হুমায়ুন আহমেদের উঠোন পেরিয়ে দুই পা ও সুনীলের তিন সমুদ্র সাতাশ নদী!
এইটা ঠিক বই নিয়ে পোষ্ট না। দুই বাংলার দুই বিখ্যাত লেখকের ভ্রমন কাহিনী লেখা নিয়ে দুয়েক প্রস্থ আলাপ মাত্র। শুরু করি নিজের কথা দিয়েই। সবার মত বেড়াতে আমারও ভাল লাগে। কিন্তু বাউন্ডুলের মত বেড়াতে না, নিজের মতো বন্ধু বান্ধবদের সাথে ঘুরতে মজা পাই। কিন্তু যা হয় ছেলেবেলায় আর কি, বাবা মার ধারনা বাইরে ঘুরতে গিয়ে ছেলে নষ্ট হয়ে যাবে তাই আমার দূরে কোথাও ঘুরতে মানা। কাছে কুলে কোথাও গেলে যাও, না গেলে মুড়ি খাও। তাই ছোটবেলা থেকেই আমার বেড়ানো মানেই রাস্তায় রাস্তায় ঘোরা একা একা। কারন এরকম ধুলা বালু মেখে হাটার লোক বন্ধু মহলে তখন কেউ ছিল না। মাঝে মাঝে খুলনা বা চিটাগাং থেকে জামালপু্রের বাড়ীতে যাওয়া এই ছিল এক মাত্র লম্বা সফরের বিবরন। আর চার পাঁচ বছর পর আব্বুর বদলী হতো চাকরীর নিয়মে তখন তল্পিতল্পা নিয়ে স্থান বদল করতে হতো। তবে একই পরিবেশ, চেনা জানা মানুষদের সাথেই আবার পাশাপাশি থাকা। আমার প্রথম বেড়ানো জন্য বের হওয়া ভার্সিটির এডমিশন টেস্ট উপলক্ষ্যে। শুধু রাজশাহী, সিলেট ও জগন্নাথে যাই নি। এছাড়া খুলনা, ঢাকা, জাহাংগীরনগরে এক্সামের উসিলায় লম্বা লম্বা সফর দিয়েছি! বন্ধুদের সাথে এক্সামের নামে ভ্রমন বিলাস যে কত মজা তা জীবনের প্রথম টের পেলাম। জাহাঙ্গীরনগরে তো দশ দিন ছিলাম বঙ্গবন্ধু হলের এক রুমে। মনে হয় সবাই চান্স পেয়ে গেছি। যে বড় ভাইয়ের কাছে গিয়ে ছিলাম তিনি সেই আমলে ছাত্রদলের বিশাল নেতা। আমরাও সেই কারনে পেয়েছি ভিআইপি ট্রিট। চিটাগাংয়ে একটা লিটলম্যাগ ছিল। মান যাচ্ছেতাই। সেখানে জীবনের প্রথম আমার জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ভ্রমনের কাহিনী এডিট করে ছাপিয়ে ছিল। সেই ম্যাগাজিন ১৫০ কপি ছাপিয়েছিল উদোক্তারা, ১০ টাকা করে। আমি কিনছি ১০ টা, জীবনে এরপর আর তেমন দারুন ভ্রমনও হয়নি আর লিখিও নি কোনোদিন। তবে নিজের নাম ছাপানো অক্ষরে দেখার যে কী আনন্দ সেটা সেই বয়সেই আবিস্কার করেছিলাম!
