সবার পড়া বনফুলের গল্প!
'শ্রেষ্ঠ' এই শব্দটার ব্যাবহার আমার ভালো লাগে না। ভালো কিংবা সেরা বলা যায় কিন্তু কোনো জিনিসকে এত সহজে শ্রেষ্ঠ বলতে ইচ্ছা করে না। কারন শ্রেষ্ঠ বলার সাথে সাথেই বাকী সব গুলোকে তুচ্ছ ঘোষনা করতে হয়। আর সাহিত্য, নাচ, গান, সিনেমা যাই হোক আর্টফর্মের কোনোকিছুই শ্রেষ্ট বলে রায় দেয়া যায় না। কারন সব কিছু সময় নির্ধারন করে, আজ যা শ্রেষ্ঠ কাল সেটা অতি সাধারণ ব্যাপার বলে হয়ে যেতে পারে। তবুও আমরা শ্রেষ্ঠ বলি, রায় দেই অমুক জিনিসটা সবার সেরা। ঠিক তেমন বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্রেরও চিরায়ত বাংলা গ্রন্থমালা সিরিজের অসংখ্য বই আছে যা পাঠকদের সুবিধার জন্য ঘোষনা দেয়া যে অমুক লেখকের শ্রেষ্ঠ গল্প বা কবিতা সুলভ সংস্করণে। পাঠকদের জন্য সুবিধা যে তারা বিখ্যাত সব লেখকদের কিছু ভালো লেখা এক বইতেই পাওয়া যায়। আমার এক বন্ধু ছিল নাম মাইনুল। ওর কাছে আমি খুব থ্যাঙ্কফুল কারন ওর বড় বোনের এইসব বইয়ের ছিল আড়ত, আমি নিয়ে নিয়ে পড়তাম আর তাতে ক্লাস টেন এলিভেনেই আমার প্রচুর বাংলা ক্লাসিক জিনিস পড়া শেষ না হলেও কিছুটা পড়ে ফেলা হয়েছিল।
বনফুলের গল্প কম বেশী সবারই পড়া। আমারও পড়া ছিল আগেই। এখনকার ছেলে মেয়েরা তা পায় কি না জানি না, আমাদের সময়েও বাংলার সাথে একটা গল্পের বই ছিল। ফাইভ সিক্স সেভেন এইটে, যেই গল্প গুলো থেকে ২০ নাম্বার করে আসতো। সেই বইয়ের উসিলায় শওকত ওসমান, বনফুল, জসিমুদ্দিন, রবীন্দ্রনাথের কিশোর সুলভ গল্পের সাথে পরিচয়। আমি ছিলাম আরেক কাঠি সরেস। শুধু নিজের ক্লাসের বই ই না, উপরের ক্লাসের এই গল্পের বই গুলাও পড়ে শেষ করে দিয়েছিলাম। এই যে এখন পড়তে ভালো লাগে তার কিছুটা অবদান এই সব বইকেও দিতে হবে। এইতো কিছুদিন আগে চিটাগাংয়ে যখন গিয়ে ছিলাম তখন কামরুল আমাকে কিনে দেয় 'বনফুলের শ্রেষ্ঠ গল্প' বইটা। আমি তাকে জানাইনি যে বনফুলের অনেক গল্পই আমার আগে পড়া। খালি মুগ্ধতার ভান করেছি, যেই জিনিসটা আমি খুব ভালো পারি। বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্রের চিরায়ত বাংলা গ্রন্থমালা সিরিজের বই, দাম কম। আহমাদ মাযহার সম্পাদিত। উনার পারসোনালিটির মতই পরিপাটি একটা ভুমিকায় বনফুলের গল্প সমন্ধে বলা আছে শুরুতেই। ভুমিকাটা খুব ভালো লাগবে যদি মন দিয়ে পড়া যায়। কেন কল্লোল যুগের সমসাময়িক এক গল্পকার এত আধুনিক ভাবনার যুক্তিগ্রাহ্য ও মানবিক বোধসম্পন্ন ছোটগল্প লিখতেন তার ব্যাখা দেয়া আছে। তাঁর গল্পের মুন্সীয়ানা ও ঠাট্টা তামাশা নিয়েও দারুণ ভাবে রেফারেন্স দেয়া আছে। পড়তে বেশ লাগে। মোট ৩৫ টা গল্প আছে তাঁর মোট ডজন খানেকের উপর গল্প গ্রন্থ থেকে!
