আশাবাদের চাষাবাদ!
সুশীল ভাষায় এই সময়টাকে বলে ক্রান্তিকাল। তবে শুধু ক্রান্তিকাল বললে এই সময়টার ঠিকঠাক নাম দেয়া হয় না। আমার মাথাতে খালি আসে দুটো শব্দই 'চরম দুঃসময় ' সেটা সব দিক থেকেই। রাজনীতি, অর্থনীতি এবং সমাজ, রাষ্ট্র সব খানেই ঘোরতর অনিশ্চয়তা, অস্থিরতা, অস্বস্তিতে দিন কাটছে সবার। যেখানেই যাই, যে কথাই বলি ঘুরে ফিরে আসে পলিটিক্যাল ক্রান্তিকালের এই কথাগুলাই। এখন তো নান্নুর চায়ের দোকান নাই তাই অনেক জায়গাতেই মাঝে সাজে বসা হয়। নানান লোকের কথা শুনি, সবাই খুব টেনশনে। আমাদের এক বন্ধু আছে নাম মুহিত। বাপের বিশাল বড় বাড়ী, জাবি থেকে মাস্টার্স করছে এখনো শেষ হয় নাই। ওর বাপ হুট করেই খুব হন্তদন্ত হয়ে ইউরোপের কোনো দেশে আরেকটা মাস্টার্সের জন্য পাঠাতে চায়, অথচ এত বছরের জীবনে তার বিদেশে যাবার কোন প্ল্যানই ছিল না। সেও দোড়ঝাপ শুরু করছে। এখন বলতে পারেন- এইসব ব্যাপার স্যাপার তো আগে থেকেই ছিল, কিন্তু আগের সাথে এখন ডিফারেন্সটা হলো আগে সামর্থ্যবান মানুষদের ভিতরে অনেকের ইচ্ছা থাকতো বিদেশে যেন একটা ঠিকানা থাকে। এখন সবাই তা বাধ্যতামুলক ভাবে করছে। এমন একটা ভাব যেন দেশে আশু সিভিলওয়্যার হচ্ছে। আরেক লোকের কথা বলি তার নাম ধাম পেশা কি জানি না, তবে মুখ চিনি। সেই ভদ্র লোক একটা সিগারেট খেতে শেকেরটেকের রাস্তায় নামে। যখন রাতেদেখি খালি এই পাশ ওপাশ করে দাঁড়িয়ে। আমি আগ্রহ নিয়ে জিগেষ করলাম ভাই এত টেনশনে কেন? উনি বললো 'ভাই দেশের যা অবস্থা বউ বাসা থেকে নামতেই মানা করে, তাও সিগারেটের নেশা তাই না নেমে উপায় নাই। তাই ভয়ে ভয়ে থাকি যদি কিছু হয়ে যায়!' আমি জিগেষ করি এই শেখেরটেকের মেইনরোডে কি হবে? গলা খেকড়ে বলে উঠে 'ভাই সাবধানের মাইর নাই! আমি খালি ভাবছিলাম এত আতংকিত জনগোষ্ঠী আমি বিডিআর বিদ্রোহের আমলেও দেখি নাই। তখন বরং খুব সাহসী মানুষ যারা গুলির শব্দেও ভয় না পেয়ে দেখছিল কি হয়?
