ার আওয়াজ পাইছি। দুই মিনিটের ব্যাবধানে ক্যামেরার কাভার আছে ক্যামেরা নাই। মানুষ কি চিজ! পড়ার সাথে সাথেই চুরি হয়ে গেল জিনিসটা।
ঢাকা শহরে হাটাঁর পরিবেশ নাই তাও আমি হাঁটি। হেঁটে বেড়াতাম আগে খুব। সমানে শাহবাগ গেছি মোহাম্মদপুর বাসা থেকে হেটেঁ। এমনকি রোজার সময়তেও হাটাঁ মাফ নাই। ইফতারীর সময় চলে যায় আমি হাটছি। হাটতে হাটতে আমি ইবনে বতুতার মত পরিবেশ ও মানুষ কম দেখি। একান্ত নিজের ভাবনা নিয়েই হাঁটি এক মনে। তাই ডাকলেও শুনি না। আর এখন তো কানে হেডফোন তাই শুনার প্রশ্নই নাই। নিজের মত করে গা বাঁচিয়ে হেঁটে চলো। যে নান্নুর দোকানে চা খাই তা বাসা থেকে ২০ মিনিটের পথ। আমি সমানে হেঁটে যাই। হাটঁতে হাটঁতে এমন হইছে যে কোনো ব্যাপারই মনে হয় না, অথচ ১৫-২০ টাকা রিকশা ভাড়া। আগে খুব বন্ধু পরাগের বাসা যেতাম। ওর বাসা গ্রীনরোডের ক্রিসেন্ট রোডে। সমানে হাটছি হাউজিং সোসাইটি থেকে। ঘামে গা গোসল প্রায় অবস্থা নিয়ে যেতাম যখন পরাগের আম্মা ভাবতো শান্ত কি গরীব? তাই ভালো মন্দ সমানে খাওয়াতো। আমি মিটিমিটি হাসতাম আর পরাগ খুব মজা নিতো। আর ধানমন্ডি অবধি হাটাতো পানি ভাত। হাটঁতে হাটঁতে অস্থির করে ফেলছি সেই এলাকা। বেশী হাটাঁর ফলে লোকজন খুব চিনতে পারে ও জায়গার ম্যাপিং করতে পারে। আমি হাঁটি রাস্তা চেনা অচেনা ঘটনা না, নিবিষ্ট চিত্তে হেঁটে যাই। তাতে কি হয় আমি চিনি ঠিকই জায়গা কিন্তু অন্যদের মত স্পেসিফিক লোকেশন দিতে পারি না। তাই একজিনিস আমাকে চিনতে হয় বারবার গিয়ে। তবে স্কাউটিং করার কারনে আমার বন্ধু জেমস যে তুমুল হাঁটে তাতে অবাক হই। আমি পারবো না সেরকম হাটতে কোনোদিনও। আমি পারি শুধু জোরে পা চালিয়ে হেটে ক্লান্ত হয়ে ঘামে শরীরের জুবথুবু করতে!
