আমি গুছিয়ে ঠিক কথা বলতে পারি না, শুধু সময় নিজের গল্প বলে যায়!
শিরোনামটা বেশী আদিখ্যেতার হয়ে গেল। কি আর করা, একটা গানের লাইন পছন্দ হলো তাই দিয়ে ফেললাম নামটা। পোস্ট লিখতে গিয়ে একটু ভাবছি। কারন ঠিক করে রেখেছিলাম পরের কিছু পোষ্ট গুলো শুধু বই নিয়ে লিখবো। প্রচুর বই পড়া হচ্ছে ইদানিং, জমছে চোখের সামনে কিন্তু তা নিয়ে লিখতে পারলাম আর কই? কারন লিখতেই ইচ্ছা করে না আর। লেখার সময় গুলো বন্ধু বাসায় আসছে তাই তার সাথে আড্ডা খিস্তিতেই কেটে যায়। ঘুরে ফিরে দুই বন্ধু শুধু অতীত নিয়ে ঘাটাঘাটি করে সময় কাটে। বন্ধুদের সমন্ধে মুল্যায়ন আর হতাশাতেই দিন যায়, সেখান থেকে লেখার সময় বের করা কঠিন। দুই বন্ধু গল্পের ঝাপি খুললে কথা আর ফুরোয় না। মামা ছিল না বাসায় তাই ঘুম আর আসে না, অজস্র রাত আজাইরা প্যাচাল পেরেই গেল। নিজেদের প্যাচাল ফুরিয়ে গেলে দুই বন্ধুর কাজ একটাই-- রিকশা দিয়ে আবাহনী মাঠ চলে যাওয়া। রাতের বেলা ক্লাব এলিভেনের ফুটবল খেলা দেখা একটা মজার কাজ। আমার বন্ধু আবার ছিল সেই ক্লাবের এককালের স্টার। তার কারনে আমাকেও লোকজন চিনে। ব্যাপক আড্ডা হয় ওখানে গিয়ে। ফিরোজ দোকানে দেখি এখন বাইশ চব্বিশ রকমের চা কফি পাওয়া যায়। তবে আগের মতোই ফাপরবাজ রয়ে গেছে দোকানদার ভদ্রলোক। আবীর ডায়লগ দিলো ফিরোজের নাকি আর বয়স বাড়ে না।
ফিরোজের বয়স না বাড়লেও ক্লাব এলিভেনে নতুন নতুন অনেক ছেলে দেখি আর আসল মেম্বাররা তো আছেই। বেশীর ভাগই ইংলিশ মিডিয়ামের ছেলে। চটচট করে ইংরেজী ভালো বলে শুনতে শ্রুতিমধুর। টেকনিক শার্প ও চেহারায় হাই প্রোটিনের ছাপ। এমনিতে টিভিতে ক্লাব ফুটবল ফলো না করলেও আমি এই ফুটসাল জিনিসটাকে খুব ভালোবাসি। আবীর আগে যখন খেলতো নিয়মিত আসতাম। মনে মনে ভাবি একদিন মুন্না ভাইয়ের মতো আমারও টাকা হবে সেদিন আমিও এমন ফ্লাডলাইটে পোলাপানরে ফুটসাল খেলাবো সংগঠক সেজে। আবাহনী মাঠের ঐ সাইডেই আবার ব্যাডমিন্টনের কোর্ট কাটা অনেক গুলান। তাদের খেলাও জৌলুসময়। কিন্তু দেখার সময় কই, নটার দিকে বাসায় ফিরি এই করে কেটে যায় দিন। চায়ের দোকানে মাঝে মাঝে বসা হয় তবে তা আগের তুলনায় পাঁচ ভাগের এক ভাগ। ভালো দোকান নাই চা খাওয়ার তাই একদম কমিয়ে দিয়েছি চা খাওয়া, দিনে তিন কাপের কমেই চলে যায়। এরকম দিন আসবে ভাবি নাই!
