ইউজার লগইন

অবরুদ্ধ নগরের ছাপোষা দিনলিপি!

অবস্থা বিশেষ সুবিধার না, কিছুই ভালো লাগে না এই থমথমে অবরোধের দেশে। সব কিছুই বোরিং লাগে, আর আনন্দময় সময় যাদের সাথে আগে উদযাপন করা হতো তারাও নাই। আগে কথায় কথায় বাইরে খেতাম ঘুরতাম তাও এখন বন্ধ। বাইরে খেতে গেলেই মেজাজ খারাপ লাগে। মুখে রুচি নাই। আর কোথাও যেতেও ভালো লাগে না। ক্রমশো একা হয়ে পড়ছি কেমন জানি। তা টের পাই বেশী দিনের বেলায়। নিজের ভালো একটা অভ্যাস ছিল ভোরে উঠার তা তো হারালাম, নয়টা দশটায় উঠি ভয়াবহ দুঃস্বপ্ন দেখে। সপ্তাহে সাতদিনের ভেতরে তিনদিনই আমার এরকম খারাপ স্বপ্ন দেখে ঘুম ভাঙ্গে। ভাগ্যিস স্বপ্ন সত্যি হয় না হলে কি যে এক দুর্বিষহ জীবন হতো তা ভাবি। কতো দোয়া কালাম পড়ে ঘুমাই, কাজ হয় না কিছুতেই। আম্মুকে যদিও বলা হয় না, বললেই বলবে নামায ঠিক মতো পড়। কিন্তু নামায পড়িলেই সব সমস্যার সমাধান নাই। স্বপ্ন সম্পর্কিত আমার জটিলতা অবশ্য নতুন না, আগেও হয়েছে। কিন্তু মেজাজ খারাপ কমাতে পারে নাই এই অভ্যস্ততায়!

আরেকটা নতুন সমস্যা হলো বন্ধুহীনতা। বিশেষ করে দিনের বেলাটা বিশ্রী রকমের বাজে কাটে। এমনিতেই এইসব স্বপ্ন টপ্ন ভুলিয়ে দিতে দরকার ভালো আড্ডাময় দিন তাই হচ্ছে না আজকাল। এই শীতের রোদে একা একা যাই, বারেক সাহেবের আনহাইজিনিক চা গিলি কাউকে খবর দেই না- কেউ আসেও না। পুলক কোর্টে যায়, এহতেশাম ও আদনান অফিসে। আর ছোট ভাইরা সারা রাত টিভি দেখে ও গেইম খেলে টায়ার্ড, পরে পরে ঘুমাচ্ছে। উঠে তিনটায়, আমি এক হতভাগা যে বুয়ার বানানো জঘন্য আলুভাজি দিয়ে রুটি খেয়ে হাটতে হাটতে চলে যাই এবং পছন্দ করি না এমন চায়ের দোকানে বসে থাকি। কেউ আসে না যদিও বারেক সাহেব আমাকে অনেক স্নেহ করে, আমার জন্যই খুলনার শহরের গল্প তিনি করে, আজ থেকে পচিশ থেকে ত্রিশ বছর আগের মোহাম্মদপুর ধানমন্ডি কেমন ছিল তার আলাপ শুরু করে দেয়। তিনি ভালো করেই জানেন এইসব ব্যাপার নিয়ে শুনতে আমার খুব ভালো লাগে। তাও সঙ্গবিহীন একা একা এইসব গল্পও এক সময় বোরিং লাগা শুরু করে। বারেক সাহেব ও আমার শৈশবের বেড়ে উঠার জায়গা খুলনার খালিশপুর, চরের হাট, নিউজপ্রিন্ট মিল, গোয়ালখালী বয়রার গল্প শুরু করে দেয়। উনার বাবার বাড়ী ওখানে ছিল তাই এগুলা জায়গা নিয়ে উনার চেনা জানার পরিধি লম্বা চওড়া, শুনতে ভালো লাগে। কিন্তু এই দুঃস্বপ্নের সকাল গুলোতে তা শুনতেও ভালো লাগে না। তবে বারেক সাহেব কথা থামায় না, বাগেরহাটের পীর, বরিশালের হাসনাতের রাজনীতি, ঢাকার শীর্ষ সন্ত্রাসীদের জীবন লিপি সব নিয়ে কথা বলে। আমি ভালো গল্পকার না, যদি হতাম তাহলে উনার প্রতিদিনের গল্প নিয়েই অসাধারণ সব ব্লগ লেখা যায়। এই ব্যাস্ত চায়ের দোকানে উনি যে আয়েশী ভঙ্গিতে গল্প জুড়ে দেয়, তখন মনে হয় বারেক সাহেব যদি ব্লগার হতো তাহলে কত নাম করতো। গড়পড়তা মানুষরা এত এত সুন্দর আলাপ জুড়ে দেয় যা অনেক শ্রেষ্ঠ গল্প পড়ার চেয়েও আনন্দের। তবে বারেক সাহেবের এই অতি কথন রোগ অন্য কেউ ভালো চোখে দেখে না। তার বউ আসলেই বলে উঠে 'প্যাচাল থামান, আর কত পারবেন! অন্য লোকেরা বলে এই বাচালের অপরিস্কার দোকানে বসেন কেন মামা? আমি কিভাবে বুঝাই, বারেক সাহেবই একটু ভালো চা বানায় আর আমাকে বুঝে গল্প করতে জানে। আমি চিরটা কাল গল্প শোনার মানুষ।

