অক্টোবরের সিনেমা দেখা দেখি!
সিনেমা দেখতে আমার খারাপ লাগে না এখন আর। আগে অবশ্য কখনোই এত ভালো লাগতো না, কারন টিভিতে কত অপশন রিমোটের ঘুরে ঘুরে কত কিছুতে চোখ বুলানোর সুবিধা। সেই তুলনায় সিনেমা দেখতে হলে পিসি খুলে বসে থাকো। টানা দেখে যাও। তাই দীর্ঘ দিন আমার সিনেমা দেখার জায়গা টেলিভিশনে। টেলিভিশনে সিনেমা দেখার কথা শুনলেই পাবলিক হাসে, বলে উঠে টিভি কি সিনেমা দেখার একটা জায়গা হলো? সব চেয়ে ভালো হয় যদি সিনেমা হল নয়তো কম্পিউটারে। এবার ঈদে সিনেমা গুলো দেখার কথা ছিল হলে বসে তা আর হলো না পলিটিক্যাল হরতাল ও ক্যাচালে। আর সবার হাতেই এখন সময় কম তাই কোনো কাজ করতে গেলে ১০ দিন আগে থেকে প্ল্যানিং করতে হয়। কি কলিকাল এখন, জীবনের নামই প্ল্যান- যা হবে সব কিছুই আগে থেকে ঠিক করা। এরকম পরিকল্পিত দিন পার করতে আমার ভালো লাগে না। তবে লোকজনের ভালো লাগে খুব। তবে আমার মতো এত পরিকল্পনাহী মানুষ হলে বিপদ, সব কিছুই আমি কালকের জন্য ফেলে রাখি। এই পোষ্টের কথাই ধরুন, থার্ড টাইম লিখতে বসলাম। দুইবার লিখেও মুছে ফেলছি। কতো বার আমাকে কামাল ভাই বলছে- মাইক্রোসফটে ওয়ার্ডে লিখো, ভেবে চিন্তে বানান যতি চিন্হ চেক করে সময় নিয়ে লিখো, আমি কোনো কথাই শুনি না লিখতে বসে। এইসব মোটেও ভালো জিনিস না! দুঃখিত ভাইয়া!
এবার চটপট কিছু সিনেমা দেখার আলাপ করি। অক্টোবরে দেখা মুভির ভেতরে প্রথমেই আছে কমলেশ্বর মুখার্জীর বানানো 'মেঘে ঢাকা তারা'। আমার এ বছরে দেখা সেরা বাংলা ছবি, ঋত্বিক ঘটকের জীবনীর কিছু অংশের উপর বানানো। সিনেমাটার স্ক্রিপ্ট, সিনেমাটোগ্রাফী, কাস্টিং, অভিনয়, কাহিনী বিন্যাস সব কিছুই দুর্দান্ত। আর সব চেয়ে দারুন হলো শাশ্বতর অভিনয়। এত ভালো লাগছে সিনেমাটা যে টানা তিনবার দেখছি। এখনো কিছু ডায়লগ মুখস্থ! দেবজ্যোতি মিশ্রের সংগীত ও ব্যাকগ্রাউন্ড এবং সাদা কালো প্রিন্ট সব কিছুই মনে দাগ ফেলে দিলো। আমাকে যদি রেটিং দিতে বলে আমি দিবো পাঁচ এর ভেতরে পোনে পাঁচ, সোয়া কেটে রাখবো সিনেমাটার একটা সমস্যার কারনেই। সেই সমস্যা টা হলো এই সিনেমা দেখে আনন্দ পেতে হলে আপনাকে ঋত্বিক ঘটকের জীবন, তাঁর চলচ্চিত্র সংগ্রাম, সেই সময়কার রাজনীতি ও নাট্য আন্দোলনের ইতিহাস নিয়ে ভালো ভাবে জানতে হবে। একদম না জেনে দেখলে ছবির কিছুই অনুধাবন সম্ভব না। এই সিনেমাতে যখন সলীল চৌধুরীর কবিতাটা পড়ে তখন মাথার রক্ত মনে হয়- নেচে উঠে। কিছুদিন আগে চে সংহতির অনুষ্ঠানে- মাহমুদুজ্জামান বাবুর অনুরোধে কবিতাটা রবীন্দ্র সরোবরে পড়েছিলো শিমুল মোস্তফা। পুরা ধানমন্ডি মনে হয় কেপে উঠেছিল উনার আওয়াজে। এত ভালো লাগছিলো। মনে হয়ে ছিল যে এর চেয়ে মহান আর কিছু হতে পারে না। ইউটিউবে পাওয়া যায় না শিমুল মোস্তফারটা। ব্রততীরটা পাওয়া যায় শুনতে পারেন http://www.youtube.com/watch?v=vLpRYm11kjo