এসব পুরোনো কথা। সবাই জানে, এই প্যাটার্নের একই কথা আগেও বহুবার বলেছি। আসলে আমার প্রধান সমস্যা অন্যকে নিয়ে লিখতে পারি না। কত মানুষ দেখি চারপাশে তাদের কত গল্প আমি জানি কিন্তু তা লেখা হয় না। যেমন ধরেন কাল আমার চোখের সামনে আমার লন্ড্রীওয়ালা তার বাড়ীওয়ালার হাতে দুটো রাম চটকানা খেলো। আমি অবাক হয়ে শুধু তাকিয়ে দেখলাম। সামান্য বিদ্যুৎবিলের উনিশ বিশ হবার কারনে এরকম মাইর ভাবাই যায় না। তাও সবাই বাড়ীওয়ালাকেই তোয়াজ করছে, তিনি ঠান্ডা পানি ও বেনসন খাচ্ছেন ভাব নিয়ে। আমি গেলাম ও কাপড় নিলাম দেখি স্বপন নামের ছেলেটার হাত কাপছে। আমার মনে হলো মানুষের জীবনের এই যে প্রতিনিয়ত পরাজয় তার গল্প আমি বলতে পারি নাই, চেষ্টাও করি না। শুধু নিজে গরুর চাপ ও চা খেতে ভালোবাসি তার ফিরিস্থি দিয়ে ক্ষান্ত হই। কিংবা ধরেন আজ এক ছেলেকে দেখলাম যে কঠিন ইয়াবা আসক্ত টাকা ধার চাইছে বন্ধুর কাছে। বন্ধু দিচ্ছে না আমি পাশে বসে শুধু দেখছি। পুরো একটা ঘন্টা ধরে চেষ্টা তদবির করে সে বন্ধুর কাছ থেকে ৫০০ টাকা নিয়েই চলে গেল। সেই যে ছেলে যার ৫০০ টাকা নিতে এসে মুখে কথার ফেনা তুললো তার গল্প আমি লিখতে পারবো না কোনোদিন। সেই যে মহান বন্ধু যে ফি সাবিলিল্লাহ উদারতায় বন্ধুকে টাকা ফেরত আর পাবে না জেনেও দিল তার কথা তো লিখতে ভুলেই গেলাম। এইভাবেই সময় চলে যায়, গুছিয়ে লেখা হয় না কিছুই।
সবচেয়ে ভয়াবহতম ঘটনা ঘটেছে গত পরশু। এক যুবক জানি না কি খেয়েছে না খেয়েছে, পচা খালে নেমে গলায় শুধু নতুন কেনা ব্লেডের পোচ দিয়ে স্বেচ্ছায় রক্ত ঝরাচ্ছে। দুই পাশে দুই হাজারের উপর মানুষ এই কান্ড দেখছে। তার বউ এসে শত অনুনয় বিনয় করছে থামার। কিন্তু উন্মাদের মত খালি পোস দিয়েই যাচ্ছে। রক্তে পুরো গেঞ্জী ভিজে যাচ্ছে। শেষে দুই লেবার নেমে তাকে কোনো রকমে উপরে উঠালো। এমনিতেই শীতে খালে পানি কম গন্ধ বেশী তার ভেতরে গলায় এলোপাথাড়ি পোছের দাগে এক বীভৎস রুপ! তা দেখার জন্য লোক ভেঙ্গে পড়েছে, পাশে যে চার্চের স্কুল তার কেবল ছুটি হলো তাই শত শত স্কুল বাচ্চা তা দেখছে। আমি দূরে তাকিয়ে খালি দেখছি, কেউ হাসপাতালে নিচ্ছে না সেই উন্মাদের প্রায় সেন্সলেস অবস্থা। আমি শেলী সাহেবকে বললাম রিকশায় করে পাঠিয়ে দেন, গলায় গামছা পেচিয়ে। তাই হলো তার এক আত্মীয়কে দিয়ে তাকে পাঠানো হলো। জানি না এরপরের অবস্থা কি? আমি বাসায় ফিরে ভাবলাম কিসের এত দুঃখ যে সাধের গলা কাটতে চায় নাকি কিছু খেয়ে মস্তিষ্ক ঠিক নাই তাই এমন করছে। তবে আমি কোনো পাবেই সেই নীল গেঞ্জী পড়া কালো যুবকের রক্তমাখা গলার কথা ভুলতে পারছি না। বারবার খালি ভেসে উঠে মুখ। তার জীবনের ইতিহাস আমি জানি না তার গল্পও আমি বলতে পারবো না ঠিকভাবে।