রাতের দিকে অবশ্য সবাই আসে তখন তাদের সাথে আড্ডা মারতে আমার ভালো লাগে না। গেলে দম মেরে বসে থাকি চুপচাপ। গায়ে পড়ে সবাই কথা বলতে আসে তখন কথা বলি, এছাড়া না। তবে পরিস্থিতি বদলে যায় আমি, জেমস আর পুলক বসলে। আমাদের গল্পের আওয়াজে অন্যরা চুপ থাকে। মনের হাউশ মিটিয়ে আলাপ করি। বিচিত্র বিষয় নিয়ে, আম আদমী পার্টি ও শিলা দীক্ষিত থেকে শুরু করে দেশের রাজনীতি, আর্মি দের গালি দেয়া না দেয়া, বই পুস্তক, কবীর সুমনের গান, গোপন প্রেমে ধরা খাওয়ার গল্প, আনন্দলোকের বাংলা বানান, রক নেশনের কনসার্ট সব কিছু নিয়েই। কিন্তু প্রতিদিন তো আর ভালো ভুড়িভোজ হয় না তাই প্রতিদিনেও আমাদের সবার টাইমিং মিলে আড্ডা হয় না। তবে একটা কাজ নিয়মিত করতেছি গত চার দিন যাবত- শান্ত ভাইয়ের ছোট ভাই মুনতাসীরকে ট্রমা সেন্টারে গিয়ে দেখে আসা। সেও এক বিচিত্র জায়গা সন্ধ্যার পরে। যাবতীয় যত হাত পা ভাঙ্গার রোগী সব দেখি ওখানে। একটু দুরেই পঙ্গু হাসপাতাল তাও এত গলা কা্টা দামের হাসপাতালে রোগীর কমতি নাই। মুনতাসীরের এক্সিডেন্টটা মারাত্মক, আমরা গেলেই সব সময় ওখানে হাসির হাসির কথা বলে। মুনতাসীরদের জেনারেশণরা কিভাবে শর্ট ফর্মে ইংরেজী বলে, তা নিয়ে ঠাট্টা মশকরা করাই আমাদের কাজ। তার ভেতরে মুনতাসীরের আব্বা কেবিনের দরজায় নোটিশ টাঙ্গিয়েছে তাও নিয়ে হাসাহাসি চলে। রোজ মুনতাসীরকে তার কলেজের বন্ধু বান্ধবরা এত দেখতে আসে তাই নিয়ে আংকেল বিরক্ত। আমরা অবশ্য দেখতে গেলেই মুনতাসীরের বোন বলে উঠবে আপনারা তো পরিবারের লোক, আর ম্যাজিস্ট্রেট সাহেব আমার ভাইকে দেখতে আসে এতো আমাদের ফ্যামিলীর কপাল। ইদানিং আমার নতুন নাম হইছে ম্যাজিস্ট্রেট, বিসিএসে পাশ দিলেই তাদের ধারনা হয় ম্যাজিস্ট্রেট হয় না হলে পুলিশ নয়তো কাস্টম অফিসারে। কি যে বিপদ, নিয়োগের খবর নাই- সরকারের উত্থান পতন কিছু না হয়েই আমার নাম হয়ে গেল ম্যাজিস্ট্রেট। বেশী বেশীর এই দেশ সবাই খালি বকে যায়, খালি কাজের বেলাতেই ঠনঠন।