এই গল্পটা হুমায়ুন আহমেদের লেখায় পড়া সত্যমিথ্যে জানি না।একবার হুমায়ুন আহমেদ, আনিস সাবেত আর আহমদ ছফা গেছে কুমিল্লায়, দাওয়াত খেতে। রাতের দিকে আনিস ছফার 'সুর্য তুমি সাথী 'নিয়ে টিপ্পনী কাটছিলো। যা হয় আর কি ছফার মেজাজ গেল খারাপ হয়ে। তিনি আনিস সাবেতকে কথা উইথড্রো করতে বললেন নয়তো তিনি একাই ঢাকায় রওনা দিবেন বলে হুমকী দিলেন। এদিকে আনিসও নাছোড় লোক তিনি জানেন কুমিল্লা থেকে সেই রাতে যাবার কোনো ওয়ে নাই আর হাঁটা ছাড়া, তাই তিনি কথা উইড্রো করলেন না। ছফা হাটাঁ দিলেন। দেড় দিনে ঢাকা আসলেন। গায়ে জ্বর,পা ফুলে টিউমার সাইজের অবস্থা। হুমায়ুন আহমেদ ও আনিস দুইজনই মাফ চাইলেন। ছফা বিগলিত কন্ঠে বলে উঠলেন 'আরে ধুর! আপনাদের উপরে আমার কোনো রাগ নাই, হাঁটতে হাঁটতে একটা উপন্যাস সাজিয়ে ফেলেছি, সামনেই লিখবো।' সেই উপন্যাসই আহমদ ছফার বিখ্যাত উপন্যাস ওঙ্কার! ছফার এরকম জেদ অনেক। যেমন একবার শীতে তিনি রাজশাহী যাবেন। শীতের জামা বলতে চাদর তার নিচে সোয়েটার। ফেরীতে চা চাইতেছেন বেটা চা দেয় না। তিনি মেজাজ খারাপ করে বললেন চা আর খাবো না আর এই চাঁদরও ফেলে দিলাম পানিতে যা। শীতে রাজশাহীতে গিয়ে পরে আয়োজকেরা উনাকে জোর করে একটা চাঁদর কিনে দেয়। আমিও তো জেদ নিয়েই হাঁটি কিন্তু উপন্যাস তো দূরে থাক, একটা ব্লগ লেখার প্ল্যানও মাথায় আসে না। মাথায় খালি ঘুরে গান আর ভাবি সময় এখন কত? হাঁটা নিয়ে আমার সব চেয়ে প্রিয় বাংলা নাটক হলো এইটা http://www.youtube.com/watch?v=dbRPae2RyS4
নাটকটার শেষ পাঁচ মিনিট যতবার দেখি ততবার চোখে পানি আসে।





হাটার মধ্যে সিরিয়াস একটা নেশা আছে, একবার অভ্যাস হয়ে গেলে সহজে যায় না। তবে এত বেভুলা হইয়া হাটাটা বিপজ্জনক। আল্লাহ আপনেরে দেইখা শুইনা ভালো রাখুক এই দোয়াই করি।
নাটকটার চাইতে গল্পটা বেশি পছন্দ আমার। ভালো থাকেন শান্ত ভাই।
হাঁটার মজাই আলাদা. হেটে হেটেই প্রিয় ঢাকা শহরে চষে ফেলতাম . আহা , কি দিন ছিল !
কে কি বলল সেটা চিন্তা না করে লিখে যান , পরার জন্য আমরা আম জনতা তো আছিই .
আপনাদের জন্যই তো লেখা!
আমি আবার লিখা শুরু করবো, ব্যসততা কমুক একটু।
আমি হাটি ৯।৮ কিমি। বাসা থেকে station - station থেকে বাসা। সামারে এটা আমার খুব ফেভ। ১ ঘনটা ৪৫ মিনিট সময় লাগে।
মামা ঠিকই বলে, তুমি বই আলোচনা শুরু করো
৮-৯ কিমি তাই তো বলি আপনি এত ফিট কেন?
অল্প খান আর এত হাঁটেন?
হাটতাম এক জীবনে, হাটার মাঝে যে কি মজা ছিল। ইডেন থেকে মীরপুর প্রায়ই হেটে আসতাম। কি এনার্জি ছিল তখন।
এখন হাটি সন্ধ্যার পর এই মফস্বল শহরে। হেটে মজা পাই না। দিনে তো হাটাই যায় না। রাতে একটু পর পরই কারো না কারো সাথে দেখা হবেই আর সবাই অতি ব্যাস্ত আমাকে রিক্সা করে দিতে যদি বাচি কারও কারও হাত থেকে তবে তারা সংগি হয় পৌছিয়ে দেবার জন্য। বড় শৃঙ্খলিত এই জীবন।ঢাকা গেলে এখন ও হাটি যানজট এড়াতে।
ঢাকার মানুষ অন্য শহরে ভালোই আছেন!
একসময় হাঁটার অভ্যেস ছিল খুব। চাকরিতে ঢোকার পর হাঁটার পরিমাণ কমে গেছে অনেক। ফুটপাতে হাঁটার পরিবেশ না থাকাও একটা কারণ।
ভাল লাগলো তোমার লেখাটা।
ধন্যবাদ ভাইয়া। আপনার নতুন লেখা কই?
মন্তব্য করুন