আমি অবশ্য এত হতাশার লোক না। নিজের জীবন, প্রত্যাশার প্রাপ্তির অসম সমীকরন কিংবা মন খারাপের দিন রাত্রী নিয়ে একটু হতাশ আর বিষণ্ণ লাগে সবার মতোই। এই জন্য অনেকেই আমাকে নৈরাশ্যবাদী ভাবে, আমিও তাতে খুব একটা মন খারাপ করি না। কিন্তু দেশকে নিয়ে আমি অন্য সবার চেয়েও অনেক আশাবাদী। এই আশাবাদ অবশ্য জনগনকে নিয়েই। কারন যত যাই হোক এই দেশের জনগনই দেশকে বদলাচ্ছে দিনে রাতে। শ্রমে ঘামে, হাসি আনন্দ দুঃখে বেঁচে থাকছে। প্রত্যেকটা দিন নতুন নতুন চ্যালেঞ্জের সাথে টিকে থেকে ঘরে ফিরছে। এও তো একধরনের জয় আমাদের। মানুষ হিসেবে বেঁচে থাকতে এত ধরনের প্রতিকুলতা আমাদের সমাজে কিংবা রাষ্ট্রে্, তার মধ্যেই যে আমরা এত দারুন ভাবে টিকে আছি, ভাবতেই অবাক লাগে। শুধু দেশে না দেশের বাইরেও যেখানেই বাঙ্গালী আছে সেইখানেই কি দুর্দান্ত প্রানশক্তি নিয়ে বেঁচে আছে। ইউটিউবে আমি ভিডিও দেখার চেয়ে বেশী মানুষের কমেন্ট পড়ি। সেখানে অনেক মানুষ আছে যারা দেশের কথা বলেন, দেশের গান শুনে এত আপ্লুত সব কমেন্ট করেন, ভেবে কূল পাই না। এত ভালোবাসা দেশকে নিয়ে সম্ভব তা মাথায় আসে না। সেদিন এক কুয়ালালামপুর ফেরত লোকের সাথে কথা বলছিলাম তিনি বলছিলেন 'যে জানোয়ারের মত পরিশ্রম করতে হয়, তাতে ভারতীয় বলেন আর ফিলিপাইন বলেন কারোরই টিকে থাকার কথা না লেবার জবে। আমরাই করতে পারি এত খাটনির কাজ' পরিশ্রম নাকি সাফল্য আনে। এত পরিশ্রম এত জীবনযুদ্ধেও আমাদের জাতি হিসাবে সাফল্য কম হতে পারে, কিন্তু বিশ্বের বুকে এরকম জনগোষ্ঠী পাওয়া আসলেই টাফ। যারা আমেরিকাতে গিয়েও সন্দীপ আমেরিকান সোসাইটি বানিয়ে দেশীয় ফ্লেভারে নির্বাচন করে। সেই ইলেকশন ক্যাম্পেইনের বিজ্ঞাপন আবার দেশীয় টিভি চ্যানেল গুলাতে সকাল সকাল দেয়। যেখানেই বাঙ্গালী যায় সেখানেই একটা বাংলাদেশ বানিয়ে ফেলে। সেখানে বসেই বাংলাদেশকে নিয়ে বাকবিতন্ডা ঝগড়া করে, আবার দেশকে ওউন ও করছে, দেশের রাজনীতি নিয়ে দুশ্চিন্তা করছে এরকম সচেতন জনগোষ্ঠী খুব কম দেশই পায়। আমাদের মানুষ গৌতম দার একটা পোষ্ট পড়ছিলাম সচলায়তনে। ফ্যান্টাসী টাইপের লেখা হলেও ভাবছিলাম, আহা এমন যদি হতো। যদি সব মেধাবীকেই দেশে ফেরানো যেত।
কিন্তু আমাদের বাস্তবিক স্বপ্নগুলোর আকাশছোঁয়া দূরে অবস্থান। এত সম্ভাবনা থাকা সত্তেও আমরা পরে পরে মার খাচ্ছি। রাজনীতিবিদেরা ব্যার্থ তাঁর সাথে আমরাও ব্যর্থ যে কিছুই হচ্ছে না। যারা সিভিল সোসাইটি বলে ভাবে তারাও সব নির্লজ্জ দলজীবি মানুষ। এইদিকে দুই বড় দল সংঘাতের এমন দিকে নিয়ে যাচ্ছে যেখান থেকে ফেরার কোনো পথ নাই। দুই নেত্রী ফোনে কথা বললো, আমরা কত আশায় বুক বাধলাম। কিন্তু শিল্পীর গানটাই যে ধ্রুব সত্য- কি আশায় বাঁধি খেলাঘর, বেদনার বালুচরে। বাংলাদেশ জুড়ে এখন এক ভয়াবহ সময় চলছে। পাওয়ারে না আসতেই শিবির টার্গেট ককটেল প্র্যাকটিস শুরু করছে। পাওয়ারে আসলে তো আওয়ামীলীগের