দেশের অবস্থাতো ভালো না, দিনে দিনে আরো খারাপ হচ্ছে। পুলিশের সাইরেন বাজিয়ে গাড়ী যায় আরেকদিকে ককটেল ফুটে যায় অবিরত। কি একটা অবস্থা, জঘন্য এক সময়। কেউ ভালো নাই, ভালো থাকতে পারেও না। তাও সবাই ভালো থাকার ভান করে, গান শুনে আড্ডা দেয়, ফেসবুকে ট্রল পড়ে হাসে। ভারতে আম আদমী পার্টি কিভাবে আসন পাচ্ছে, আমরা কি কোনোদিন বিএনপি আওয়ামীলীগের বাইরে এরকম কোনো জনপ্রিয় পার্টি পাবো? হয়তো পাবো ততদিনে বাংলাদেশই নিঃশেষ হবে নয়তো আমাদের জেনারেশন আর থাকবে না দুনিয়ায়। কবরে আযাব খেতে খেতে হয়তো জানতে পারবো দেশটা এখন অনেক ভালো আছে, তার আগে না। তাও আমি আশাবাদী যে আমরাই কাদের মোল্লার ফাসীর রায় শত সংঘাতেও দিয়ে যেতে পেরেছিলাম, একাত্তরের দেশীয় ঘাতকদের ফাঁসীর দাবীতে যে মানুষের ঢল নেমেছিল তা শেষ পর্যন্ত বিলং করেছিলাম।

জীবনকে আমরা মহান জীবন বানাই, কিন্তু জীবন মোটেও মহান কিছু না। বিশেষ করে আমাদের মত সুশীল নিম্নমধ্যবিত্তদের জন্য। টাকা এত দরকার তাও জীবনটা এখনো পরের উপর নির্ভর করে চলতে হয়। আমাদের মত অলস যারা জীবনে শুধু গল্প শুনে ও বলেই কাটিয়ে দেয় তাদের জন্য জীবনটা শুধুই গল্পের জায়গা। কিন্তু নির্ভার ভাবে গল্প করাও এখন সুদুরপরাহত ব্যাপার। মামাকে পাওয়া যায় না স্বভাবতই, বিবাহের পরে অনেক কিছুতেই মামা ব্যাস্ত। ভালো বই নাই বাসায় সব পড়া শেষ, রকমারীতে বই অর্ডার দিয়ে বসে আছি কিন্তু অবরোধে বই আর আসে না। আড্ডা দেয়ার লোক নাই, আর যখন পাওয়া যায় তখন নিজেরই ভালো লাগে না। সব কিছুই কেমন জানি নাগালের বাইরে আমাদের চলে যাচ্ছে। এসেজ দেখতে বা ভারতে নাকানি চুবানী খাওয়ার খেলাও দেখতে ইন্টারেস্ট পাই না। ইন্টারনেটে খালি ইংলিশ রোমান্টিক কমেডি মুভি দেখি আর হাপিত্যেশ করে ভাবি আমাদের জীবনের জটিলতা আর তাদের জীবনের জটিলতা রাতে আর দিনে ফারাক। বন্ধুদের টাকা পয়সার ঘাটতি ধার চায়, দিতে পারি না। বিশ্রী এক অবস্থা। টাকা ধার দিতে পারা অনেক আনন্দের ব্যাপার, আমি তা পারলাম না। খালি নিয়েই গেলাম পরিবার ও মানুষের কাছ থেকে। এই ভাবেই চলছে দিন, বেঁচে আছি এইটুকুই আপাতত বলা যায়!

পোস্টটি ১৩ জন ব্লগার পছন্দ করেছেন

টুটুল's picture


জীবনকে আমরা মহান জীবন বানাই, কিন্তু জীবন মোটেও মহান কিছু না।

একদম খাটি কথা Smile

আরাফাত শান্ত's picture


ধন্যবাদ ভাইজান!

রাতিফ's picture


ভালো লাগলো লেখাটা ।

জীবন অবশ্যই মহান। "মহান" ব্যাপারটার উপলব্ধি তখনই হয় যখন জীবনকে জীবনের মতো করে treat করা যায় ... বহু কারনেই অনেকের জীব্দদশায় তা হয়ে ওঠে না হয়তো ... কারণগুলোকে ব্যক্তি-নিয়ন্ত্রিত অথবা ব্যক্তি-অনিয়ন্ত্রিত দুভাবেই বিশ্লেষণ করা যায় ..

জীবনের এই মহান ব্যাপারটাকে উপলব্ধি করার জন্য সফল হওয়া কোনও ভাবে জরুরী নয় একজন অতি মাত্রায় অসফল মানুষও সময়ে জীবনের মাহাত্মটাকে উপলব্ধি করে থাকতে পারেন। কে জীবনকে কীভাবে বিশ্লেষণ করছেন তার উপরই মূলত নির্ভর করে জীবনের মাহাত্ম কে ধরতে পারা , যদিও ব্যাক্তিগত ও সমষ্টিগত সাফল্য ব্যর্থতা অনেক ক্ষেত্রেই জীবনের সামগ্রিক রস ও অর্থ আহরণে ব্যাপক প্রভাব বিস্তারি ভুমিকা পালন করে ।

তবে জীবন অবশ্যই "মহান"।

আরাফাত শান্ত's picture


আপনার বিশ্লেষনটাও ভালো লাগলো ভাইয়া। থ্যাঙ্কস এ লট!