বনফুল ওরফে বলাই চাঁদ মুখোপাধ্যায়ের গল্প নিয়ে আর কি বলবো। পানির মত সরল সব গল্পের বর্ননা। কিছু গল্পের আকার অত্যন্ত ছোট। এক কালে বাংলা ব্লগে অনুগল্প লেখার বিপ্লব ঘটেছিল, এখন তেমন কাউকে আর লেখতে দেখি না। আমারে মনে হয় বাংলা অনুগল্পের জনক হলো বনফুল। তাঁর গল্পের আরেকটা আশ্চর্য শক্তি আছে তা হলো মানবিক চোখ দিয়ে দেখে মানুষের জীবনের নানান বিচিত্র অবস্থা নিয়ে পরিহাস করা। পরিহাস, তামাশা, ব্যাঙ্গ এই সবে বনফুল অনন্য। গল্পের শেষ মুহূর্তে এমন একটা ধাক্কা খাবেন যে আপনার মুগ্ধ হওয়া ছাড়া আর কিছুই করার থাকবে না। ঠিক বলতে পারবো না তবে আমার ধারনা ডাক্তার হবার কারনেই তিনি হয়তো এই প্রতিভা টা পেয়েছেন। তার গল্প সেই কবেকার, কিন্তু চরিত্র গুলো এতটাই কাছাকাছি যে পাঠকের মনে হবে খুব চেনা জানা দেখা সব গল্প এগুলো। তাঁর কিছু গল্পের একটা মজার ফিচার হলো তা সাধু ভাষায় লেখা। সাধু ভাষায় হাস্যরস কিংবা করুনার গল্প এমন সুন্দর হতে পারে তা আমার জানা ছিল না আগে। আরেকটা ভালো জিনিস হলো এই বইয়ের গল্প সিলেকশন খুব ভালো। প্রত্যেকটা গল্পই লেখকের প্রতি তাঁর গল্পের প্রতি ভালোবাসা বাড়িয়ে দেবে। আমি কোনো গল্পের নাম বলছি না। কারন কোনটা ছেড়ে কোনটা বলবো! সব গল্পই খুবই উপভোগ্য, আমি এখন হন্যে হয়ে খুজছি বনফুলের সব গল্পের সমগ্র। পেলে অসাধারণ একটা ব্যাপার হতো। আমার একটা সমস্যা হলো- একদিকের ঝোক হারিয়ে আরেকদিকে যাই ক্রমশ, তাই যা শেষ করবো তাই লাভ।
যারা বইটি পড়েন নি কিংবা বনফুলের গল্প পড়া হয় নি তেমন, তাদের জন্য বেষ্ট চয়েজ এই বই। কমিশন বাদ দিয়ে বইয়ের দাম মাত্র ১৪০ টাকা। এই বাজার মুল্যে ১৪০ টাকা দিয়ে কিছুই হয় না। তাজমহল রোডের হামজা রেস্টুরেন্ট ও বার বি কিউতে একটা সামান্য চিকেন টিক্কার দামই ১৪০ টাকা। একটা মুরগীর এক চতুর্থাংশ। পরোটা কিংবা নান, মাউন্টেন ডিউ কিংবা লাচ্ছির দামতো বাদ ই দিলাম!





অনেক আগে পড়েছি, শান্ত বইটা আমার জন্যে রেখে দিও।
আলোচনা অসাধারণ হয়েছে
অবশ্যই রাখবো আপু!
আলোচনা ভাল হয়েছে। বই কিন্তে উৎসাহি করে লেখাশেষ প্যারাটা য় মজা পেলাম। বইটা সেই এস এস সি পরিক্ষা দিয়ে পড়েছিলাম। প্রায় ৩০ বছর আগে।
ওরে বাবা সত্যি ৩০ বছর আগে এসএসসি দিছেন?
বনফুলের প্রতিটি ছোট গল্পই দারুন
আসলেই দারুণ!
তোমার এই ধরনের লেখাগুলোর আমি একজন ভক্ত
আলোচনা দারুণ লাগলো। বইটি সংগ্রহ করার চেষ্টা করব।
থ্যাঙ্কস ভাইয়া!
এই রকম লেখা পড়তে অনেক ভাল লাগে। প্লিজ চালিয়ে যান.।.।
ধন্যবাদ ও অশেষ কৃতজ্ঞতা!
অবশ্যই লিখবো!
মন্তব্য করুন