হুমায়ূন আহমেদের ভ্রমন কাহিনী ও বিদেশে থাকার গল্প তো সবারই পড়া। মে ফ্লাওয়ার, হোটেল গ্রোভারইন এক কালে মানুষের মুখে মুখে শুনছি। ক্লাস সেভেন এক ম্যাডাম ছিল- নাম গেছি ভুলে। প্রথম সাময়িক এক্সামে পাশ ছিল ৪০য়ে পেলাম ৩৮। ম্যাডামের কাছে গেলাম ম্যাডাম তো দুই নাম্বার গ্রেস দূরে থাক, আমাকে শুনিয়ে দিল হুমায়ূন আহমেদের ০০ থেকে ৯৯ পাওয়ার গল্প। আরো নানা কিছুতে বড় দের মুখে শুনতাম এইসব কাহিনী। ক্লাস এইটেই এসব কাহিনীওয়ালা বই পড়ে খতম করে, নিজেও লেকচার দেয়া শুরু করলাম। এই গত সপ্তাহ যখন চিটাগাং সফরে তখন বন্ধু আবীরের বাসায় দেখলাম উনার লিখিত ভ্রমন কাহিনী সমগ্র নাম 'উঠোন পেরিয়ে দুই পা'। আবীর টিভি দেখে আমি এই ফাকে বইটা পড়ে ফেললাম। আগের কাহিনী গুলোর সাথে এখন নতুন করে চীন, সুইজারল্যান্ড, শ্রীলংকা ভ্রমনের গল্প। দুই ঘন্টার মধ্যেই নতুন চ্যাপ্টার গুলা পড়া শেষ। হুমায়ূনীয় স্টাইলেই লেখা। ভ্রমনের আলাপ কম বরং শাওন, শাওনের দুই ছেলের কীর্তিকলাপ ও সফরসংগীদের ধরা খাওয়ার গল্পই বেশী। আর আছে হুমায়ূন আহমেদ যে অনেক জানেওয়ালা মানুষ তার বয়ান। এক শ্রীলংকা ভ্রমন করতে গিয়ে তিনি খালি সময় অসময় ইতিহাসের কান ধরে টান দিয়েছেন। চীন ভ্রমনেও তাই। নিজেকে একটা কিছু প্রমান করতে তিনি কেন জানি মরিয়া। আকাশের সমান বড়- দেশের জনপ্রিয়তম লেখক তা তো আমরা মেনেই নিছি তা প্রমানের কি আছে তা আমি জানি না। তবে আমার নতুন চ্যাপ্টার গুলোর ভেতরে সব চেয়ে ভালো লাগছে সুইজারল্যান্ড ভ্রমনের গল্প। বিদেশে নাটকের শুটিং করতে গিয়ে কত ধরনের বিড়ম্বনা তা দারুন ভাবে লেখা আছে। ফ্লোরিং করে- ইউরো ছাড়া থাকা, বাংলাদেশের খেলা দেখার জন্য জুরিখে ঘুরে বেড়ানো এইসব পড়তে খুব মজা লাগছে। আরো মজা লাগছে অভিনেতা এজাজ আর ফারুক সাবান কেনার গল্প। মে ফ্লাওয়ার বা হোটেল গ্রোভারইন তো সবারই পড়া তা নিয়ে আর কি লিখবো। তবে সেখানে একটা দারুন লেখা আছে বিদেশে যে সমস্ত মা ছেলেদের সংসারে হাজির হন তাদের দিনলিপির গল্পটা। কিছুতেই তারা মানিয়ে নিতে পারেন না তা নিয়ে ছোট করে সুন্দরভাবে লেখা।
এরচেয়ে সুনীলের আমেরিকা, ইউরোপ ও রাশিয়া ভ্রমন আমার বেশী ভালো লাগছে। সম্ভবত তিনি ষাটের দিকে যে ইউরোপ আমেরিকায় গিয়েছিলেন তার পরের দিকের ভ্রমনের গল্প এগুলা। আশির দশকে হতে পারে। বইটার নাম 'সময়ের উপহার'। এখানে সুনীলের ২ টা ভ্রমন কাহিনী, ৩৪ টা ইন্টারভিউ, ৪টা চিত্রনাট্য আছে। ঢাউস সাইজের বইটা আমাকে পড়তে দিয়েছে আমার এক খুব প্রিয় বন্ধু। এখানে ইউরোপ আমেরিকা তে যে সফর দিয়েছিলেন তার শিরোনাম- তিন সমুদ্র সাতাশ নদী। ২০৬ পেইজের এই লেখা নিয়ে বলার খুব সুযোগ নাই। তবে যা লিখেছেন তিনি একদম অসাধারণ। প্রথমত তিনি কোনো ভাব নেন নি। গরীব দেশের এক গরীব লোক অল্প ডলারে নিয়ে ঘুরতেছেন, এই সেন্স থেকেই তার বেড়ানোর গল্প বলেছেন। এত প্রাঞ্জল ভাষায় লেখা মনে হবে যে আমি গিয়ে ঘুরছি। দ্বিতীয়ত হলো উনি খুব ব্যালেন্স মেইনটেন করেছেন লেখায়। নিজের বেড়ানোর দিনলিপি, নানান পরিচিত অপিরিচি্ত মানুষের গল্প ও যেখানে যেখানে ছিলেন যা দেখেছেন তার বিবরনী, সব কিছুই সমন্বিত ভাবে লেখা। সাধারন বাঙ্গালীর চোখ দিয়েই তিনি ইউরোপ আমেরিকা দেখছেন। জাদুঘর, আর্ট গ্যালারী ও থিয়েটারের প্রতি তার দুর্বলতা আছে, বিদেশের জীবন জীবিকা যান বাহন সব কিছুই তিনি দেখেছেন আমাদের মত করেই। সস্তায় ওভারকোট কেনার পুলকিত অনুভব আছে, তার সাথে আছে অযথা নানান জায়গায় আক্কেল সেলামীর হওয়ার বিবরন। মোট কথা হলো দারুন লাগে পড়তে। আমি নিজেই পড়ে খুব শিহরন অনুভব করেছি। সেই কোন কালে 'ছবির দেশে কবিতার দেশে' পড়ে মনে মনে ফ্রান্সের ছবি এঁকে রেখেছিলাম, মার্গারিটার জন্য এক ধরনের দুঃখ অনুভব করতাম ঠিক সেরকম না হলেও ভালোই লাগলো এই বইয়ের ভ্রমন কাহিনী পড়তে। রাশিয়া ভ্রমনটা ওতো ভালো লাগে নাই। প্রটোকলের ভেতরে থেকে সফর তাও তিনি নিজেকে ভিআইপি দাবী করে উপরে উপরে থেকে দেখছেন না রাশিয়াকে। কঠোর আইন কানুনের ভেতরেও তিনি চেষ্টা করেছেন সমাজতন্ত্র রাশিয়ার মানুষকে দেখার। খুব বেশী সফল তা বলা যাবে না!