দেখানো গুম খুনের একটা এক্সটেনডেড ভার্সনে টার্গেট কিলিং শুরু হবে। ভাবতে পারছি না, সামনে মনে হয় আরো খারাপ দিন। আবার বাশের কেল্লায় দেখলাম যুবলীগ নাকি বোমা মারে নাম হ্য শিবিরের, নুরুল কবীরকে তারা নতুন যুগের মাহমুদুর রহমান ভাবছে। নুরুল কবীরের বক্তব্য কিংবা টকশো এখন আর শুনি না তাই জানি না তার কি স্ট্যান্ট! তবে আগে দেখতাম উনি দুই দলের বিরুদ্ধেই কথা বলতেন, বলতেন সংঘবদ্ধ নাগরিক ঐক্যের কথা। তাহলে কি তার সংঘবদ্ধ রাজনৈতিক সেই নাগরিক বিপ্লবী দলের নাম শিবির? ভাবতেই কষ্ট লাগে। উনারে ধর্মান্ধ শক্তির তীব্র সমালোচক হিসেবেই জানতাম, কথায় কথায় এরশাদকে গালি দিতেন রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম করানোর জন্য। এখন দেখি এরা দুই দিকেই কাটে এমন করাত। যীশু বলেছিলেন মানুষের উপর বিশ্বাস হারানো পাপ। এখন দেখি বাংলাদেশের নানান পর্যায়ের এলিট এনলাইটেন মানুষ যারা তাদের উপরে বিশ্বাস রাখা আরো বেশী পাপের! আর এখন তো নির্বাচনকালীন ক্রান্তিকাল, এখন সবার মুখোশ কিভাবে জানি খুলে পড়ছে একে একে। এখন মনে হচ্ছে নিরপেক্ষ মানুষের চেয়ে খারাপ লোক আর এই দেশে নাই, কারন গোপনে গোপনে তারা সবাই তুমুল দলীয় ও গোষ্ঠী স্বার্থের মানুষ!
এত বিরূপ সময়েও আমি আশাবাদী মানুষ। কারন এই দেশের মানুষের উপরে আস্থা রাখতেই হবে আমাকে। কাল বিবিসিতে যখন রেশমার সাক্ষাৎকার শুনছিলাম। অবাক হচ্ছিলাম। নতুন পরিবেশ, নতুন জায়গায় নতুন কাজ, কিভাবে জানি মানিয়ে নিয়েছে আজরাইলের হাত থেকে ফিরে আসা মেয়েটা। ধ্বংস স্তুপ এত লাশের মাঝখানেও যারা বাচতে জানে তাদের আর কে ঠেকাবে? আরেক এক্সামপল হতে পারে ক্রিকেট। আমি ক্রিকেট খেলা মাঠে গিয়ে না দেখলেও টিভিতে দেখতে ভালোবাসি অনেক দিন। সমানে যেই দেশ আগে হারতো, ভাবনাই থাকতো কতোটা সম্মানজনক পরাজয়ের। তারাই এখন কি দারুন ভাবে জিতে! খালি সবাই যার যার ভালো খেলাটা দেখাতে পারছে বলেই। আগে যা একজন কিংবা দুইজন দেখাতো। এই বোধটা যদি আমরা নেশনহুডে বানাতে পারি তাহলেই দেশের এমন ক্রান্তিকাল আর আসবে না। এই আমার আশাবাদের জায়গা জমিতে চাষাবাদ। কারন এই দেশের মানুষ এত অসাধারণ যে নিরাশার অন্ধ গোলকেও তারা আশার আলো নিয়ে চলে। এরকম দুর্দমনীয় জনগোষ্ঠীকে আটকে রাখার ক্ষমতা কারো নাই!





আল্লাহ ভরসা
হ আল্লাহই ভরসা!~
চল মিনি আসাম যাবো --- দেশে বড় দু:খরে
(
সাঈদ বলেছেন অল্লাহ ভরসা আর আমি বলি রহিমুদ্দিন/করিমুদ্দিন ভরসা।
চমৎকার পোস্ট। ভাল্লাগছে।
থ্যাঙ্কস বর্ণ, আনন্দ পাই এসব শুনলে!
খুব ভাল লাগলো আশাবাদের চাষাবাদ।
বেশ ভালো লেগেছে, কোন কিছু বিশ্বাস করতে পারলেই তা অর্জন করা সহজ হয়ে যায়। আপনাকে অনেক ধন্যবাদ, আপনি ইতিবাচক ভাবে চিন্তা করছেন, আমরা হাজারো সমস্যার মাঝে থেকেও আশাবাদী বাংলাদেশ একদিন বিশ্বের সেরা দশ জাতির একজাতি হবেই, ইনশাল্লাহ !
আপনাকেও ধন্যবাদ~!
মন্তব্য করুন