এইভাবে অসংখ্য ঘটনা ও চরিত্রের গল্প আমার আশেপাশেই থাকে তাদের গল্প আমার বলা হয় নি। মাঝে মাঝে মনে হয় লিখছি না কেন এসব নিয়ে, আবার মনে হয় ঠিকই আছে আমি তো গল্পকার নই যে লিখতে হবে। আসলে সবার জীবনের দিনযাপনে অসংখ্য গল্পের ভিতরেই যায়, খুব কম মানুষই তা স্বার্থক ভাবে বলতে পারে। তাই আমি সংখ্যাগুরুর দলে যারা স্রেফ শুধু নিজের কথাই বলে যায় আর দেখে যাই চারদিক। আর এমনিতেই আমার একটা সমস্যা তো আছেই তা হলো গুছিয়ে সাজিয়ে কথা বলতে পারি না এবং লিখতেও পারি না। সাধারণত আত্মীয়স্ব্জন বন্ধু বান্ধবদের সাথে মানুষ যে সুন্দর রস রসিকতায় কথা বলতে পারে আমি সামান্য সেটাই পারি না। যেসব কমন কথা বললে মানুষ খুশি হয় তাও বলা হয়ে উঠে না। মোবাইলটাও নষ্ট আগে এসেমেস লিখতাম ঝটপট এখন তাও করি না। তাতে একটা সমস্যা হচ্ছে ক্রমশ বন্ধুর সংখ্যা কমছে। আগে যারা নৈকট্য বোধ করতো তারা কেমন জানি ছাড়াছাড়া হচ্ছে। জানি না কেন এমন হয়, হয়তো এটাই মানবজীবনের পরিনতি। দেশের অবস্থা তেরোটা,বিসিএসের রেজাল্ট দেয় না, নতুন বিসিএসের ডেইট নাই, রাজনৈতিক ঢামাডোলে অস্থির দেশে চাকরী বাকরী নাই কোথাও, আর হচ্ছেও না এই নিয়ে চিন্তায় থাকি। চিন্তার শেষ নাই। কিন্তু বাহিরে সবাইকে জানাই আমি খুব সুখে আছি, লোকজন হিংসে করে আমি শুধু মনে মনে হাসি আর অপঠিত বইয়ের ভেতরে ও ফেসবুকে থেকে বেঁচে থাকার আশ্রয় খুঁজি!





দুরের মানুষ কাছে আসে, কাছের মানুষ দুরে সরে - এটাই জগতের নিয়তি , অল্প কিছু সম্পর্ক ছাড়া বাকি সব সম্পর্কই হচ্ছে ক্ষণিকের .. সম্পর্ক গড়ে , সম্পর্ক ভাঙ্গে , পুরানো সম্পর্কের জায়গা পূরণ করে নতুন সম্পর্ক ....
দারুণ সত্য কথন। ভালো থাকেন ভাইয়া!
খুব বাজলো এ কথাটা শানত। বড় হয়ে যাওয়া মানে কিছুটা একা হয়ে যাওয়া, এর মধ্যে সুখের কিছু আসলে নাই
কিছুই করার নাই আপু জীবনের নাম বেদানা!
এমনই হয়। একসময় দেখবা সবাই ব্যস্ত, কারো জন্য কারো সময় নেই।

ঠিক কথা!
অনেক দিনের ভেতর সবচাইতে সার্থক শিরোনামের লেখা।
যদিও টুকরো কিছু ঘটনা বেশ কিছুটা আওলে দিল -
তবুও বলব লেখাটা ভালো হইছে। মাঝে মাঝে এরকম আরও লেখা দিয়েন কিছু।
ভালো থাকেন সুপ্রিয় শান্ত ভাই। অনেক ভালো, সবসময়।
থ্যাঙ্কস বর্ণ, ভালো থেকো!
এখন বন্ধুর সংখ্যা আরও কমে যাবে, বেড়ে যাবে ব্যাস্ততা মাঝে মাঝে দীর্ঘ শ্বাস সম মনে হবে আমিও ছিলাম।
মন্তব্য করুন