আরেকটা সিনেমা দেখলাম নাম -শব্দ। জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার প্রাপ্ত ছবি। পরিচালক কৌশিক গাঙ্গুলীর এই ছবিটাও দারুণ। একজন ফলি আর্টিস্টের মানসিক টানাপোড়েন ও বিপর্যস্ততার গল্প। একটু বেশী ত্যানা পেচানো ছাড়া ছবিটা সব দিক থেকেই নতুন। ঋত্বিক ছেলেটাকে আমার 'ক্রস কানেকশন' সিনেমা থেকেই ভালো লাগে, এই ছবিতেও দারুণ অভিনয় করেছে। কলকাতার একটা জিনিস এখন খুব ভালো তা হলো নতুন নতুন অনেক ছেলেকে তারা ব্রেক দেয়। এরকম এক্সপেরিমেন্ট বাংলাদেশে এখন আর হয় না। পরিচালক কাম অভিনেতা সৃজিত ও পরিচালকের বউ চূর্ণী গাঙ্গুলী সবার অভিনয়ই ভালো। আরেকটা ছবি দেখলাম এইটাও সেই পরিচালকেরই রিসেন্ট ছবি নাম - কেয়ার অফ স্যার। এই সিনেমাটাও ভালো লাগছে। একজন অন্ধ শিক্ষক ও তার বাল্য শৈশবের দার্জেলিংয়ের স্মৃতি বিজরিত স্কুলের গল্প। দারুণ কাহিনী ও টানটান উত্তেজনাময় ছবি। এই ছবিতেও শ্বাশ্বত চ্যাটার্জীর যা অভিনয়, জবাব নেই তাঁর। তবে এই ছবিতে আমি খুব মিস করলাম অঞ্জন দত্তকে, কারন আমি দার্জেলিংয়ের ছবি মনে মনে আকি উনার গান শুনে শুনেই। সেইদিন বন্ধু জেমস একটা গান দিলো কবীর সুমনের-- সেই গানটাও অঞ্জন দত্ত আর দার্জেলিংকে নিয়েই।
কিছু ভুসি মাল টাইপ কলকাতার ছবিও দেখলাম। তার ভেতরে সবার আগে আছে জিতের ছবি 'বস'। মুম্বাইয়ের বিখ্যাত সিনেমা ট্রেড এনালিস্ট তরুন আদার্শ টুইট করে বলেছেন বাংলা সব চেয়ে ব্যাবসা সফল ছবি নাকি এখন এটা। এই নিয়ে শুরু হলো হাঙ্গামা। রিলায়েন্সের প্রতিপক্ষ ভেংকটেশ দাবী করলো তাদের ছবি 'চ্যালেঞ্জ টু' ই সব চেয়ে ব্যাবসা সফল। দুটো ছবিই তেলেগু সুপার স্টার মহেশ বাবুর দুই খান সিনেমা থেকে কপিরাইট হুবহু। খালি ভাষা আর গান বাদে সব কিছু একি। দেখতেই ভালো লাগে না। দেবের একটা বিখ্যাত ছবি 'খোকাবাবু ৪২০'। এই ছবিটা নকল হলেও দেখা যায়। মাসালা এন্টারটেনমেন্ট হিসাবে যে কারনে মানুষ চেন্নাই এক্সপ্রেস দেখে সে কারনেই দেকগা যায়। তবে এত দিন হয়ে গেল দেবের বাংলা ভাষা এখনো যাচ্ছে তাই। পাবলিক হজম করে কিভাবে? আরেকটা ছবি দেখলাম নাম কাগজের নৌকা, বাজে। ভিক্টর ব্যানার্জী সোমিত্র চ্যাটার্জীদের মতো ভালো অভিনেতাদের দিয়ে আজাইরা এক ছবি বানালো পরিচালক।