হুমায়ুন আহমেদের ভ্রমন কাহিনী আগের গুলাই খুব দারুন ছিল। নতুন কাহিনী গুলো কেমন কেমন, খালি হাম হাম হ্যায়, বাকি সাব কম হ্যায় মার্কা লেখা। আর আমারও শাওনের গল্প খুব একটা শুনতে ইচ্ছা করে না। সেই তুলনায় সুনীলের ভ্রমনকাহিনী অনেক বেশী পরিপাটি বিনয় নিয়ে লেখা। নিজেকে তুচ্ছ মানুষ ভেবেই তিনি সব কথা বলেছেন, সবার সাথে মিশেছেন, সব জায়গায় গিয়েছেন!





শেষ প্যারার সাথে সম্পুর্ন একমত।
সুনীলের দুই খন্ড
'পায়ের তলায় শর্ষে'
আর
শীর্ষেন্দুর লেখা
'বাঙ্গালের আমেরিকা দর্শন'
পড়ে দেইখেন, আপনের ভাল্লাগবো।
পায়ের তলায় সর্ষে পড়বো সামনে। শীর্ষেন্দুরটাও মনে রাখলাম।
ভালো থাকো বর্ণ
সেই চেষ্টাতেই তো আছি..
দোয়া রইলো রাশি রাশি!
আমিতো কিছুই পড়ি নাই।
তোমার লেখাটা পড়ে অনেক কিছু জানলাম। ঘুরাঘুরি এই জীবনে হবে কিনা জানিনা, তবে বইগুলো পড়ে ফেলবো। তুমিতো বেশ ভালোই পড়ুয়া, একজনের টিভি দেখার ফাকেই বই পড়ে শেষ করে ফেলছ !
ভালও করছো। চাকরী বাকরী করো বাসায় খেয়ে দেয়ে ঘুম দেও ইহাই শান্তির জীবন! আমি তো ফূটবল খেলা দেখি না তাই সময় ভালোই পাইছি। হুমায়ুন আহমেদের বই পড়তে তো আর বেশী টাইম লাগে না!
লোটা কম্বল এর লেখকের নাম এই মূহুর্তে মনে করতে পারছি না। ভ্রমন কাহিনী খন্দকার মোহম্মদ ইলিয়াছের "কত ছবি কত গান "অসাধারন। পারলে পড়। জিম করবেটের শিকার কাহিনী আমার কাছে ভ্রমন কাহিনী র মত লাগে। এ ছাড়া "মা'বাত "বইটি পেলে লেখকের নাম সহ বলতো ভাই। বাবার লাইব্রেরীতে ছিল সেখানে পড়েছিলাম ছোটবেলায়। বইটা ছেড়া ছিল এখন আর বইটা পাই না।
লোটা কম্বলের লেখক সঞ্জীব চট্টোপ্যাধায় না?
জিম করবেট পড়ছি ভালোই লাগে!
খন্দকার মোহাম্মদ ইলিয়াসের বইটা পড়ি নাই। খুজে পড়বো!
আচ্ছা আপু ভালো থাকেন!
সুনীলের নীললোহিত নাম দিয়ে যে ছোট উপন্যাস বা ভ্রমণ গল্প লিখেছে তাঁর ধারে কাছে কেউ নাই আমার মতে ।
সব পড়ি নাই, তবে সামনেই পড়ে ফেলবো!
আসেন না কেন এ পাড়ায়?
আর একটা বই আছে সুনীলের এ্যামেরিকা বেড়ানো নিয়ে, বাংলাদেশী আর বাংগালীদের জীবন যাপনের মানে দুই বাংলার লোকের মানসিক ডিফরেনস নিয়ে, একদম মোললা বাহাউদদিন এর স্বপননগরী নিউইরয়ক এর মতো সত্য ভাষন। নামটা বাসায় গিয়ে দেখে বলতে হবে
সমস্যা নাই আপু পড়ে ফেলবো সুনীলেরটা। পরিচিত এক বন্ধু আছে তার বাসায় অনেক সুনীলের বই দেখে আসছি। মোল্লা বাহাউদ্দিনেরটা পড়তে চাই! পারলে জানায়েন কোন প্রকাশনীর ওইটা?
মন্তব্য করুন