সামছা আকিদা জাহান's picture


চরম ভাবে অবরুদ্ধ আমি। দিন রাত বাড়িতে কোন কাজ নাই অফিস একে বারারেই বন্ধ। কবে ইলেকশন হবে তার পর কাজ শুরু হবে। আমি এখন সম্পূর্ন গৃহবন্দি। সারাদিন যে ঘুরে বেড়ায় তাকে বাড়িতে বসে থাকতে হলে তা যে কি পরিশ্রমের তা শুধু ভুক্তভোগী বোঝে।

আরাফাত শান্ত's picture


ঢাকায় আইসা পড়েন, আড্ডা মাডডা দেই!

নিভৃত স্বপ্নচারী's picture


এই অস্থির সময়ের কবে যে অবসান হবে? Puzzled Puzzled

আরাফাত শান্ত's picture


জানি নারে ভাইয়া!

মীর's picture


ভালো সময় কাটতেসে। একসময় হয়তো এই সময়ের জন্য আক্ষেপ হবে।

১০

আরাফাত শান্ত's picture


হইতে পারে। আপনার দিনকাল কেমুন যায়?

১১

জ্যোতি's picture


ইদানিং আমার নতুন নাম হইছে ম্যাজিস্ট্রেট

Big smile ম্যাজিস্ট্রেট সাহেব, বেশীরভাগ মানুষের দিনকালই ইদানীং খারাপ কাটছে। তুমি তো তাও চায়ের দোকানে যাও, গল্প শোন, আর আমি বাসায়ই থাকি বেশীরভাগ সময়, বোরিং নিউজ দেখি টিভিতে, মোবালই টিপাটিপি করি....বিরক্তিকর সময় কাটাই। Sad
বাইরে যদি বের হতেই হয় আতংকে থাকি যে ঠিকঠাক ফিরে যাব তো আবার! এই দেশে এমন আতংক নিয়ে দিন কাটাতে হবে কখনও কল্পনাও করিনি।

১২

আরাফাত শান্ত's picture


দিলেন তো খোচা তাও কথা মন্দ বলেন নাই, আপনার চেয়ে দিন ভালোই যায়। আপনার দিনও ভালো যাক আপু!

১৩

তানবীরা's picture


আমি ভালো গল্পকার না, যদি হতাম তাহলে উনার প্রতিদিনের গল্প নিয়েই অসাধারণ সব ব্লগ লেখা যায়। এই ব্যাস্ত চায়ের দোকানে উনি যে আয়েশী ভঙ্গিতে গল্প জুড়ে দেয়, তখন মনে হয় বারেক সাহেব যদি ব্লগার হতো তাহলে কত নাম করতো। গড়পড়তা মানুষরা এত এত সুন্দর আলাপ জুড়ে দেয় যা অনেক শ্রেষ্ঠ গল্প পড়ার চেয়েও আনন্দের।

শান্ত লিখে ফেলোতো ঐ গলপগুলো। আমরাও জানতে চাই

১৪

আরাফাত শান্ত's picture


ওগুলা গল্প কিভাবে লিখবো তা আমার জানা নেই! চেষ্টা করবো আপনি বলছেন বলে কথা!

১৫

বিষণ্ণ বাউন্ডুলে's picture


নিষ্ফলা শ্রেষ্ঠ সময়ের ফসল ঘরে তোলা শুরু হয়ে গেল, ঐ সিরিজের একটা নতুন পর্ব দেয়া যায় না ভাই?

১৬

আরাফাত শান্ত's picture


রাতে লিখবো দেখি। কেমন আছো বর্ণ?

মন্তব্য করুন

(আপনার প্রদান কৃত তথ্য কখনোই প্রকাশ করা হবেনা অথবা অন্য কোন মাধ্যমে শেয়ার করা হবেনা।)
ইমোটিকন
:):D:bigsmile:;):p:O:|:(:~:((8):steve:J):glasses::party::love:
  • Web page addresses and e-mail addresses turn into links automatically.
  • Allowed HTML tags: <a> <em> <strong> <cite> <code> <ul> <ol> <li> <dl> <dt> <dd> <img> <b> <u> <i> <br /> <p> <blockquote>
  • Lines and paragraphs break automatically.
  • Textual smileys will be replaced with graphical ones.

পোস্ট সাজাতে বাড়তি সুবিধাদি - ফর্মেটিং অপশন।

CAPTCHA
This question is for testing whether you are a human visitor and to prevent automated spam submissions.

বন্ধুর কথা

আরাফাত শান্ত's picture

নিজের সম্পর্কে

দুই কলমের বিদ্যা লইয়া শরীরে আমার গরম নাই!