এবার আসি হিন্দি ছবিতে। হিন্দি ছবি অনেক গুলাই দেখা হলো। তার ভেতরে সব চেয়ে ভালো লাগলো দুটো সিনেমা মাদ্রাজ ক্যাফে আর লাঞ্চ বক্স। লাঞ্চবক্সের প্রিন্ট ভালো না, তাও দেখে শান্তি পাইছি অনলাইনে। কান ফেস্টিভ্যালে পুরস্কার প্রাপ্ত। ইউনিক একটা গল্প। তবে কিছুটা বোরিং, কিন্তু ইরফান খান ও সিদ্দিকীদের অভিনয় দুর্দান্ত। মাদ্রাজ ক্যাফেও ভালো লাগলো। টানটান উত্তেজনা ময় ছবি, জন আব্রাহামের অভিনয় প্রশংসার দাবী রাখে। তবে পরিচালক এক চোখ কানা টাইপের গল্প বেছে নিছে, স্বাধীনতা সংগ্রামী আর সন্ত্রাসীদের ভেতরে তিনি পার্থক্য করতে পারেন নি। রনবীর কাপুরের ফ্লপ ছবি 'বেশরম' দেখলাম। টিপিক্যাল হিন্দি ছবি। ছবিটাতে রনবীরের অভিনয়ও ভালো। তাও ছবিটা বক্স অফিসে কেন মুখ থুবড়ে পড়লো, বোঝা গেল না। যারা চেন্নাই এক্সপ্রেস দেখে হাতে তালি দেয় তাদের কাছে এই সিনেমাটাও ভালো লাগার কথা। রাজকুমার সন্তোষীর রিসেন্ট ছবিটা দেখলাম। শহীদ কাপুরকে নিয়ে বানানো। সন্তোষী সাব তার সার্কেলেই আটকা, সেই চিরাচরিত কমেডী গুলাই। আমার কাছে খারাপ লাগে নাই। কারন যেই পরিচালক 'আন্দাজ আপনা আপনা' বানাতে পারে তার প্রতি নিরাশ হওয়া ঠিক না। সেই ৯৪ সালে বানানো 'আন্দাজ আপনা আপনা' র কিছু সিনের কথা মনে পড়লে এখনো হাসি পায়। কলেজে আমি আর আবীর দুইজনের প্রায় মুখস্থ ছিল সিনেমাটা। 'জন ডে' নামের এক ছবি দেখলাম, ভালো না। রনদীপ হুদা, নাসিরুদ্দিন শাহ দের মতো অভিনেতাদের দিয়ে পরিচালক কি বানাতে চাইলেন বোঝা গেল না!
হলিউডের সিনেমা দেখছি তিনটা। ম্যান অফ স্টীল, হোয়াইট হাউজ ডাউন আর নাউ ইউ সি মি। তিনটাই লাগলো মোটামুটি। তবে তিনটাই ফ্যান্টাসী ও গাজাখুরী কাহিনীর মুভি। তবে বাজেটের কারনে কিংবা বিপুল আয়োজনের কারনেই আমাদের তা ভালো লাগে। বাংলা হিন্দি সিনেমাতে বাজেট নাই টেকনোলজি কম তাই সেগুলা এরকম হতে পারে না। আমি সাধারন দর্শক। তাই সবার মতোই কলকাতার বাংলা ছবি আর হিন্দী ছবি সহজলভ্যতার কারনে বেশী দেখা হয়। কেউ আবার ভেবে নিয়েন না ভারতের দালাল !





বেশরমের মতো অখাদ্য আমি জন্মেও খাই নাই, সেই তুলনায় চেন্নাই এক্সপ্রেস আড়াই ঘন্টার বেশ যুৎসই বিনোদনই ছিলো .... ১০ মিনিট দেখার পরই আমি বেশরম বন্ধ করে দিসি, জোকারের মতো একটা সিনেমার নায়ক কেমনে এই অখাদ্যের মধ্যে পড়লো আল্লাহই মালুম
শব্দ সিনেমাটা দুর্দান্ত ....
Man of Steel দেইখা মনে হইছে শুধু Man ই আছে , Steel নাই .. হা হা হা!!
সেই চিন্তা করলে বেশারাম আসলেই থার্ডক্লাস মুভি, তাও আমি ভাত খেতে টাইমপাস করতে করতে দেখা!
ম্যানই আছে স্টীল নাই
লাইক করলাম কথাটা!
আমিও বলবো বেশরমের তুলনায় চেন্নাই এক্সপ্রেস যুৎসই বিনোদন ছিল
মেঘে ঢাকা তারা' আহা। এখনো চোখে পানি সেই চিৎকার, "দাদা আমি বাচতে চাই"
-শব্দ --- দেখেছি --- ভাল। নতুন একটা দিক জানলাম
মাদ্রাজ ক্যাফে আর লাঞ্চ বক্স দেখেছি। লাঞ্চ বক্স দেখে মেঘ বলে, একই জিনিসতো দেখাচছে মা সারাখখন। হাজার বাজে ছবির ভীড়ে এগুলোই খানিক শানতি দেয়
ভাই বোনের চয়েজে কি মিল!
জয় বাংলা
ম্যান অফ স্টীল,
হোয়াইট হাউজ ডাউন আর নাউ ইউ সি মি। এই তিনটা দেখেছি। তবে বয়সের কারনে এই সব সিনেমা আর ভাল লাগে না।
তবে বেশ কয়েকবার দেখলাম সল্ট। এখনও জেকি চ্যাং প্রিয়।
মেঘেঢাকা তারা দেখিনি। বাংলা সিনেমা খুব কমই দেখি যদি সিনেমা নাটকের মত হয় তবে দেখি প্যানপ্যানানি প্রেম ফালতু লাগে।
দেখে ফেলান আপু মেঘে ঢাকা তারা, শব্দ ও কেয়ার অফ স্যার। তিনটার ভেতরে দুটো ভালো লাগবে মাস্ট!
"লাঞ্চ বক্স" দেখবো দেখবো করে দেখা হচ্ছে না। "মেঘে ঢাকা তারা" দেখব, ঋত্বিক ঘটক সম্পর্কে আমার জানাশোনা খুবই কম। শুধু মাঝে মাঝে কিছু ব্লগে তার নাম শোনা আর কিছু পোস্টার দেখা ছাড়া তার সম্পর্কে আর কোন আইডিয়া নেই। যদি সময় সুযোগ হয় তবে পড়ালেখা করেই মুভি দেখতে বসব।
অনেক দিন হিন্দী সিনেমা দেখি না !!
"ম্যান অফ স্টিল" আর "নাও ইউ সি মী" দেখা হয়েছে। এভারেজ মনে হয়েছে। তোমার সাথে একমত, শুধু বিগ বাজেটের কারণে দেখতে কিছুটা ভালো লেগেছে।
দেখে ফেলো বাংলা ছবি দুটো, ভালো লাগবে মাস্ট!
থ্যাঙ্কস কমেন্টানোর জন্য!
হিন্দি সিনেমাতে বাজেট নেই কথাটা বোধ হয় ঠিক না
বাজেট তো আছেই মেলা কিন্তু হলিউডের যে বাজেট সেই রকমের নাই
কলকাতার বেশ কিছু আর্ট ফিল্ম অসাধারণ।'শব্দ' এখনও দেখা হয়নি।শীঘ্রই দেখে ফেলব,হরতালে বাসায় বসে বসে ইজি কাজে একটু বেশিই বিজি টাইম যাচ্ছে!
যেহেতু আমার মুভি'র চেয়ে মেকিং এর দিকে নজর বেশি,তাই 'নাউ ইউ সি মি' তে কাহিনীর চেয়ে মেকিংটাই চোখে বেশি পড়েছে।।
দেখেন, খারাপ লাগবে না আশাকরি!
আপ্নের সাথে দেখা কইরা কিছু মুভি নিতে হইব।
মুভি দেইখা রাখেন নাকি ফালাইয়া দেন।
ইন্ডিয়ান বাংলা মুভি আমার সবচাইতে ভাল্লাগছিল বাইশে শ্রাবণ।
অবশ্যই নিয়ে যাও, বাইশে শ্রাবন আমারও প্রিয় মুভি!
'বাইশে শ্রাবণ' এর লিস্টে আমিও আছ....
নাইস
তোমার সিনেমা দেখার ইতিহাস দেখে হিংসে হচ্ছে।

আবার তোমার সময়টাতে ফিরে যেতে পারলে ধুমাইয়া সিনেমা দেখতাম।
মেঘে ঢাকা তারা, শব্দ এবং কেয়ার অব স্যার তিনটাই একটুর জন্য মিস করছি। কিন্তু ট্রেইলর দেখে আমারও খুব ভালো লেগেছে। দেখে ফেলব তাড়াতাড়ি। তবে এত সুন্দর করে লেখার জন্য তোমাকেও অনেক অনেক ধন্যবাদ।
বাকী গুলো দেখা হয়নি। তওমার কথা শুনে লাঞ্চ বক্সটা দেখে ফেলব ভাবছি।
থ্যাঙ্কস আপুনি!
মন্তব্য করুন